তুমি কোথায় ॥ জয়েস ক্যারল ওটস | চিন্তাসূত্র
৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ | বিকাল ৪:৫৮

তুমি কোথায় ॥ জয়েস ক্যারল ওটস

অনুবাদ: মোস্তাফিজ ফরায়েজী
তার বউ ওপরতলায়, সে নিচতলায়; অথবা সে ওপরতলায়, বউ নিচতলায়—যে যেখানেই থাকুক না কেন, সে তার বউকে ডাকাডাকি করে। মোদ্দাকথা সে বাড়ির যেখানেই থাকুক না, সময়টা যখনই হোক না কেন, বউকে ডাকা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তার ডাক শুনে তার বউ যদি উত্তর দেয়, হ্যাঁ? কী হলো? তারপরও সে তাকে একনাগাড়ে ডাকতে থাকবে, হ্যালো? তুমি কোথায়? ভাবটা দেখলে মনে হবে, সে তার বউয়ের দেওয়া উত্তর শুনতেই পায়নি, কথাটা মিথ্যেও নয়। ডাক শুনে বউ তার কাছে দ্রুত ছুটে আসা ছাড়া উপায় থাকবে না। তার স্বামী যেখানেই থাকুক না কেন সেখানেই সে ছুটে আসবে। নিচতলায়, ওপরতলায়, পাতালঘরে অথবা বেলকনির বাইরে; সে যে জায়গাতেই থাকুক না কেন, তার বউ এসে শান্তভাবে বলবে, কী হয়েছে? বলো! সে তার জিজ্ঞাসা করবে, এটা কী? এই ক্ষুদ্র প্রশ্নটি হতে পারে অভিযোগমূলক, পর্যবেক্ষণমূলক, অভিজ্ঞানমূলক কিংবা অনুসন্ধানমূলক।

এখানেই শেষ নয়, এর কিছুক্ষণ পর বউটি পুনরায় জরুরি তলব শুনবে, হ্যালো? হ্যালো? তুমি কোথায়? তার স্ত্রী হয়তো তার অবস্থান জানার জন্য বলবে, কী হলো? তুমি কই? স্বামীটি তার কথা শুনতে না পেয়ে ডাকতেই থাকবে। তার শুনতে না পাওয়ার কারণ তার ক্ষীণ শ্রুতিশক্তি; এজন্য ডাক্তার তাকে একটা কানের যন্ত্রও দিয়েছে। কিন্তু বাড়িতে সে তার কানের যন্ত্র ব্যবহার করতে পছন্দ করে না। তাছাড়া এই বিশাল বাড়িটিতে তার কথা শোনার জন্য শুধু তার বউই অবশিষ্ট আছে। শুধু তাই নয়, কানের যন্ত্রটি নিয়ে তার গুরুতর অভিযোগ। প্লাস্টিকের শামুক আকৃতির জিনিসটা পরলে তার কানে নাকি ব্যথা লাগে, কানের ভেতরটা লালচে হয়ে যায়, এমনকী রক্তও বের হয় মাঝে মাঝে। একারণে সে তার বউয়ের কণ্ঠ শুনতে পায় না, খিটখিটে মেজাজে সে ডাকতেই থাকে, হ্যালো? তুমি কোথায়? মাঝে মাঝে তার বউ কাছ থেকে বেশ দূরে থাকে, এজন্য তার বউ ডাকাডাকি শুনতে পায় না। অথচ এটা সে জানতেই পারে না। তার বউ কোথায় অথবা কী করছে, তা সে জানেই না। মাঝে মাঝে সে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। যতক্ষণ না তার বউ হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে খুঁজে পায়, ততক্ষণ তার মনে প্রশান্তি আসে না। তাকে চোখের সামনে দেখতে পেলেই সে বলে ওঠে, কোথায় ছিলে? তুমি উত্তর না দিলে আমি দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। যদিও বিষয়টা হাস্যকর নয়, তবু তার বউ হাসতে হাসতে বলে—না ঠিক হাসতে হাসতে নয়, হাসার চেষ্টা করতে করতে বলে, আমি তো এখানেই ছিলাম! এ কথা শুনে সে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলে ওঠে, না, তুমি ছিলে না। তুমি ছিলে না। আমি এখানে ছিলাম, তুমি এখানে ছিলে না।

সেদিন দুপুরের খাবারের পর এবং ভাতঘুমের আগে অথবা দুপুরের খাবারের আগে এবং ভাতঘুমের পরে, বউটি তার স্বামীর ডাক শুনতে পেলো, হ্যালো? হ্যালো? তুমি কোথায়? বউয়ের মাথায় একটা চিন্তা এলো, না। আমি ওর সামনে যাবো না। আমি লুকিয়ে পড়বো। কিন্তু এরকম বাচ্চামি সে করতে পারলো না। তার বদলে সে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তার নিজের মুখে হাত দিয়ে বলে, এই তো, আমি আছি। আমি সবসময় এখানেই আছি, তোমার পাশেই আছি। আমি আবার কোথায় যাবো? কিন্তু তার স্বামী তার কথা শুনতে পায় না, সে ডাকতেই থাকে, হ্যালো? হ্যালো? তুমি কোথায়? এবার তার বউ চিৎকার করে বলে, তুমি চাওটা কী? আমি বললাম তো, আমি এখানেই আছি। কিন্তু এবারেও তার স্বামী তাকে শুনতে পায় না, সে ডাকতেই থাকে, হ্যালো? তুমি কোথায়? হ্যালো! শেষমেশ বউটি তার স্বামীর উদ্বিগ্ন-রাগান্বিত কণ্ঠস্বর শুনে তাকে খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিলো। সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলো সে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলো। মারাত্মক হোঁচট। সঙ্গে সঙ্গে তার ঘাড় ভেঙে গেলো, সিঁড়ির শেষপ্রান্তে এসে তার প্রাণবায়ু ফুরিয়ে গেলো, ওই সময় নিচতলার কোনো একটা রুমে অথবা পাতালঘরে অথবা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে স্বামীটি জরুরি ভিত্তিতে তার স্ত্রীকে ডাকতেই থাকলো, হ্যালো? হ্যালো? তুমি কোথায়?

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন