কেন ছন্দ অনিবার্য ॥ মোহাম্মদ নূরুল হক | চিন্তাসূত্র
৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২১ নভেম্বর, ২০১৮ | দুপুর ২:২৭

কেন ছন্দ অনিবার্য ॥ মোহাম্মদ নূরুল হক

ছন্দহীন রচনা কবিতা নয়।
প্রাণীদেহে স্পন্দন যেমন, কবিতায় ছন্দও তেমন। স্পন্দন থেমে গেলে প্রাণী আর জীব থাকে না, জড়ে পরিণত হয়। তেমনি ছন্দবিবর্জিত রচনাও আর কবিতা থাকে না, কতিপয় শব্দের জড়ভরতে পর্যবসিত হয়।

সৃষ্টিজগতের প্রতিটি প্রপঞ্চই কিছু নিয়ম মেনে চলে। যেখানে নিয়মের লঙ্ঘন, সেখানে লয়; সেখানেই ধ্বংস। কবির কাজ হলো তার রচনাকে ছন্দবদ্ধ করে কবিতায় উত্তীর্ণ করা। যে কবি ছন্দে যত সিদ্ধহস্ত, ভাব-ভাষা ততই তার করায়ত্ত। এ জন্য কবিকে নিরন্তর সাধনা করে যেতে হয়। হাঁটতে হয় আপাত পরিচিত-চেনা পথে, কিন্তু তৈরি করতে হয় নতুন পথ। সেই পথে শব্দ-ভাষা, অলঙ্কার-ছন্দ-আঙ্গিক মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। কবির কাজ নতুন পথ সৃষ্টির আরাধনা করা। সেই ধ্যাননিবিষ্ট সাধনার পথে এমন কিছু চিত্র নিজের মতো করে তিনি অবলোকন করেন, যা আর কারও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মেলে না। তখনই কবি হয়ে ওঠেন দ্রষ্টা। আর সেই প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে কবি নতুন বাণী ও নতুন স্বপ্নের চিত্র আঁকেন বলেই হয়ে উঠতে পারেন স্রষ্টা।

ছন্দে সিদ্ধহস্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজন আবেগ, অনুশীলন, অভিজ্ঞতা, কবিকল্পনা ও প্রজ্ঞার সমন্বয়। কারণ ছন্দের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক সুনিবিড়। ছন্দ ও আবেগের সমন্বয়ে কবিতায় গতির সঞ্চার হয়। এজন্য সেই আবেগের কার্যকারণ নির্ণয় করতে গেলে অভিজ্ঞতার শরণাপন্ন হতে হয়। কারণ, ‘ছন্দোবেগের মধ্যে অভিজ্ঞতার বিবিধ প্রবণতা নিশ্চয়ই থেকে যায়। আঙ্গিকের নবীনতায় বিমিশ্র মাধুরী সৃষ্টি করে। প্রসঙ্গের অপ্রত্যাশিত পরিধি-রচনায়  কবিতার দিগন্ত তৈরি হতে থাকে। সুরের ভাবনা ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যায় ভিন্ন রাগরাগিণীর দরোজা, যাদের মধ্যে বাহিরের সদ্ভাব নেই; তাল এবং লয়ের বোল-চাল যায় বদলিয়ে।’ (কাব্যের ধারণাশক্তি: অমিয় চক্রবর্তী)। ছন্দ প্রসঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর ‘ছন্দোবেগের মধ্যে অভিজ্ঞতার বিবিধ প্রবণতা নিশ্চয়ই থেকে যায়’ কথাটা ষোলো আনাই খাঁটি। কারণ ছন্দের ভেতর  কেবল বেগ ও আবেগই নিহিত নেই, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তির বহুদিনে অভিজ্ঞতার সারাৎসারও। ব্যক্তি যখনই স্বল্পতম শব্দব্যয়ে কল্পনা ও অভিজ্ঞতার সম্মিলনে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে যান, তখনই তাকে ছন্দের আশ্রয় নিতে হয়। কারণ তার বলার কথাটি সাধারণ গদ্যের বাক্যে বললে লোকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করবে না।  চোখের দেখা ও কানের শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে। আর যদি কথাগুলো ছন্দবদ্ধ করে প্রকাশ করা হয়, তাহলে তার মধ্যে এক ধরনের তাল-লয় সৃষ্টি হয়, তা শ্রোতার কানকে ভিন্ন রকমের ব্যঞ্জনা দেয়। সাধারণ কথাবার্তার ভিড়ে ব্যতিক্রমী কথাগুলো সহজেই শ্রোতা হৃদয়াঙ্গম করতে পারে। এছাড়া ছন্দবদ্ধ বাক্যাবলির যে গতি বা বেগ, তা গদ্যের বাক্যের স্বাভাবিক গতির চেয়ে বেশি শ্রুতিমধুর। এ কারণে গদ্যের ত্রিশ শব্দ সংবলিত তিন-চারটি বাক্য লোকে সহজেই মনে রাখতে না পারলেও মাত্র শত শব্দের ছন্দবদ্ধ চার-পঙ্‌ক্তি অনায়াসে মনে রাখতে পারে।

কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, অল্পকথায় অনেক কথা বলা।
শুধু তাই নয়, কবিকে  শব্দ নির্বাচন-গঠনে হতে হয় সচেতন

ছন্দই কবিতা নয়—কথাটা শতভাগ খাঁটি। যেমন হৃৎস্পন্দনই প্রাণী নয়। জীবের হৃৎস্পন্দন ছাড়াও অন্যান্য প্রত্যঙ্গের নানা ধরনের কাজ আছে। সেসব প্রত্যঙ্গ ও প্রত্যঙ্গের উপস্থিতি ও ধর্মের সমন্বয়েই প্রাণী। কিন্তু যখনই তার হৃৎস্পন্দন থেমে যাবে, তখনই মৃতদেহে পরিণত হবে। এজন্যই যিনি কবি, তিনি ছন্দজ্ঞানকেই একমাত্র অভিজ্ঞান বিবেচনা করেন। এই প্রসঙ্গে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এক প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমার বিবেচনায় কবি প্রতিভার একমাত্র অভিজ্ঞানপত্র ছন্দ-স্বাচ্ছন্দ্য, এবং মূল্য নির্ণয় যেহেতু মহাকালের ইচ্ছাধীন আর অর্থগৌরবের আবিষ্কর্তা অনাগত সমধর্মী, তাই সমসাময়িক কাব্যজিজ্ঞাসার নির্বিকল্প মানদণ্ড ছন্দোবিচার।’ কবিতায় ছন্দ প্রয়োগের যেসব কারণ রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

ক) বাক-সংযম
খ) শব্দ নির্বাচন-গঠনে সচেতনতা
গ) গতিশীল বাক্যগঠন
ঘ) যুক্তির শৃঙ্খলা
ঙ) স্মরণযোগ্য পঙ্‌ক্তি সৃষ্টি
চ) কণ্ঠস্বাতন্ত্র্য

কবি মানসপটে যা উদয় হয়, যেভাবে উদয় হয়, হুবহু সেভাবেই তিনি তা প্রকাশ করেন না। তিনি সবার আগে নিজের কল্পনা-উপলব্ধিকে অভিজ্ঞতার আলোকে যাচাই করেন। এর সঙ্গে আবেগকে যুক্তির শৃঙ্খলা ও প্রজ্ঞার শাসনে নিয়ন্ত্রণ করে তবেই প্রকাশ করেন। নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে কবিকে শব্দ নির্বাচন ও নতুন শব্দগঠনে সচেতন হতে হয়। তাকে ভাবতে হয়, বিষয় ও ভাব অনুযায়ী কোন ছন্দের (অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত) জন্য কী ধরনের শব্দ নির্বাচন করতে হবে। একইসঙ্গে ছন্দের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে বাক্য বা পঙ্‌ক্তির গতিশীলতা ও প্রবহমানতাও তাকে রক্ষা করতে হয়। আর এসবের পরও অডেনের মতে, কবির প্রধান কাজ হলো—স্মরণযোগ্য পঙ্‌ক্তি (মেমোরেবল স্পিচ) রচনা করা। কোনো বাক্য বা পঙ্‌ক্তি বা রচনাকে মেমোরেবল হওয়ার জন্য ছন্দবদ্ধ হতে হয়। ছন্দবদ্ধ পঙ্‌ক্তি সহজেই স্মরণীয় হয়। কেউ কেউ অন্ত্যমিল বা অস্ত্যানুপ্রাসকেই ছন্দ ভেবে ভুল করেন। অন্ত্যমিল যে ছন্দ নয়, অন্যকথায় ছন্দে যে অন্ত্যমিলের কোনো শর্ত নেই, বিষয়টি তারা হয়তো জানেন না, নয় খেয়াল করেন না। ছন্দের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে  সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বাক্যস্থিত পদগুলিকে যেভাবে সাজাইলে বাক্যটি শ্রুতিমধুর হয় ও তাহার মধ্যে ভাবগত ও ধ্বনিগত সুষমা উপলব্ধ হয়, পদ সাজাইবার সেই পদ্ধতিকে ছন্দ বলে।’  সুনীতিকুমারের দেওয়া সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, অন্ত্যমিলের কথা কোথাও বলা নেই। বরং বলা হয়েছে, বাক্যের  পদবিন্যাস এমনভাবে করতে হবে, যেন সেটি শ্রুতিমধুর হয়। শুধু তাই নয়, একইসঙ্গে পদগুলোর মধ্যে যেমন ভাবের মিল ও ধ্বনিগত সুষমা বজায় থাকে।  অন্যদিকে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর মতে, ‘ছন্দ হলো কবিতার শরীরে দোলা লাগাবার অস্ত্র।’ এক অর্থে এটিও সত্য। সুনীতিকুমার দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী বাক্যস্থিত পদগুলোর মধ্যে ভাবগত ও ধ্বনিগত সুষমা উপলব্ধিটাই মূলত নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর  ‘দোলা লাগাবার অস্ত্র’। তফাত শুধু এটুকু প্রথমজন বিস্তৃত, সম্যক ও সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছেন, দ্বিতীয়জন আংশিক-খণ্ডিত।

গদ্যে যে কথাটি হাজার শব্দে বলা হয়, সেটিই কবিতায় মাত্র কয়েকটি শব্দের একটি পঙ্‌ক্তিতে বলতে হয় কবিকে। অর্থাৎ কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, অল্পকথায় অনেক কথা বলা। শুধু তাই নয়, কবিকে  শব্দ নির্বাচন-গঠনে হতে হয় সচেতন। একইসঙ্গে কবিতার পঙক্তিগুলোকে রাখতে হয় গতিশীল। নিজের বক্তব্য যেন যুক্তিহীন প্রগলভতা ভেসে না যায়, সেদিকেও থাকে কবির সতর্ক নজর। সর্বোপরি তাকে সৃষ্টি করতে হয় স্মরণযোগ্য পঙ্‌ক্তিমালা। এখানে প্রচলিত তিনটি ছন্দে রচিত কয়েকটি কবিতার অংশবিশেষ তুল ধরা হলো।

স্বরবৃত্ত

এক.
আমার কাছে এখনো পড়ে আছে
তোমার প্রিয় হারিয়ে যাওয়া চাবি
কেমন করে তোরঙ্গ আজ খোলো!

থুৎনি ‘পরে তিল তো তোমার আছে
এখন ? ও মন, নতুন দেশে যাবি ?
চিঠি তোমায় হঠাৎ লিখতে হলো।

চাবি তোমার পরম যত্নে কাছে
রেখেছিলাম, আজই সময় হলো–
লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?

অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে
তোমার মুখ অশ্রু–ঝলোমলো
লিখিও, উহা ফিরৎ চাহো কিনা?
(চাবি: শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

দুই.
আমার বুকে রাতবিরেতে
রাতবিরেতে ময়ূরগুলো
বেড়ায় নেচে।

রক্তে আমার ভীষণ ডাকে
ভীষণ ডাকে ময়ূরগুলো
রাতবিরেতে।

নখর ঘায়ে বুকের টালি
হৃদয়পুরের চার  কুঠুরি
নাকাল হলো

মাথার ভেতর পেখম তোলে
চঞ্চু রাখে ঘাড়ে মুখে,
রক্ত মোছে।
(ময়ূরগুলো: শামসুর রাহমান)

মাত্রাবৃত্ত

এক.
সেদিনও এমনি ফসল বিলাসী হাওয়া
মেতেছিল তার চিকুরের পাকা ধানে
অনাদি কালের যত চাওয়া যত পাওয়া
খুঁজেছিল তার অনন্ত দিঠির মানে
একটি কথার দ্বিধা থরো থরো চূড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী
একটি নিমেষ দাঁড়ালো সরনীজুড়ে
থামিলো কালের চির চঞ্চল গতি
(শাশ্বতী: সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)

দুই.
শ্রাবণের মেঘ আকাশে আকাশে জটলা পাকায়
মেঘময়তায় ঘনঘন আজ একি বিদ্যুৎ জ্বলে।
মিত্র কোথাও এশপাশে নেই, শান্তি উধাও;
নির্দয় স্মৃতি মিতালী পাতায় শত করোটির সাথে।

নিহত জনক, এ্যাগামেমনন, কবরে শায়িত আজ।
(ইলেকট্রার গান: শামসুর রাহমান)

অক্ষরবৃত্ত:

এক.
শুভ এই ধানদূর্বা শিরোধার্য করে মহীয়সী
আবরু আলগা করে বাঁধো ফের চুলের স্তবক,
চৌকাঠ ধরেছে এসে ননদীরা তোমার বয়সী
সমানত হয়ে শোনো সংসারের প্রথম সবক

বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল
গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল কবুল।
(সোনালী কাবিন: আল মাহমুদ)

দুই.
সোনার বন্যার মতো গলগল করে বলি অমিতাভ আকাঙ্ক্ষার কথা :
যেন উড়ে চলে যায় বালকের হাত থেকে হাওয়া-ভরা শত রঙিন ফানুশ
সপ্রাণ খুশির ভরে, দূর থেকে আরো দূরে নীলিমার পারে পৃথিবীর
রেস্তোরাঁ টেবিল জ্বলা সন্ধেবেলা থেকে দূর শূন্যে উড়ে যায় শব্দহীন।

পরে, মনে পড়ে যায় :—বসন্ত, কলম তুলে কোনোদিন লিখেছে কবিতা
স্মৃতিরেখা তাও নেই : দুঃস্বপ্নে আমার জন্ম : উগরে দিয়েছে বঙ্গদেশে
পঞ্চাশের মন্বন্তর নামহীন ফুটপাতে পিলপিল ভিড়ের ভিতরে—
আমার জননী, সে তো ক্ষুৎকাতর পঞ্চাশের মন্বন্তর ছাড়া কেউ নয়।
(রক্তের পলাশবনে কালো ফেরেশতা: আবদুল মান্নান সৈয়দ)

স্বরবৃত্তের উদাহরণে শক্তির ‘চাবি’ ও  শামসুর রাহমানের ‘ময়ূরগুলো’ থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। মাত্রাবৃত্তের উদাহরণে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘শাশ্বতী’ ও শামসুর রাহমানের ‘ইলেকট্রার গান’ থেকে নেওয়া হয়েছে। এই দুটি উদাহরণের মধ্যে ‘শাশ্বতী’ অন্ত্যমিল যুক্ত হলেও ‘ইলেকট্রার গান’ কবিতায় মিল রক্ষা করা হয়নি। আবার অক্ষরবৃত্তের উদাহরণে আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’ ও আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘রক্তের পলাশবনে কালো ফেরেশতা’য়ও কোনো অন্ত্যমিল নেই। অথচ অক্ষরবৃত্তের চাল পুরোপুরি রয়েছে। তবে আল মাহমুদের সোনালি কাবিনের উদাহরণে পর্ববিন্যাসের সাধারণ ক্রম রক্ষিত হয়নি। অক্ষরবৃত্তের সাধারণ ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী পর্ব থেকে ছোট পর্বের দিকে সাজাতে হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী—‘শুভ এই ধানদূর্বা/ শিরোধার্য করে/ মহীয়সী’ পঙ্‌ক্তিটি ৮+৬+৪ ক্রমানুসারে সাজানো হলেও পরবর্তী পঙ্‌ক্তি ‘আবরু আলগা করে/ বাঁধো ফের/ চুলের স্তবক’ পঙ্‌ক্তি  সাধারণ ক্রমবিন্যাস রক্ষা করা হয়নি। এটি সাজানো হয়েছে ৮+৪+৬ ক্রমানুসারে সাজানো হয়নি। অর্থাৎ কবি অক্ষরবৃত্তের সাধারণ শর্ত এখান মান্য হয়নি। উদ্ধৃতিগুলোয় যেমন বাক-সংযম রক্ষা করা হয়েছে, তেমনি শব্দ নির্বাচন ও গঠনে কবির সচেতনতার স্বাক্ষর রয়েছে। একইসঙ্গে বাক্যগুলো যেমন গতিশীল, তেমনি বাক্যস্থিত পদগুলোয় রয়েছে যুক্তির শৃঙ্খলা। আর এসবের সমন্বয়ে পঙ্‌ক্তিগুলো স্মরণযোগ্য হয়ে ওঠার পথে সহায়কও। তবে স্মরণীয় বাক্য মাত্রই কবিতার পঙক্তি নয়। যেমন, ‘চিঠি তোমায় হঠাৎ লিখতে হলো’ কিংবা ‘গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল কবুল’ কিংবা ‘একটি কথার দ্বিধা থরো থরো চূড়ে/ ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী’ কিংবা ‘নিহত জনক, এ্যাগামেমনন, কবরে শায়িত আজ’। এই পঙ্‌ক্তিগুলো একবার মাত্র পাঠে মনে স্থায়ী দাগ কাটে। একইসঙ্গে পাঠ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় মনে অনুরণন তোলে। সর্বোপরি কবির কণ্ঠস্বাতন্ত্র্যের জন্যও ছন্দসিদ্ধি অনিবার্য।

সেই একঘেয়েমি দূর করার জন্য ছন্দবিসর্জন নয়, অন্ত্যমিল এড়িয়ে চলতে হয়।
সমপার্বিক পঙ্‌ক্তি রচনার পরিবর্তে বিসম-পার্বিক করেও কবিতায় বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে

কোনো কবি একবার ছন্দ আত্মস্থ করতে পারলে ছন্দ ওই কবির দাসত্ব করে। আর যিনি ছন্দে সিদ্ধি অর্জন করতে পারেন না, তিনি নিজের ব্যর্থতার ঢাকতে গিয়ে ছন্দবিদ্বেষ দেখান। আর রচনা করেন ছন্দহীন শব্দের জড়ভরত।  এই প্রসঙ্গে  ‘দিশেহারা কবির দল’ শীর্ষক এক গদ্যে আল মাহমুদ বলেছেন, ‘যখনই আলাপকালে এই কাব্য সিদ্ধির পরিধি আলোচনায় লিপ্ত হয়েছি, তখনই জানতে পেরেছি যে, এরা এমনকি ছন্দ সমন্ধে প্রাথমিক ধারণাটুকুও রাখে না। ছন্দের দুর্বলতা ঢাকতেই গদ্যছন্দ অবলম্বন করে যা লিখছে, সেটাকেই আধুনিক কবিতার আঙ্গিক বলে দুর্বলতা ঢাকতে চাইছেন। গদ্যের রহস্যময় ছন্দ রয়েছে, এটা তাদের আয়ত্তেও নেই। অথচ নিকট দূর প্রায়শ পূর্বসুরির সমালোচক অস্বীকারের মধ্যে এদের সাহিত্যে বিজয় দেখতে পাই।’ আল মাহমুদের এ কথার সূত্র ধরে বলা যায়, কোনো বাক্য কাব্যিক হওয়া আর কবিতা হওয়া একই কথা নয়। অর্থাৎ কাউকে রাজার মতো মনে হওয়া আর রাজা হওয়া একইকথা নয়। তেমনি ছন্দহীন আবেগঘন-কাব্যগন্ধ বাক্য মাত্রই কবিতার পঙ্‌ক্তি নয়। এখানে একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক।

সমস্ত রাত্রি ঝড়ও থামে না,
ক্রন্দনও থামে না।
আমি নিষ্ফল পরিতাপে ঘরে ঘরে অন্ধকারে
ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলাম।
কেহ কোথাও নাই; কাহাকে সান্ত্বনা করিব।
এই প্রচণ্ড অভিমান কাহার।
এই অশান্ত আক্ষেপ কোথা হইতে উত্থিত হইতেছে।
পাগল চীৎকার করিয়া উঠিল,
‘তফাত যাও, তফাত যাও!
সব ঝুট হ্যায়, সব ঝুট হ্যায়।’

এই রচনাংশটি যতই কাব্যিক মনে হোক, এটি কবিতা নয়।  উদাহরণটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পের। এখানে গদ্যের বাক্যগুলোকে আলাদা করে এভাবে সাজালে প্রথম দর্শনে কবিতার পঙ্‌ক্তির মতোই দেখায়; শুনতেও কাব্যিক মনে হয়। কিন্তু এই বাক্যগুলো কবিতা নয়, কাব্যঘেঁষা গদ্য।

ছন্দবদ্ধ কবিতার অন্ত্যমিলে কারও কারও একঘেয়েমি আসতে পারে। সেই একঘেয়েমি দূর করার জন্য ছন্দবিসর্জন নয়, অন্ত্যমিল এড়িয়ে চলতে হয়। সমপার্বিক পঙ্‌ক্তি রচনার পরিবর্তে বিসম-পার্বিক করেও কবিতায় বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে। যার হৃদয় কবির, যিনি কবিতাকে জীবনের ব্রত করেছেন, তিনি ছন্দেই সিদ্ধি খোঁজেন, মাত্রা-পর্ব-পঙ্‌ক্তির বৈচিত্র্য সৃষ্টিতেই তার আনন্দ। তিনি জানেন, ছন্দহীন রচনা কখনোই কবিতা নয়, কবিতার ছদ্মবেশে শিল্পের শত্রু মাত্র। ছবি আঁকার জন্য শিল্পীকে যেমন রঙ-জ্যামিতিক পরিমিতি বোধ, আলোছায়ার ব্যবহার জানতে হয়, তেমনি কবিকেও জানতে হয়, ছন্দের ব্যবহার। না হলে সবই আবর্জনায় পর্যবসিত হয়। শেষপর্যন্ত কবিতা ও অকবিতার পার্থক্য নির্ণয়ের জন্যও ছন্দ জরুরি।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।