অনাবৃষ্টির পৃথিবীতে ॥ ক্যাথেরিন পন্ড | চিন্তাসূত্র
৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ | বিকাল ৪:২৩

অনাবৃষ্টির পৃথিবীতে ॥ ক্যাথেরিন পন্ড

অনুবাদ: মোস্তাফিজ ফরায়েজী
ক্যাথেরিন পন্ড লস এঞ্জেলসে বসবাসকারী একজন নবীন কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। তিনি সাউথার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি সাহিত্য ও ক্রিয়েটিভ রাইটিং বিষয়ে পিএইচডি করছেন। ২০১৩ সালে কবিতার জন্য তিনি অ্যাকাডেমি অব আমেরিকান পোয়েটস পুরস্কার লাভ করেন। ‘অনাবৃষ্টির পৃথিবীতে’ গল্পটি ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান অনলাইন ম্যাগাজিন ন্যারেটিভ ম্যাগাজিনে In The Absence of Rain শিরোনামে প্রকাশিত হয়। গল্পটি ন্যারেটিভ ম্যাগাজিনের ‘বসন্ত সংখ্যা ২০১৮’ গল্প প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান লাভ করে।
এক.
কোথাও বৃষ্টি নেই। ধুলোয় তোমার গাড়িটা ভরে গেছে, যেন ধুলো দিয়ে স্নান করেছে। আগের পৃথিবীতে সবসময় বৃষ্টি হতো। কিন্তু এখন? এখন যদি তোমাকে বৃষ্টি দেখতে হয়, তোমাকে জাদুঘরে যেতে হবে। জাদুঘরের একটা বেদীর ওপর দাঁড়িয়ে তোমাকে অনুভব করতে হবে ঝিরঝির করে তোমার চারপাশে বৃষ্টি হচ্ছে। সেই বৃষ্টিকে কি তুমি স্পর্শ করতে পারবে? উত্তর হচ্ছে—না, তুমি স্পর্শ করতে পারবে না। তুমি যখনই হাত বাড়িয়ে দেবে, তোমাকে বাধা দিতে তোমার পাকানো চুলগুলো সরে যাবে। শরতের রাতেরা তোমাকে নাড়া দিতে থাকবে। তোমার জানালার পাশের ওক গাছের পাতার ওপর থেকে পিছলেপড়া জল তোমার হৃদয়ে সাড়া জাগাবে। অথবা বর্ষারাতে তোমার পূর্ববর্তী বাড়ির নীরব নিস্তব্ধতাকে তুমি ফিরে পেতে চাইবে। কল্পনার বৃষ্টি শেষে তুমি জাদুঘর থেকে বের হওয়ার জন্য পা চালাবে। ঠিক সেই মুহূর্তেই দেখবে—জাদুঘরের ফটকে এক দম্পতি শরীর বাঁকিয়ে ভালোবাসার চিহ্ন আঁকছে। তারপর তোমার মনে হবে, এখানে কোনো ঋতুই নেই। চারিদিকে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় তুমি বলতে চাইবে, পুরো পৃথিবীটা বাষ্পীভূত হয়ে গেছে। তুমি এ কথা শুধু একজনকে না, সবাইকে বলতে চাইবে। এমনকি যে একাধিকার নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাকে বলতেও দ্বিধা করবে না।

লস ফেলিজের বারের তাকে সাজানো চকচকে বোতলগুলোর দিকে তাকিয়ে তুমি বিষণ্ণ মনে বসে আছ। নীলরঙা গ্লাসে ভদকা দেওয়া হয়েছে তোমাকে। ধূসর আকাশ সবুজ মাঠে মিশে গেলে যেমন হয়, তোমার কাছে গ্লাসটিকে তেমনটি মনে হচ্ছে। ভদকার গ্লাসই তোমাকে অতীতে বসবাস করা তোমার সব ঘরের কথা মনে করিয়ে দেয়। শুধু কী ঘরের কথা? তোমার ঘরের মানুষের কথা, ভালোবাসার মানুষের কথা সবই ভেসে উঠবে তোমার চোখে। এছাড়া বিশেষভাবে মনে হবে বৃষ্টির দিনে তোমার জীবনকে রাঙিয়ে দেওয়া একজনের কথা। তুমি বার বয়কে ডেকে অতীতের কথা স্মরণ করে বলবে, দেখিস! একদিন আমার জীবনে সেসব দিনের কিছু অংশ হলেও ফিরে আসবে। বোতলের পর বোতল শেষ করার পর যখন বারটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে, তোমার দৃষ্টি তখন ঝাপসা হয়ে আসবে। তুমি টলতে টলতে স্ট্রিট লাইটের আলোয় পথ দেখে কোনোমতে তোমার রুমে ফিরবে। তারপর প্রতিটি নিঃসঙ্গ রাতের মতো হুট করেই ঘুমে ডুবে যাবে।

বৃষ্টির কোনো মাত্রা নেই, কোনো জ্যামিতি নেই, কোনো আকার নেই, কোনো দৈর্ঘ্য নেই, কোনো ছন্দ নেই। বৃষ্টির কোনো সীমানা নেই। সবকিছুর মধ্যেই বৃষ্টি ছড়িয়ে পড়তে পারে। হয়ত তুমি বৃষ্টি পছন্দ করো না, তুমি সীমাবদ্ধতা পছন্দ করো; তখন কিন্তু বিষয়টা বিপরীত গোছের হয়ে যাবে। তখন বৃষ্টিই সব সীমানা, আর তুমি সেই সীমানার মাঝে উদগ্রীব এক মানব। তুমি অন্তহীন দিগন্ত চাও না, তুমি চাও ঝঞ্ঝার কালো শরীর তোমাকে পরাভূত করুক। একাকী নিস্তব্ধ আবহাওয়ার মাঝে তুমি থাকতে চাও। এসব শুধু বৃষ্টিই তোমাকে দিতে পারবে। ফ্রাঞ্জ রাইট এটাকে বলেছেন, Wisteria Rain, চার্লস ডিকেন্স বলেছেন, Looping Rain, আসলে এই বৃষ্টি তোমার ভেতরে বসবাসকারী নিস্তব্ধতার একটি রূপ ছাড়া কিছুই নয়। এটা তোমার রুমেই আছে। একটু খেয়াল করে দেখো, বসার ঘর থেকে রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছে, অতপর তোমার পড়ার ঘরের বাইরে জমা হচ্ছে। নিস্তব্ধতা নিজে নিজেই তোমার ঘরে ঢুকে যাবে—তারপর তুমি নিস্তব্ধতাকে এতটা ভালোবাসতে থাকবে যে, ওকে ছাড়া তোমার চলবেই না।

তুমি শেষবারের মতো তোমার বাড়িতে আছো। আর সেদিন রাতেই তোমার বাবা দুঃস্বপ্ন দেখে চিৎকার করতে করতে জেগে উঠলো। তুমি পাশের রুমেই ছিলে। তড়িঘড়ি করে বাবার রুমে এসে বাবাকে জাগানোর চেষ্টা করলে। তোমার বাবাও অল্পতেই জেগে গেলেন। সেই মুহূর্তে তোমার বাবা যেন শিশু! তোমার বুকে শিশুসুলভ ভঙ্গিমায় আশ্রয় নিলেন। বাবার বয়স ছিয়াত্তর, তবে এই বয়সেও তার তেমন শারীরিক সমস্যা নেই। তবে ওই একটাই সমস্যা, তিনি এখনো রাতের বেলা মাঝে-মাঝে চিৎকার করে জেগে ওঠেন। আর এই বিষয়টাই তোমাকে ভীত করে তোলে। কী কারণে পৃথিবীর কিছু কিছু মানুষ অতি সহজে ভীত হয়? সবাই হয় না কেন? তুমি ভীতুদের মধ্যে একজন। তোমার বাবা কিছুক্ষণ পরেই তোমার হাত ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। তোমার জানা মতে, তিনি কখনোই যুদ্ধে যাননি। কিন্তু তোমার মনে হচ্ছিল, একটু আগেই তোমার বাবা যুদ্ধ থেকে ফিরেছেন।

একদিন ঘুম থেকে উঠতে তোমার দেরি হয়ে গেলো। তাই তড়িঘড়ি করে জামাকাপড় পরে তুমি সংক্ষিপ্ত দিনের দিকে হাঁটা শুরু করলে। তোমার প্রিয়জনদের কেউ অনেকদিন ধরে মরেনি। এটা আশীর্বাদ না কি অভিশাপ? এ নিয়ে তোমার বিস্তর দ্বিধা। তোমার চলার পিচঢালা রাস্তায় আলো পড়ে তরঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছিল। তরঙ্গ দেখতে দেখতে ভাবলে, সম্ভবত তোমার একটা নিভৃত জায়গায় একমাস কিংবা তার চেয়ে দীর্ঘসময় কাটানোর সময় এসেছে। যদিও নিভৃত জায়গায় যাওয়ার কোনো মানে নেই। কেননা তোমার আশেপাশে তেমন শব্দ নেই, সুনসান নীরবতা। গভীর রাতে গোলাপ থেকে জল গড়িয়ে পড়ার মতো মৃদু শব্দও নেই। শুধু তোমার জলমগ্ন লেবুর মতো মুখাবয়বটা আয়নায় ভাসমান। শান্ত থেকে অশান্ত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে তুমি তোমাকে শুধু তোমার ঘরের মধ্যেই খুঁজে পাবে। তুমি চিৎকার করে কেঁদে উঠবে। তুমি যখন ক্রন্দনরত, তুমি দেখতে পাবে তোমার ঘরের চার দেয়াল শুধু একটিমাত্র বৃষ্টির ফোঁটা দিয়ে পরিপূর্ণ।

দুই.
তুমি যদি তোমার সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষের সন্ধান পাও, তাহলে তুমি মদ্যপান ছেড়ে দেবে। কিন্তু এতে করে মদ্যপান ছেড়ে দেওয়াটা আরও জটিল হয়ে গেলো।

মনে করো, তোমার প্রেমিক একজন বৃষরাশির জাতক। মদের প্রতি তার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই। শুধু সালাদ খাওয়া আর নিয়মিত দৌড়ানোতে তার আসক্তি। তুমি একরাতে মাতাল হলে সে যদি তোমাকে বলে বসে—আমি কোনো মদ্যপায়ীকে বিয়ে করছি না। সে যদি তোমাকে বিয়ে না করে, তাহলে তুমি কী করবে? হয়তো তুমি এমন ভাণ করবে যেন তুমি একটুও আঘাত পাওনি। আসলেই কী তাই?

ছুটিতে তোমার প্রেমিক হাওয়াইতে যেতে চায়, তুমি রাজি হলে। কারণ, হাওয়াইতে একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে ছোট্ট একটি পর্বত আছে, যেখানে এখনো বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি হয় মানে সবসময় বৃষ্টি হয়। দিনে-রাতে সবসময়। পৃথিবীর অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় ওখানে। তুমি ডব্লিউ এস মারউইন ও জুলিয়ানার স্পার বই পড়ো। তোমার ধারণা, নতুন বিশ্বে তোমার কোনো বাচ্চাকাচ্চা থাকা চলবে না। তা না হলে তুমি তোমার মেয়ের নাম দিতে জুলিয়ানা। এদিকে তোমার প্রেমিক তোমার দেওয়া মালা কখনো পরবে না, এটা ভেবে তোমার খুব মন খারাপ। কিন্তু সে মাঠে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে, আবার গ্রীষ্মের দিনে গোসল করতেও কখনো ভুলে যায় না। তবু এখনো রাতের বেলায় তুমি তোমার শরীরটা দিয়ে তার শরীরটাকে পেঁচিয়ে ধরে থাকো। তার বিপরীতে জলের মতো প্রবাহিত হতে থাকো। তার সঙ্গে থাকলে তোমার মনে হয়, পৃথিবীর যেন শেষ হবে না কোনোদিন! মৃত্যুকে তুমি ভয় করো না, কিন্তু ভোগান্তিকে ভয় না করে উপায় নেই। তুমি যতক্ষণ তার বাহুর মাঝে আছ, তুমি কোনো কষ্ট পাবে না। তার বাহুর মাঝের সব ঋতুই বর্ষাকাল।

তোমরা এক সোমবারে ভিন্ন ভিন্ন ফ্লাইট ধরে কাউয়াইতে গেলে। পৌঁছাতে পৌঁছাত রাত হয়ে গেল। উড়োজাহাজে বসে তুমি বাইরের সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাওনি, দ্বীপমালা দেখতে পাওনি। শুধু উড়োজাহাজের পাখা অন্ধকারকে ভেদ করে সামনে চলছে। অন্ধকারকে যেন পাকস্থলীর মতো চিরে ফেলছে পাখা। কাউয়াইতে তুমি তোমার হোটেল রুমে পৌঁছে দেখলে আরেক কাণ্ড। তোমার রুমের এক কোনায় পড়ে আছে একখানা শিশুশয্যা। সম্ভবত পূর্বের ভাড়াটিয়া ফেলে গেছে। তুমি প্রহরীকে ডেকে শিশুশয্যাটা সরিয়ে ফেলতে বললে।

তুমি ‘প্রিয়তম’ শব্দটাকে ঘৃণা করো, কিন্তু যখন সে গোসল শেষে বাথরুমের দরজা দিয়ে উঁকি দেবে, তুমি তাকে ‘প্রিয়তম’ বলেই ডাকবে। আলোতে সে চকচক করে উঠবে, স্বর্ণকেশী চুল তার কোমর পেঁচিয়ে থাকবে, ওকে দেখলে মনে হবে ওফেলিয়াকে নদী থেকে তুলে আনা হয়েছে। ও পৃথিবীর যেকোনো নারীর তুলনায় সুন্দর। তুমি তোমার সারা জীবন ওর সঙ্গে কাটাতে চাইবে। ওর হাতটা তোমার বুকে রেখে ওকে তোমার হৃদপিণ্ড বের করে দিতে চাইবে। তার নামের অর্থ হাওয়াইয়ান ভাষায় ‘সমুদ্র’। পুরো রাত তুমি তার শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর উথাল-পাতাল ঢেউয়ের মতো চড়তে থাকবে।

তিন.
প্রথম দিন মোরগের ডাক তোমার কানে ভেসে আসতেই ঘুম ভেঙে গেলো। তোমার কাছে মনে হচ্ছে বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু জানালার পর্দা সরাতেই দেখলে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা। কোথায় বৃষ্টি? কোথায় মেঘ? আকাশ একেবারে ফকফকা। কিছুক্ষণ পরেই তুমি আর তোমার প্রেমিক বাইরে ঘুরতে বের হলে। তুমি সমুদ্র সৈকতে গা এলিয়ে মাওয়াইয়ের সার্ফারদের সম্পর্কে একটা বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকলে, আর তোমার প্রিয়তম আগ্নেয়গিরির পাশের পথ ধরে হাঁটতে গেছে। দিন যত গড়ায়, তোমার উদ্বেগ তত বাড়ে। জোয়ারের সময় সৈকতের প্রায় পুরোটাই পানির নিচে চলে যায়। সামান্য অংশ খালি থাকে। জোয়ার এলে তুমি জোয়ারের পানি থেকে বাঁচতে দৌড়ে পাশের বটগাছের শিকড় বেয়ে উঠতে থাকলে। তোমার হাতের বইটি যেন না ভেজে, সেদিকে তোমার বেজায় খেয়াল। গাছের ওপর থেকেই তুমি দেখলে ঢেউ বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হয়ে উঠছে। তোমার সুনামির কথা মনে পড়ে গেলো। জোয়ার শেষ হলো। সূর্যাস্তের একটু আগে সে ফিরে এলো। তুমি স্বস্তির কান্নায় ভেঙে পড়লে। তোমার ভয় ছিল দ্বিমুখী। হয়তো আজ সে মারা যেতে পারতো নয়তো তুমি। অথবা তোমরা দুজনেই। সে তোমাকে জড়িয়ে ধরে, তুমি তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরো।

দ্বিতীয় দিন, তুমি সুইমিংপুলের পাশে বসে একটা কবিতার বই পড়ছো। কবিতাগুলোর কতগুলো প্রশান্ত, কতগুলো উন্মাদ প্রকৃতির। কবিতাগুলোর স্বর চরম দুর্ভাগ্যের শিকার মানুষের মতো পিচ্ছিল। তুমি বিরক্ত হয়ে কবিতার বইটি চেয়ারের ওপর থেকে পুলের মেঝেতে ফেলে দিলে। এসব কবিতা লেখা ভুল কিছু নয়। আবার এসব কবিতা পড়তে না চাওয়াও খারাপ কিছু নয়। আজকে তুমি কিছুই পড়তে চাও না, কিছুই বলতে চাও না। গতরাতে সে যখন তোমার পুরো দিনের ফিরিস্তি শুনতে চেয়েছিল— তুমি তাকে মিথ্যে বলেছিলে। তুমি প্লাস্টিকের কাঁটাচামচ কিনতে বাইরে গিয়ে একটা বারে ঢুকেছিলে। সেখানে বসে রাম খেয়েছিলে। সেকথা তুমি তার কাছে লুকিয়ে গেছো। তারপরও তুমি আশা করছো, সব কিছু জানার পরেও সে কিছু বলবে না। সে খুব মিষ্টি প্রকৃতির। মিথ্যে বলার জন্যেই এখন তুমি তাকে জড়িয়ে ধরে বোঝাতে চেষ্টা করছো— তুমি কতই না অসুস্থ! তোমাকে সুস্থ করতে তার ভালোবাসার চেয়ে ভালো ওষুধ আর নেই।

তৃতীয় দিন, হ্যানাপিপের শেষপ্রান্তের একটা বইয়ের দোকান থেকে তুমি আরও মারউইন কিনলে। তোমার ধর্মপুত্রের জন্যও কিছু বই কিনলে। তুমি ক্রয় করলে একটি জর্জ ও’কিফের বই, একটা এমন বই যাতে দ্বীপের সব ফুলের ছবি আছে, গোলাপী রঙের শব্দার্থের বই, বেইজ কালারের চিত্রাঙ্কনের বই যেখানে ছবি আছে: গোলাপ ফুল, সিলভার কাপ, বার্ড অব প্যারাডাইস, হ্যালিফোনিয়া ইত্যাদির। ডিনারের সময় তুমি বিয়ারের বোতলে কোক নিয়ে তা পান করতে করতে মাতলামির ভাণ করে তুমি তাকে একটা বই থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনাবে। সে তোমার কথা বলার ধরন দেখেই হাসে, তুমিও হাসো। কিন্তু একটু পরেই তোমার মুখটা কালবৈশাখীর কালো মেঘে ছেয়ে যায়, তোমার হঠাৎ-ই মনে হলো— তুমি একদমই ভালো নেই।

পৃথিবীটা আবার কোমলতায় পরিপূর্ণ হওয়া শুরু করেছে। ঠিক কিসের জন্য সেটা বলা মুশকিল। তুমি সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝে হারিয়ে যাবে, আবার ফিরে আসবে। ঢেউ নিয়ে খেলায় মাতবে তুমি। তোমার নোটবুকে তুমি লিখবে: প্রশান্তি। তারপর লেখাটা কেটে দিয়ে সমুদ্র সম্পর্কে লেখা শুরু করবে। সমুদ্রের নীলাভ, সবুজাভ, সাদাটে কিংবা মেটে সবদিক সম্পর্কেই লিখবে তুমি। তুমি সমুদ্রের ভেতর প্রবাহিত হবে। তোমার মানসিক অবস্থা অগভীর সমুদ্রের দুর্বল জেটির মতো। চালাকি এখানে কাজে দেবে না, একজন বলে উঠলো। আরেকজন বললো—আমাকে মদ্যপপূর্ণ কক্ষটা দেখাও। আমি তোমাকে সবচেয়ে উদ্বিগ্ন মানুষে ভরা একটা কক্ষ দেখিয়ে দিলাম। তোমার নামের অর্থ সময়ের সঙ্গে শুকিয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলের জলাশয়।

পঞ্চম দিন, স্যাঁতস্যাঁতে বারের টেবিল থেকে একটা টিকটিকি লাফ দিয়ে পড়ে গেলো। তবু তোমার ভয় করছে না। কারণ এখানে কোনো জাহাজ ঘাট অথবা প্রবাল প্রাচীর নেই। এছাড়া তোমার প্রেমিক তোমার পাশে থাকলে তুমি খুব সাহস পাও। সে তোমাকে চোখ দিয়ে ইশারায় ভালোবাসা পাঠায়, তুমি চোখে চোখেই তার ভালোবাসার উত্তর ফেরত দাও। রাতের বেলায় স্প্যাম টাওয়ার অতিক্রম করার সময় তুমি বিগ সেভ থেকে আইসক্রিম ও হিমায়িত শুকরের মাংস কিনলে। কেনা শেষে তুমি যখন দরজার দিকে যেতেই দেখলে বাইরে নীরবে বৃষ্টি হচ্ছে। পরিশেষে তোমার হৃদয়ের তালা খুলে গেলো। এ যেন পৃথিবীর প্রথম বৃষ্টি অথবা শেষ বৃষ্টি।

ষষ্ঠ দিন, তোমার প্রিয়তম প্রবাল প্রাচীরের ওদিকটাতে সার্ফিং করছে। এদিকে তুমি সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আছো। জলে সাঁতার কেটে তার দিকে যাবার জন্য সে অপেক্ষা করছে। তার অপেক্ষা করার মানেটা তোমার কাছে ভিন্ন, এটা তোমার মনে শক্তি জোগায়। তুমি সাঁতার কাটতে পারবে কিনা এটা নিয়ে কালও ভয়ে ছিলে। কিন্তু তোমার প্রিয়তমের টানে তুমি স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলছো। তোমার ভয় বিকেলের রোদের ভিতর উবে গেছে। এমনকি এখন তুমি মাছের ঝাঁকের মাঝেও সাঁতার কেটে চলছো। এবারও ছোট্ট একটি মিথ্যা তুমি তার কাছে গোপন করেছিলে, তাকে বলেছিলে তুমি কোনো অলঙ্কার পরোনি, কিন্তু তুমি ক্ষুদ্র একটি অলঙ্কার পড়েছিলে। সেই ক্ষুদ্র অলঙ্কার পরার কারণেই তুমি এবং তোমার পৃথিবীর মাঝে একটা বাধার সৃষ্টি হয়েছে। সে কারণে সে তোমাকে বললো—আমার মনে হয় তুমি তোমার শত্রুকে পছন্দ করবে; তুমি সে কথার প্রতিবাদ করোনি।

সপ্তম দিন, বাড়ি ফেরার আড়ে তুমি শেষবারের মতো সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে আছো। সমুদ্রের ঢেউ তোমার চারপাশে আছড়ে পড়ছে। তুমি তোমার প্রিয়তমের ওপর হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছো। তার কিছুক্ষণ পর তুমি সৈকতের পাশে স্বচ্ছ পানিতে শরীরটা ধুয়ে নেওয়ার জন্য নেমেছো। একটা ছোট্ট বালক তার পা ধোয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। তুমি যখনই নিচের দিকে তাকাচ্ছো, বালকটি তোমার অর্ধনগ্ন বক্ষদেশের দিকে তাকাচ্ছে। তুমি কিছু দেখোনি এমনটি ভাব করে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছো, তারপর তুমি তোমার প্রেমিকের দিকে গিয়ে মুচকি হাসতে হাসতে ভাবলে—কত পবিত্র, কত সুন্দর হয় ছোটরা। তারা যা কিছু চায় কোনো কিছু না ভেবেই তার দিকে অগ্রসর হয়।

তুমি ভুল করে খবরের কাগজ পড়ে ফেলেছো। ক্যালিফোর্নিয়াতে সবকিছু জ্বলছে। সব কবি এ সম্পর্কে লিখছে, তবে কী বলবে তা খুঁজে পাচ্ছে না। তুমিও তোমার জীবনকে জ্বালিয়ে দিতে পারো। একটা দিয়াশলাই অথবা সিগারেট দিয়ে পৃথিবীতে আগুন ধরিয়ে দিতে পারো। গ্রহে গ্রহে সংঘর্ষে নাকি আমরা সবাই মরে যেতে পারি। এই ব্যাপারটা অনেকটা দীর্ঘ অনাবৃষ্টির মতো। এটা আমাদের চিন্তাভাবনাকে পুড়িয়ে দিলো। অথচ, আমরা পালিয়ে গেলাম না, আমরা সেখানেই থাকলাম। সব কিছু অস্বীকার করে আমরা পরিত্যক্ত স্ত্রীর মতো সেখানেই পড়ে রইলাম।

চার.
পৃথিবী বহুল বিক্রিত একটা গল্প চায়। তুমি হাতের আঙুল দিয়ে বালিয়াড়ির ওপর আনমনে অভ্যাসের বশে নানা আঁকিউঁকি করছো। কিন্তু আসক্তি কোনো গল্প নয়। গল্পটা হয়তো অন্য কারও অধীনে। হয়তো তোমার দাদি, তোমার চাচাতো ভাইবোনদের অধীনে। তোমার কী স্বাভাবিক জীবনে আসার আগের জীবনের কথা মনে আছে? তুমি তখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতে। তুমি যখন ছোট ছিলে, তুমি একটা বাতিঘরের জিম্মাদার হতে চাইতে, সুউচ্চ অন্ধকার টাউয়ারে বসবাস করতে চাইতে, টাউয়ার থেকে সমুদ্র উপভোগ করতে চাইতে।

যেটা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, সেই হারানো অতীতকে আমরা স্বপ্নে দেখি। এখন স্বপ্নগুলো এমনভাবে বৃত্তাকার আকার ধারণ করেছে যেন তুমি একটা মহাপ্লাবনের ভিতরে আবদ্ধ হয়ে আছো। তোমার বাহুর শিরাগুলো ফুলে উঠছে। ভেজা ধূসর প্রকৃতির শিরা। অনেকটা নর্দমার জটিল নকশার মতো এর বিস্তার। শুধু তুমি যখন পায়ের তলে মাটি খুঁজে পেলে তখনই বুঝতে পারলে এতক্ষণ তুমি মাটিতে ছিলে না। পিচঢালা রাস্তায় আলো পড়ে কুয়াশাকে বিলীন করে দিক, তুমি এখন এটাই চাও। তাপমাত্রা যত কমই হোক না কেন, তোমাকে বাড়ি যেতে হবে। ট্রেন যদি বরফে ঢেকেও যায় তুষারপাতের ভেতর পাইলট সবাইকে বলবে—যাত্রা শেষ হতে চলেছে। সবকিছুই নিয়মমাফিক হবে। কিন্তু প্রথমে তোমাকে অবশ্যই হাতলটা ছাড়তে হবে, তারপর আলোকোজ্জ্বল দরজার দিকে একাকী ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে হবে।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন