বিশল্যকরণী-৬॥ রঞ্জনা বিশ্বাস | চিন্তাসূত্র
২ ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৭ আগস্ট, ২০১৮ | রাত ১১:৩১

বিশল্যকরণী-৬॥ রঞ্জনা বিশ্বাস

॥ পর্ব-ছয় ॥
একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে।  বেদেবহরে তাঁবুর চারপাশে কাদার মধ্যে একদল উলঙ্গ শিশুর দাপাদাপি আর চিৎকার চেঁচামেচি ছাড়া বিশেষ কোনো শব্দ নেই। অন্যসময় বেদেনীদের গলার আওয়াজে মুখর থাকে বেদেবহর। শুক্রবার দিন কেউ গাওয়ালে যায় না। ভালো মন্দ রান্না হয়। মালতীর ঘরে জ্বলে না। মামানীর ঘরেই রান্না। বিষু সর্দারের নির্দেশনায় মামরা ছেলে খলিলকে ঝন্টু যখন নিয়ে আসে, তখন তার বয়স আট মাস। বিষু সর্দারের বউ ননী বালাই তাকে এত বড় করে বিয়ে-থা দেয়।  আজ এই ছেলের দুর্দিনে ননীবালা টিনের মাগলায় করে ভাত আর একটা টিনের বাটিতে ছালুন নিয়ে আসে মালতীর নৌকায়। ছালুন বলতে হলুদ ডোবানো জলে রান্না করা তিতির পাখির মাংস আর চার টুকরা আলু। মালতী তখন কোলের বাচ্চাকে পা ছড়িয়ে বসে দুধ দিচ্ছিল। এই একটা সময়, যখন তামাম দুনিয়ার কথা ভুলে যায় মালতী। এমনকি নিজের কথা নিজের পিপাসার কথাও। কোলের বাচ্চাটা হাত-পা ছড়িয়ে কোলে শুয়ে আয়েশ করে স্তনের চুষি টানছে। একহাত দিয়ে সে ধরে আছে মায়ের হাতের আঙুল। যেন সে তার খাওয়া শেষ হওয়ার আগে বাধা না দিতে পারে। চুষি টানতে টানতে মায়ের মুখের দিকেও নজর রাখছে। তার ভরাট গালে টোল পড়ছে। মায়ের চোখের পলক ফেলা দুষ্টমিতে সে হাসে কিন্তু স্তনের দখল ছাড়ে না।  এই মুহূর্তটায় মালতীর সঙ্গে থাকে। মামানীর আগমন টের পেলেও কোনো সাড়াশব্দ করে না। ননীবালাও বিশেষ কোনো কথা না বলে চলে যায় নিজের নৌকায়। যাওয়ার আগে কেবল জনতে চায়—খাইল্লা কই?

উত্তরে মালতী নিচের ঠোঁটটা বাড়িয়ে দেয়। ননীবালা এর অর্থ বুঝে চলে যায়। ফের মালতী মেয়ের প্রতি মনোযোগী হয়। খলিলের আর কোনো উদ্বেগ নেই। খুব স্বাভাবিকভাবে সে দুপুরের খাবার খেতে আসে ননীবালার নৌকায়।
মামনীরে, দুইডা খাইতে দে, পেটটা কেমুন জ্বালবার নাগছে।।
হ বাজান, ব।
ননীবালা-টিনের থালায় বাত আর তিতির পাখির একটুকরো মাংস তুলে দেয়।
ঝোলনি আছে, মামানী?
ননীবালা হাতায় করে একহাতা হলুদ ঝোল তুলে দেয় খলিলের পাতে। বলে—খা-বাজান খা, মন খারাপ কইরা কী হইবো? যা হয় আল্লাহ ভরসা।

খলিল রা’টি পর্যন্ত করে না। গোগ্রাসে গিলতে থাকে। সেই দিকে চেয়ে ননী বালার বুকটা জুড়িয়ে যায়। নিজের পেটে তার তিন-তিনটা মেয়ে। বাপের দেশে তাকে রাজকপালী বলে। অমন বীরের মতো শ্বশুর বীরের মতো স্বামী তার ওপর তিন তিনডা নাগকন্যা।  ঈর্ষাও করে তারে অনেকেই।  ননীবালা কেয়ার করে না। ছেলে-সন্তানের সাধ তার ছিল। মুখ ফুটে বলতে পারেনি স্বামীকে।  হয়েও ছিল। কিন্তু আল্লায় তুলে নিছে। তার বদলে খলিলরে দিছে। পরম মমতায় সে তুলে নিছে বুকে। মেয়েরা হিংসায় জ্বলত। ননীবালা উল্টো মেয়েদের পিঠে কষে মার লাগাতো। খলিল এই যে ডাক ছেড়ে কাঁদত। থামতো না কিছুতেই। শেষে নিস্তেজ স্তনের বোঁটা মুখে পুরে দিত ননী বালা, কই ঘুইরা বেড়াস খালি। বাপ!

খলিল থালায় হাত ধোয়। ননীবালা থালা টেনে পানি ফেলে দেয় চন্দনায়। খলিল আচমকা গড় হয়ে শুয়ে পড়ে ননী বালার কোলে মাথা রেখে—মামানীরে কতদ্দিন-তু-হামার মাথাৎ হাত দেস না ক দিখি।

ননী বালা হাসে, পাগলা বেটা হামার। পাগলই বটে সে। নইলে দরবারের দিনে আর বেজার হইয়া থাকার কথা তার নয়। সে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। যেন কিছুই ঘটেনি। মামানীর নৌকায় আসার সময়-জগুর সঙ্গে খগেনের সঙ্গে দেখা। কেউ কোনো কথা বললো না। সরে গেল মুখ ঘুরিয়ে। কেয়ার করেনি খলিল। এতদিন উপেক্ষা সে সহ্য করতে পারেনি। নীরবে গুমরে কেঁদেছে। আজ সে উপেক্ষা আগ্রহ্য করে জগাইকে ডাকে, জগু-জগুরে। জগু ফিরে তাকায়। এগিয়ে আসে। যতই সে উপক্ষো করুক সর্দারের ভাগ্নে সে ঝন্টু মালের নাতি। তার ভি দাম আছে তো। জি কও। একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খলিল বলে, ‘স্বগ্গ আছে স্বগ্গ আছে মানুষ যুদি নাই। মানুষ ছাড়া সগ্গের দামনি আছে ভাই? খলিলে মুখের দিকে চেয়ে থাকে জগা।  খলিল পিঠচাপড়ে বলে, যে কামে যাবার লাগছিলা, যা তার পরেই সে মামানীর নৌকায় আসে।

চলবে…

বিশল্যকরণী-৫॥ রঞ্জনা বিশ্বাস

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন