কাজী জহিরের কবিতায় উপমা-চিত্রকল্প ॥ পীযূষ কান্তি বড়ুয়া | চিন্তাসূত্র
২ ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৭ আগস্ট, ২০১৮ | রাত ১১:৩০

কাজী জহিরের কবিতায় উপমা-চিত্রকল্প ॥ পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

কবিতা এক অনন্য শিল্প। যিনি কবিতাকে ধারণ করেন তিনিই কেবল এই শিল্পের সুষমায় বিমূর্তকে মূর্তরূপে বিকশিত করেন। কবিতাকে যথার্থ অর্থেই শিল্প করে তোলে উপমা আর চিত্রকল্প। জীবনানন্দের চিত্রকল্পগুলো শিল্প ও জীবনের সৌন্দর্যকে চিত্রিত করে তুলেছিল বলেই তা চিত্ররূপময়। উপমার সযতন বিন্যাসে নজরুলের কবিতার চরণগুলো হয়ে উঠেছে অপার্থিব। উপমা ও চিত্রকল্পশিল্পী কবি কাজী জহিরুল ইসলাম লিখেছেন প্রচুর। এখনো তাঁর কলম ভীষণ রকম সচল।। তার অনায়াস সৃজনশিল্পে বিশেষ একটি স্থান দখল করে আছে উপমা ও চিত্রকল্প।

‘অতৃপ্তি’ কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘আয়ুর বয়স আলোর সমান’। আলো এখানে জীবনের প্রতীক হয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে। আলো চমৎকারভাবে এখানে চিত্রিত করেছে জীবনের অনন্য ব্যাপ্তিকে। যতদিন আলো আছে জীবনে ততদিন আয়ুও আছে জীবনের দীপ হয়ে। তারই বিপরীতে তিনি রাতকে আবিষ্কার করেন অতৃপ্তির অপূর্ণতায়। আলোর আগমনে রাতের আয়ু ক্ষয় হয়। রাত তাই অতৃপ্ত থাকে ব্যাপ্তিতে, প্রাপ্তিতে। রাতের অতৃপ্তির সঙ্গে কবিও অতৃপ্ত। অতৃপ্তির অপূর্ণতাকে পূর্ণতায় পেতে কবি কবিতার শিরোনামেই বলে ওঠেন ‘আজ রাতে চোখ ছুড়েছি’। রাত যেন কবির কাঙ্ক্ষিত কান্তা। তাকে কাছে পেয়ে তিনি হয়ে উঠেন উদ্বেল, উচ্ছ্বল। তাই তার চোখ আর চোখ থাকে না, নিমিষেই হয়ে যায় শস্ত্র-শামিল। ‘অশ্রুযতিচিহ্ন’ কবিতায় কবি হাঁটেন শোকের সমান আয়ুপথে। শোক এখানে জীবনের অনুসঙ্গ। ‘শোকের সমান আয়ুপথ’ হয়ে উঠেছে এক চমৎকার চিত্রকল্প। এখানেই কবি কণ্ঠ ছেড়ে বলেছেন,

মায়ের ক্রন্দন থেকে গর্জে ওঠে যে নদী
কোন তটরেখায় তা আছড়ে পড়ে মিছিল বিকেলে?

কবি খুব সুন্দর করে নির্মাণ করেন বিকেলের পরিচিতি। তার এই বিকেল গর্ভে ধারণ করে আছে মিছিলের সৃজনসত্তা। বিকেলের আগের মিছিল কথাটি পরিবেশনের মাধ্যমে কবি অযুত-সহস্র মানুষের জমায়েতকে করে তুলেছেন গর্জনময়। ‘আলপিন ধর্মের ইচ্ছেবিজ্ঞান’ কবিতায় কবি নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন পৃথিবী ও তার মানুষকে উপমার শিল্পরূপের মাধ্যমে। তিনি বলেছেন ‘একটি গোলকে পরম আটকে আছে কোট কোটি আলপিন’। বাস্তবিক পৃথিবীর বুকে মাধ্যাকর্ষণের কল্যাণে সবাই আটকে আছে আলপিনের মতো।

উপমায় কখনো কখনো কাজী জহিরুল ইসলাম নিয়ে আসেন শ্লেষ, নিয়ে আসেন স্যাটায়ার। এই শ্লেষ ও স্যাটায়ার কবিতার দেহে জড়িয়ে হয়ে ওঠে শিল্প। ‘রক্তস্রোতবন্দনাশিল্পকাব্য’ ধরণের নূতন শব্দ প্রয়াসে শ্লেষ ও উপমা বাঙময় হয়ে ওঠে। তখন বলতেই হয় কাজী জহিরুল ইসলামের উপমারা শব্দ নয় ছবিই হয়ে রয়। মাঝে মাঝে জীবনানন্দের কৌশলও তার উপমার প্রকৌশলে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। একই শব্দের একাধিকবার ব্যবহারে জীবনানন্দ যেমন কখনো কখনো আকাশ ও তার ব্যাপকতাকে তুলে ধরেছেন তেমনি বক্ষ্যমান কবিও আঁধারের একাধিক ব্যবহারে বলে উঠেন ‘আঁধার ফেটে যায় আরো দূর আঁধারে’। আঁধার তখন আঁধার না থেকে হয়ে যায় দারুণ এক চিত্রকল্প। একই পঙ্‌ক্তিতে আঁধারের একাধিক ব্যবহার আঁধারের ব্যাপ্তি বাড়িয়ে নির্মাণ করে উপমার নান্দনিকতা। পাখি হয়েও উড়তে পারে না উটপাখিরা। তাদের ডানা আছে, জানা নাই উড়াল। এই উড়ালের জন্য তাদের সভা আহ্বান কবির দৃষ্টিতে নেহায়েৎ জরুরি হয়ে পড়েছে। কবির চোখে উটপাখিদের উড়তে না পারার ঘটনা কোনো নেহায়েৎ সাদামাটা ঘটনা নয়। বরং তাদের উড্ডয়ন শিল্প সময়ের হাতে লুট হয়ে গেছে। এখানে ‘লুট’ এর ব্যবহার তৈরি করেছে বিবর্তনবাদের ধারাবাহিকতা। তাই কবিতারা হয়ে উঠেছে চিত্রকল্পময়। ‘ঊনত্রিশে মার্চ বৃত্তান্ত’ কবিতায় কবি দুপুরকে উবে যেতে দেখেন। কর্পূর এর মতোই দুপুর যেনো উদ্বায়ী হয়ে যায় ঘটনার পরমার্থে। ‘উদ্বায়ী দুপুর’ বলার সঙ্গে সঙ্গেই নাকে আসে ন্যাপথালিনের সুঘ্রাণ আর জীবন্ত হয় সফেদ পূণ্যতা। ‘একান্ন দেহ’ কবিতাতে দেহকে একান্নতায় লালন-পালনের ধারণা দিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় লুপ্ত হওয়া আগেকার একান্নবর্তী পরিবারকেও চোখের সামনে হাজির করে। সত্যিকার অর্থেই দেহ একটি একান্নবর্তী পরিবার। সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-কোষ-কলা সবই এখানে একটি মাত্র পরিবার হয়ে মায়া-মমতায় সুশৃঙ্খল হয়ে আছে। কবি ‘একান্ন দেহ’ পদবাচ্যের মধ্য দিয়ে আত্মঅবহিতির আত্মপ্রয়াসকে মূর্ত করে তুলেছেন। কবি যখন চিত্রকরকে ডেকে বলেন ‘আঁকো দেখি বুকের বাতাস’- তখন বুক ও বেলুন এক হয়ে চোখে ভেসে ওঠে। সত্যিকার অর্থে, কবি ‘বুকের বাতাস’ বলতেই চিত্রকর এর পক্ষে তা আর আঁকা কঠিন হয় না। কল্পনায় অবয়ব ফোটে ফুসফুস ও বেলুনের যুগল গ্রন্থিতে। একটা সময় ছিলো এ দেশে এবং তা এখনো আছে কনসার্ট শুনতে তরুণ ও যুবাদের ভিড় হতো। লোকে-লোকারণ্য হতো উচ্ছ্বলতায়। কবি হয়তো তার দূর বালকজীবনে ফিরে এ রকম কনসার্ট এর নস্টালজিক মায়ায় পড়ে যান। কবি যখন বলেন, ‘ছায়া মানুষেরা রোদের কনসার্ট শোনে’ তখন রোদ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। জীবন পেয়ে রোদ ঘোরাফেরা করে বুঝি আমাদের চারপাশে। ‘একটি অসমাপ্ত ভ্রমণ’ কবিতায় কবিকে সন্ধ্যায় বনপোড়া জ্বরে পেয়ে বসে। ‘বনপোড়া জ্বর’ তবে কি আপনাকেও তাপিত করে না? দাবানলে পুড়ে যাওয়া বনের উত্তাপ আর জ্বর কী সুন্দর উপমায় শব্দবন্দী হয়েছে কবির কল্পনায়। বনপোড়া জ্বরের উপমা আস্ত বনকেই চোখের সামনে পোড়াতে শুরু করে কবিতায় নিমগ্নতার সঙ্গে সঙ্গে।

কবি কাজী জহিরুল ইসলামের উপমারা সবসময় যে গতিকেই ধারণ করে তা নয়। কখনো কখনো উপমারা নস্টালজিক হয়ে যায়। তাদের নস্টালজিয়া ছবির রিঙ্কলস-এ জমে থাকা ধুলো ঝেড়ে জীবন ফিরে পায়। চিত্রকল্প নির্মাণে প্রেমের ব্যবহার কবির হাতে ফুটেছে সাবলীলতায়। তরুণীর প্রেমে মজে ওঠা কবি পঙ্‌ক্তিতে ফুটিয়ে তোলেন ধাবমান রেল যার বাইরে চারআনা বা সিকিমূল্যের প্রেমিক পৌনে এক টাকার বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রেমিকার বিচ্ছেদে আত্মসমবেদন খুঁজে পান। প্রাণহীন পাথরও প্রাণবন্ত হয়ে যায় উপমার গুণে। আর তাতে যদি নারীর স্পর্শ থাকে তবে পাথরেও ফোটে ফুল। কবি ‘দিদজেরিদু’ কবিতায় এ রকম উপমার প্রতিমা গড়েন যেখানে ‘পাথরে বিছিয়ে দেহ কোনো গুহামানবী’ বাজায় প্রাণ।

আড্ডা আর আলাপনের কথা উঠলে চায়ের কাপে ঝড়ের উপমা আসে। কিন্তু কবি ঝড় না, চায়ের কাপে বর্ষাকে খুঁজে পান উপমায়। সুদিনগুলোতে চায়ের পিপাসা মেটাতো অবিরল ধারার বর্ষার মতো চা আপ্যায়নে। কিন্তু এখন দিনগুলো ডানাগোটানো, প্রতিকূল। তাই চায়ের কাপে আজ আর বর্ষা আসে না। উপমার অনিন্দ্য প্রয়োগে চা নয়, বর্ষাই বেজে উঠেছে টিপ টিপ বৃষ্টির সুরে পাঠকের শ্রবণে।

নিজেকে ‘বাওনবাইডার পুত’ ভাবতে পিয়াসী কবি ‘ভগ্নাংশ’ কবিতায় একদিন প্রমত্ত গঙ্গায় পূর্ণস্নানে তৃপ্ত হন। ‘প্রমত্ত গঙ্গা’ এখানে পূতঃ প্রেমের উপমায় পবিত্র হয়ে উঠেছে। অবয়ব পেয়েছে উথাল-পাতাল প্রেম, নদী ও নারী রূপে গঙ্গার মিথ নিয়ে। প্রেম কবিকে নিরন্তর আপ্লুত করে বলেই আমরা কবির বুকের ভেতর দূরের আপনকে নড়ে উঠতে দেখি। ‘দূরের আপন’ এমন এক চিত্রকল্প যা বুকের মধ্যে একটা গাঢ় টান তৈরি করে, একটা অপার্থিব বেদনা জাগিয়ে তোলে।

উপমায় কবি প্রেমের কোমলতা ছেড়ে হয়ে উঠেন ক্রমশঃ সাহসী। তার সাহস অঙ্কুরিত হতে হতে একসময় বলে ওঠে ‘মানুষের জিহ্বায় মেরুদন্ড গজাতে শুরু করেছে’। মানুষ আসলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে সাহসী হয়। তখন মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ায়। নচেৎ বাঙালি সর্বদা তোয়াজ আর তেলে অভ্যস্ত। কিন্তু জিহ্বায় যদি মেরুদন্ড গজায় অর্থাৎ মানুষ যদি কথায় তার দৃঢ়তা ও সাহস বজায় রাখে তবে তাতে সার্থক হয়ে ওঠে মনুষ্যত্ব। কবির উপমারা সাহসী হওয়ার পর খুঁজে পায় প্রজ্ঞায়। প্রজ্ঞা-দৃষ্টি পেয়ে উপমারা বলে, ‘সাঁওতাল শিশু রোদের সতীর্থ’। অর্থাৎ রোদ যেমন আঁধার তাড়ায়, হেসে লুটোপুটি খায় ঘাসে, সাঁওতাল শিশুটিও তেমনি রোদের মতোই নির্মল, প্রাণবন্ত। রোদের শিক্ষক প্রকৃতি আর সাঁওতাল শিশুটিকেও বড় করে তোলে নিসর্গবিদ্যালয়ে। কবি নিজেও পাঠ নেন নিসর্গ থেকে। তিনি দেখতে পান উড়ে যাওয়া যুগল শাবকের মধ্যে যুগল ব্যঞ্জনবর্ণ। সন্ধ্যা যখন কবির কল্পনায় জলজ হয়ে ওঠে তখন আর বুঝতে বাকী থাকে না এই সন্ধ্যা বিকেল গড়িয়ে আসে বলেই জলের মতো উপমায় মূর্ত হয়।

দেহকাব্যের একটি পংক্তি কানে বাজে ‘হাত বাড়িয়ে পাই না তোমার শেকড় দিয়ে পাই’। এ শেকড় সে তো আদিমতা, অস্তিত্বের বুনো শীৎকার। ‘ডাক্তার রোগ বোঝে, কৃষ্ণ বোঝে লীলা’, আর কবি বোঝেন উপমার মানিকজোড়। ‘কৃষ্ণ’ কবির চোখে এক দেহতাত্ত্বিক চিকিৎসক যিনি লীলা দিয়ে নীরোগ করেন প্রেমাষ্পদকে। কবি নিরোগ করে তোলেন তার কবিতায় আসক্ত জনকে অনুপম উপমায়, জীবন্ত চিত্রকল্পে।

ক-বচনের কবি দেশকে দেখেন বৃহৎ জেলখানার মতো। সীমানা দিয়ে ঘেরা, বিধি-নিষিধের সংকীর্ণতায় দেশ যেনো সত্যিকার অর্থেই জেলখানার মতো নির্মম আচরণ করতে শুরু করে। ‘বালিকাদের চাবিওয়ালা’ কবিতায় কবি হেমন্তকে দেখেন ‘দুঃখ পুরাণ’ এর মতো। সমাগত শীতের বেদনালিপি নিয়ে হেমন্ত ধারণ করে দুঃখের পুঁথি, করুণ পুরাণ। প্রিয়ার স্তুতিতে মগ্ন কবির চোখে চুলের দীর্ঘ সৌন্দর্য মানে না ব্যাকরণ। তাই সমাসের প্রকৌশলও হার মানে প্রিয়ার চুলের দীঘলতাকে বাগে আনতে।

কবিতায় ক্রিয়াপদহীনতার শিল্পী কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। ‘ক্রিয়াপদহীন ক্রিয়াকলাপ’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে আমরা কবিকে বলতে শুনি- ‘আমাদের হাতগুলোই সেতু তপ্ত খররোদে’। ‘সেতু’ এখানে দারুণ অনিন্দ্য মূর্ত করে তোলে তুমুল ইচ্ছা ও উদ্যোগের শক্তিকে। কাউকে আর বলে দিতে হয় না তখন ‘আপনা হাত জগন্নাথ’। ‘ইমিগ্রান্ট’ কবিতাতেই আমরা তার আক্ষেপ শুনি- ‘ভোরের আলো তখনও দূরের অতিথি’। সৌভাগ্যের অন্বেষণে স্বদেশ ছেড়ে আসা একজন অভিবাসীর কাছে পরবাসে বৈধতা সে যে রাতের আঁধার পেরিয়ে ভোরের আলো পাওয়ার মতোই। কবির ‘ভোরের আলো’ আর অভিবাসীর ‘নাগরিক সনদ’ এ যেন সমার্থক হয়ে দাঁড়ায় ভুক্তভোগীর চোখে।

কবি কাজী জহিরুল ইসলামের উপমারা কখনো গতিমান, কখনো নস্টালজিক আবার কখনো আধুনিক এবং উড়ালমুখী। কবির কবিতার নির্মাণে তার উপমা ও চিত্রকল্পসমূহ তৈরি করে নিপুণ গাঁথুনি এবং সবশেষে শব্দকে শব্দের অধিক শিল্প করে তোলে। উপমা ও চিত্রকল্পের শিল্পী কবি কাজী জহিরুল ইসলাম তার কবিতার পঙ্‌ক্তিতে ফিরে পান শ্বসনের সজীবতা, স্বপনের বিনোদন আর জীবনের স্বাভাবিকতা। অর্ধশতকের উপাখ্যানে কবির উপমা ও চিত্রকল্পেরা সমৃদ্ধ করেছে শিল্পের জগৎ।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন