মধ্যমা ॥ আশান উজ জামান | চিন্তাসূত্র
১৩ ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ | রাত ৪:৩২

মধ্যমা ॥ আশান উজ জামান

হতভম্ব হয়ে গেছে আরিফ। ধড়ফড় করছে বুক।  মহিলারটাও। তারটাও। উত্তেজনায়।  হাত কাঁপছে তার। ভয়ে। আর চিন্তায়।

কিছুক্ষণ আগেও যা যা ছিল, হঠাৎ নেই হয়ে গেছে সব। টিনের চাল। ইটের দেয়াল। দেয়ালে লটকানো সূচিকর্ম। তার নিচে ঢাউস আকৃতির নিপ্পন টিভি। কিছুই যেন নেই। আরিফ দেখছে না কিছুই। ওই অবিরাম টিকটিক আর পায়রার বাকুম বাকবাকুম বাক আর হাঁস মুরগির গান আর বাঁশঝাড়ে বাতাসের ফিসফিস কিছুই আসছে না কানে।

কানজুড়ে শুধু ভারী নিঃশ্বাস। তার আর মহিলার।
চোখজুড়ে শুধু ঘোর।
ঘোরলাগা চোখদুটো স্থির হয়ে আছে মহিলার ওপর।

মহিলার বুকে চোখে ঠোটে মুখে লেপ্টে আছে আহ্বান। পৃথিবীর সবচে’ সরল সবচে’ কোমল সবচে’ প্রবল সে আহ্বান। যেটা এড়ানো কঠিন। তাতে সাড়া দেওয়া আরও কঠিন। এবং, বিশেষত, লোকটা আরিফ বলেই, এটা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। কারণ সে উড়ে যাওয়া বাতাসে ঘুরে যাওয়া শুকনো পাতার মতো। নিয়ত দিকহীন। সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। ঠিক করতে পারে না কোথায় যাবে। বা আদৌ যাবে কিনা। কে যেন বলেছিল তার মাথা একটা শানবাঁধানো পুকুরঘাট। তাতে শ্যাওলা ধরেছে। কোনো চিন্তাই সেখানে দাঁড়াতে পারে না বেশিক্ষণ। পিছলে যায়। তাই সকালের কথা সে বিকেলে ভোলে। সন্ধ্যার কথা ভোরে। এক লাইনের একটা সিদ্ধান্ত নিতেও প্রাণান্ত হয় তার। ফলে চিরকাম্য চিররম্য এই আহ্বানে সে সাড়া দেবে, না গিয়ে দাঁড়াবে অন্য মানুষের দলে, বুঝতে পারে না। ঘামতে থাকে। ঘামতে থাকে।

গোঁফের রেখা কেবল গাঢ় হয়েছে। এখনো চাষ হয়নি তাতে। নেহাৎ বাচ্চা একটা ছেলে। এরকম ভয়ানক পরিস্থিতিতে কেন পড়ল সে? চাইলেই কি এড়ানো যেত না এই কুরুক্ষেত্র? চাইলেই কি থাকা যেত না নিরাপদ দূরত্বে?

না, যেত না। এটাই হওয়ার ছিল। নইলে চেষ্টা তো আর কম করেনি!
কতবার ভেবেছে, কোনো মেয়ের সঙ্গে জড়াবে না। না তার নাম। না তার মন।

কতবার ভালো লেগেছে একে ওকে। কত জন তারা! কেউ কাছের। কেউ দূরের। কেউ আপু। কেউ ভাবী। কেউ ছোট। কেউ বড়। কেউ না থাক, তাদের নিয়ে ওরকম ভাবলে জিব কাটতে হয়, তওবা পড়তে হয়! তবু ভালো লেগেছে। প্রতিবারই শান্ত করেছে নিজেকে। নিবৃত করেছে এটা ওটা বুঝিয়ে।

তবু কি রক্ষা হলো শেষে?
লজিং থাকার মহিমা বোধহয় এখানেই।
যারাই থাকে, কাৎ হয়ে যায়। আরিফ জানে। তার দুই চাচাও এই দলের। দুই চাচীই চাচাদের ছাত্রী ছিলেন। পড়তে পড়তে আর পড়াতে পড়াতেই প্রেম। তারপর জানাজানি। তারপর বিয়ে।

রকমারি গল্প চালু ছিল তালেব স্যারকে নিয়েও।

সবারই এক হাল। লজিং থাকা মানুষের। হয় বিয়ে, নয় কেলেঙ্কারি।

এ কালি মাখবে না বলেই পণ করেছিল সে। ভেবেছিল থাকবে না লজিং। কিন্তু শহরে পড়ার খরচ অনেক। দিনমজুর বাবা। টানবে কিভাবে? বাধ্য হয়েই তাই এ বাড়িতে আসা।

কলেজ থেকে খুব দূরে নয় বাড়িটা। খুব কাছেও নয়। এক পা দুই পা করে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রামটা। শহরের দিকে। বেশ একটা সাবালক সাবালক ভাব তার। শহরটাও দুহাত বাড়িয়ে রেখেছে। কিছুদিন পরই মিলে যাবে। মিশে যাবে। আলাদা করা যাবে না তাদের।

গ্রামের অধিকাংশ লোক কৃষক। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খায়। দুএকজন আছেন যাদের বেতন ধরা। মাস গেলেই চেক। এমনই একজনের বাড়িতে জায়গা হলো তার। লম্বা স্কুলঘরের মতো বিল্ডিং। পাশাপাশি চারপাঁচটা ঘর। সামনে পাল্লা দিয়ে লম্বা হয়েছে বারান্দাটা। বারান্দার এক প্রান্তে ইটের দেয়াল তুলে ঘর করা হয়েছে আরেকটা। পকেটের মতো। ওই পকেট ঘরেই থাকে আরিফ।

ছাত্র দুজন। দুই ভাই। বড়টা ক্লাস এইটের। ছোটটা পড়ে থ্রিতে। ছোটটা যত মেধাবী, বড়টা ততই গাধা! একজন বাঁহাতে লেখে। অন্যজন ডানহাতে। একজন ফর্সা। আরেকজন কালো। এক মায়ের পেটে এরকম হয়! বিশ্বাস হয় না আরিফের। মিল বলতে এই, দুজনই খুব মিষ্টি। আর পড়তে বসলে দুজনই ঝিমোয়।

কলেজ থেকে ফিরে পড়তে বসে আরিফ। বিকেলেই। সন্ধ্যাটা ছাত্রদের জন্য বরাদ্দ। এসময় প্রায়ই লোডশেডিং হয়। হারিকেন দিয়ে যায় ছাত্রদের বড় বোন। হারিকেনের আলোয় জাদু আছে। চোখ বুজে আসে পিচ্চিদের। আরিফেরও। ঢুলে ঢুলে পড়ে। পড়তেই থাকে।

এই ঘুমঘুমপড়া আর পড়াপড়াঘুমের শেষ হয় খাবার সময়। বারান্দায় প্লেট পড়ে ছয়টা। একপাশের তিনটা নিয়ে বসে আরিফ আর তার ছাত্ররা। পাশেই আঙ্কেল। বাড়ির কর্তা। ছোটখাটো গোলগাল শরীর। পাশে আরো মোটা আন্টি। ওপাশে আরিফের দিকে মুখ করে বাড়ির বড় মেয়ে। লাবণী। ক্লাস টেনে পড়ে। ভালো ছাত্রী বলে একটা পরিচয় আছে তার। দেখতে কেমন জানে না আরিফ। দেখেনি কোনো দিন। খাওয়ার সময় মুখোমুখি (দূরত্ব যতই হোক) বসেও না। বিদ্যুৎ গেলে হারিকেন জ্বালাতে এসে হাতে হাতে (অন্ধকারে, অনিচ্ছায়) ঠোকাঠুকি লাগলেও না। দেখেনি কোনো দিন। প্রেমে পড়ার ভয়েই মূলত। এসব করলে যে পড়াশোনা শিকেয় উঠবে, তা তো জানা। তাই সব মনোযোগ তার পড়াশোনায়।

সারাদিন কলেজে থাকে। আড্ডায় সে নেই। খেলায় নেই। অকারণ অনাদরে বসে বসে সময় নষ্ট করায় নেই। ক্লাসের বাইরে সময় কাটে পাঠাগারে। পড়া নিয়েই ব্যস্ত সে। সন্ধ্যায় ঘুম পায়। ঘুমোয়। কিন্তু ভোরবেলা ঠিকই ওঠে। পড়তে বসে। তখন মোমের আলো সাথী হয় তার। ভীরু মৃদু আলোটুকু জ্বলতে থাকে। জ্বলতেই থাকে। সে আলোয় জ্বলে জ্বলে রাঙা হয় সূর্য। আকাশ রাঙায়। তখন ওঠে ছাত্ররা। পড়তে বসে। আর গুছিয়ে নিতে থাকে আরিফ। কলেজ তাকে ডাকছে। গোছাতে গোছাতেই পড়ায় ছাত্রদের। বোঝায়। বকে। মারে। বোঝায়।

একটা ফাঁকিবাজি যে হচ্ছে, তা আরিফও বোঝে। কিন্তু তার কাছে তার পড়াটাই আগে। তাছাড়া ওরা তো পড়ছেই। ভালোও করছে। বড় ছেলেটা গতবছর কুড়ি পেয়েছিল অংকে। এবার পেয়েছে বিয়াল্লিশ। অত চিন্তা তাই করে না ও। তারপরও যদি এখানে থাকা না হয়, না হবে। অন্য কোথাও যাবে। কোনো পিছুটান তো নেই!
কিন্তু পিছুটান জন্মাতে সময় লাগে না।
ওপাড়ার বাবুলের সঙ্গে ভাব হয়েছে আরিফের।

একসঙ্গে বেড়ায়। নামাজ পড়ে। পুজো দেখতে যায়। মেলায় ঘোরে। যাত্রাপালা দেখে। জোছনা মাখে। রাতের আঁধার রাঙায় কবিতায়। আর গানে। আর চুটকির রসে।
ভিনজায়গায় থাকা, এমন দুই একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ভালো। কাজে লাগে।
সেদিন বিকেলেও বেরিয়েছিল। হাঁটছিল খালপাড়ে। এ কথায় সে কথায় বাবুলই বললো কথাটা।
লাবণীর জন্য পাত্র দেখা হচ্ছে। ছেলে পাশের গ্রামের।

আরিফের খুশি হওয়ার কথা। উল্টো মন খারাপ হলো। সেদিন থেকে বদলে গেল সময়। লাবণীর প্রতি আগ্রহ বাড়লো। বোঝা গেলো লাবণীই বরং এড়িয়ে চলে আরিফকে। এটাই তো চেয়েছে আরিফ! বোঝালো নিজেকে। নানাভাবে। নানা যুক্তি দেখাল। নানা পন্থা শেখালো। কিন্তু এমনই ঢেউ এটা, কোনো বাঁধই টেকে না। টিকলোও না। তার চোখ তার কথা শোনে না। বিরুদ্ধে গেলো কান। হাত। নাক।

গোপনে লাবণীর দিকে চেয়ে থাকে সে। সুযোগ পেলেই তার কাপড়ের গন্ধ নেয়। সবাই যখন টিভিই দেখে, আরিফের চোখে পড়ে লাবণীর ছায়া। মেয়েটার পছন্দের নায়কের মতো চুল কাটায় আরিফ। তার মতো করে হাঁটে। সবমিলে বেশ একটা থইথই ব্যাপার! ফলে পানি উঠলো পড়াশোনায়। আর জোরালো হলো গানের গলা। রবীন্দ্র নজরুল আগে গুনগুনাতো, এখন খোলা স্বরে গায়। মিলন হবে কত দিনের আস্থায়ীটা নিয়ে লালনও হাজির।
তবে? আরিফ এবার পড়েই গেল। প্রেমে!
তা পড়ুক। এ বয়সে ওরকম একটু মন আনচান না করলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে না। না শরীরের। না মনের।

কিন্তু টনক নড়লো সরস্বতীর। আরিফের মা হয়ে তিনি স্বপ্নাদেশ দিলেন! ভালো করে পড়িস বাবা। ভালো হয়ে থাকিস।  হুঁশ হলো আরিফের। এ কী করছে সে! না এভাবে আর না। পড়াশোনায় চড়ে বসতে হবে। আবার।

দুদিন খুব চলল পড়াশোনা। পড়া আর পড়া। অন্যদিকে মনোযোগ নেই।
কিন্তু জোর করে কি আর পিরিত হয়? পড়া তাই পড়েই থাকল। আবার।
এর মধ্যেই লাবণীর বড় খালা এলেন।

আন্টির বোন বলে মনে হয় না মহিলাকে। আন্টি তো নাদুশনুদুশ ফর্সা গোলগাল এবং দেখতে বদখৎ। আর ইনি ছোটখাটো কালো কিন্তু সুন্দর। তবে কপালটা বোধহয় ফাটা। কথা বলতে পারেন না। শোনেনও না। বিয়ে হয়েছিল। বছরখানেকের মধ্যেই ভেঙেছে সে ঘর। সেই থেকে একা। বাপের সম্পত্তি পেয়েছেন। সেসব ভাগ করে দিয়েছেন দুই বোনকে। দুজনের বাড়িতেই থাকেন।  ছ মাস।  ছ মাস। পালা করে।

যোগাযোগের কাজ সারেন হাত পা নাড়িয়ে। নানা রকম অঙ্গভঙ্গিই তার ভাষা। দুহাত বুকে বেঁধে একপাশে হেলে দাঁড়িয়ে যে বিশেষ ভঙ্গিটা করেন, সেটা দিয়ে আন্টিকে বোঝান। অনামিকা আর মধ্যমা দিয়ে কানের লতি ধরা মানে লাবণী। বুড়ো আঙুল মুখে দিলে আংকেল। একেকজনের জন্য একেক সংকেত। পরিচিতজন সহজেই বোঝে সব। কিন্তু অন্যদের বেলায় ঝামেলা। খুব বেগ পেতে হয় তাকে।

নামটা কী? শোনা হয়নি কখনো। সবাই বলে গুঙি। আরিফের এটা পছন্দ না। তবুও গুঙি বলেই ডাকে।

মায়া হয় গুঙির প্রতি। স্বামী-সংসার নিয়ে তার সুখে থাকার কথা। অথচ এই শিকড়হীন ভবঘুরে জীবন কাটাচ্ছেন। এত কষ্ট কেন মানুষের? কেন চাইলেই সবাই ভালো থাকতে পারে না? আরিফ চেষ্টা করে তাকে সাহায্য করতে। যতটুকু সাধ্যে কুলোয়, ততটুকু করেও। কিন্তু গুঙি তাকে সহ্য করতে পারেন না। কেন পারেন না? ও যে লাবণীর মোহাবিষ্ট, বুঝে ফেলেছেন নাকি মহিলা? বোবাকালাদের অন্য ইন্দ্রীয়গুলো প্রখর হয় বলেই শুনেছে। তাই হবে হয়তো। না হলে তার দিকে এমন খটোমটো করে তাকান কেন তিনি!
সেই তাকানো হঠাৎ বদলে গেল।
খুব অসুখ হয়েছিল আরিফের।
আরিফকে যারা চেনে, তারা জানে, ও কেমন। একটু কিছু হলেই নেতিয়ে পড়ে। দুদিন হুঁশই হলো না।

এই দু’রাত ঘুমোননি গুঙি। বসে থেকেছেন আরিফের পাশে। বমিটমি পরিষ্কার করেছেন। জলপট্টি দিয়েছেন। গা মুছিয়েছেন। একা।

সেই থেকে বেশ খেয়াল রাখেন তিনি আরিফের। পানিটা তেলটা এগিয়ে দেন। জোর করেই আরেকটু ভাত আরেকটু তরকারি আরেকটু দুধ তুলে দেন। আগে পাত্তাই দিতেন না। এখন এটা বলেন সেটা বলেন। কথার শেষ হয় না। আরিফ এই ইশারাভাষার আগাও বোঝে না, গোড়াও বোঝে না। অনুবাদ করিয়ে নিতে হয়। এখন ঘুমোনো যাবে না। গোসল করে আসো। ঠিকমতো কাপড় কাচতে পারো না যেহেতু কেচো না। আমিই কেচে দেবো। ছেলেদের মাথায় নারকেল তেল দিতে নেই, জানো না? সরষের তেল দাও। ইত্যাদি ইত্যাদি।

আন্টির মেজো বোনের বড় ছেলের নাম রফিক। অনার্স ভর্তি হয়েছে।

গুঙি বলেন, আরিফ নাকি তার মতো। চেহারায়। উচ্চতায়। চলনে বলনে।

রফিকের জন্য গুঙির সংকেতটা দেখেছে আরিফ। তর্জনি দিয়ে নাকের ওপর চাপ। একইরকম সংকেতে তিনি আরিফকেও বোঝান। তবে সেখানে তর্জনির জায়গায় মধ্যমা। পার্থক্য শুধু এটুকুই।

খারাপ লাগে না আরিফের। সদয় এই আচরণটুকু উপভোগই করে ও।  কিন্তু মন ভালো নেই তার। লাবণী এখনো দূরবাসী। এভাবে আর কত? ইনিয়ে বিনিয়ে তাই একটা চিঠি লিখেছে। ঘুরছে পকেটে নিয়ে। দিতে পারছে না। সুযোগ মিললো শুক্রবারে।

চাল কুটা হবে। বাড়িতে ঢেঁকি নেই। যেতে হবে পাড়ায়। আন্টি যাবে। গুঙি যাবে। তার ছাত্রছাত্রী যাবে। যাবে না শুধু লাবনী। কাল তার পরীক্ষা। পড়বে। এই তো সুযোগ। এসপার ওসপার হয়ে যাবে আজ।

চিঠিটা আরো ক’বার পড়ে দেখেছে আরিফ। দুটো বানান ভুল ছিল। ঠিক করে নিয়েছে। যা লিখেছে, পড়ে দেখলো আবার, পড়লেই ফেঁসে যাবে! নির্ঘাত।

কিন্তু সে আশায় ছাই! লাবণীও গেলো ওদের সঙ্গে।  মানুষের আশা ফিনিক্স পাখির মতো। মরলেও গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। বার বার। নতুন আশায় বসে থাকে আরিফ। নিশ্চয় ও ফিরে আসবে। একা। তখন দেবে চিঠিটা। দুপুর গড়ালো, তিন বার বিদ্যুৎ গেলো, তিন বার এলো, কিন্তু আসলো না মেয়েটা। কী নিষ্ঠুর!

ঘুমিয়ে পড়েছিল আরিফ। জাগলো গুঙির ডাকে। এক গামলা চালের গুঁড়ো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আন্টির ঘরের দরজায়। শিকল দেওয়া। খুলে দিলো আরিফ। তারপর ঘরে এলো। চিঠিটা পড়ে আছে বালিশের পাশে। কেউ যদি দেখে ফেলে! লুকোচ্ছে সেটা, এমন সময় আবার গোঙানি। গুঙি ডাকছেন। ছুটলো আবার। মহিলা শুয়ে আছেন। তাকিয়ে আছেন তার দিকে। হাসছেন। তাকে ডাকছেন। নেশাগ্রস্তের মতো কাছে গেলো ও। মহিলা ওর হাত দুটো নিলেন। বুকের ওপর রাখলেন। কেঁপে উঠলো আরিফ। মাথা ঘুরে গেলো। নড়তে পারছে না। হাত দুটো তার মহিলার বুকে। একহাতে চেপে ধরে রেখেছেন মহিলা। অন্যহাতে ইশারা করছেন। কী সজীব এই ইশারা! কী গাঢ় এই ডাক! কী মোক্ষম এই সুযোগ! আরিফের মতো মানুষ তা এড়াবে কী জোরে?

কত কিছু চেয়েছে আরিফ। কত কিছু ভেবেছে। কতজনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে। আকাশ বুনেছে কল্পনার। কিন্তু এমনটা কখনো চিন্তায় আসেনি।
ঘামছিল ও। আর কাঁপছিল।
ঘামতে ঘামতে আর কাঁপতে কাঁপতে নড়ে গেলো ভালোমন্দবোধ।
অনন্ত এক আঁধারের দিকে এগোলো আরিফ। আলো হয়ে যেখানে হাসছে গুঙির দেহটা। যেখানে হারিয়ে যেতে হয় সবকিছু নিয়ে। পুড়ে যেতে হয়। উড়ে যেতে হয়।

কিন্তু উড়াল দেওয়া হলো না ওর। কার যেন পায়ের শব্দ এলো বাতাস চেপে। সাবধান হতে হলো।

বের হয়ে এলো। নিজের ঘরে ঢুকলো। অপেক্ষা করলো। নিশ্চয় কেউ আসছে। খানিকক্ষণ কাটলো এভাবে। না, কেউ নেই। ততক্ষণে বুকের ধুঁকপুক কমেছে। হালকা হয়েছে শ্বাস। ফিরেছে জ্ঞান।

এরপর কি আর ফেরা যায় ওখানে?

না। তাই বের হলো ও। চোখ পড়লো গুঙির দিকে। দাঁড়িয়ে আছেন দরজায়। চোখে জল। দাঁড়াতে পারলো না আরিফ। পা বাড়ালো। দু’তিন বাড়ি পরেই পথ। পথের গায়ে মাঠ। মাঠের ওপর আকাশ। আকাশজুড়ে আলো। টানা রোদ। গরম পড়ছে খুব!

গেঞ্জিটা খুললো ও। একটু বসা দরকার। বসে পড়লো। পথের ওপরেই। কাঁঠালগাছের ছায়ায়।

কোমল পেলব নরম বাতাস ভাসছে। শরীর ঠাণ্ডা হলো। শান্ত হলো মন।

আরিফ তখন অতীতে। ছুটে বেড়াচ্ছে ঘটনা থেকে ঘটনায়।

ইঙ্গিতে ইশারায় অনেক কিছুই বলতেন গুঙি। আরিফ তা বুঝতো না। মাথা নাড়তো শুধু। হাসতো। সেসবের মধ্যেই হয়তো কোনো প্রশ্রয় ছিল।

প্রায়ই তার গা ঘেঁষে দাঁড়াতেন মহিলা। বসতেন। তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। অপলক। জানলা থেকে। দরজা থেকে। উঠোন থেকে।

সেদিনের ঘটনাটা মনে পড়লো।

সন্ধ্যা। পড়ছিল ও। ছাত্ররাও। বিদ্যুৎ চলে গেলো। হঠাৎ ছুটে এলেন গুঙি। অন্ধকারে। তার হাতটা হাতে নিলেন। নিজের বুকে চেপে ধরলেন। অস্বস্তি বোধ হওয়ার কথা ওর। হলো। কিন্তু খেয়াল করলো বুকটা মহিলার ধড়ফড় করছে। শরীর দুর্বল হলে এমন হয়। কী খাটাখাটনিটাই না করতে হয় তাকে। বেচারা। পাগল মানুষ। মায়া হলো খুব। ওষুধ এনে দিলো পরদিন। বুক ধড়ফড়ের!

গুঙির আর দোষ কী। সম্মতি হয়তো আরিফই জানিয়েছে! না জেনে।

অনেকক্ষণ পর বাড়ি ফিরলো ও। সব সেখানে স্বাভাবিক। কাজ শেষে ফিরেছে সবাই। আন্টি। লাবণী। আংকেলও ফিরেছেন। ইলিশ এনেছেন একজোড়া। কুটছেন আন্টি। আড্ডা বসেছে তাকে ঘিরে। কে কোন অংশ খাবে, হিসাব চলছে। মাথা নিয়ে ঝগড়া বেঁধেছে তিন ভাইবোনের। হাসি হাসি ভাব সবার। শুধু থমথমে মুখ গুঙির। উঠোন ঝাট দিচ্ছেন।  সামনে দিয়েই হেঁটে গেলো আরিফ। তাকানোর সাহস হলো না।

পরের সপ্তাহটা খুব বাজে কাটলো। পড়ায় মন বসে না। অপরাধবোধ কাজ করে। কখনো কখনো মনে হয় কীই বা এমন ঘটেছে! পরক্ষণেই আবার অস্থির লাগে। কাউকে বলতেও পারে না। লাবণীর দিকেও তাকাতে পারে না আর। কেমন যেন লাগে। ওর চিঠিটা ছিঁড়ে ফেললো একদিন। ভেসে গেলো খালে। টুকরো টুকরো কথা হয়ে।

না। এভাবে আর না। পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে খুব। লজিং বদলাতে হবে। যা হওয়ার হয়েছে। এ নিয়ে বসে থাকলে চলবে না।

গোপনে চলছে তার লজিং খোঁজা।

দুটো বাড়িতে কথা হচ্ছে। পাশের গ্রামে। তবে আরিফ চাইছে একটু দূরে যেতে। এদের মুখ আর দেখতে চায় না ও। তবু। হোক না পাশের গ্রাম, হাঁড়ি তো বদলাবে! দুগ্রামের মাঝ দিয়ে খাল বয়ে গেছে একটা। তাতেই হয়তো ভেসে যাবে অস্বস্তির প্রহর।

অগোছালো দিন কাটছে।

এরমধ্যে একদিন রফিক এলো। পরিচয় হলো। ভালো করে খেয়াল করে দেখলো আরিফ। গায়ের রঙ ভালো। মায়াকাড়া চেহারা। তার মতো কোনোভাবেই না। শুধু লম্বায় ছাড়া। কী মিল যে গুঙিটা দেখেছে তাদের মধ্যে, কে জানে!

লাবণীর সঙ্গে খুব ভাব ছেলেটার। ওই তো গল্প করছে ওরা। হাসাহাসি করছে। গায়ে হাত পড়ছে এর ওর। চরম বিরক্তি নিয়ে সব দেখছে সে। সহ্য হচ্ছে না ছেলেটাকে। ওর সঙ্গে মিশবে কেন লাবণী? এত ঢলাঢলির কী আছে?

সেদিন সন্ধ্যায় পড়তে বসলো না ছাত্ররা। বিদ্যুৎ নেই। ঘাপটি মেরে আছে আঁধার। এখানে ওখানে। লুকোচুরি খেলার আবহ। তাতেই মেতে উঠেছে ছাত্ররা। আর লাবণী। আর রফিক।

উঠোনে হাঁটাহাঁটি করছিল আরিফ।

রান্নাঘরে চোখ পড়ছে। বাটনা বাটছেন গুঙি। সেদিনের পর থেকে কেমন গম্ভীর হয়ে গেছেন। কথা বলেন না আরিফের সঙ্গে। মুখোমুখি হলে বিব্রত হয় আরিফও। কেমন একটা লাগে। তাই এড়িয়ে চলে।

তখনো চোখ ফেরালো। মনোযোগ দিলো লুকোচুরির দিকে। কী দারুণ সময় কাটছে ওদের! কী অবাক অধীর সময়! তার ভালো লাগা উচিত। কিন্তু লাগছে না। বরং রাগ হচ্ছে। এত ঘনিষ্ঠ ওরা! রফিক আর লাবণী। একসঙ্গে লুকোচ্ছে। এক আঁধারে। একসঙ্গে বেরোচ্ছে। এক আলোয়। বার বার।

সহ্য হলো না। ঘরে গেলো। একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়লো।

শীত আসি আসি করছে। রাত এখন বড়। এক ঘুমে পার হয় না। ঘুম ভাঙে ভোরের আগে। সেদিনও ভাঙলো। তলপেটে প্রচণ্ড চাপ। ঘর ছেড়ে উঠোন। উঠোন হয়ে পায়খানা। বেশিদূরের পথ না। তবু যেতে সাহস হয় না আরিফের। উঠোনের তেঁতুলগাছটাতেই যত ভয়। কী না কী থাকে। একা পেলে ঘাড় মটকাবে। তাই ভোরের আগে ওমুখো হয় না ও। আরেকটু পর আরেকটু পর করছে। উঠতেও ইচ্ছে করছে না। আবার থাকতেও পারছে না।

এমন সময় চিৎকার শুনলো গুঙির। হাওমাও আওআও করছে। চোরটোর আসলো না কি?

তাড়াতাড়ি বের হলো। গুঙি তখন বারান্দায়। চিৎকার করেই চলেছে।

আংকেল আন্টি বের হলো কিছুক্ষণ পর।  তারও কিছুক্ষণ পর লাবণী।

ঘটনা মারাত্মক।

গুঙি বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে শুয়েছেন। প্রতিদিনের মতো। লাবণী শোয় পাশের খাটে। কেমন একটা আওয়াজ আসছে ওখান থেকে। মৃগী রোগ মেয়েটার। আক্রান্ত হলো না তো? ত্রস্ত এগোলেন গুঙি। হাত বুলোবেন। শান্ত করবেন। সাহস দেবেন। কিছুই করা হলো না। হাত পড়লো যার গায়, সে লাবণী নয়। পড়তেই বেরিয়ে গেলো ছুটে। বুঝতে একটু সময় লেগেছে। তারপর ছুটেছেন তিনিও। পেছন পেছন। কিন্তু লাভ হয়নি।

চারপাশে খোঁজা হলো। পাওয়া গেলো না কাউকে।

আংকেল আন্টি রেগে আগুন। সব রাগ তাদের গুঙির ওপর। মেয়েকে একা রেখে তিনি বাইরে গেছেন কেন! ইত্যাদি ইত্যাদি।

ঘটনা থিতিয়ে গেলো। ঘরে ঢুকলো সবাই। বাকি ঘুমটুকু ঘুমিয়ে নেবে।

আরিফ শুলো না। বসে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর পড়তে বসলো। পড়া কি তখন হওয়ার কথা? নানা হিসাব মেলাতে চেষ্টা করলো তাই। মিললো না কোনোটাই।

বোমাটা ফাটলো পরদিন।

ফিরতে সন্ধ্যা হয়েছে। হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসেছে ও। আন্টি এলেন। এবং চলে যেতে বললেন! কোনো রাখঢাক না। সরাসরি। কাল সকালে যেন আরিফকে আর এ বাসায় দেখা না যায়!

তার আর গুঙির ঘটনাটা জানতে পেরেছে নাকি? কিংবা চিঠিটা। না সেটা তো ছিঁড়েই ফেলেছে সে! তাহলে? যেখানে ব্যথা, সেখানেই হাত যায় মানুষের। অন্য কিছুর কথা মনে হলো না তার। তাই জানতে চাইলো কারণটা।

ন্যাকামো, এখন সাদু সাজা হচ্ছে—ইত্যাদি বলে তেড়ে এলেন আংকেল। মারবেন।

কে যেন এসে ঠেকালো। ঘরে ঢুকিয়ে দিলো। দরজা আটকাতে বললো।

ভেতর থেকেই অনুনয় করল ও। পরিস্থিতিটা বুঝতে বললো। কিন্তু সবাই অনড়। এখনই তার যাওয়া চায়। অগত্যা গুছিয়ে নিলো সব।

কদিন ধরে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছিল। চলে যাবে। চলে যাবে। আজ যেতেই হচ্ছে। কিন্তু এমন যাওয়া সে চায়নি। মাথায় পাহাড়। মুখে কালি। বুকে প্রশ্ন। কিভাবে কী হলো, কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে, কেন যাবে। কিছুই জানে না। জানে শুধু যেতে হবে।

বাইরে মানুষের ভিড়। কথার চাষ হচ্ছে। এর ওর কথা জোড়া দিল আরিফ। বোঝা গেলো কাহিনীটা।

সকাল থেকে লাবণীকে ধরেছে সবাই। কে ছিল তার সঙ্গে?

কিছুই বলছে না সে। তালা দেওয়া মুখ।

তখন গুঙিই ভরসা। সে তো দেখেছে শয়তানটাকে। হ্যাঁ। কিন্তু চিনতে পারেনি নাকি? অনেক করে বোঝানো হয়েছে। তবু বলেননি। পরে যখন মারতে মারতে লাবণীকে বের করে দিচ্ছে তার বাপ, তখন মুখ খুলেছেন। খুলতে বাধ্য হয়েছেন। মধ্যমা নাকে চেপে দেখানোর সময় যদিও বোঝা গেছে খুব সংকোচ হচ্ছে তার। কিন্তু অপরাধীকে চিনতে তাতে সমস্যা হয়নি কারও।

নিজের কানকে বিশ্বাস হলো না আরিফের। চিৎকার করে উঠলো। ওঘরে যায়নি ও। অন্য কেউ গেছে। ফাঁসানো হচ্ছে ওকে। কিন্তু ধমকে উঠলো রফিক। শুধু সে মাস্টার, না হলে যা করেছে আরিফ, তার ঠ্যাং ভেঙে দেওয়াই রীতি। তাই কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে যাক সে। ভালোয় ভালোয়।

বের হয়ে যাচ্ছে আরিফ। লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। চোখমুখ কঠিন সবার। ঘৃণাভরা। কে যেন থুথুও ফেললো! গুঙিকে দেখা গেলো না। কপাল ভালো। সামনে পেলে ছিঁড়েই ফেলতো আরিফ। খানকি কোথাকার! মাগি! সেই বিকেলের প্রতিশোধ নিয়েছে! তাই বলে এভাবে ফাঁসাবে!

সন্ধ্যা বুড়িয়ে গেছে। বন বাগান ছেড়ে পৌঁছে গেছে উঠোনে। ঘরে। ঘরের চালে। গায়ে তার ঘন ভারী আঁধার। থিক থিক করছে পচা কাদার মতো। আঁধার সাঁতরে পার হচ্ছে আরিফ। মুখে কলঙ্কের ভার। বুকে ক্ষোভ রাগ ঘৃণা। আর চোখে অনিশ্চিত পথ। পা দুটো উঠতে চাইছে না তাই। জোর করে চালাচ্ছে নিজেকে।

বিষোদগার ভেসে আসছে পেছন থেকে। মারমুখী আওয়াজ। এও ছিল কপালে? মাথাটা কেটে পড়ছে না কেন ওর? এতটুকু প্রতিবাদও করতে পারেনি। দুষছে নিজেকে।

বাড়ির পেছনে জোড়া খেজুর গাছ। দুদিকে হেলে আছে। ওর ছায়াটা পার হয়েছে কি হয়নি, থমকে দাঁড়ালো আরিফ। সামনে নড়ে উঠলো একখণ্ড আঁধার। দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু বুঝতে পারা যায়। গুঙি। একটু এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। মাঝে তখনো দূরত্ব বেশ। কিন্তু একটু আলো যেন পড়ছে মহিলার গায়ে। মাথা নিচু করে আছে। আঁচল পেচাচ্ছে আঙুলে। আর খুলছে।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন