লেখক শুধু নিজের কাছেই দায়বদ্ধ: পর্ব-২ ॥ উইলিয়াম ফকনার | চিন্তাসূত্র
১১ মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮ | বিকাল ৩:২২

লেখক শুধু নিজের কাছেই দায়বদ্ধ: পর্ব-২ ॥ উইলিয়াম ফকনার

উইলিয়াম ফকনার ১৮৯৭ সালে মিসিসিপির নিউ আলবেনিতে জন্মগ্রহণ করেন। মারি কাথবার্ট ফকনার ও মড বাটলার ফকনারের  চার ছেলের মধ্যে সবার বড় উইলিয়াম ফকনার। তার বয়স যখন পাঁচ, তখন পরিবার স্থানান্তরিত হয়ে ৩৫ কিলোমিটার দূরে মিসিসিপির অক্সফোর্ড শহরে চলে যায়। এই শহরেই ফকনার তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটান। শেরউড অ্যান্ডারসনের কাছ থেকে উৎসাহিত হয়ে তিনি ১৯২৬ সালে রচনা করেন প্রথম উপন্যাস ‘সোলজার’স পে। ১৯৩১ সালে প্রকাশিত তার স্যাংকচুয়ারি বইটি সর্বপ্রথম পাঠক জনপ্রিয়তা পায়। এর আগে তিনি মসকুইটোস, সারটোরিস, দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি, অ্যাজ আই লে ডাইং লিখলেও এতে তার সংসার চলতো না।

উইলিয়াম ফকনার মোট ১৯টি উপন্যাস ও বহু ছোট গল্প লিখেছেন। বেশ কিছু কাব্যগ্রন্থও তার আছে। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো—দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি (১৯২৯), অ্যাজ আই লে ডাইং (১৯৩০), লাইট ইন অগাস্ট (১৯৩২), আবসালোম, আবসালোম (১৯৩৬),  দ্য আনভ্যাংকুইশ্‌ড (১৯৩৮), দ্য হ্যামলেট (১৯৪০), অ্যা ফ্যাবল (১৯৫৪) ইত্যাদি।১৯৪৯ সালে বিশ্বখ্যাত কথাসাহিত্যিক উইলিয়াম ফকনার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।

সাক্ষাৎকারটি ১৯৫৬ সালে নিউইয়র্ক শহরে নেওয়া হয়। দ্য প্যারিস রিভিউতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন আমেরিকান লেখিকা ও সম্পাদিকা জিন স্টাইন। সাক্ষাৎকারটি চিন্তাসূত্রের জন্য অনুবাদ করেছেন তরুণ অনুবাদক মোস্তাফিজ ফরায়েজী। আজ প্রকাশিত হলো এর দ্বিতীয় পর্ব

পর্ব-দুই

জিন স্টাইন: বেনজিকে যে নার্সিসাস দেওয়া হয় সেটার গুরুত্ব কতটুকু?
ফকনার: বেনজিকে নার্সিসাস দেওয়া হয় তার মনোযোগ বিঘ্নিত করার জন্য। নার্সিসাস এক ধরনের ফুল।

স্টাইন: উপন্যাসটি রূপকভাবে বর্ণনা করাতে কি কোনো শৈল্পিক সুবিধা আছে? অ্যা ফ্যাবলে তো আপনি ক্রিশ্চিয়ান রূপকতা ব্যবহার করেছিলেন।
ফকনার: একটা বাড়ির চার কোণা তৈরি করতে কিছু সুবিধা ছুতার পায়, কিন্তু বর্গাকৃতির বাড়ি তৈরি করতে সে সুবিধা পায় না।  অ্যা ফ্যাবলে গল্পের কাহিনী অনুসারে ক্রিশ্চিয়ান রূপকতা যথার্থ ছিল।

স্টাইন: এটার মানে কি একজন লেখক ক্রিশ্চিয়ানিটিকে তার লেখার একটা যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে? একজন ছুতার যেমন হাতুড়ি ধার নেয়, সেভাবে?
ফকনার: ছুতারের কখনোই হাতুড়ির ঘাটতি থাকে না। আমরা যদি ক্রিশ্চিয়ানিটি শব্দটা ব্যাখ্যা করি, তবে ক্রিশ্চিয়ানিটির বাইরে কেউ নেই। 

স্টাইন: আপনি আপনার লেখালেখির কতটুকু বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে করেছেন?
ফকনার: বলতে পারব না।  আমি এসব গুনে রাখিনি। কারণ ‘কতটুকু’ বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ নয়। একজন লেখকের তিনটি জিনিস থাকা অত্যাবশ্যক: অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও কল্পনাশক্তি। এই তিনটির দুটি বা মাঝে মাঝে একটি অন্যটির শূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে। আমার ক্ষেত্রে, একটা কাহিনী সাধারণত শুরু হয় একটি নির্দিষ্ট ধারণা, স্মৃতি কিংবা মানসিক চিত্র থেকে। গল্প লেখাটা হচ্ছে একটি মুহূর্তে কেন অথবা কী কারণে নির্দিষ্ট ধারণাটা আসছে তার উত্তেজনা প্রকাশ করা।

স্টাইন: কিছু লোক বলে, তারা আপনার লেখা দু-তিনবার পড়ার পরেও বুঝতে পারে না। আপনি তাদের কী বলবেন?
ফকনার:
চার বার পড়ো।

স্টাইন: অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও কল্পনা লেখকের জন্য অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ, এটি আপনি বললেন। আপনি কি এরসঙ্গে অনুপ্রেরণাকেও যোগ করবেন?
ফকনার:
অনুপ্রেরণা সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। কারণ হচ্ছে অনুপ্রেরণার সংজ্ঞা আমি জানি না। আমি অনুপ্রেরণার কথা শুনেছি কিন্তু কখনো দেখিনি।

স্টাইন: লেখক হিসেবে আপনাকে বলা হয়ে থাকে, আপনি সহিংসতায় আচ্ছন্ন।
ফকনার:
শুনতে এমন লাগছে যে, একজন ছুতার সবসময় হাতুড়ি নিয়ে মগ্ন থাকে। সহিংসতা সবসময় ছুতারের এক ধরনের অস্ত্র। একজন লেখক একটা যন্ত্র দিয়ে কিছু গঠন করতে পারে না।

স্টাইন: আপনি কিভাবে লেখালিখি শুরু করেছিলেন?
ফকনার: আমি নিউ অরলিন্সে বসবাস করতাম। তখন আমি কিছু টাকা রোজগারের জন্য এটা-ওটা করতাম। তারপর শেরউড অ্যান্ডারসনের সঙ্গে দেখা হলো। আমরা বিকেলের দিকে শহরে হাটতে বেরুতাম। শহরের মানুষদের সঙ্গে কথা বলতাম। সন্ধ্যার দিকে আমরা আবার একটা অথবা দুটি বোতল নিয়ে বসতাম, তিনি গল্প করতের আর আমি শুনতাম। পূর্বাহ্নে আমার সঙ্গে অ্যান্ডারসনের দেখা হতো না। পরদিন আবার একই নিয়মে দেখা হতো।  আমি মনে করলাম, এই যদি হয় একজন লেখকের জীবন, তবে আমাকে লেখক হতে হবে। তাই আমি আমার প্রথম বই লেখা শুরু করলাম। খুব দ্রুতই লেখালেখিটা আমি উপভোগ করা শুরু করলাম। আমি পরের তিন সপ্তাহ মিস্টার অ্যান্ডারসনের সঙ্গে দেখা করতে ভুলেই গেলাম। এরপর অ্যান্ডারসনই আমার বাসায় এসে বলেছিলেন, সমস্যা কী? তুমি কি আমার সঙ্গে পাগলামি করছ? আমি তাকে বললাম, আমি একটি বই লিখছি। তিনি ‘হায় আল্লাহ!’ বলে চলে গেলেন।

আমার প্রথম বই সোলজার’স পে যখন লেখা শেষ হলো আমি মিসেস অ্যান্ডারসনের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, বইটি লেখা কেমন চলছে? আমি বললাম, শেষ করে ফেলেছি। তিনি বললেন, শেরউড বলেছে তোমার সঙ্গে সে ব্যবসা করবে। তাকে যদি তোমার পাণ্ডুলিপি না পড়তে হয় তাহলে সে তার প্রকাশককে এটা গ্রহণ করতে বলবে। আমি বললাম, ঠিক আছে।  এভাবেই আমি লেখক হয়ে গেলাম। 

স্টাইন: কিছু টাকাপয়সা রোজগারের জন্য লেখালিখির আগে কী করতেন?
ফকনার: যখন যেটা পেতাম, সেটা করতাম। আমি সবকিছুই একটু একটু পারতাম—নৌকা চালানো, বাড়ি রঙ করা, অ্যারোপ্লেন চালানো—সবই পারতাম। আমার খুব বেশি টাকার দরকার ছিল না, কেননা নিউ অরলিন্সে বসবাসের খরচ কম, সব কিছু সস্তা। আমার শুধু দরকার ছিলো ঘুমানোর জায়গা, কিছু খাবার, তামাক আর হুইস্কি। আমি দুই-তিন দিনে অনেক কাজ করতে পারতাম। আর সেটা দিয়েই পুরো মাস চলে যেত। আমি ভবঘুরে ছিলাম। একটা দুঃখের বিষয় হলো, প্রতিদিন একটা মানুষ আট ঘণ্টা শুধু একটা জিনিসই করে, সেটা হলো কাজ। তুমি প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে খেতে পারবে না,পান করতে পারবে না কিংবা ভালোবাসতেও পারবে না; শুধু  যেটা পারবে সেটা হলো কাজ। যেকারণে মানুষ নিজেকে ও সবাইকে দুর্দশাগ্রস্ত ও অসুখী অবস্থায় রাখে।

__________________________________________________________________

গতি হচ্ছে এমন কিছু যা মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়
____________________________________________

স্টাইন: আপনি শেরউড অ্যান্ডারসনের কাছে ঋণী, কিন্তু আপনি তাকে কেমন লেখক হিসেবে বিবেচনা করেন?
ফকনার: তিনি ছিলেন আমাদের প্রজন্মের আমেরিকান লেখকদের জনক এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এটা বহন করে নিয়ে যাবে। তাকে কখনোই যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। ড্রাইসার হচ্ছে তার ভাই। আর মার্ক টোয়েন হচ্ছে তাদের জনক।

স্টাইন: সেই সময়কার ইউরোপিয়ান লেখক কারা ছিলেন?
ফকনার: আমার সময়ে দুজন বিখ্যাত লেখকের কথা বলতেই হবে ম্যান আর জয়েস।

স্টাইন: আপনি কি সমসাময়িকদের বই পড়েন?
ফকনার:
না, আমি সেসব বই পড়ি, যেগুলো আমি পড়তে ভালোবাসি, যেগুলো আমি যুবক বয়সে পড়েছি। পুরনো বন্ধুর কাছে ফিরে যাওয়ার মতো বিষয়টা।  দ্য ওল্ড টেস্টামেন্ট, ডিকেন্স, কনরাড, সারভান্তেস, ডন কিহোটে পড়তে ভালোবাসি। ফ্লবেয়র, বালজাক, দস্তয়ভস্কি, তলস্তয়, শেক্সপিয়রও পড়ি। মাঝে মাঝে ম্যালভেলের বই পড়ি। মার্লো, জনসন, হেরিক, ডান, ক্যাম্পিয়ন, কিটস ও শেলির কবিতা পড়ি। আমি এখনো হাউজম্যানের লেখা পড়ি। কিন্তু এসব বই আমি খুব কম পড়ি, মাঝে মাঝে। আমি সবসময় এক নাম্বার পৃষ্ঠা থেকে পড়া শুরু করে শেষ পর্যন্ত পড়ি না। আমি শুধু একটা দৃশ্য, অথবা একটা চরিত্র সম্পর্কে পড়ি, এটা অনেকটা তোমার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে কিছুক্ষণ গল্প করার মতো।

স্টাইন: আর ফ্রয়েড?
ফকনার:
আমি যখন নিউ অরলিন্সে থাকতাম সবাই ফ্রয়েডের কথা বলতো, কিন্তু আমি ফ্রয়েডের লেখা কোনোদিন পড়িনি।

স্টাইন: আপনি কি কখনো রহস্যগল্প পড়েছেন?
ফকনার: সিমেননের লেখা পড়েছি, কারণ ওর লেখা আমাকে চেখভের কথা মনে করিয়ে দেয়।

স্টাইন: আপনার প্রিয় চরিত্রগুলো সম্পর্কে কি বলবেন?

ফকনার: আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র হলো সারাহ ক্যাম্প। সে একজন নিষ্ঠুর, মাতাল, সুবিধাবাদী ও অবিশ্বস্ত মানুষ। তার চরিত্রের প্রায় সব কিছুই খারাপ। কিন্তু সেটাও একটি চরিত্র। মিসেস হ্যারিস, ফালস্টাফ, প্রিন্স হাল, ডন কিহোটে, সানকো চরিত্রও আমার কাছে প্রিয়। লেডি ম্যাকবেথের প্রশংসা আমি সবসময় করে থাকি। এছাড়া বাটম, অফেলিয়া ও মারকুশিয়ো আমার প্রিয়। অবশ্যই হাকফিনের কথা বলতে হবে, তাছাড়া জিমের কথা না বললে ভুল হয়ে যাবে। টম সয়ারকে আমি কখনো পছন্দ করি না। এসব ছাড়াও আমি সাট লাভিনগুড চরিত্রটি পছন্দ করি, এটা জর্জ হ্যারিস ১৯৪০ অথবা ১৯৫০ সালের টেনেসি মাউন্টেনস সম্পর্কে লিখেছিল। চরিত্রটির কোনো মতিভ্রম ছিল না, সে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। একটা সময় সে বুঝতে পেরেছিল সে কাপুরুষ। অথচ কাপুরুষ হওয়াতেও সে লজ্জিত হয়নি। সে তার দুর্ভাগ্যের জন্য স্রষ্টা কিংবা অন্য কাউকে কখনো দোষারোপ করেনি।

স্টাইন: আপনি কি ওই উপন্যাসগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, এটা বলতে পারবেন?
ফকনার:
আমি মনে করি, যতদিন পর্যন্ত মানুষ উপন্যাস পড়া অব্যাহত রাখবে, ততদিন তারা এই অসাধারণ চরিত্রের উপন্যাসগুলো পড়বে।

স্টাইন: সমালোচকদের কাজ কী?
ফকনার: সমালোচকের কথায় কান দেওয়ার মতো সময় নেই একজন লেখকের। যারা লেখক হতে চায়, তারা রিভিউ পড়ে, যারা লিখতে চায় তাদের রিভিউ পড়ার সময় নেই।  সমালোচকেরা লেখকদের উদ্দেশে লেখে না। লেখক সমালোচকদের থেকে ভিন্ন, লেখকের লেখা সমালোচককে তাড়িত করে। অন্যদিকে সমালোচক যা লেখে, সেটা সবাইকে তাড়িত করে, শুধু লেখক বাদে।

স্টাইন: তাহলে আপনি আপনার কাজ সম্পর্কে অন্য কারও সাথে আলোচনা করতে প্রয়োজনবোধ করেন না?
ফকনার: না। আমি লেখালেখিতেই সবসময় ব্যস্ত থাকি। আমি যেটা লিখছি, সেটা যদি আমাকে সন্তুষ্ট করে, তাহলে সেই লেখাটি সম্পর্কে অন্যের সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। যদি লেখাটা আমাকে সন্তুষ্ট না করতে পারে, কারও কাছে বিষয়টা জানালেও লেখাটির উন্নতি হবে না। উন্নতি করার একমাত্র উপায় হচ্ছে, লেখাটি নিয়ে আরও কাজ করা। আমি কোনো সাহিত্য সংগঠক নই, আমি শুধু একজন লেখক। গল্পগুজবের দোকান আমাকে আনন্দ দেয় না।

স্টাইন: সমালোচকেরা দাবি করে, রক্তের সম্পর্ক আপনার উপন্যাসে মূল ভূমিকা পালন করে।
ফকনার:
এটা একটা অভিমত হতে পারে। আমি তোমাকে বলেছি, আমি সমালোচনা পড়ি না। আমার মনে হয়, একজন যখন মানুষের সম্পর্কে লেখার চেষ্টা করে তখন রক্তের সম্পর্কের চেয়ে মানুষের নাকের গড়নটা গুরুত্বপূর্ণ হয়, যদিও গল্পের কাহিনী অগ্রসর হতে এর তেমন ভূমিকা থাকে না। লেখককে গল্প লিখতে কিসের প্রতি মনোযোগী হতে হবে, এটার কথা যদি বলতে হয়, তাহলে তার নাকের গড়ন কিংবা রক্তের সম্পর্কের প্রতি মনোযোগের সময়ই থাকবে না। আমার মতে, কল্পনা ও ঘটনার সঙ্গে সত্যের সীমিত সম্পর্ক আছে।

স্টাইন: সমালোচকেরা আরও বলে আপনার চরিত্রগুলো শুভ না কি অশুভ সেটা সজ্ঞানে নির্বাচিত নয়।
ফকনার:
জীবনটা শুভশক্তি ও অশুভশক্তির প্রতি দায়বদ্ধ নয়। ডন কিহোটে সবসময় শুভ-অশুভ শক্তির মধ্যে কোনো একটা বেছে নিয়েছে, কিন্তু একসময় সে তার স্বপ্নের মধ্যে সেটা বাছাই করতে লাগলো। সে ছিল উন্মাদ। যখন সে বাস্তবজগতের মানুষদের সঙ্গে চলার চেষ্টা করলো, তখন এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো যে, কোনটা শুভ আর কোনটা অশুভ; সেটা ভাবার তার সময়ই রইলো না। মানুষের অস্তিত্ব যেহেতু তার জীবনের ভেতর নিহিত, সেহেতু তারা তাদের সময় জীবিত থাকার সংগ্রাম করতে ব্যয় করে। জীবন এক ধরনের গতি। আর গতি হচ্ছে এমন কিছু যা মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়। এই গতি হতে পারে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা কিংবা আনন্দ।

স্টাইন: আপনি কি লেখকের গতিশীলতার বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করবেন?
ফকনার: প্রতিটি লেখকের কাজ হচ্ছে জীবনের গতিকে আবদ্ধ করা। শৈল্পিক অর্থে বলতে গেলে এটাকে এমনভাবে স্থাপন করতে হবে, যেন শত বছর পরেও যদি একজন এর দিকে তাকায়, তাহলে এটি যেন জীবন্ত হয়ে চলতে শুরু করে।  যেহেতু মানুষ মরণশীল, তাই অমরত্ব লাভের একমাত্র উপায় পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার আগে পেছনে এমন কিছু ফেলে যাওয়া, যেটা সবসময় জীবন্ত থাকবে।

স্টাইন: ম্যালকম কাউলি আপনার চরিত্রগুলো সম্পর্কে বলেছেন, আপনার চরিত্রগুলোতে ভাগ্যের পরিহাস বহন করে।
ফকনার: এটা তার নিজস্ব অভিমত। আমার মতে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনটি হয়, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয় না। অন্য সব লেখকের চরিত্রগুলোও এমনি। লিনা গ্রোভ চরিত্রটি কিন্তু ‘লাইট ইন আগস্ট’ উপন্যাসের সঙ্গে ভালোমতো খাপ খেয়েছিল। তার সঙ্গী লুকাস বার্চ নাকি অন্য কেউ হবে এটা কোনো ব্যাপার ছিল না। তার ভাগ্যে লেখা ছিল সে বিয়ে করবে এবং সন্তান জন্ম দেবে, এটা সে জানত, তাই সে কারো সাহায্যপ্রার্থী না হয়েই বাইরে বের হয়েছিল। সে নিজেই তার আত্মার নিয়ন্তা।

স্টাইন: সোলজার’স পে এবং সারটোরিসের মাঝখানে কী ঘটেছিল, কী কারণে আপনি ইওকনাপাতফা সাগা শুরু করেছিলেন?
ফকনার: সোলজার’স পে লেখাটা আমি উপভোগ করেছিলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম শুধু প্রতিটি বইয়ের জন্য একটা পরিকল্পনা থাকলেই চলবে না একজন লেখকের পুরো কাজটাই পরিকল্পনা অনুসারে হতে হয়। সোলজার’স পে ও মসকুইটোস আমি লেখার জন্য লিখেছিলাম। সারটোরিস লেখার শুরুতে আমি নতুন কিছু বিষয় আবিষ্কার করলাম। এটা অন্য লোকদের জন্য সোনার খনি উন্মুক্ত করলো, তাই আমি আমার নিজের নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করলাম। আমি ওই সব লোকদের দেবতাদের মতো হতে দিলাম। ওরা শুধু শূন্যে নয় সময়ের মধ্যেও বিচরণ করতে পারত। আসলে আমি আমার চরিত্রগুলোকে সময়ের চারপাশে সফলভাবে বিচরণ করতে দিলাম। আমার সূত্রমতে, সময় একটা তরল অবস্থা যার কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধু প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষণস্থায়ী আত্মার ভেতরে এর অস্তিত্ব আছে। এরকম জিনিস আর কখনো ছিল না এবং এখনো নেই। যদিও বা এর অস্তিত্ব ছিল, এর জন্য কোনো দুঃখ নেই। আমার শেষ গ্রন্থের নাম হবে ইওকনাপাতফার ডুমসডে বুক, দ্য গোল্ডেন বুক। তারপর আমি আমার পেন্সিল ভেঙে ফেলবো, আমি লেখালিখি থেকে ইস্তফা নেব।
(শেষ)

লেখক শুধু নিজের কাছেই দায়বদ্ধ: পর্ব-১ ॥ উইলিয়াম ফকনার

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন