সাহিত্যে গোষ্ঠীবদ্ধতা পছন্দ করি না : পর্ব-৪॥ হারুকি মুরাকামি | চিন্তাসূত্র
৪ মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ | দুপুর ২:৫৫

সাহিত্যে গোষ্ঠীবদ্ধতা পছন্দ করি না : পর্ব-৪॥ হারুকি মুরাকামি

॥ পর্ব: ৪॥ 
হারুকি মুরাকামি (১২ জানুয়ারি ১৯৪৯) বর্তমান সময়ে জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য জাপান ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমালোচকদের প্রশংসা ও অনেক পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি। এইসব পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড (২০০৬), ফ্রাংক ও’কনার আন্তর্জাতিক ছোটগল্প পুরস্কার। এছাড়া তাঁর সমস্ত সাহিত্যকর্মের জন্য ফ্রান্‌ৎস কাফকা পুরস্কার (২০০৬) ও জেরুজালেম পুরস্কার (২০০৯) পেয়েছেন। তাঁর মৌলিক রচনার মধ্যে ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ (১৯৮২), ‘নরওয়েজিয়ান উড’ (১৯৮৭), ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’ (১৯৯৪-১৯৯৫), ‘কাফকা অন দ্য শোর’ (২০০২) এবং ‘ওয়ানকিউএইটফোর’ (২০০৯-২০১০) অন্যতম।

হারুকি মুরাকামি উত্তর আধুনিক সাহিত্যের একজন অন্যতম প্রভাবশালী লেখক। তিনি গত এক দশকে কয়েকবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য শর্ট লিস্টেড হয়েছেন কিন্তু রহস্যময় কারণে তিনি এখনো নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত।  সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন আমেরিকান উপন্যাসিক জন রে, চিন্তাসূত্রের জন্য দ্য প্যারিস রিভিউ থেকে অনুবাদ করেছেন মোস্তাফিজ ফরায়েজীআজ প্রকাশিত হলো ৪র্থ কিস্তি।

জন রে: আমি মনে করি, খুব কম উপন্যাসিক আপনার মতো আবেশী অনুভূতি প্রকাশ করতে পেরেছেন।  হার্ড-বয়েল্ড ওয়ান্ডারল্যান্ড, ড্যান্স ড্যান্স ড্যান্স, দ্য উইন্ড-আপ ক্রনিকল এবং স্পুটনিক সুইটহার্টের বিষয়গুলো একে অন্য থেকে এত ভিন্ন যে, সেটা পড়তেই হবে: কারও দ্বারা একজন পরিত্যক্ত মানুষ, সে কাউকে অথবা আকাঙ্ক্ষার বস্তুকে হারিয়েছে এবং সে হারানো নারীটিকে ভুলতে পারে না, তাই তার মাঝে তাকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা জাগে, একটা তীব্র সম্ভাবনা, যেটা কখনো উপন্যাসটি পূরণ করতে পারে না। আপনি কি আপনার চরিত্রের বিশ্লেষণ সম্পর্কে এই বিষয়গুলোর সঙ্গে একমত?
মুরাকামি: হ্যাঁ।

জন রে: আপনার কথাসাহিত্যে এই আবেশ কতটা কেন্দ্রীভূত?
মুরাকামি: আমি জানি না আমি কেনো ওগুলো লিখি। আমি ওটা জন আর্ভিং-এর প্রত্যেক বইয়ে খুঁজে পেয়েছি, সেখানে কিছু মানুষ আছে, যাদের একটা অংশ হারিয়ে গেছে। আমি জানি না, সে কেন কোনো ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া অংশ নিয়ে লিখেছে, সম্ভবত সে নিজেও জানতো না। আমার বেলাও তাই, আমিও জানি না। আমার নায়ক সবসময় কিছু জিনিস হারিয়ে থাকে, তারপর সে সেই হারানো জিনিসটি খুঁজতে থাকে। এটা অনেকটা হলি গ্রেইল বা ফিলিপ মার্লোর মতো।

জন রে: যতক্ষণ না কোনো কিছু হারিয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ আপনি গোয়েন্দার আনতে পারেন না।
মুরাকামি: ঠিক বলেছ। যখন আমার নায়ক কোনো কিছু হারিয়ে ফেলে, তাকে সেটা খুঁজতে হয়। সে ওডিসিয়াসের মতো। তার অনুসন্ধান পর্বে সে অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিসের সম্মুখীন হয়…

জন রে: বাড়িতে ফিরে আসার পর্বে?
মুরাকামি: তাকে সেসব পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হয় এবং সবশেষে সে তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি পেয়ে যায়। কিন্তু সে নিশ্চিত হতে পারে না, আসলে সে যা চেয়েছিল, তার প্রাপ্ত জিনিসটি সেটা কি না। আমি মনে করি, আমার বইয়ের প্রসঙ্গ এটাই। এই জিনিসগুলো কোথা থেকে আসে? আমি জানি না। এটা হয়তো আমার ভেতরেই আছে। এটাই আমার গল্পের চালিকাশক্তি, হারানো, অনুসন্ধান ও খুঁজে পাওয়া।

জন রে: আমি আপনার নিজের বইয়ের অনুবাদের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। একজন অনুবাদক হিসেবে আপনি নিজেও জানেন, অনুবাদে কতটা অসঙ্গতি হতে পারে।  আপনি কিভাবে আপনার অনুবাদক নির্বাচন করেন?
মুরাকামি: আমার তিনজন অনুবাদক আছে—আলফ্রেড বির্নবাম, ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল, জে রুবিন। আর আমার নীতি হচ্ছে ‘আগে আসো, আগে পাও’। তারা আমার বন্ধু, তাই তারা খুব সৎ। তারা আমার বইগুলো পড়ে এবং তাদের ভেতর যদি একজন মনে করে এটা দারুণ, আমি এটা অনুবাদ করতে চাই, তাহলে সে সেটা অনুবাদ করতে নেয়। অনুবাদক হিসেবে আমি জানি, একটা ভালো অনুবাদের মূল শর্ত হচ্ছে বইটি সম্পর্কে কৌতূহলী হওয়া। একজন যদি ভালো অনুবাদক হয় কিন্তু যেটা সে অনুবাদ করছে, সেটা তার পছন্দের নয়, তাহলে সেই অনুবাদের কাজ সেখানেই শেষ। অনুবাদ করাটা খুব কঠিন কাজ, এটা অনেক সময় ও ধৈর্যের ব্যাপার।

জন রে: আপনার অনুবাদকরা কোনো সময় নিজেদের ভিতর ঝামেলা পাকায় না?
মুরাকামি: সত্যি বলতে, কখনোই না। তাদের ভিন্ন ভিন্ন নিজস্ব পছন্দ আছে, তারা ভিন্ন চরিত্রের ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। কাফকা অন দ্য শোর পড়ে ফিলিপ পছন্দ করেছিল এবং সে কাজটা নিয়েছিল। জে এটা নিয়ে অতটা আগ্রহী ছিল না। ফিলিপ নম্র-ভদ্র মানুষ আর জে খুব সতর্ক এবং নির্ভুল অনুবাদক। সে অনেকটা দৃঢ় চরিত্রের মতো। আলফ্রেড ভবঘুরে স্বভাবের, আমি এই মুহূর্তে জানি না—সে এখন কোথায় আছে। সে মিয়ানমারের একজন সমাজকর্মী মেয়েকে বিয়ে করেছে। মাঝে মাঝে সরকার তাদের আটক করে। সে অন্য ধরনের মানুষ। সে অনুবাদক হিসেবেও উন্মুক্ত স্বভাবের, মাঝে মাঝে সে গদ্যে পরিবর্তন আনে। এটাই তার বিশেষ ধরন।

জন রে: আপনি কিভাবে আপনার অনুবাদের কাজে সাহায্য করেন? প্রক্রিয়াটা ঠিক কিভাবে কাজ করে?
মুরাকামি: তারা যখন অনুবাদ করতে থাকে, তারা আমাকে অনেক বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। যখন প্রথম খসড়া অনুবাদ হয়ে যায়, আমি সেটা পড়ি। মাঝে মাঝে আমি তাদের কিছু সংশোধনের জন্য বলি। আমার বইয়ের ইংরেজি সংস্করণটা খুব জরুরি। কেননা ক্রোয়োশিয়া অথবা স্লোভেনিয়ার মতো ছোট দেশগুলোতে ইংরেজি থেকে তারা অনুবাদ করে, জাপানিজ থেকে নয়। তাই এটা খুব নিখুঁত হতে হয়। কিন্তু বেশিরভাগ দেশেই, অনুবাদকরা জাপানিজ সংস্করণ থেকে অনুবাদ করে।

জন রে: আপনি নিজে কার্ভার, ফিটজগেরাল্ড, আর্ভিং-এর অনুবাদ করতে পছন্দ করতেন। এটা কি পাঠক হিসেবে আপনার রুচিকে প্রভাবিত করেছে, না কি লিখতে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছে? আপনাকে ভিন্ন ধরনের লেখা লিখতে প্রভাবিত করেছে?

মুরাকামি: আমি তাদের বই অনুবাদ করেছি, যাদের বই থেকে আমার শেখার আছে। এটাই মূল বিষয়। আমি বাস্তবধর্মী লেখকদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তাদের বই যখন অনুবাদ করেছি, তখন খুব গভীরভাবে তাদের বইগুলো পড়তে হয়েছে।  এভাবেই তাদের গোপন সূত্রগুলো আমি জেনে ফেলেছি।  আমি যদি উত্তরাধুনিক যুগের লেখক ডন ডেলিলো, জন বার্থ অথবা থমাস প্যানশনের লেখা অনুবাদ করতাম, একটা সাংঘার্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারত। কেননা আমার অপ্রকৃতিস্থ অবস্থা আর তাদের অপ্রকৃতিস্থ অবস্থার মাঝে সংঘর্ষ ঘটার আশঙ্কা ছিল। আমি অবশ্যই তাদের লেখার প্রশংসা করি, কিন্তু আমি যখন অনুবাদ করেছি, তখন বাস্তববাদীদের বেছে নেই।

জন রে: জাপানি সাহিত্যের ভেতর আপনার লেখাগুলো আমেরিকায় সর্বাধিক পঠিত, তাই আপনাকে সমসাময়িক জাপানি লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে পাশ্চাত্যপন্থী বলা যেতে পারে। আমি অবাক হই, জাপানি সংস্কৃতির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?
মুরাকামি:
আমি বিদেশিদের সম্পর্কে বিদেশে লিখতে চাইনি। আমি জাপান সম্পর্কে লিখতে চেয়েছি, আমাদের এখানকার জীবন সম্পর্কে। এটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেকেই বলে আমার লেখাগুলো পশ্চিমারা গ্রহণ করছে, এটা হয়তো সত্যি কিন্তু আমার গল্পগুলো আমার নিজস্ব ধারার, সেগুলো পশ্চিমা ধারার কিছু নয়।

জন রে: আপনার লেখায় অনেক দৃষ্টান্ত আছে, যেগুলোকে পাশ্চাত্য-আমেরিকান মনে হয়, যেমন: দ্য বিটলস।
মুরাকামি: আমি যখন লিখি মানুষেরা ম্যাকডোনাল্ডের হামবার্গার খাচ্ছে, আমেরিকানরা অবাক হয়। তারা প্রশ্ন করে, কেন একটি চরিত্র টফু না খেয়ে হামবার্গার খাচ্ছে? কিন্তু হামবার্গার খাওয়াটা আমাদের কাছে সাধারণ ব্যাপার, একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

জন রে: আপনি কি বলতে চান—আপনার উপন্যাসগুলো সমসাময়িক জাপানের শহুরে জীবনকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুটিয়ে তুলেছে?
মুরাকামি: যেভাবে মানুষেরা চলাফেরা করে, যেভাবে কথা বলে, যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, যেভাবে ভাবে সেগুলো জাপানি ধরনের। কোনো জাপানি পাঠক বলতে পারবে না, আমার গল্পগুলো জাপানিদের জীবনধারার থেকে বিচ্যুত। আমি জাপানিদের সম্পর্কে লেখার চেষ্টা করেছি। আমি লেখার চেষ্টা করেছি, আমরা কারা, আমরা কোথায় যাচ্ছি, আমরা কেন এখানে। আমি মনে করি, এটাই আমার রচনার বিষয়বস্তু।

জন রে: আপনি ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’-এর কথা উল্লেখ করে অন্য এক জায়গায় বলেছিলেন, আপনি আপনার বাবার প্রতি আগ্রহী ছিলেন, তার ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল, তার প্রজন্মে কী ঘটেছিল, সেগুলো নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু আপনার পুরো উপন্যাসে কোনো বাবার চরিত্র নেই, অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, আপনার কোনো উপন্যাসেই নেই। আপনার আগ্রহটা কোন বইতে তুলে এনেছেন?
মুরাকামি: মুটামুটি আমার সব উপন্যাসই উত্তম পুরুষে লেখা। আমার নায়কের প্রথম কাজ হচ্ছে আশেপাশে কী ঘটছে, তা পর্যবেক্ষণ করা। যা দেখা উচিত, সেটা সে ঠিক সময়ে দেখে। আমি যদি বলি, সে দ্য গ্রেট গ্যাটসবির নিক ক্যারাওয়ের সদৃশ, তাহলে সে তাই। সে নিরপেক্ষ। নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য সে অবশ্যই সবকিছু থেকে মুক্ত—পারিবার, আত্মীয়-স্বজন থেকেও। পরিবার সম্পর্কে বলতে গেলে, জাপানি সাহিত্যে পরিবার খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। আমি আমার মূল চরিত্রকে একজন স্বাধীন ব্যক্তিতে পরিণত করতে চেয়েছি। সে এমন একজন মানুষ, যে স্বাধীনতা বেছে নিয়েছে, ঘনিষ্ঠতা ও ব্যক্তিগত বন্ধন ছেড়ে একাকিত্ব বেছে নিয়েছে।

জন রে: আমি যখন ‘সুপার ফ্রগ সেভস টোকিও’ পড়ছিলাম, সেটাতে অসংখ্য ভূগর্ভস্থ কীট টোকিওকে ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছিল, ওই সময় আমি পুরনো ধাঁচের জাপানি দৈত্য-দানবদের সিনেমা ম্যাঙ্গার কথা ভাবছিলাম। এরপর টোকিও-র সমুদ্র সৈকতে দৈত্যাকার ক্যাটফিশ ঘুমিয়ে থাকাটা প্রাচীন মিথের কথা মনে করিয়ে দেয়, প্রতি পঞ্চাশ বছরে যে একবার জেগে ওঠে, এটা ভূমিকম্পের সৃষ্টি করে। আপনার কাজের সঙ্গে এগুলোর কি কোনো সম্পর্ক আছে?
মুরাকামি: না, আমি এটা মনে করি না। আমি ম্যাঙ্গা কমিকসের খুব একটা ভক্ত নই। আমি ওগুলো থেকে তেমন প্রভাবিত নই।

জন রে: আর জাপানি লোক-কাহিনীটার বিষয়ে কী বলবেন?
মুরাকামি: আমি যখন ছোট ছিলাম, আমি অনেক জাপানি লোক-কাহিনী শুনেছি। তুমি যখন বড় হয়ে উঠবে, এগুলো জটিল মনে হবে। ওই যে সুপার ফ্রগের চেহারাটা, হয়তো কোনো ভাণ্ডার থেকে নেওয়া হয়েছে। তোমাদের আমেরিকান লোককাহিনীর ভাণ্ডার আছে, জার্মানদের তাদের লোককাহিনীর ভাণ্ডার আছে, রাশিয়ানদের তাদের। কিন্তু এখানে একটা পারস্পারিক ভাণ্ডার আছে যেখান থেকে আমরা যে কেউ যেকোনো কিছু নিতে পারি, যেমন: দ্য লিটল প্রিন্স, ম্যাকডোনাল্ড অথবা দ্য বিটলস।

চলবে…

সাহিত্যে গোষ্ঠীবদ্ধতা পছন্দ করি না : পর্ব-৩॥ হারুকি মুরাকামি
সাহিত্যে গোষ্ঠীবদ্ধতা পছন্দ করি না : পর্ব-২॥ হারুকি মুরাকামি
সাহিত্যে গোষ্ঠীবদ্ধতা পছন্দ করি না : পর্ব-১ ॥ হারুকি মুরাকামি

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন