শিল্প সর্বোতভাবে জীবনের জন্যই ॥ আল মাহমুদ   | চিন্তাসূত্র
৬ আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ | ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং | সকাল ৮:২৫

শিল্প সর্বোতভাবে জীবনের জন্যই ॥ আল মাহমুদ  

বাংলা ভাষার প্রধান কবি আল মাহমুদ।  আজও তিনি অবিরাম লিখে চলেছেন দুই হাতে।   গদ্য-পদ্য দুটোতেই তার সমান দক্ষতা, সমান জনপ্রিয় তিনি দুই ভুবনের পাঠকের কাছেই।  ২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজ কৌরবের পক্ষ থেকে  আল মাহমুদের সঙ্গে এক দীর্ঘ আলাপচারিতায় মুখোমুখি হন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম।  চিন্তাসূত্রের পাঠকদের জন্য  কথোপকথনটি এখানে তুলে ধরা হলো।

কাজী জহিরুল ইসলাম: ১৯৭০/৭১ সালে আপনি যখন কলকাতায় যেতেন, ওখানকার বাঙালি কবিদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হতো, সেই আন্তঃক্রিয়া কি আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?
আল মাহমুদ: যেতাম না, ১৯৭১-এ আমি ওখানে ছিলাম। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম। আমার কাজটা ছিল বাংলা ভাষার লেখক/কবিদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সংগঠিত করা, মটিভেট করা। আই ওয়াজ বেসিক্যালি এ মটিভেটর। কাজটি ছিল অনেকটা কেমপেইনিং-এর মতো।  তো এ কাজ করতে গিয়ে ওখানকার অনেক কবির সঙ্গেই সখ্য গড়ে ওঠে। তবে ওখানকার কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে আরও অনেক আগেই, মিড ফিফটিজে। তখন আমি নতুন সাহিত্য, চতুরঙ্গ, কৃত্তিবাস—এসব  পত্রিকায় লিখতাম।  ৫৭/৫৮ সালের দিকে বুদ্ধদেব বসুর কবিতাপত্রিকায় লিখতে শুরু করি।  এ কথা ঠিক যে, ওখানকার সব বড় কবির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধলীন সময়ে আমার সরাসরি দেখা হয় এবং কারও কারও সঙ্গে বন্ধুত্বও হয়।  আর এই বন্ধুত্ব পরবর্তী জীবনে আমাকে নানান সময়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

জহিরুল: পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন কবির সঙ্গে আপনার সেই সময় সখ্য গড়ে ওঠে?
মাহমুদ: অনেকের সঙ্গেই সখ্য হয়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাদের অন্যতম। এছাড়া রয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শরৎ মুখোপাধ্যায়। ওখানকার কম্যুনিস্ট পত্রিকা ‘পরিচয়’-এর কবিদের মধ্যে অমিতাভ দাশগুপ্তের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। এছাড়া কবিতা সিংহের বাড়িতে গিয়ে মাঝে মাঝে থাকতাম।  কবিতার অভিনেত্রী কন্যা এবং জামাতা বেশ সমাদর করতেন।

জহিরুল: বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কথা কিছু বলুন।
মাহমুদ: তখন আমি যেমন কাগজে কাজ করতাম, আমার সমসাময়িকদের মধ্যে শামসুর রাহমান, আহমেদ হুমায়ূন, হাসান হাফিজুর রহমান, ফজল শাহাবুদ্দিনও খবরের কাগজেরই লোক ছিলেন, দৈনিক পাকিস্তানে কাজ করতেন।  তারা কেউ কিন্তু আমার মতো মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য ভারতে যাননি।  সরাসরি বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের সঙ্গে কাজও করেননি।  অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পাদনা করেন তাদেরই কেউ কেউ। বাম বুদ্ধিজীবীরা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে, ছয় দফার প্রবর্তক, শেখ মুজিবুর রহমানকে সমর্থন করেননি। বরং তারা আগাগোড়াই শেখ মুজিবের বিরোধিতা করেছেন। শেখ মুজিবের নেতৃত্বকেই আপামর জনসাধারণ সমর্থন দিল, মুক্তিযুদ্ধ তাঁর নেতৃত্বেই সফল হলো। বাম বুদ্ধিজীবীরা কেউ পালিয়েছে, কেউ মরেছে, পরবর্তী সময়ে নানান লেবাস পরে কেউ কেউ পুনর্বাসিতও হয়েছে। সেই সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার ছিলেন আমার এক আত্মীয়, এইচ টি ইমাম। এক্সাইল সরকার গঠিত হলে তিনি এর মুখ্য সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তার সঙ্গে আমি আগরতলায় দেখা করি। তারপর ওখান থেকে গোহাটি হয়ে কলকাতায় চলে যাই।  এরপর শুরু হয় আমার মুক্তিযুদ্ধ জীবন।

জহিরুল: আর লেখালেখি? একেবারে বন্ধ হয়ে গেল!
মাহমুদ: এর মধ্যে কি আর লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব! আমি চেষ্টাও করিনি। তখন তো একটাই স্বপ্ন, স্বাধীনতা। পুরো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি একটিমাত্র কবিতা লিখেছি, কবিতাটির নাম ‘ক্যামোফ্লেজ’।

জহিরুল: ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ আপনি কোথায় ছিলেন? সেই দিনটির কথা আপনার মুখে শুনতে চাই।
মাহমুদ: ঢাকায়ই ছিলাম।  তখন আমি ইত্তেফাকে চাকরি করি।  রাত প্রায় নয়টা পর্যন্ত অফিসে ছিলাম। আমার এক আত্মীয় (তিনিও ইত্তেফাকে ছিলেন) ইশারা করলেন, বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য।  তখন ঢাকার খিলগাঁওয়ে আমার বাসা। আমি বাসায় চলে আসি। খেয়ে শুয়ে পড়েছি।  হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠি।  কানে তালা লাগানো শব্দ।  মনে হচ্ছিল খাট থেকে ছিটকে পড়ে যাব। বুঝতে পারছিলাম বাঙালি নিধন শুরু হয়ে গেছে।  সে এক দুঃস্বপ্নের রাত।

জহিরুল: বাংলাদেশের কবিতা গত পঁয়ত্রিশ বছরে কিভাবে বদলেছে বলে আপনার মনে হয়?
মাহমুদ: বাংলাদেশের কবিতা মানেই তো স্বাধীনতা উত্তরকালের কবিতা। এই সময়ে কবিতার যে উত্তরণ, তা ঘটেছে পঞ্চাশের কবিদের হাতেই।  শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ আর শহীদ কাদরী, বাংলাদেশের কবিতা মানেই তো এই তিনজন। আরও কেউ কেউ লিখতেন, কিন্তু টিকে থাকতে পারেননি। অধিকাংশেরই কবিতা লেখা স্বাধীনতার পর বন্ধ হয়ে গেছে।

জহিরুল: ষাট, সত্তর, আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকের এমন কেউ কি নেইযারা এই উত্তরণের ধারাবাহিকতায় কন্ট্রিবিউট করেছেন?
মাহমুদ: ষাটের কবিদের মধ্যে আমি নির্মলেন্দু গুণের নাম উল্লেখ করতে চাই, সত্তরের আবিদ আজাদ আর আশির খোন্দকার আশরাফ হোসেন।  নব্বইয়ের কবিরা এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে আছে, আমি এই দশকের কারও নাম উল্লেখ করে বিপদগ্রস্ত হতে চাই না।

জহিরুল: এই পঁয়ত্রিশ বছরের কবিতায় আঙ্গিকগত যে পরিবর্তন এসেছে, এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
মাহমুদ: জহির, এ কথা তোমাকে আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি, কবিতার আঙ্গিক নির্ভর করে এর বিষয়ের ওপর।  বিষয়ই বলে দেয় আঙ্গিকটা কেমন হবে।  মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এবং এর অব্যবহিত পরে আমাদের কবিতায় এসেছে বারুদ, মৃত্যু, পরাজয়, বিশ্বাসঘাতকতা।  এই বিষয়গুলোর জন্য এক ধরনের আঙ্গিক অপরিহার্য ছিল।  এখন বিষয় বদলাচ্ছে, আঙ্গিকও বদলাচ্ছে।  বিষয় নতুন না হলে আঙ্গিক নড়ে না।

জহিরুল: ‘সোনালি কাবিন’ রচনার সময়টার কথা বলুন।  অনেকে বলেন ওটাই আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই।  সবচেয়ে স্বতন্ত্র বই।  কবিতা নিয়ে একটা নির্দিষ্ট ভাবনা কি সেই সময়ে আপনার মনের মধ্যে ছিল?
মাহমুদ: আমি ‘সোনালি কাবিন’-এর কবিতাগুলো লিখেছি ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের সময়।  ‘ইত্তেফাক’ তখন বন্ধ হয়ে যায়।  আমি চট্টগ্রামে চলে যাই। ওখানকার ‘আর্ট প্রেস’-এ একটা চাকরি নেই।  ওদেরই ‘বইঘর প্রকাশনী’ থেকে বাচ্চাদের একটা কাগজ বেরুতো, যেটার নাম ছিল ‘টাপুর টুপুর’।  ঠিক সেই সময়টাতে আমি ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো রচনা করি। তবে ‘সোনালি কাবিন’ আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই—এটা আমি স্বীকার করি না।  আমি মনে করি, আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’।

জহিরুল: কবিতাভাবনার উৎস কোথায়? কোথায় থাকে কবিতা? কিভাবে ঘটে তার উদ্ধার কার্য?
মাহমুদ: কবিতা একটি রহস্যজনক ব্যাপার। মানুষ তার উৎপত্তিকাল থেকেই স্বপ্ন দেখে, ঘুমিয়ে না, জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে।  সব ধর্মগ্রন্থের প্রারম্ভেই আদম এবং ঈভের কথা আছে। তারা সুখে-শান্তিতে স্বর্গের ইডেন গার্ডেনে বসবাস করতেন। একদিন স্রষ্টা অনুভর করলেন আদমের নিঃসঙ্গতা।  তখন তিনি আদমের বাঁ দিকটা কেটে ঈভকে তৈরি করলেন।  অচেতন আদম জ্ঞান ফিরে পেয়েই ঈভকে আলিঙ্গন করতে চাইলেন, জড়িয়ে ধরতে চাইলেন। কারণ ঈভ তারই শরীরের অংশ কিন্তু ঈভতা মেনে নিতে পারেননি, তিনি নিজেকে স্বতন্ত্র ঘোষণা করলেন। এই যে জড়িয়ে ধরার আকাঙ্ক্ষা এটাই প্রেম। শয়তানের প্রলোভনে যখন আদম এবং ঈভ গন্দম খেলো, তখনই তাদের মধ্যে জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে।  তখনই তারা বুঝতে পারে, তাদের নগ্নতার লজ্জা। তাদের মধ্যে জেগে ওঠে কাম, ক্রোধ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা।  ইডেন থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা নেমে আসেন পৃথিবীতে।  তখন থেকেই শুরু হয় ড্রিম, স্বপ্নদেখা। ইডেনে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন।  এই স্বপ্নই হলো কবিতা।

জহিরুল: আর ওই যে, আদম হাওয়াকে জড়িয়ে ধরতে চাইল, তুমি আমার বলে। আর হাওয়া বলল, না, আমি স্বতন্ত্র। ওখান থেকেই কি শুরু হলো নারীপুরুষের ব্যক্তিত্বের অনিবার্য দ্বন্দ্ব? পুরুষ চিরকাল নারীকে ‘আমার’ বলে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, আর নারী খোঁজে তার স্বাতন্ত্র?
মাহমুদ: ঠিক ধরেছ।

জহিরুল: আমার তো মনে হয়, চাইলেই কবিতা লেখা যায় না।  কবিতা আসতে হয়, অনেকটা নাজেল হওয়ার মতো, আপনি কী বলেন?
মাহমুদ: তুমি আগেও আমাকে বলেছিলে কবিতা ওহির মতো নাজেল হয়। এটা আমি মানি না।  তবে হ্যাঁ, এ কথা মানি যে চাইলেই কবিতা লেখা যায় না।

জহিরুল: অন্য ভাষার কবিতা আপনাকে কখনো আলোড়িত করেছে? কারও নাম বলবেন?
মাহমুদ: অবশ্যই।  ইংরেজি কবিতা, ফরাসি কবিতা আমাকে আলোড়িত করেছে। কিটস, শেলি, শেক্সপিয়র, বায়রন, এলিয়ট, ইয়েটস পড়েছি, অনুপ্রাণিত হয়েছি। বদলেয়ার এক অসাধারণ কবি। র‍্যাবোঁ পড়েছি, আমার ভালো লেগেছে।

জহিরুল: ‘ধর্ম’ শব্দটি আপনার কাছে কী? আপনি কি এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন না, যেখানে সব মানুষের ধর্ম এক।  অথবা কোনো মানুষেরই নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম নেই, মনুষ্যত্ব ছাড়া?
মাহমুদ: আমি সুনির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাস করি। যদিও সব ধর্মগ্রন্থই মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য এসেছে কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমারটি শ্রেষ্ঠ, আর এজন্যই আমি এই ধর্মের অনুসারী।  আমার ধর্মগ্রন্থে আছে, আগের ধর্মগ্রন্থের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা, আমি সব ধর্মগ্রন্থকেই সম্মান করি।  পৃথিবীর সব মানুষ একটি ধর্মের অনুসারী হবে, এটা তো একটা স্বপ্নের কথা।  এই স্বপ্ন আমিও দেখতাম।

জহিরুল: সেই স্বপ্নের ভিত্তিটা কী ছিল? মানবতা, না ইসলাম? এখন সেই স্বপ্নটি দেখেন না?
মাহমুদ: এখনো দেখি।  তবে এটা বিশ্বাস করার মতো কোনো ভিত্তি খুঁজেপাই না যে, মানবতার ভিত্তিতে এই একত্রায়ণ হবে। এখন আমি বিশ্বাস করি আধ্যাত্মিকতার ভিত্তিতে বা কোনো অলৌকিক ঘটনার দ্বারা হয়তো একদিন পৃথিবীর সব মানুষ একটি অভিন্ন ধর্মের কথাই বলবে। তবে আমি মনুষ্যত্বের ওপর এখনো নির্ভর করি। মনুষ্যত্বের ভিত্তিতে বিশ্ববাসীর অভিন্ন কণ্ঠস্বর আজও শুনতে না-পাওয়ার আক্ষেপ আমার আছে।

জহিরুল: আবার কবিতায় ফিরে আসি, রবার্ট ফ্রস্ট বলেছেন, কোনোকিছু না বুঝেই যা ভালো লাগে, তা-ই কবিতা।  আপনার কাছে কবিতা কী?
মাহমুদ: আমি এর সঙ্গে একমত না।  আমি মনে করি যা কমিউনিকেট করে না, তা কবিতা না।  কবিতায় রহস্য থাকবে, তবে পাঠকের বোধে ধরা পড়ার মতো অবকাশ তাতে থাকতে হবে।

জহিরুল: এখন তরুণ কবিরা বলছেন, কবিতায় বিষয়, দর্শন, বক্তব্য এসবের কিছুই প্রয়োজন নেই। কেবল ভালোলাগাই কবিতা। তরুণদের এই বোধকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
মাহমুদ: দর্শন থাকার প্রয়োজন নেই, মানি।  কিন্তু কবিতা পাঠককে কিছু বলবে না, এটা মানি না।  আমি মনে করি কবিতায় সহস্য থাকা জরুরি।

জহিরুল: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘গভীর প্রত্যয়ের কথা লিখতে গিয়েও আল মাহমুদকে কখনো চেঁচামিচি করতে হয়নি, কোনো জঙ্গি মনোভাব দেখাতে হয়নি’। এই যে গভীর প্রত্যয়, এর মূলে কী আপনার ধর্মবোধ?
মাহমুদ: ধর্মবোধই বলতে পার। তবে আমি সুফি মানুষ। প্রচলিত ধর্মবোধের বাইরেও আমি একটু বিচরণ করি। সুফিরা প্রচলিত ধর্মচর্চার বাইরেও নানা পদ্ধতিতে ধর্মপালন করেছেন।

জহিরুল: আপনি কোন পদ্ধতিতে করেন?
মাহমুদ: দেখো এটা একান্তই নিজস্ব ব্যাপার, আমি বলতে চাচ্ছি না। এসব কথা কেন জানতে চাও (কিছুটা উত্তেজিত)?

জহিরুল: এতে করে আপনার পাঠকেরা আপনাকে আরও স্পষ্ট করে জানবে, নিজেকে মেলে ধরতে অসুবিধা কী?
মাহমুদ: ঠিক আছে লেখো।  কিন্তু লেখবা না  তো খামাখা জিজ্ঞেস করছ।

জহিরুল: অবশ্যই লিখব, আপনি বলেন মাহমুদ ভাই।
মাহমুদ: আমার একজন ধর্মগুরু আছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, নিয়মিত জিকির করতে, আমি জিকির করি।

জহিরুল: ধর্মগুরুর নামটা জানতে পারি?
মাহমুদ: কী দরকার? খালি ঝামেলায় ফালাও। ঠিক আছে লেখো। তাঁর নাম মৌলানা শাহ সুফি আব্দুল জব্বার।  আমি হঠাৎ একদিন তাঁর এক মজলিশে গিয়ে হাজির। তিনি কোরানের মর্মার্থ বর্ণনা করছিলেন। আমি ঢুকতেই তিনি এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, মনে হলো দুটো দৃষ্টির বল্লম আমাকে মাছের মতো গেঁথে ফেলল। আমি ছটফট করতে করতে একেবারে সামনে, তাঁর কাছে পৌঁছে গেলাম। আর আশ্চর্য ব্যাপার সবাই দুপাশ থেকে আমার জন্য পথ ছেড়ে দিল।  আমি গিয়ে তাঁর হাত ধরলাম।  তিনি আমাকে মাত্র তিনটি কথা বললেন।  (এরপর তিনি চুপ হয়ে রইলেন)

জহিরুল: কথা তিনটি কী?
মাহমুদ: তিনি বললেন, অহঙ্কার ত্যাগ করতে হবে। সব ঢেলে দেওয়ার মতো সেজদাহ করবে।  আর জিকির করবে।

জহিরুল: আপনি লিখেছেন ‘কেবলই আমার মধ্যে যেন এক/শিশু আর পশুর বিরোধ’। এই বিরোধ কি আপনার আত্মাকে বিক্ষত করে? আপনার সাহিত্যকে সক্ষম করে তোলে? দুটোই একসঙ্গে করে?
মাহমুদ: এই বিরোধ প্রতি মুহূর্তে আমাকে ক্ষত করে, বিক্ষত করে। এই বিরোধই আবার আমার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে।  একজন কবির এই অস্থিরতা থাকা খুবই জরুরি, এই বিরোধ সৃজনশীলতার সহায়ক।

জহিরুল: আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষা একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
মাহমুদ: স্বাধীনতার আগে একটা চেষ্টা ছিল দুই বাংলার সাহিত্য ভাষাটাকে এক করে তোলার।  কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে কেবলই তা দূরে সরে যাচ্ছে।  দুই বাংলার ভাষা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

জহিরুল: পশ্চিমবঙ্গের তরুণ কবিদের কবিতা পড়ার অবকাশ হয়েছে? চমকে দেওয়ার মতো কোনো কবিতা কি চোখে পড়েছে?
মাহমুদ: চমকে দেওয়ার মতো কবিতা নিশ্চয়ই ওখানকার তরুণরা লিখছেন।কিন্তু আমার অধ্যয়ন সীমিত বলে আমি এ সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারছি না।  তবে আমি নিশ্চিত ওরা খুব ভালো কবিতা লিখছেন।

জহিরুল: বাংলাদেশের এই মুহূর্তের কবিতা আপনাকে কতটুকু আন্দোলিত করে। আজকাল তো বেশ অন্যরকম কবিতা লেখা হচ্ছে, আল মাহমুদের কবিতা থেকে আলাদা।
মাহমুদ: আমাকে মোটেও আন্দোলিত করছে না। বলতে পারো, আমার ভালো লাগে না।  হ্যাঁ, নব্বইয়ের দশকের কয়েকজন অভ্যাসের বাইরে কিছু পঙ্ক্তি রচনা করেছে।  আমাকে কিছুটা আলোড়িত করেছে।

জহিরুল: অভ্যাসের বাইরে মানে কী? আঙ্গিকগত, বিষয়বস্তুর দিক থেকে, না কি অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহারের দিক থেকে, না কি রাজনীতির ডান-বামের কথা বলছেন?
মাহমুদ: আমি এদের আস্তিক কিংবা নাস্তিক কোনোভাবেই দেখছি না। কবিতার রহস্যই আমাকে আন্দোলিত করেছে।

জহিরুল: নব্বইয়ের এই যে কয়েকজনের কবিতা আপনার ভালো লাগল, তারা কারা, নাম বলবেন কি?
মাহমুদ: কারও নাম উল্লেখ করে বিপদে পড়তে চাই না।

জহিরুল: আপনি লিখেছেন, ‘ভেবেছি তো অন্ধকারে আমি হব রাতেরপুরুত/আদিম মন্দিরে একা। তুমি এসো নগ্নতার দেবী’। মনে হয় আপনারকবিতায় ‘প্রেম’, ‘প্রকৃতি’, ‘নারী’ ও ‘মানবিকতা’ সব সমার্থক এবং তীব্রভাবে শারীরিক।  এ সম্বন্ধে কিছু বলেন।
মাহমুদ: আমি তো ধারাবাহিকতার বাহক। বাংলা আদি সাহিত্য মূলত নরনারীর শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে খুবই খোলামেলা, অশ্লীলও বলতে পার। আমি আদি সাহিত্য থেকেই সংগ্রহ করেছি, আমার পূর্বপুরুষের ধারাবাহিকতা বহন করব না?

জহিরুল: প্রেমিক, স্বামী, বাবা ও কবি। কোন ক্ষেত্রে নিজেকে সফল মনে করেন?
মাহমুদ: আমি আসলে কবিতায়ই পারঙ্গম। স্বামী হিসেবে নিজেকে খুব সফলমনে করি না। আজ পঞ্চাশ বছর একসঙ্গে আছি, এটা তারই কৃতিত্ব, তারই গুণে। আমি প্রকৃতপক্ষে আমার স্ত্রীর ওপর খুবই নির্ভরশীল।  তাকে ছাড়া আমার একদিনও চলবে না। আমার নখ কাটা থেকে শুরু করে বলা যায় প্রায় ব্যক্তিগত সবকিছুর জন্যই তার ওপর আমাকে নির্ভর করতে হয়।

জহিরুল: ক’বছর বয়সে লিখতে শুরু করেন? প্রথম কবিতাটির কথা মনে আছে?
মাহমুদ: মনে আছে তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি।  কবি নজরুল ইসলামের কবিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তার কবিতার মতো একটি কবিতা লিখেছিলাম।  আজ এত বছর পর আর সেই কবিতার নাম বা কোনো চরণ মনে করতে বলো না, আমি পারব না।

জহিরুল: হতে পারতেন ডাক্তার, উকিল, অভিনেতা কত কিছু, কবি হলেন কেন?
মাহমুদ: যেহেতু অন্য কোনো কাজের দক্ষতা আমার মধ্যে জন্মায়নি।

জহিরুল: পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র, এরপর পশ্চিমা বিশ্ব বনাম ইসলাম, এই যেদ্বিধা-বিভক্তি, অস্থিরতা, যার ফলাফল দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ। ইরাক, আফগানিস্তান এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ।  এ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী বলে আপনি মনে করেন?
মাহমুদ: সমাজতন্ত্রের নেতারা এখন আর পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না। লড়াই করছে ইসলামপন্থীরা।  ইসলাম কেন পুঁজিবাদের শত্রু? এজন্য যে, ইসলামে সুদ হারাম।  আর সুদ না থাকলে পুঁজিবাদ শেষ। বিশ্বায়নের পাঁয়তারা হলো তৃতীয় বিশ্বকে আরও সহজে শোষণ করার একটা কৌশল। তবে আমেরিকাকে কাউন্টার করার জন্য এক ঘুমন্ত দানব জেগে উঠছে, তার নাম চায়না। যুদ্ধ থামবে না। আমি মনে করি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাসন্ন। পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ অবধারিত।  এরপর মানবসভ্যতা টিকে থাকবে না। যদি কোনো কারণে টিকে থাকে, তখন একটি ধর্ম লাগবে। সেই ধর্ম হলো ইসলাম।  ইসলামই শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে।

জহিরুল: কিন্তু আমি জানতে চাচ্ছিলাম এই ‘অনিবার্য’ ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে বাঁচার উপায় কী?
মাহমুদ: কোনো উপায় নেই।  এজন্য যে আমেরিকা কারও কথা শুনবে না।

জহিরুল: মাতৃভূমি যখন বিপন্ন, তখন মানুষ নিজের জীবন দিতে দ্বিধা করে না। দেখেছি প্যালেস্টাইনে, দেখেছি ইরাকে, সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্যরা অবলীলায় প্রাণ-বিসর্জন দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে তো অমন সমস্যা নেই, এখানে সুইসাইড স্কোয়াড কেন?
মাহমুদ: এই বিষয়ে আমি কোনো কমেন্ট করতে চাই না।

জহিরুল: অনেক বড় কবিকে দেখেছি সুনির্দিষ্ট কোনো নারীর নাম নিয়েছেন কবিতায়, কখনো বার বার, অনেকবার। আপনি অনেক প্রেমের কবিতা লিখেছেন। আপনার কবিতায় প্রেম, নারী, যৌনতা—এই বিষয়গুলো বার বারই এসেছে কিন্তু আপনি কখনোই সুনির্দিষ্ট কোনো নারীর নাম করেননি কবিতায়, যেমন সুনীলের নীরা, জীবনানন্দের বনলতা।  বিষয়টি কি আপনি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন, নাকি তেমন কোনো অনুপ্রেরণা ছিল না?
মাহমুদ: আমি তো সমস্ত কবিতায় একটি মেয়ের কথাই বলেছি।  একটি শ্যামলা মেয়ের রূপের বর্ণনা করেছি সর্বত্র কিন্তু সেটা বাই নেমে আসেনি। আমি মনে করি নাম উল্লেখ করা ঠিক না, আমি সচেতনভাবেই নাম এড়িয়ে গেছি।

জহিরুল: ত্রিশের দশকেই মূলত আধুনিক বাংলা কবিতা সাবালক হয়ে ওঠে। পঞ্চাশের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়রা একে দান করেন পূর্ণযৌবন। ষাট, সত্তর, আশি এর ধারাবাহিকতা মাত্র। নব্বইয়ের তরুণরা কিংবা নতুন সহস্রাব্দের অতি-তরুণরা বদলাতে চাচ্ছে কবিতার গতি-প্রকৃতি। চলছে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই ধারাবাহিকতার সূত্র ধরে ২১০০ সালের কবিতা কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
মাহমুদ: তখনো কবিতায় স্বপ্ন থাকবে, ইঙ্গিত থাকবে, প্রেম থাকবে, যৌনতা থাকবে এবং আমার মনে হয় পয়ারও থাকবে। তবে তখন কবিরা চাঁদের রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা দেবে আর মঙ্গলের মাটির নিচে বানানো প্রাসাদে ঘুমাবে, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।

জহিরুল: পয়ারের প্রতি আপনার বেশ দুর্বলতা আছে লক্ষ করেছি, আপনি ব্যক্তিগতভাবে কোন ছন্দে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?
মাহমুদ: মাত্রাবৃত্ত আমার খুবই প্রিয় ছন্দ। আমি মাত্রাবৃত্তে লিখতে বেশি পছন্দ করি।  তবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি অক্ষরবৃত্তে।

জহিরুল: আজ সত্তর পেরিয়ে একবার পেছনে তাকান তো, এই যে পর্বতপ্রমাণ সাফল্য, এত এত গ্রন্থ, জনপ্রিয়তা, সম্মাননা, পদক,কখনো কি মনে হয় যদি কবি না  হয়ে অন্য কিছু হতেন, তাহলে বড় ভুল হয়ে যেত?
মাহমুদ: খুব ছোটোবেলায় মনে হতো প্রত্নতাত্ত্বিক হব।  ইতিহাসের অনুসন্ধানে মাটি খুঁড়ব।  কিন্তু কিছুকাল পরেই বুঝতে পারলাম আমাকে লেখকই হতে হবে।  আমি আসলে যা হতে চেয়েছিলাম, তাই হয়েছি।

জহিরুল: আপনি যখন গণকণ্ঠের সম্পাদক ছিলেন, সাংবাদিকতার কারণে আপনাকে জেল খাটতে হয়েছে।  কেমন ছিল জেল জীবন?
মাহমুদ: জেল খুব খারাপ জায়গা।  জেল আমার কোনো উপকার করেনি। ভীষণ ক্ষতি করেছে।  তবে ওই একটি বছর কোনো কাজ ছিল না বলে বেশ কিছু বই পড়তে পেরেছি। রামায়ণ, মহাভারত, উপনিষদ, গীতা, ত্রিপিটক এসব পড়েছি।  জেল খুব কষ্টকর, মানুষকে শেষ করে দেয়।

জহিরুল: কবিতার জন্য সংবর্ধিত হয়েছেন বহুবার, কখনো কি নিগৃহীত হয়েছেন?
মাহমুদ: তেমন অর্থে এই দুর্ভাগ্য আমার হয়নি। একবার একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী আমাকে লাঞ্ছনা দিতে চেষ্টা করেছিল।  অন্য একদল মুক্তিবুদ্ধির মানুষের জন্য তা করতে পারেনি। স্পেনের কুইভাল নদীর পাড় ধরে হাঁটব, আমার এই স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল।

জহিরুল: এক কবিতায় আপনি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘ডাকাতদের গ্রাম’ বলার পরে অনেক লেখালেখি হয়েছিল, অনেকে ব্যক্তিগতভাবেও অপদস্ত করতে চেয়েছিল।
মাহমুদ: ওই কবিতাটি আমি কেন লিখেছি তা হলে শোনো, আমি তখন শিল্পকলা একাডেমির ডিরেক্টর। আমার অফিসের একটি মেয়ে, মাত্র ক’দিন আগে বিয়ে হয়েছে, গহনা পরে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে।  ওকে টেনে-ছিঁড়ে ফেলল ডাকাত ছেলেগুলো। ওর সব গহনাগাটি ছিনিয়ে নিল।  মেয়েটি অফিসে এসে পরদিন আমার কাছে উপুড় হয়ে পড়ল। ওই কবিতা লেখার পর দেশের একজন বড় কবির নেতৃত্বে আমার বিরুদ্ধে একটি মিছিল বের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। কারণ ওই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে প্রচুর অস্ত্র ধরা পড়ে।

জহিরুল: জীবনের কোনো মুহূর্তে কি মনে হয়েছে কবি হয়েছেন বলে স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, সমাজ আপনার দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়েছে?
মাহমুদ: মনে হয়নি। বরং কবি হয়েছি বলে আমার দিকে সবাই সুদৃষ্টিতেই তাকিয়েছে।  এ জীবনে যা কিছু অর্জন তা-তো কবিতার জন্যই।

জহিরুল: আপনার এই দীর্ঘ কবি জীবনের ধারাবাহিকতা অক্ষত রাখার ক্ষেত্রে ভাবির অবদান কতখানি? অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার দিনে কখনো কি স্ত্রীর কটুবাক্য শুনতে হয়েছে, কারণ আপনি কবি?
মাহমুদ: আমি আমার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসি।  তাকে আমি পুরোটাই উজাড় করে দিয়েছি, স্ত্রী হিসেবে তার যা তৃষ্ণা, আমি তা মিটিয়েছি ষোলোআনা। আমি কখনো ড্রেনের পানির দিকে মুখ বাড়াইনি, কারণ আমার ফ্রিজ ভরা ঠাণ্ডা পানি। বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে বেশ অনেককাল অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা ছিল। পরবর্তী জীবনেও মাঝে মাঝে চাকরি ছিল না। সেই সব দুর্দিনে সে তার বাপের বাড়ি থেকে অনেক এনেছে কিন্তু কখনো আমাকে ব্লেইম করেনি।

জহিরুল: আপনার একটি অসামান্য উপন্যাস ‘উষ্ণ কর্দমের চর’। এই উপন্যাসে বর্ণিত কৈবর্ত্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে আপনার বাস্তব সম্পৃক্ততা কতখানি?
মাহমুদ: ছোটোবেলা থেকেই আমি কৈবর্ত্য সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পড়েছি। ওদের ঘরে গেছি, থেকেছি, খেয়েছি। ওদের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক ছিল, এখনও আছে। কৈবর্ত্য মেয়েরা অত্যন্ত দুঃসাহসী, প্রেমে এবং কর্মে। আমার দেখা ওই বিশেষ কৈবর্ত্য শ্রেণীর মেয়েদের গায়ের রং কালো, পেটানো স্বাস্থ্য। দীর্ঘাঙ্গিনী, ছয় ফুট লম্বা একেকটি মেয়ে।

জহিরুল: আপনার লেখালেখিতে প্রায়ই কালো নারীর রূপের বর্ণনা আসে। মনে হয় কোনো বিশেষ কারণে আপনি কৃষ্ণবর্ণের নারীদের প্রতি দুর্বল। কারণটা কী?
মাহমুদ: আমি নিজেও এ নিয়ে ভাবি। কারণটা মনে হয় এই যে, আমি যে নারীর কাছে মানুষ হয়েছি, অর্থাৎ যে নারী আমাকে লালন-পালন করে বড় করেছেন, তিনি ছিলেন শ্যামবর্ণ, কালোও বলতে পারো।  শৈশবের সেই ভালো লাগাই হয়তো আমার রচনাতে বার বারই ঘুরে-ফিরে এসেছে।

জহিরুল: ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ আপনি এই স্লোগানকে কিভাবে দেখেন?
মাহমুদ: আমি তা মানি না।  আমি জীবনের তরঙ্গ থেকে বের হয়ে আসা কবি। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, শিল্প সর্বোতভাবে জীবনের জন্য।

জহিরুল: স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতাউত্তরকালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা আপনার কবি জীবনকে কতখানি প্রভাবিত করেছে?
মাহমুদ: একজন কবিকে রাজনীতি ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। রাজনীতি আমার ব্যক্তিজীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। জেল খেটেছি, আবার পুরস্কৃতও হয়েছি।  আমাকে দু’ভাবেই প্রভাবিত করেছে।

জহিরুল: একজন কবির কি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকা উচিত? আপনি কি কখনো কোনো দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা আছেন?
মাহমুদ: আমি কবিদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পরামর্শ দেই। রাজনীতি দুঃখ ছাড়া আর কিছুই দেয় না। রাজনীতি মানুষকে বুর্জোয়া মানসিক করে তোলে, প্রতারণা ও চতুরতা শেখায়।  কাব্য সৌন্দর্যের বিষয়।  কবিদের এ জন্য রাজনীতির কদর্যতা থেকে দূরে থাকা উচিত।

জহিরুল: শেখ মুজিব আপনাকে জেল খাটালেন আবার চাকরিও দিলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গেও আপনার সুসম্পর্ক ছিল, প্রেসিডেন্ট এরশাদ আপনাকে, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দীনসহ আরও অনেককে জমি দিয়েছেন।  মোটামুটি সব সরকার প্রধানের সঙ্গেই আপনার একটা সম্পর্ক ছিল।  এই তিন পুরুষ সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করুন, কেমন ছিলেন তারা?
মাহমুদ: এই কাজটা আমি করতে চাই না।

জহিরুল: ঠিক আছে নেগেটিভ কিছু না বলেন, পজেটিভ কিছু বলেন। তাদের নিশ্চয়ই অনেক গুণও ছিল।
মাহমুদ: শেখ মুজিব ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের মানুষ, লায়ন হার্টেড ম্যান। জিয়া ছিলেন সাহসী যোদ্ধা এবং খাঁটি দেশপ্রেমিক। আর এরশাদ, হা হা হা…তিনি একজন রোমান্টিক মানুষ। সুন্দরীদের এবং কবিদের তিনি খুব ভালোবাসেন।

জহিরুল: আপনি প্রায়শই বলেন, একজন কবিকে স্বার্থপর হতে হয়। এই স্বার্থপরতার স্বরূপ কেমন?
মাহমুদ: আড্ডাবাজি কমাতে হবে।  স্বার্থপরের মতো আড্ডা থেকে উঠে আসতে হবে। লেখায় বসে যেতে হবে। একজন কবিকে কবিতা লিখতে হবে। আড্ডাবাজি করে কবি হওয়া যায় না।  কবি হতে হয় কবিতা লিখে।

জহিরুল: অনেক বড়ো কবি/লেখককে দেখা যায় তারা ছবি আঁকেন, গান করেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। যেমন: রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সত্যজিৎ, হুমায়ূন আহমেদ।  আপনি এ কাজগুলো করেননি, এ জন্য কি আক্ষেপ হয়?
মাহমুদ: ছবি বানাবার ভারি শখ ছিল।  আসলে সময় পাইনি।  কবিতাতেই বেশি জোর দিয়েছি।  তবে এজন্য কোনো আক্ষেপ নেই।

জহিরুল: যা যা হয়েছেন বা করেছেন, এর বাইরে আর কিছু না করতে পারার অতৃপ্তি রয়েছে আপনার?
মাহমুদ: আমার জীবনে দ্বিতীয় নারীর সঙ্গে সঙ্গম করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, এইটা একটা অতৃপ্তি, হা হা হা হা…।

জহিরুল: প্রতি বছর ঈদসংখ্যার জন্য বেশ তাড়াহুড়ো করে লেখকদের, আপনাকেও বেশ অনেকগুলো লেখা তৈরি করতে হয়। বিশেষ করে উপন্যাস। আপনার কি মনে হয় না, একজন লেখক এই সময়টাতে তার স্বাভাবিক ক্যাপাসিটির চেয়ে বেশি লেখেন বলে কোয়ালিটি ফল করে?
মাহমুদ: আমি তো মনে করি আমি কোথাও ফেইল করিনি। কোয়ালিটিও ফল করেনি।  এই ঈদে একটি উপন্যাস লিখেছি, যমুনাবতী, বাংলা ভাষায় এরকম বর্ণনামূলক উপন্যাস আর কটা আছে দেখাও।  যা লিখেছি, আমি মনে করি না আমার ক্যাপাসিটি এর চেয়ে কম ছিল।

জহিরুল: নতুন ধরনের কোনো কাজ করার পরিকল্পনা আছে কি? এ যাবৎ যা করেছেন তার বাইরে কোনো কিছু?
মাহমুদ: দুটো কাজ করার পরিকল্পনা আছে। একটি কাব্যনাট্য লিখতে চাই। আর একটি দীর্ঘ কবিতা লিখব, সমিল ছন্দে। একটি কবিতা-ই একটি বই হবে।

জহিরুল: কেউ কেউ বলেন, আপনি দলবাজিতে অপটু। তাই শামসুর রাহমানের চেয়ে পিছিয়ে আছেন।  এই অভিযোগকে আপনি কিভাবে দেখেন?
মাহমুদ: হয়তো তারা ঠিকই বলে।

জহিরুল: শামসুর রাহমান তাঁর ভক্ত তরুণ লেখকদের নানান উপকার করেন কিন্তু আপনি তা করেন না, কথাটা কি ঠিক?
মাহমুদ: আমি একজন উদার মানুষ।  এই অভিযোগটা ঠিক না।

জহিরুল: আপনাকে খুব অল্প দামে কিনে ফেলতে পারে প্রকাশকরা, কাগজওয়ালারা।  কথাটা কি ঠিক?
মাহমুদ: ঠিকই বোধহয়।  দরিদ্র লোক, টাকার লোভ সামলাতে পারি না।  যে যা বলে, অমনি রাজি হয়ে যাই, দর কষাকষি করি না।

জহিরুল: আপনি নাকি জামায়াতের  উপদেষ্টা ছিলেন?
মাহমুদ: ডাহা মিথ্যা কথা (কিছুটা উত্তেজিত)। জামায়াতের রাজনীতির ধরন জানো না? ওদের মেম্বারশিপের নানান স্টেজ আছে। জামায়াতের রাজনীতিতে ঢোকা বা কাউকে ঢোকানো বেশ কঠিন ব্যাপার। আর এছাড়া আমি ওদের উপদেষ্টা হতে যাবই বা কেন? আমি মনে করি না একজন কবির সরাসরি রাজনীতি করা উচিত।

জহিরুল : এপার বাংলা ওপার বাংলা এক হওয়ার স্বপ্নকে আপনি কিভাবে দেখেন?
মাহমুদ : এটা বারো ভূঁইয়াদের দেশ।  এই স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না।

জহিরুল : আপনি ‘কবিতীর্থ’-র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সুনীলের কবিতা তেমন কিছুই হয়নি তবে তার গদ্য বেশ ভালো। পরবর্তী সময়ে ‘নকশিকাঁথা’র প্রসঙ্গে বলেছেন, সুনীলের গদ্য তেমন ভালো না তবে তার কবিতা ভালো।  এটা কি পরস্পরবিরোধী বক্তব্য হয়ে গেল না?
মাহমুদ: তাহলে এখন কী বলি শোনো, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গদ্য কিংবা পদ্য কোনোটাই আমার ভালো লাগে না। ওপারের প্রধান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, একথা আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি। সুনীলের শ্রেষ্ঠ রচনাটির নাম ‘অর্জুন’। এটি একটি বিশুদ্ধ সাম্প্রদায়িক বই।  সে প্রাণ খুলে ওটা লিখেছে।  আমি এতে তেমন কোনো দোষ দেখি না।

জহিরুল: এখন তো সময় এসেছে ষাটের প্রধান কবি খুঁজে বের করার।  আর এ কাজটা আপনাদের, মানে পঞ্চাশের কবিদেরই করতে হবে। আপনার দৃষ্টিতে ষাটের প্রধান কবি কে?
মাহমুদ: গুণ, নির্মলেন্দু গুণ-ই ষাটের প্রধান কবি। তবে রফিক আজাদও ষাটের গুরুত্বপূর্ণ।

জহিরুল: তার মানে কি এই দাঁড়ালো, পঞ্চাশের কথা উঠলেই আমরা যেমন বলি, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ।  ঠিক তেমনি, ষাট মানেই নির্মলেন্দু গুণ আর রফিক আজাদ?
মাহমুদ: বলতে পারো।

জহিরুল: নিজের মৃত্যু নিয়ে কখনো ভাবেন? শামসুর রাহমান বলেছিলেন, ‘একজন কবির ৪০০ বছর বাঁচা উচিত’ আপনি কী মনে করেন?
মাহমুদ: নিজের মৃত্যু নিয়ে আমি সব সময় ভাবি।  আমি মনে করি কবির দীর্ঘায়ু হওয়া উচিত।

জহিরুল: মানে কত বছর?
মাহমুদ: আশি বছর।

জহিরুল: লেখার সংখ্যা ও মান, এই দুটোর মধ্যে কোনটিকে আপনি প্রেফার করেন?
মাহমুদ: মানকেই আমি সব সময় গুরুত্ব দেই।  তবে সংখ্যাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

জহিরুল: ক্রোধ, ঘৃণা, প্রেম—এই বিষয়গুলোর প্রতি আপনি কতটা সংবেদনশীল?
মাহমুদ: আমার ক্রোধ নেই, কিছুটা থাকলেও সেটা আমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। তেমন তীব্র ঘৃণাও নেই আমার। তবে কামস্পৃহা খুব তীব্র। আমি এটা কন্ট্রোল করতে পারি না।  সবসময় প্রার্থনা করি কাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জনের জন্য। তবে কাম প্রবৃত্তিই হয়তো কবিতা হয়ে বেরিয়ে এসে আমাকে প্রশমিত করে।

জহিরুল: এটাই শেষ প্রশ্ন, ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’তে আমরা দেখেছি আপনার শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনা। বেড়ে ওঠার পরের ঘটনা আপনার পাঠকদের জানাচ্ছেন না কেন?
মাহমুদ: হে হে হে হে…অনেকেই তো এখন বড় বড় নেত্রী হয়েছেন। ওদের ঘর ভাঙতে বলো আমাকে?

প্রথম প্রকাশ: ছোটকাগজ কৌরব

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।

কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন