টাইমমেশিন-৩ ॥ শাপলা সপর্যিতা | চিন্তাসূত্র
২৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮ | রাত ১০:৫১

টাইমমেশিন-৩ ॥ শাপলা সপর্যিতা

তিন.
রাত গভীর। প্রায় বারোটা। ঢাকা শহরে এ কোনো রাত নয়। অথচ সেই লালমাইয়ের নিচে সন্ধ্যা সাতটা-আটটায় মনে হতো গভীর নিশুতি। মেয়েদের খাইয়ে ঘুম পাড়াতে শুয়েছে ঝুমুর। ঘুমানোর সময়ের ঝগড়া দু’জনের প্রতিদিনের। রূপকথা আর চন্দ্রকথা দু’জনেরই মাকে লাগবে। দু’পাশে দু’জন শুবে। মায়ের গলা ধরে। দুবোন পাশাপাশি শোও? না তা না। যতক্ষণ মা না শোবে ততক্ষণ রূপকথা আর যাই হোক ঘুমাতে শোবে না। চন্দ্র একটু ঘুম কাতুরে। মাঝে মাঝে বেশি ঘুম পেলে ঘুমিয়ে পড়ে একাই। আর রূপ। প্রতিদিন একই কাজ। শুয়েই এক কথা। প্রতিদিনের মতো আজো

মা তোমার ছোটবেলার গল্প বলো।
এক গল্প কতদিন শুনবে তুমি? ভালোলাগে এতবার এক কাহিনি?
হ্যাঁ, আমার ভালো লাগে।
আচ্ছা আজ একটা কথা আমাকে খুলে বলতো?
মা, খুলে বলে কিভাবে?
ঝুমুর হেসে ফেলে।
বুঝিয়ে বলাকেই খুলে বলা বলে।
ওহ!

এখন আমাকে বলো, তোমার বয়সী ছেলেমেয়েরা জিনপরী দেও-দৈত্যর গল্প পড়ে আর শুনতে চায়।কিন্তু তুমি তা করো না। তুমি কেবল মায়ের ছোটবেলার গল্প শুনতে চাও কেন বলতো?

বেশ মজা পেয়ে যায় রূপকথা।

মা। আমার কেন যে ভালোলাগে কী যে ভালোলাগে, তোমাকে বুঝাতে পারব না। আমি যে কোনো দিন বিশাল একটা সবুজ মাঠ দেখিনি। পাহাড় দেখিনি এত কাছ থেকে। বাদুড় কেমন তাও জানি না। শকুন দেখিনি। বই এ পড়েছি ওইগুলো সব ভয়ঙ্কর পাখি। কিন্তু তুমি যখন বলো, ওদের কষ্টের কথা, পেয়ারা খেতে এসে ইলেকট্রিসিটির তারে শক খেয়ে মরে যাওয়ার কথা, তখন আমার ওদের জন্য খুব কষ্ট হয়।

তাই?

হ্যাঁ মা। আমি মধ্যরাতে ঠিক তোমার মতো বাগডাসের ডাক শুনি, শেয়ালের ডাক শুনি, তক্ষকের ডাক শুনি।

মা ঝুলানো বাড়ান্দা কী?

রূপকথা আর মা ভেবেছিল চন্দ্র বুঝি ঘুমিয়েছে। হঠাৎ ওর প্রশ্ন শুনে বুঝতে পারে চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল কিন্তু সব কথা শুনছে। চন্দ্র এমনই। চুপ করে নিজের কাজ করবে আর ঠিক চারপাশে যা যা ঘটছে সব মাথায় নেবে। ও প্রশ্ন করে,

মা, ঝুলানো বাড়ান্দায় কি দোল খাওয়া যায়?

আরে নাহ!

ঝুলানো বাড়ান্দাটা আসলে ঝুলে থাকে। তার ওপর নিচে কোনো গ্রিল থাকে না। আর মাথার ওপরেও কোনো ছাদ থাকে না। শুধু কিছু রড এর ওপর ইট বালি সিমেন্ট বসিয়ে এটি তৈরি করা হয়। দালানের সঙ্গে এটাচড্ নয়। সব শোনার পর রূপকথা বলে,

ওহ তাই! সেজন্যই বৃষ্টি এলে সবটা বৃষ্টি ওই বারান্দার ভেতর পড়ে তাই না মা?

হুম।

মা, তোমাদের বাড়ির সেই ঝুলানো বারান্দার গল্পটা বলোনা মা।

গলা ধরে খুব অনুনয় করে রূপকথা। মা ফেরাতে পারে না।

ঠিক আছে বলছি। কিন্তু তুমি চোখ বন্ধ করে শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ো। সকালে স্কুল আছে।

আচ্ছা খুব খুশি হয়ে রূপকথা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে। ওদিকে চন্দ্রর মাঝ রাত্তির।

শোনো তাহলে। সেই ঝুলানো তিনতলা বাড়ির নিচতলায় ছিল একটা শিউলি আর একটা পেয়ারা গাছ। পেয়ারা গাছটা উঁচু হয়ে উঠে এসেছিল আমাদের তিনতলার বারান্দা অবধি। শিউলি তত উঁচু হয় না। যখন ঝুম বৃষ্টি নামত ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে পেয়ারা গাছটা দুলে-দুলে ঝুঁকে এসে পড়ত বারান্দার ভেতর। আমি আর তোমার ছোটমামা বৃষ্টিতে ভিজে লুকিয়ে চুরি করে পেয়ারা গাছ থেকে পাকা আর ডাসা পেয়ারাগুলো পেড়ে নিতাম। যেদিন ঝড়ের দিন সেদিন সন্ধ্যা নামত আরও দ্রুত। চোখের সামনে পাহাড়টা দাঁড়িয়ে থাকত রাতদিন। উঁচু টিলায় ছোট্ট কুপি বাতিটা খুব তাড়াতাড়ি নিভে যেত। খানিক দূরে ছিল দীঘল এক পেয়ারা বন। বাদুড় ডানা মেলত আর অদ্ভুত এক শব্দ করত। কেন জানো? বাদুড় তো চোখে দেখতে পায় না। শব্দ দিয়ে সে তার সামনে কোনো বাধা আছে কিনা তা টের পায়। শব্দটা কোনো কিছুর মধ্যে লাগলে যখন প্রতিধ্বনি ফিরে আসে তার কানে, তখন সে বুঝতে পারে সামনে বিপদ। আর এগুনো যাবে না। তখন অন্য দিকে পাখা মেলে। তবু জানো সকালে ঘুম ভাঙলেই….

 চলবে…

টাইমমেশিন: পর্ব-২ ॥ শাপলা সপর্যিতা

টাইমমেশিন: পর্ব-১ ॥ শাপলা সপর্যিতা

 

 

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন