আধো ঘুমেই হাত বাড়িয়ে সাইড টেবিলে রাখা ক্লকটার অ্যালার্ম অফ করতে গিয়ে স্মরণের মনে পড়লো আজ শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটি। এদিন ঘড়ি সকালে এলার্ম দেয় না। সেভাবেই সেট করা। তাহলে নিশ্চয়ই কলিং বেলের আওয়াজ। যে ইচ্ছে বাজাক, বাজিয়ে চলে যাক। বালিশটা উল্টে তার ভেতর মাথা গুঁজে আবার ঢলে পড়তে চাইলো ঘুমের ভেতর। সারা-সপ্তাহ করপোরেট জব সামলে বন্ধের দিনটা একটু রিল্যাক্স করলে তবেই না পরের সপ্তাহের জন্য চার্জ হবে শরীর, মন। গত রাতে উইকএন্ড পার্টিতে পানটা খানিক লাগাম ছাড়াই হয়ে গিয়েছিল। সুন্দরী নারীরা আশেপাশে থাকলে কেই বা নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে?
আজ ছুটি। দিনমান পড়ে পড়ে ঘুমাতে বাধা কোথায়? কাজের ছেলেটা এ সপ্তাহে বাড়ি গেছে, বারবার ডেকে বিরক্ত করবে সে আশঙ্কা নেই। তাই পানে কার্পণ্য ছিল না গতরাতে। কিন্তু এখন এত সকালে ডোর বেল দিচ্ছে কে? উঠতে ইচ্ছে না করলেও লম্বা হাই তুলতে তুলতে উঠে বসলো স্মরণ। ঘুম ঢুলু ঢুলু চোখেই টলোমলো পায়ে বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। অভ্যাসবশত ডোর ভিউয়ারে চোখ রেখে কে এসেছে দেখার চেষ্টা করলো। ঘুম চোখে, ঘোলাটে দৃষ্টিতে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কে আসতে পারে এই সাত সকালে? বন্ধুরা কেউ এত সকালে আসার নয়। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেও তেমন যোগাযোগ নেই স্মরণের, যে সাত সকালে হুট করে চলে আসবে। বরং সবাই রিনকির ব্যাপারটা জানার পর স্মরণকে যেন এড়িয়েই চলে। তাহলে কে আসতে পারে? বাবা-মা মফস্বল শহরে নিজ বাড়িতে থাকেন। দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার সুবাদে এলাকায় সম্মানীয় সুপরিচিত মুখ। সচ্ছল মানুষ। ছেলের কাছে এসে বোঝা হতে চান না। যদি বা দুই চারবার এসেছেন রাতে থাকেননি কখনো। স্মরণ তাই বুঝতে পারে না ভোর সাড়ে পাঁচটায় তার বাসায় কে আসতে পারে?
দরজা খুলেই স্মরণ হতবাক। তার সমস্ত ঘুম মুহুর্তে হাওয়া। গোলাপি রঙের শাড়ি। সাদা ব্লাউজ। ব্রাউন কালারের খোলা চুলের কয়েকগুচ্ছ কপালে আর সামনে বুকের ওপর ঝুলে আছে, রিনকি দাঁড়ানো। রিনকি! কেন?
কয়েক সেকেন্ড। রিনকি বললো, ঢুকতে দিবি না?
তুমি, আমতা আমতা করে স্মরণ।
স্মরণকে ধাক্কা দিয়ে রিনকি ঘরে ঢুকে যায়। গটগট করে হেঁটে যায় স্মরণের বেডরুমের দিকে।
স্মরণ বুঝতে পারে না কী ঘটছে। রিনকিকে পেছন থেকে ডাক দেয়। রিনকি থামে না। দরজা লাগিয়ে স্মরণ রিনকিকে অনুসরণ করে।
বেডরুমে বিছানার ওপর বসে আছে রিনকি।
স্মরণ রিভলভিং চেয়ারটা টেনে রিনকির কাছাকাছি এগিয়ে নিয়ে বসে বলে, এত সকালে এলে, কী ব্যাপার! কোনো সমস্যা?
আমার সমস্ত জীবনটাই তো সমস্যা করে দিয়েছিস তুই। এ জীবন আমি আর বয়ে নিতে পারছি না। আমার হাসবেন্ডকে বলে তোর এখানে চলে এসেছি।
মানে কী?
একটু পরেই বুঝবি। খুব খিদে পেয়েছে। বাসায় বিস্কিট আছে? চা, কফি কিছু বানাতে পারিস? থাক আমিই বানিয়ে আনছি। কথাগুলো একনাগাড়ে বলেই কিচেনের দিকে চলে গেলো রিনকি।
চার বছর আগে রিনকিকে যেমন দেখেছিল সেই একই রকম আছে। আসলেই কি একই রকম আছে? না কি স্মরণের চোখে একই রকম লাগছে?
রিনকি স্মরণের মামাতো বোন। বয়সে বছর তিনের বড়। একই ভার্সিটিতে পড়ার সুবাদে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতো। রিনকিও স্মরণকে দিয়ে নিজের বিভিন্ন কাজ করিয়ে নিতো। বই কেনা, পেপারস ফটোকপি করা, রিনকির ডিপার্পমেন্টের কোনো ফাংশন থাকলে স্মরণও বসে থাকতো রিনকিকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। রিনকির ক্লাসমেটরাও স্মরণকে বেশ পছন্দ করতো রিনকির ভাই হিসাবে তো বটেই তাছাড়া স্মরণের নিজস্ব একটা ব্যক্তিত্বও ছিল।
একসঙ্গে চলাফেরা করতে গিয়ে দুটো তরুণ তরুণী কখন যে ভালোবাসায় জড়িয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারেনি। আসলে একুশ বছরের তরুণ আর তেইশ বছরের তরুণীর প্রেমে পড়ার জন্য জটিল কোনো সমীকরণের দরকার পড়ে না। পাশাপাশি থাকতে থাকতে ভালোলাগা, ভালোবাসা হয়ে যায়। রিনকি আর স্মরণও প্রেমে পড়ে গিয়েছিল।
তিন বোনের মধ্যে রিনকি সবার বড়। দেখতে অপরূপা। এমন মেয়েদেরই লোকে ডানাকাটা পরী বলে। বাবা-মায়ের অত্যন্ত আদরের আর গুণীও বটে। তার রান্নার হাত অসাধারণ। যখন তরুণ-তরুণীরা দোকানের খাবারে আসক্ত তখন রিনকি বাসাতেই তৈরি করে পিজ্জা, পাস্তা, চিজবলের মতো রকমারি খাবার। প্রায়ই স্মরণের বাসায় চলে আসতো। স্মরণ ভার্সিটিতে পড়লেও হলে থাকতো না। অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট নিয়ে থাকতো। আজও সেই ফ্ল্যাটেই থাকে স্মরণ। টাকা-পয়সা সে বাবার কাছ থেকে আনতো না। ফার্স্ট ইয়ার থেকেই ফ্রিল্যান্সিং করে উপার্জন শুরু করেছিল। কারণ অভিজাত জীবনের প্রতি তীব্র আগ্রহ। একা থাকায় দোকানের কেনা খাবারেই ভরসা করতে হতো স্মরণকে। তখনো বাবলার মতো ভালো একটা কাজের লোক সে খুঁজে পায়নি। আজ রিনকিকে দেখে পুরনো স্মৃতিগুলো জেগে উঠছে স্মরণের চোখের সামনে।
ধপ করে মেঝেতে পড়ে যায় রিনকি। ঠোঁটেট কোণ বেয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। রিনকি, রিনকি, ডাকতে ডাকতে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্মরণ।
রিনকি আসতো স্মরণের বাসায়। রান্না করতো। গল্প করতো। দুজনে মিলে খাওয়া-দাওয়া হতো। টিভির বড় স্ক্রিনে ইউটিউব থেকে সার্চ দিয়ে মুভি দেখতো। আর কোনো কোনো দিন জড়িয়ে পড়তো উত্তাল ভালোবাসায়।
নে, কফি। রিনকি কফির মগ স্মরণের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজে আবার বিছানায় গিয়ে বসে। মগে চুমুক দিয়ে বলে, আমি আসাতে রাগ হচ্ছিস, বিরক্ত হচ্ছিস খুব, তাই না?
এতদিন পর, কেন এসেছো সেটা তো বলোনি। তোমাদের বাসার সবাই ভালো আছে? মামা, মামি, মিঙ্কি ঝিঙ্কি? তোমার হাসব্যান্ড?
এতসব খবর দিতে আমি আসিনি। যাদের খবর জানতে চাইছিস তাদের সঙ্গে যোগাযোগ কর। আত্মীয়রা কেউ আমাকে পছন্দ করে না।
আমি করতাম।
এখন করো না?
না। এখন তোকে। আর কিছু না বলে চুপ করে যায় রিনকি।
স্মরণের মনে পড়ে রিনকি তার বাসায় আসে এটা নিয়ে রিনকির পরিবারের কেউ গা করেনি। এমনকি মাঝে মাঝে রিনকি থাকা অবস্থায় স্মরণের বাড়ি থেকে মা ফোন করলে রিনকির সঙ্গে মা কথাও বলেছে অনেকবার। কেউ উল্টোপাল্টা কিছু চিন্তাও করেনি। আফটার অল রিনকি বড় আপু!
কিন্তু দু’আড়াই বছরের বড়-ছোটতে প্রেম আটকায় না এটা ভাবেনি কেউ। হুট করে রিনকি প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়লে সব ফাঁস হয়ে যায়। উপায়ন্তর না দেখে দুজনের পরিবার দুজনকে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে স্মরণের বন্ধুরা স্মরণকে নানাভাবে হাসি মশকরা করে ক্ষ্যাপাতে থাকে। বন্ধুদের লজ্জায় স্মরণ রিনকিকে বিয়ে করতে পারবে না বলে এবং সকল আত্মীয়-স্বজন এমনকী নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গেও যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে একপ্রকার আত্মগোপনে চলে যায় স্মরণ।
সে সময়টা রিনকির জন্য ছিল ভয়াবহ। এ সমাজে বিয়ের আগে প্রেগন্যান্ট হওয়াটা ধর্মীয় ও সামাজিক দিক দিয়ে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তবে রিনকির পরিবার পাশে ছিল সব সময়। স্মরণ অস্বীকার করার পর অ্যাবরশনের উপায় ছিল না। অনেক টাকা যৌতুক দিয়ে এক নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে শায়েককে ঘরজামাই হিসেবে রিনকির সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। বাচ্চাটা অবশ্য বাঁচেনি। তবে রিনকি আর মাও হয়নি এখন অবধি। তার ওপর শায়েক শ্বশুরের টাকায় ব্যবসা বাণিজ্য করে এখন বেশ অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছে। আজকাল সে রিনকিকে কথায় কথায় চরিত্র নিয়ে খোঁটা দেয়।
নোনতা বিস্কিটে কামড় বসাতে বসাতে রিনকি তার কথাগুলো বলে চলে। বলে নির্লিপ্তভাবে। গলার স্বর কাঁপে না। চোখে জল পড়ে না। কেবল একটা বিষণ্ন ছায়া ঘনীভূত হয়ে থাকে চোখের পাপড়িতে, কোমল কপোলের ভাঁজে।
জানিস স্মরণ, ভুলটা আমারই ছিল। তুই আমার ছোট, তবু তোর সাথে এত বন্ধুর মতো মেশাটা উচিত হয়নি।
স্মরণ চুপ করে থাকে। ভাবে, আসলে কি, রিনকির একারই দোষ? একারই ভুল? স্মরণের কি কোনো দায় নেই? সে কি রিনকিকে পরোক্ষভাবে হলেও ভালোবাসার মায়াজালে আটকায়নি? রিনকি যতটা প্রশ্রয় দিয়েছিল, সে কি আরও বেশি হাত বাড়ায়নি?
ভাবতে ভাবতে স্মরণ আবার নিজেকে কঠিন করতে থাকে ভেতরে ভেতরে। রিনকি বড়, তারই উচিত ছিল নিজেকে সামলে রাখা। এটাই সত্যি, আর এটাই নিয়ম। রিনকির আশকারাতেই তো…
রিনকি বলে চলে, আমার দোষ। তবু আমি তোকে ক্ষমা করবো না। নিজে নিজে তো প্রেগন্যান্ট হইনি। আর তুই সাথে সাথে অস্বীকার করে পালিয়ে গেলি? কত চোখের ঘৃণা তখন আমি দেখেছি, জানিস? বাঁচতে ভালোবাসি বলে বেঁচে ছিলাম সবকিছু ইগনোর করে। কিন্তু আর পারছি না। আর আমার বাঁচা হবে না।
মানে কী?
আমার হাসবেন্ড আমাকে ভীষণ মানসিক অত্যাচার করে। বাবা-মাকে আর আমার জীবনে টানি না। ভাবলাম তোকে জড়িয়েই যখন আমার এ অবস্থা তখন তোকে জড়িয়েই শেষটা হোক।
কীসব বলছো? কফি শেষ? চলো, বাসায় দিয়ে আসি।
কোন বাসায়? বললাম না শায়েককে বলে এসেছি। কফি শেয। কফিতে বিষ মিশিয়ে…
মগটা ছুড়ে ফেলে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় স্মরণ, এটা তুমি কী করলে রিনকি? তুমি আমাকে মেরে ফেলতে।
হেসে ফেললো রিনকি। তোর কফিতে নয়। আমারটাতে। এই যে আমার বুক পেট জ্বলতে শুরু করেছে। কেমন বমি পাচ্ছে। তুই অ্যাম্বুলেন্স ডাকার আগেই আমি মরে যাবো। তোকে ভালোবেসে আমি নিঃশেষ হয়েছি। তুইও তো আমাকে ভালোবেসেছিলি, তাহলে তুই কেন কিছুই হারাবি না? তবে আমি তোর মৃত্যু চাই না, একটু তো অনলে পোড়, সব কিছু প্রমাণ হওয়া পর্যন্ত।
এমন কেন করলে? সামনে আমার প্রমোশন। সিঙ্গাপুর নয়তো জাপানে আমার পোস্টিং হবে। আমার কত স্বপ্ন। চোখের সামনে হসপিটাল, থানা, পুলিশের ছবি ভেসে আসতে থাকে।
আমি তোর থেকে কম মেধাবী ছিলাম না। স্বপ্ন কি আমার ছিল না? আমি তো সব হারিয়ে এখন জীবনটাও হারাচ্ছি।
ধপ করে মেঝেতে পড়ে যায় রিনকি। ঠোঁটেট কোণ বেয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। রিনকি, রিনকি, ডাকতে ডাকতে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্মরণ।

