রেলস্টেশনটা নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, সেই আগের মতোই। পুরনো, জীর্ণ, আর জৌলুসহীন। শুধু একা সে-ই বদলে গেছে, ভেবে, বেঞ্চে বসে হলুদ হয়ে যাওয়া খামটার দিকে তাকিয়ে খুব সন্তর্পণে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মেহরাব। খামের কোণায় সেই চেনা হাতের কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা, আমার শেষ চিঠি, খুলবে না।
না, আজ আর কোনো নিষেধ মানবে না, আজ নিয়ম ভাঙবে মেহরাব।
প্ল্যাটফর্মের চায়ের দোকানটার কেটলিতে চা ফুটছে অনবরত। পাশের লোকটা দ্রুতলয়ে পান বানাচ্ছে আর শিস বাজাচ্ছে মুখে। চেনা সুর কিন্তু সুরটা ধরতে পারছে না মেহরাব। মাথার ভেতর এটা নিয়ে ভীষণ ভোঁতা একটা যন্ত্রণা ঘাই মারছে। চায়ের দোকানের ছেলেটা ‘এই চাগ্রম’ বলে হাঁক দিচ্ছে বিকট শব্দে।
মেহরাবের হঠাৎ ইচ্ছে করে ছেলেটাকে ডেকে ঠাটিয়ে একটা চড় কষায়। কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে অন্যদিকে মনোযোগ দেয় সে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, একটু আগেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। অথচ মেহরাবের মনে হয়, তার ভেতরটায় প্রখর চৈত্রের খরা জমে আছে, বহুদিন সেখানে বৃষ্টির দেখা নেই। মনে পড়ে, ঠিক দশ বছর আগে, এই একই স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল তারা দু জন, সে আর রিয়া। সেই বিকেলটা ছিল গোধূলির নরম আলোয় রাঙা, আর তাদের ভবিষ্যৎটা ছিল ভীষণ অস্পষ্ট ও অনিশ্চিত, ঠুনকো কোনো কাঁচের মতোই ভঙ্গুর আর অনির্ণেয়। দীর্ঘদিনের অদর্শনের জড়তা কাটিয়ে রিয়া সেদিন হঠাৎ করেই খামটা তার হাতে দিয়ে বলেছিল, এটা রাখ, যেদিন তোমার মনে হবে সব সম্পর্ক মুছে গেছে, সেদিন খুলবে এটা।
বিস্মিত, হতভম্ব মেহরাব রিয়ার মুখের দিকে বেকুবের মতো তাকিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করেছিল, মানে? কী এটা? কী বলছ?
রিয়া আর দাঁড়ায়নি সেদিন। ঘুরে একটু হেসে শুধু বলেছিল, জীবন তো কবিতা নয় মেহরাব, জীবন কঠিন এক গদ্যের নাম!
তারপরই ফিরতি ট্রেনে উঠে চলে গেছিল সেদিন রিয়া, কোনো আশ্বাস বাক্য বা প্রতিশ্রুতি ছাড়া।
সেদিনের পর থেকে অনেক ভেবেছে মেহরাব , ‘সব সম্পর্ক মুছে যাওয়া’ বলতে ঠিক কী বোঝায় আশলে? ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়া? অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে যাওয়া? নাকি নিজের ভেতরের আলো নিভে যাওয়া? কী বলতে চেয়েছিল সেদিন রিয়া? কেনই-বা এসেছিল সে?
ভেবে কোনো উত্তর মেলেনি যদিও আর। সে চেয়েছিল শহরে ফিরে গিয়ে জীবনটা গুছিয়ে নিতে। এরপর কত চাকরি করেছে, ছেড়েছে, আবার নতুন করে শুরু করেছে, কিন্তু মনের ভেতর দারুণ এক ভাঙচুর টের পেয়েছে অবিরাম। হরদম মানুষের ভিড়ে থেকেও সে ভীষণ একাকীত্বে ডুবে থেকেছে ভেতরে ভেতরে। মাঝে মাঝে অফিসের কাঁচের দেয়ালে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে চমকে উঠেছে, ভেবেছে, এই মানুষটা কে?
মাঝে একবার বিয়ের কথা পাকা হয়ে যায় তার। সব ঠিকঠাক। কিন্তু বিয়ের আগের রাতে হঠাৎই তার মনে হয়, সে তখনও অপেক্ষারত!
কীসের জন্য এই অপেক্ষা, সে প্রশ্নের উত্তর জানে না মেহরাব। কিন্তু সেই বিয়েটাও শেষপর্যন্ত হয়নি আর।
আজ বহুদিন পর, হঠাৎ করেই এই স্টেশনে এসে বসেছে সে। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই। যেন-বা এই স্টেশনই ডেকে এনেছে তাকে।
বেঞ্চের অন্য পাশে বসে থাকা লোকটা হুট করে বলেন,
খামটা এতদিনেও খোলা হয়নি?
মানে? আপনি আমাকে চেনেন?
লোকটা হো হো হেসে সরল গলায় বলেন, না না, দেখে বোঝা যাচ্ছে অনেক পুরনো খাম, কিন্তু মুখটা এখনো আটকানো, তাই বলছি।
বলেই দার্শনিকের মতো করে আবার বলেন, আমার যার জন্য অপেক্ষা, সে কখনো আসে না আমার কাছে, আমার জন্য যার অপেক্ষা, আমিও কখনো যাই না তার কাছে, এটাই জীবন।
কথাগুলো বলে আচমকাই উঠে দ্রুতপদে হেঁটে চলে যান লোকটা। কিন্তু তার বলা কথাগুলো
মেহরাবের বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধে যায়, আটকে থাকে পিনের মতো। সে জানে না, রিয়া কোথায়, কেমন আছে, আদৌ আছে কি না। তবু একটা অদৃশ্য সুতো তাকে এতদিন ধরে বেঁধে রেখেছে রিয়ার সঙ্গে। সম্পর্ক মুছে যাক, রিয়া কি তাই চেয়েছিল শেষমেশ? কীভাবে আদতে মুছে দেওয়া যায় কোনো সম্পর্ক? জানে না মেহরাব।
কোত্থেকে একটা ছোট্ট মেয়ে দৌড়ে এসে মেহরাবের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তার হাতে একটা কাগজের নৌকা, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে অনেকটা, প্রায় ছিঁড়ে যাওয়ার দশা। মেয়েটার কান্নার শব্দে সচকিত মেহরাব অদ্ভুতভাবে নড়ে ওঠে। মেয়েটার কাছে গিয়ে নৌকাটা তুলে নিয়ে নিজের পকেট থেকে একটা পুরোনো টিকিট বের করে সেটাকে ভাঁজ করে বলে, এই যে তোমার নতুন নৌকা।
কান্না থামিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে মেয়েটা বলে,
এইডা কি পানিত ভাসবো?
মেহরাব একটু হেসে বলে, নিশ্চয়ই ভাসবে! নাও!
নৌকাটা হাতে নিয়ে ছোট্ট মেয়েটা খুশিতে ডগমগ হয়ে হাসতে হাসতে চলে যায় নিজের পথে। হাসিটা করে মেহরাবের ভেতরে অদ্ভুত এক আলো জ্বেলে দেয়।
হঠাৎ তার মনে হয়, কোনো সম্পর্ক মুছে যাওয়া মানেই সবকিছু থেমে যাওয়া নয়, কখনো তা হতে পারে নতুন করে শুরুর ইঙ্গিতও…
অবশেষে, বহু বহুকাল পরে ধীরে ধীরে খামটা খোলে মেহরাব ।
ভেতরে একটা চিঠি, খুব ছোট, মাত্র কয়েকটা লাইন।
মেহরাব,
তুমি যখন এই চিঠিটা খুলেছ, তার মানে তুমি অনেকদিন অপেক্ষা করেছ। হয়তো আমি ফিরিনি। কিন্তু একটা কথা মনে রেখ, আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি, আমি শুধু নিজের পথে ফিরে গেছি।
তুমি যদি আমার জন্য থেমে থাক, তাহলে আমি হেরে যাব।
তুমি বাঁচো, নতুন করে।
আর যদি কোনোদিন আবার দেখা হয়, তাহলে যেন আমরা দুজনই নতুন মানুষ হয়ে দেখা করি।
—রিয়া
চিঠিটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকে মেহরাব। ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে তার শরীর-মনে।
এতদিন মিথ্যে একটা স্মৃতির সঙ্গে লড়াই করছিল সে, একজন মানুষের সঙ্গে নয়। মূলত রিয়া তাকে বেঁধে রাখেনি এতদিন, সে নিজেই আটকে ছিল নিজের ভেতরকার মোহজালে।
মেহরাব উঠে দাঁড়ায়, দূরে ট্রেনের আলো দেখা যায়। লাউডস্পিকারে ভাঙা গলায় ঘোষণা বাজে। ক্রমশ মানুষের ভিড় বাড়ে।
তখন হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া লোকটা হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হন আবার। মেহরাবের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলেন, চললেন?
হুম। এবার যাই।
কোথায়?
মেহরাব থমকায়। ক্ষণকাল ভাবে, বলে, দেখি গন্তব্য মেলে কি না!
লোকটা রহস্যময় হাসেন। মাথা নেড়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যান মুহূর্তেই। তাকে আর কোথাও দেখা যায় না সহসা।
মেহরাব ট্রেনে উঠে জানালার পাশে বসে। পকেট থেকে খামটা বের করে ভাঁজ করে আবার। কী ভেবে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে খামটা ছেড়ে দেয় হাওয়ায়। হাওয়া লুফে নেয় খামের পলকা শরীর। ভাসিয়ে দেয় শূন্যে।
ট্রেন ছেড়েছে বেশ আগেই। স্টেশনটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। সেই বেঞ্চ, সেই প্ল্যাটফর্ম, সেই অপেক্ষা, সবকিছু ছোট হয়ে আসে ক্রমশ।
হঠাৎ চোখে পড়ে প্ল্যাটফর্মের এক কোণে সেই ছোট মেয়েটাকে। কাগজের নৌকাটা পানিতে ভাসিয়েছে সে, এতদূর থেকেও ভাসমান নৌকাটার মৃদু দুলুনি স্পষ্ট বোঝা যায়, না, এখনো ডোবেনি নৌকাটা।
মেহরাবের মনে হয়, জীবনও হয়তো এমনই। ডুবে যাওয়ার ভয় নিয়েই শেষপর্যন্ত ভেসে থাকা।
একটা প্রশ্ন হুট করেই উঁকি দেয় মনে। যদি কোনোদিন সত্যিই আবার দেখা হয়?
প্রশ্নটাকে তখনই সে সরিয়ে দেয় মন থেকে, অকারণে উত্তর খুঁজে মরে না আর।
এখন সে জানে, উত্তরটা সামনে অপেক্ষারত, পেছনে নয়।
বাতাসে হালকা শীতলতা ছড়িয়ে দিয়েছে অকালের বৃষ্টি। দূরের আকাশে মেঘ জমছে আবার।
হয়তো বৃষ্টি হবে। হোক, আজ ভিজবে সে।

