অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে অপরিসীম সৃজনীদক্ষতা ও সূক্ষ্ম চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি সমাজের নিদারুণ সত্যকে অতীব গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাঁর গল্পে সমাজ একটি কেন্দ্রীয় ও শক্তিশালী উপাদান। তৎকালীন বাঙালি সমাজের বাস্তব চিত্র—দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, কুসংস্কার, নারী-নির্যাতন, শ্রেণিবৈষম্য ও প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম—গভীর সহানুভূতি ও মানবিক দৃষ্টিতে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি কোনো কৃত্রিমতা বা অলঙ্কারের আশ্রয় না নিয়ে সহজ-সরল, প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক ভাষায় সমাজের অন্তর্লীন সত্য তুলে ধরেছেন, যা তাঁর গল্পগুলোকে করে তুলেছে জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য।
শরৎচন্দ্রের গল্পে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায় নারীর অবস্থান ও তাদের প্রতি সমাজের অবিচার। বিধবা নারী, বাল্যবিবাহের শিকার কিশোরী কিংবা সামাজিকভাবে অবহেলিত নারীদের দুঃখ-দুর্দশা তিনি এমনভাবে চিত্রিত করেছেন, যা পাঠকের মনে গভীর সহমর্মিতা জাগায়। একইসঙ্গে নিম্নবিত্ত ও গ্রামীণ জীবনের দুঃখ-কষ্ট, বঞ্চনা ও মানবিক সম্পর্কের টানাপড়েনও তাঁর গল্পে বাস্তবতার নিরিখে ফুটে উঠেছে।
তাঁর ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে সমাজের কদর্য সত্য বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মৃত্যু পরবর্তী ক্রিয়া সম্পন্ন করতে কখনো কখনো অর্থ-জাত-পাত যে গভীর প্রভাব ফেলে তা শরতের এই গল্পটি প্রমাণ করে। অভাগী কাঙালীর মা। রসিক বাঘের প্রথম স্ত্রী। ছোট জাত দুলের ঘরের মেয়ে অভাগী। স্বামীর ভালোবাসা তার কপালে কখনো জোটেনি, তবু মৃত্যু পরবর্তী স্বামীর পায়ের ধুলো আর চৌদ্দ-পনেরো বছরের ছেলে কাঙালীর হাতের আগুনটুকুই তার শেষ ইচ্ছে। কিন্তু সমাজের কদর্য নিয়ম ও শ্রেণিবৈষম্যের কষাঘাতে শেষমেশ সেটুকুও অভাগীর কপালে জোটে না! তার জীবনের অন্তিম ও একটিমাত্র সাধ ছিল ছেলের হাতের আগুন ও স্বামীর পায়ের ধুলো! ঠাকুরদাস মুখুয্যের বর্ষীয়ান স্ত্রী সাতদিনের জ্বরে মারা গেলে তার ক্রিয়াকর্ম বেশ উৎসবের আমেজেই ঘটে। এই চিত্র দেখেই অভাগীরও শেষ ইচ্ছে জাগে। কিন্তু জমিদার অধর রায়, ঠাকুরদাসের হস্তক্ষেপে কাঙালী নির্মমভাবে বুঝতে পারে তার সামাজিক অবস্থান। গল্পকার শরৎ কথার মালা বুনেছেন এভাবে, ‘কাছারির ব্যাপারটা ইতিমধ্যেই মুখে মুখে প্রচারিত হইয়া পড়িয়াছিল, একজন কহিল, ও বোধ হয় একটা গাছ চায়। এই বলিয়া সে ঘটনাটা প্রকাশ করিয়া কহিল। মুখুয্যে বিস্মিত ও বিরক্ত হইয়া কহিলেন, শোন আবদার। আমারই কত কাঠের দরকার কাল বাদে পরশু কাজ। যা যা, এখানে কিছু হবে না এখানে কিছু হবে না। এই বলিয়া অন্যত্র প্রস্থান করিলেন। ভট্টাচার্য্য মহাশয় অদূরে বসিয়া ফৰ্দ্দ করিতেছিলেন, তিনি বলিলেন, তোদের জেতে কে কবে আবার পোড়ায় রে-যা, মুখে একটু নুড়ো জ্বেলে দিয়ে নদীর চড়ায় মাটি দিগে।’
শরৎচন্দ্রের এই গল্পে সমাজে বিদ্যমান জাত-পাতের দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, মানুষ কত তুচ্ছ! সমাজ মানুষকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে। অর্থ-জাতপাতই মানুষের মাঝে দেওয়াল তুলে দিয়েছে। যা আজও এ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিরাজমান।
সমাজকে আরও সুতীক্ষ্মভাবে তুলে ধরতে শরৎচন্দ্র লিখেছেন ‘মহেশ’ গল্পটি। যে গল্পের পরতে পরতে জমিদারি শোষণ, নিম্নবর্গের মানুষের অসহায়ত্ব, অবলা প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ও ক্ষুধার যন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে। এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি অবলা পশু মহেশ। একজন হতদরিদ্র মুসলমান কৃষক গফুর। তার জীবনের অন্যতম সঙ্গী পোষা গরু মহেশ ও একমাত্র মেয়ে আমিনা। সন্তান আমিনার মতোই মহেশকেও ভালোবেসে আগলে রাখতে চায় গফুর। কিন্তু শেষপর্যন্ত অভাবের চূড়ান্ত পর্যায়ে খাবার না পেয়ে মহেশ জমিদারের বাগানে ঢুকে পড়ে। তখন কাশীপুর গ্রামের জমিদার ও সমাজপতি তর্করত্নের লোকেরা গফুরকে নির্মমভাবে অপমান-অপদস্ত করে। গফুরও অভাবের তাড়না, রাগ-ক্ষোভে ও হতাশায় লাঙলের ফলা দিয়ে মহেশকে আঘাত করে। মহেশের মৃত্যুর পর গফুর তার মেয়ে আমিনাকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চটকলের কাজে চলে যায়। ‘মহেশ’ গল্পে শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন, জমিদারি শোষণের তীব্রতা। মহেশের ওপর গফুর লাঙলের ফলার যে আঘাত করে তা প্রকৃতপক্ষে সমাজের নির্মমতার প্রতি তার প্রতিবাদ। কিন্তু গফুর নিম্নশ্রেণীর মানুষ, নুন আনতে তার পান্তা ফুরোয়। তাই চাইলেই সে তর্করত্নকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেননি। সেই ক্ষোভটা প্রকাশ পেয়েছে অবলা পশুর প্রতি আঘাতের মধ্যে দিয়ে! উচ্চবিত্তের কদর্য শোষণ গফুরকে ঘরছাড়া করেছে শেষপর্যন্ত।
‘বিলাসী’ গল্পেও সমাজবাস্তবতার নিদারুণ সত্য প্রকাশ পেয়েছে। একদিকে জাত-পাত বড়াই অন্যদিকে ভালোবাসার বলিদান। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিলাসী, মৃত্যুঞ্জয়। নাম মৃতুঞ্জয় হলেও সে মৃত্যুকে জয় করতে পারেনি! বিলাসী নিচু জাতের মেয়ে। অন্যদিকে মৃত্যুঞ্জয় কায়স্থের সন্তান। কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় অসুস্থ হলে তাকে সেবা-শুশ্রূষা দিয়ে সারিয়ে তোলে বিলাসী। বিলাসীর হাতে ভাত খাওয়াতে মৃত্যুঞ্জয়ের খুড়ো ন্যাড়া ও গ্রামবাসী তাকে ‘অন্নপাপী’ বলে সাবস্ত করে। সাত পুরুষের জাত খোয়ানোর জন্য তাকে সমাজ বিচ্যুত করা হয়। বিলাসীর সঙ্গে ঘরে বেঁধে মৃত্যুঞ্জয় সাপুড়ে পেশা বেছে নেয়। সাপের বিষেই তার প্রাণ যায় অন্যদিকে ভালোবাসার হার বিলাসী সহ্য করতে না পেরে বিষ পানে আত্মাহুতি দেয়। গল্পে বিলাসী ও মৃত্যুঞ্জয়ের ভালোবাসার পরীক্ষা যতটা না পাঠককে নাড়া দেয় তারচেয়ে বেশি গভীর হয়ে ওঠে অন্নপাপ! সমাজনিবদ্ধ জাত-পাতের খেলায় মেতে অনেককেই বিলাসী, অভাগীর মতো জীবন বরণ করে নিতে হয়েছে।
সমাজের আরেক সত্য প্রকাশ পেয়েছে ‘মামলার ফল’ গল্পে। লোভ-লালসা, সামাজিক কুসংস্কার ও আইনী জটিলতা একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দিতে পারে। শরৎচন্দ্রের ‘মামলার ফল’ গল্পে দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্ব ও কলহ শেষপর্যন্ত গড়ায় আদালত পর্যন্ত। বৃন্দাবন সামন্তের রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব বাধে শিবু ও শম্ভু সামন্তের মধ্যে। জমিদার চৌধুরী মহাশয়ের হস্তক্ষেপে সবটা দু’ভাগ করা গেলেও বাঁশ বাগান দুজনেরই থাকে। কোনো এক-ভাই বাঁশঝাড়ের কাছে গেলেই অন্যপক্ষ রে-রে করে ওঠে! শম্ভুর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার ছেলে গয়ারাম জ্যাঠাইমা গঙ্গামণির কাছেই খেয়ে-পরে মানুষ। কিন্তু ষোল-সতের বছরের গয়ারামের গোয়ার্তমিকে কেন্দ্র করে শিবু; শম্ভু ও গয়ারামের বিরুদ্ধে মামলা করে! আইনি জটিলতায় অর্থ ও সমাজিক জটিলতা বাড়ে। শরৎচন্দ্র ‘মামলার ফল’ গল্পে গ্রামীণ সমাজচিত্র ও লোভ-লালসার দিকটি স্পষ্ট করেছেন। আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে যাদের পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহ শেষপর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে আদালতে! যার ফল দু’পক্ষকেই অশান্তিতে ফেলে দেয়। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীর পরামর্শে ভাইয়ে ভাইয়ে শত্রুতা আমাদের সমাজের একটা অতি পরিচিত ঘটনা। গল্পকার সামাজিক কুসংস্কার, লোভ-লালসা, আইনি জটিলতার ব্যঙ্গাত্মক রূপ দিতেই গল্পটি নির্মাণ করেছেন।
‘রামের সুমতি’ গল্পে একটি দুষ্টু ছেলের ভালো মানুষ হয়ে ওঠার মনস্তাত্ত্বিক দিক প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে শরৎচন্দ্রের ছোটগল্পগুলোতে গ্রামীণ বাংলার লৌকিক জীবন, কুসংস্কারের বেড়াজাল, শ্রেণিশোষণ, সাধারণ মানুষের আবেগ-দুঃখ-কষ্ট অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর ‘দর্পচূর্ণ’ গল্পে মূলত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপড়েন, নারীর আত্মমর্যাদা ও সাংসারিক দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নরেন্দ্র ও ইন্দুর দাম্পত্য কলহের মধ্যে দিয়ে সমাজের প্রতিচ্ছবি প্রকাশ পেয়েছে।
‘অভাগীর স্বর্গ’, ‘মহেশ’, ‘বিলাসী’, ‘মামলার ফল’, ‘রামের সুমতি’ বা ‘দর্পচূর্ণ’ প্রতিটি গল্পেই সমাজের চিত্র বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃত অর্থেই শরৎচন্দ্রের সমাজবাস্তবতা কেবল সমস্যার চিত্রায়ণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, প্রতিবাদী চেতনা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ পেয়েছে। ‘অভাগীর স্বর্গ’, ‘বিলাসী’ বা ‘মহেশ’ একদিকে যেমন সমাজের নির্মম বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে, অন্যদিকে তেমনি মানুষের অন্তর্নিহিত মানবিক শক্তির দিকটিও আলোকিত করতে সহায্য করে।

