সূর্যনারায়ণ পুরের শ্যামলিমা নিবিড় শালবনে
ফরেস্ট বাংলোর প্রেক্ষাপটে সূর্যনারায়ণ পুরের শ্যামলিমা নিবিড় শালবন
বসেছিলাম কাঠের সিঁড়িতে,
ধুম্রশলাকা ফুঁকে ফুঁকে…স্বাদ পাচ্ছিলাম না তেমন,
ক্যাপস্টেন টোব্যাকোর রোল করা বিড়িতে—
মেঠোপথে…ফোর্টিফোর মডেলের বাসটি
কেমন যেন ধুঁকে ধুঁকে হেঁচকি তুলে উড়োচ্ছে লালচে ধুলো
পেছনে ছুটছে পল্লীগ্রামের উদলাগতর ছেলেপিলে—
কান খাড়া করে চাকার শব্দ শুনছিল পোষা খরগোশগুলো,
চারুচঞ্চলতায় ছলকে ওঠেছিল মেঘ আকাশের সূর্যনীলে
ডিঙ্গিয়ে আদিগন্ত ডাঙ্গা—
মুড়ির টিনটি যাচ্ছে সাত ক্রোশ দূরের বুধবারী হাটে,
চাইলে হাত তুলে থামানো যেতো—
আপার ক্লাসে চড়ে যাওয়া যেত কিন্তু যাইনি
দিগন্ত ভরে ওঠেছিল পরিযায়ী মরালের পাখসাটে;
যেতে পারলে হাটে খুব যে কিছু হতো, তা নয়
কবরেজি দোকান থেকে হয়তো জোটানো যেতো চ্যাবনপ্রাসের বটিকা,
পরিব্রাজক বলাকা কৌমের মৌসুমি প্রণয়ে জমে উঠেছিল শালবন
হয়তো কেনা যেতো তিথিনক্ষত্র নন্দিত লোকনাথ পকেট পঞ্জিকা,
অর্ধ-শতাব্দী পরও অনুভব করি, হাটে না যাওয়ার অনুশোচনায় দগ্ধ দহন
মৃতকীট পুঞ্জিভূত হয়ে অবচেতনের সমুদ্রতুলে গড়ে তুলেছে স্মৃতির প্রবাল,
মাকড়শার লালাসিক্ত কালি খেরোখাতায় কেবলই বুনে চলে বর্ণের ইন্দ্রজাল।
সুরাইয়া নক্ষত্রের উষ্ণীষ
টিপটে লেমন-জিনজারের ফ্লেভারঅলা তপ্ত পানীয় তৈরি করে
ফায়ারপ্লেসের উষ্ণ আঁচে সৌরভে দগ্ধ হতে গিয়ে আজ সন্ধ্যায়,
কেন জানি কাঠের খুঁটিতে ছিদ্র খোঁড়া ঘুনপোকার গুঞ্জনের আখরে
মনে হয়…বিজয়ী হতে পারিনি এ জীবনে কোনো প্রতিযোগিতায়।
এ খেদের দূর্বাঘাস গজায় আমার করোটিতে, যেন জাবর কাটে ছাগল
আঙিনায় বেরিয়ে আসি, নাসারন্দ্রে অপ্রাপ্তির ঝাঁজালো নস্যি গুঁজে,
দ্রাক্ষার লতানো সবুজে রোদের রূপচাঁদা আঁশে শোভিত হয় অবতল
দেখি…বিবরে প্যাঁচা একচোখ ঘুরিয়ে বৃহস্পতির যমজ চাঁদ খুঁজে।
ভেষজের বিশুষ্ক প্রসূন সিরামিকের পাইপে জ্বালিয়ে করি আজ স্মোক
কাশফুল খচিত পাড়ে পদচিহ্ণ ফেলে সাঁতরে অতিক্রম করেছি তিতাস,
স্নায়ু পাথর ছড়ানো বালুকার উদ্যানে ক্যাকটাসের কুঁড়িতে হয় উৎসুক
শুনি…মহাস্থানগড়ের স্তূপে অঙ্কিত শ্রমণের প্রার্থনা-পতাকার প্রশ্বাস।
চন্দ্রকীর্তির বচন বুঝি ক্যারাভানে দুশামবে পাড়ি দিয়ে তাঁবু ফেলে তাসখন্দে
পুরানো শতাব্দী তিমি মাছের দীর্ঘশ্বাসে অগাধ জলধিতে ফোয়ারা হয়ে উতলায়,
ঘর-বৈঠকী আমি, সিল্করুটে শুনি উটের গলায় ঘণ্টাধ্বনি, বিচলিত হই দূরের দ্বন্দ্বে
এ সফর পরিক্রমায় স্রোতস্বিনী অযুত,মশকে জল ভরে পাল তুলে দাঁড় বায়।
পর্যটনের পরিশ্রান্ত হয়ে প্রাগ-তিবলিসি রুটে যাত্রাবিরতীতে থেমেছি বাকুতে
খিবার কেল্লায় জ্বলেছে আকাশ প্রদীপ…খুঁজে পাইনি গন্তব্যের সুনির্দিষ্ট হদিস,
ঝরেছে স্মৃতি ধারাপাতে,ভবিষ্যতের বস্ত্র বোনা হয়েছে বর্তমানের মাকুতে
পেয়েছি আকাশ, মেঘের শুভ্র শেরওয়ানি, শিরপ্যাচে সুরাইয়া নক্ষত্রের উষ্ণীষ।
তাঁবুতে সারাদিনমান
আবছা অন্ধকারে অস্পষ্ট কিছু ঝোপঝাড়
মনে হয় ঝ্যান মার্গের সন্ন্যাসিরা গাঢ় তপস্যায়
. হয়ে আছে বিভোর,
আকাশের অরুণিম আভায় ফুটে ওঠে বনানীর সাবুজিক পাড়,
অতি ধীরে ক্যানভাসে…কুয়াশায় জলরঙে জারিত হয় ভোর।
কৈশরে যে প্রিয়জন হয়েছিল পর, তার নিরাসক্ত অবহেলায়
বহু দূরে রচিত হয় বৃষ্টিবনের জল ভরা উপন্যাস,
প্রান্তরে তাঁবুর আঙিনায় দাঁড়িয়ে একাকী সকাল বেলায়,
শিশিরে বিম্বিত সুরুজের সহজিয়া পলকে উদ্ভাসিত হয় ঘাস।
ছাইরঙের ঘোড়াটি কেশরে রেণুকা মেখে দুলকি চালে খুঁজছে পথ
তার করোটিতে উদ্বেগ ছড়ায় কী পরকাল,
চিরোকী গোত্রের যে আদিবাসীরা প্রান্তরে নিয়েছিল সংরক্ষণের শপথ,
পূরাতাত্ত্বিকরা ফরেনসিক উপাত্তে খুঁজে তাদের কংকাল;
এখানে শ্বেতাঙ্গরা একদিন খনিজ আন্ধারে খুঁড়েছিলো স্বর্ণ
গ্রিলে পোঁড়েছিল শিংগাল হরিণের গোলমরিচ মাখা স্টেক,
আদিবাসীদের উন্মূল বাস্তভিটার প্রচ্ছদপট হয়েছে বিবর্ণ,
তৈরী করে ঈশায়ী জনপদ গির্জার বেদিতে যাজকেরা পরেছিলো ভেক।
চরাচর কেটে যাওয়া মেঠোপথে হাঁটি
প্রান্তর ভরে ওঠে লুপাইন পুষ্পের পার্পোল ফুলদলে,
বৃক্ষে ফুটেছে অভিবাসী অর্কিড…দীপ্র…পরিপাটি,
কেটে যায় সারা দিনমান সংসারে অপ্রাপ্তির ছলে।
গোধূলির গোলাপি আভায় নীলের অঞ্জন ছড়ায় বৃষ্টিবন
মৌমাছিরা উড়ে উড়ে শূন্যতায় রচনা করে সংখ্যার বিচিত্র আঁক,
পিট সিগারের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়,‘হোয়ার হ্যাভ অল দ্যা ফ্লাওয়ার্স গন’,
তাঁবুর ছাদে ধূপছায়ায় রুপোর চামচ মুখে ঝিমোয় দাঁড়কাক।

