অশ্বত্থ ছায়ায়
প্রকৃতি বিপন্ন করে ছুটে আসা হেমন্ত শিশির
তোমাকে মাতাল ভেবে লুট করে বিষয়-আশয়;
অথচ খড়ের ঘরে, একার সন্ন্যাস গুনে গুনে,
রুয়ে গেছো পৃথিবীতে, অভাবিত-ত্রিবিধ বিস্ময়!
একদিন কানামাছি উঁকি দিলে হোগলা পাতায়
জেনে গেছো তুমি, এই সুর তোমারই প্রতিধ্বনি
অশ্বত্থ ছায়ায় তাই, শুনি গান-ওঠে শোরগোল,
অপার বেদনা নিয়ে নেচে যায়-বৃষ্টিস্নিগ্ধদিন!
এখন স্বপ্নের কালে দূর কোনো আমলকী বনে
হয়তোবা বসে আছো তুমি কুয়াশা উড়িয়ে…
নাচ
তিলের পাতায় হুল ফুটানো মাছি-
শীতের রাতেও প্রণয় হাওয়ায় মাতে;
নাচন আমার, কীসের কাছাকাছি?
হতে পারে রাতের দ্বিপ্রহরে-
ঘুমের পাতায় দোলায় এসে বেণী!
ঝলমলে রোদ পড়ছে এসে গাছে
সকাল থেকেই প্রত্যুৎপন্নমতি
প্রেম কী তবে সবাক ফুলেই নাচে?
কোথাও যেতে বলো না
জীবন কোথায়-এই প্রশ্নে বহুবার বেঁকে গেছে পথ;
আকণ্ঠ ডুবেছি ঋতুদৃশ্যে—সরল ধ্বনির ভেতর;
কখনও, প্রচুর প্রেম নিয়ে মহাশূন্যে গেছি ভেসে—
আড়াল করেছি প্রথা ও পুষ্পরীতি, সঞ্চিত সুকৃতি যত;
যন্ত্রণাবিভূতি একপাশে রেখে বিকল্প খুঁজেছি কখনও;
দেখেছি, সন্ত্রস্ত পরিযায়ীর সূক্ষ্ম আর্তনাদ মিশে যাচ্ছে
মিথুন হাওয়ায়—ধ্যান ভাঙা পরিশীলিত দ্বিপ্রহর
বৃত্তের ভেতর কাঁপছে, খসে পড়ছে বিশ্বাসের মিনার;
এমন নির্ণিমেশ সময়, বিন্দু, কোথাও যেতে বলো না!
সততার সফেদ মঞ্জুরি
[অরণ্য ডেকেছে মেঘ—জলবায়ুদিন; বিপুল, বিরহী খরা—বিষণ্ন রঙিন!]
ধরে নাও, অকৃত্রিম এই ডাক ও অপেক্ষার ভেতর আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো টোপা পানা, খরস্রোতা নদীতে ভেসে ভেসে বিস্ময়করভাবে সমুদ্র সন্ধান করছে। আমরা বয়ে চলেছি সমান্তরাল, কিন্তু ধাবমান পথ ঘেঁষে ঠিকঠাক ফুটতে পারছে না—প্রাণের কল্লোল; কোথায় গেঁথেছে তবে চোরকাঁটা? ষষ্ঠইন্দ্রিয় প্রতিস্থাপন করেও খুঁজে পাচ্ছি না তার সূত্রমুখ, হায়! এই বিচ্ছিন্নতা, কিংবা স্বেচ্ছাচারিতা প্রকৃত জীবন হতে পারে না গো!
মনে রেখো, প্রাণের সম্মিলনে পৌরহিত্য করা খুব কঠিন কিছু নয়; আগে পরিশীলিত আচরণ আর প্রজ্ঞায় মনবিশ্বে ফুটিয়ে তোলা দরকার সততার সফেদ মঞ্জুরি…
তোমার মোহন স্বপ্নে
[এখন আমার লব্ধবিকাল, খুব আহ্লাদে টলোমলো; দ্বন্দ্বদ্বিধায় পুড়ছে কেবল সময়পোড়া ‘ভালোবাসা’]
তোমার মোহন স্বপ্নে ঝলকে উঠেছি শাদা ঘাম; একদিন ঝরেও যাবো প্রান্তরের ঘাসে; নোনাগন্ধে আত্মা ভিজিয়ে হয়তো বা, তখন, দূরে কোথাও বৃষ্টির সেতার শুনছো তুমি, ভেজা হাওয়ায় প্রবল ও চিত্তাকর্ষী; আলিঙ্গনেও নতুন ব্যঞ্জনা, আষাঢ়ে প্রথম ফোটা কদমের ঘ্রাণের মতোই উদ্বেল। জীবনের আটপৌরে সান্ত্বনা খুঁজতে গিয়ে, এভাবেই, ঠিক খুঁজে পাবে একদিন, জীবনের প্রকৃত অর্থ; আহা জীবন! সময় উতরে গেলেই ছন্দসমেত ধরা দিতে জানে!
তোমার মোহন স্বপ্নে জেগে আছি ক্রন্দনফুল, অযাচিত!
অন্ধকার ফুঁড়েই আলো আসে
সময়ের খাতা হাতে বেদনায় গাঢ় হয় রাত, জেগে থাকে অরণ্য উঠোন; শেলি-বায়রন ঘুরে, শ্যামল সম্পদে থিতু হতে গিয়ে দেখি, বহুধা বিভক্ত হয়ে সরে যায় পথ; তোমাকে জানার পথে সহস্র কাঁটাতার, রাশি রাশি কালচক্র; আহামরি ধর্মের বিউগলে অভিন্ন বাজে বলেই দ্রুত পৌঁছাতে পারি না জীবনের যুগ্মতায়!
বিন্দু, অন্ধতার কর্দমাক্ত কোনও পথে ত্রিবিধ আলো-গীতি হারাতে দিও না; শ্রাবণ ঢলে ভিজতে ভিজতে কখনও বাস্তচ্যুত ভেবো না নিজেকে; জেনো, মনুষ্যসৃষ্ট সকল ফাঁদ পেরিয়ে যেতে, সম্মতির আলোটুকু যত্ন করে জ্বালিয়ে রাখা চাই; কেননা, অন্ধকার ফুঁড়েই আলো আসে, যার ভেতর সুচিত হয় নতুন প্রত্যুষ।
আপাত মোহের কাছে
এরপরও পৃথিবীর ফর্সা বিকালগুলো আছড়ে পড়বে
সন্ধ্যার তল্লাটে; দুর্বিষহ প্রতীক্ষার পর
উঁকি দেবে এমন আকাঙ্ক্ষা-বৃষ্টি হবে খুব-মনোরম;
এবং চারপাশে ফুটতে থাকবে বহুবর্ণ আলোক,
ভৌগলিক চাঁদ নুয়ে পড়বে রাত্রিশেষের দিকে।
আসবে কী? হয়তো বা দীর্ঘ হবে এমন জিজ্ঞাসা;
গৌরব বাড়তে বাড়তে সারাক্ষণ দৃশ্যমান হবে
শাসনের আস্ফালন, নির্বাপিত হবে শ্রমণের স্বর
এবং কৌতূহলগুলোও ঘুমাবে ছলনারচিত তন্ত্রে!
মৌন হাহাকার, হয়ত বা, সম্প্রসারিত হবে—ধীরে
নিজস্ব রীতিতে মরে যাবে প্রতিভার উজ্জ্বলতা;
তারপর একদিন, হতে পারে-পরিত্যক্ত সত্যগুলো
কবিতা ও গান হয়ে ঘুরে আসবে মননের প্রান্তসীমা
কিংবা, হারিয়েও যেতে পারে প্রগতির কুহেলিকায়..
আপাত মোহের কাছে সব সত্যই যেহেতু মুখভার
সুতরাং পাবে না—ছিলাম না কখনো—যেমন!
অগণন বৃষ্টির ভেতর
অগণন বৃষ্টির ভেতর লুকিয়ে পড়বে অপঠিত গ্রন্থগুলো; পরচর্চা সিকেয় তুলে বহু শতাব্দী ধরে ঝুলতে থাকবে বিচিত্র রঙ; বর্ণ-অন্ধ জিজ্ঞাসার দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে অবসন্ন, ঠোঁটলাল টিয়েগুলোও হারিয়ে ফেলবে আজন্ম কৌতূহল! অথচ, লোভাতুর আঙুলগুলো তখনও ভেসে বেড়াবে না-দেখা আঙুরপাতায়!
এভাবে ভেসে থাকব, বহুকাল—গীত হতে থাকবে প্রকাশ্যে, স্বরের নতুনত্ব; কখনও হাঁটতে হাঁটতে, পথিমধ্যে অনুমোদন পেয়ে যাবে সূর্য ফোটার দিন। আপাতদৃশ্যের ভেতর উড়ে যাবে সাবলীল আড়াল! দেখতে পাবে ঝুলে আছে অস্তিত্ব, অপসৃয়মান দিগন্তরেখায়-
তোমাকে ভাবতে থাকা রাত্রিশেষে যদি না আসে প্রত্যুষ, হিরন্ময় সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তবুও রূপকথার কোনও বাঁকে অপেক্ষা ফুটে থাকবে লাল ও নীল—অগণন;
কথ্যরূপে ঝরো
রঞ্জক রহস্য মেখে ঝুলে আছে—বিনীত বিকাল;
শাওন আসমান, জমকালো দৃশ্য চিরে অকস্মাৎ
চোখে পড়ল—ষড়যন্ত্র থেকে ধীরে নেমে আসছে মর্ম,
মন্দাক্রান্তা ঘোরে কৃতিত্ব বিছিয়ে রাখা—দূরটব;
নিঃসঙ্গ চক্রবূহে তবুও ক্ষরণ ঢালছে কারা?
যদিও মানিয়ে নিয়েছি—পীতচোখ, প্রবল তাচ্ছিল্য
বিপন্ন হতে হতে অনুবাদও করেছি আশ্বাস কিরণ;
কিছু নিচুস্বরের গান, যাকে কেউ সঙ্গীত বলছি না
শুনতে পাও কী—মাত্রাহীন চিৎকারে
ভরে যাচ্ছে উঠোন ও খোলেন!
পুঞ্জিভূত মেঘদল ছেড়ে, এবার কথ্যরূপে ঝরো!
চলে যাওয়া ভালো
সহাস্য মুখে চলে যাওয়া ভালো, অনুতাপহীন—
কিঞ্চিত আলস্য ঢেলে রতিপুলকের স্রোতে
যেমন চলে যায় জুলাইয়ের পলাতক রোদ;
চলে যাওয়াই খাঁটি—নিঃসঙ্গ চক্রান্ত ছেঁটে,
চলে যাওয়াই খাঁটি—আকাঙ্ক্ষা মাড়িয়ে, হেঁটে!
যেমন চলে যাচ্ছে—সুন্দরের মহিমা, সু-বোধ
ক্রমোত্থিত আঁধারের গহ্বরে—অজানায়!
বিশীর্ণ অনুভব আর স্তব্ধতায় অভিমান ঢেলে,
বরং চলে যাওয়াই ভালো—অগ্যস্ত যাত্রায়!
