পর্ব: ছয়
খিক খিক হাসে বনি আমিন। হাতের দা আর ডাব রেখে ছোট্ট লতাপাতার চিলতে গুহার মধ্যে শুয়ে পরে মাথাটা একটু কাত করে ওপরের দিকে তাকায়, আমার কাছে আইয়া শুইয়া পর।
সুলতা আরও বিস্মিত, তোর কাছে আমু ক্যা?
মুই কোথায় নারকেল পাইলাম, তোরে দেহামু, আয় কাছে আয়…
কৌতূহলে সুলতা এগিয়ে যায় বনির দিকে। ইশারায় পাশে ওর মতো করে শুইতে বললে, প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও, কৌতূহলের বশে ওর পাশে মাটিতে শুয়ে পড়ে। তাকায় ওপরের দিকে। সূর্য তখন ঠিক মাথার ওপর, গাছপালার হালকা আভরণের মধ্যে সূর্যের তীব্র আলো পড়ে চোখের পাতায়! আলোর দাপটে প্রথমে দৃষ্টি মেলে তাকাতে পারে না সুলতা। চোখের ওপর ডান হাত উল্টে ছায়া তৈরি করে তাকালে, দেখতে পায় বনি আমিনের তৈরি লতাপাতার গুহার পাশেই একটা লম্বা নারকেল গাছ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রবল বাতাসে হালকা দুলছে। নারকেল গাছটা খুব মোটা নয়, অনেকটা সুপারী গাছের চেয়ে মোটা। গাছের মাথায় কাঁদি ভরা নারকেল ঝুলছে। নারকেলের কাঁদিগুলো নানা ধরনের। দুটি কাঁদি তো ঝুনা। কয়েকটা কাঁদির নারকেল ডাবের চেয়ে একটু শক্ত হয়েছে। একটা কাঁদির নারকেল একেবারেই কচি। গাছ অনুসারে নারকেলের পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে নদীর খোলা বাতাসে নারকেল গাছটা দুলছে—দুলতে দুলতে দক্ষিণ দিকে অনেকটাই নুয়ে পড়ে।
তুই এই নারকেল গাছ দিয়া…
সুলতা শেষ করতে পারে না, বনি খিক খিক হাসে।
তোর অনেক সাহস বনি।
বনি শোয়া থেকে উঠে পড়ে। দা হাতে নিয়ে নারকেল ছিলতে শুরু করে। মিনিট দুয়েকের মধ্যে নারকেল ছিলে ফুটো করে বাড়িয়ে দেয় সুলতার দিকে, নে খা।
সুলতা দেরি করে না। মুখের কাছে নিয়ে ঢক ঢক শব্দে অর্ধেক পানি খাওয়ার পর বনির কাছে ফিরিয়ে দেয়। বনি নারকেল হাতে নেয়। সুলতার মুখে লেগে থাকা পানি পরনের ফ্রক দিয়ে মুছলে ওর তল পেট দেখা যায়। বনি নারকেল মুখে পানি খেতে খেতে আড়চোখে তাকায় সুলতার তলপেটের দিকে। সুলতা মুখ মুছে তাকালে দেখে বনির দৃষ্টি। সঙ্গে সঙ্গে লাথি মারে বনিকে, হারামজাদা!
ডাবের পানিসহ মাটিতে পড়ে যায় বনি। শরীরের জামা প্যান্টে ডাবের পানি পড়ে কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই, খিক খিক হাসে। সুলতার মেজাজ আরও খারাপ হয়, উঠে পা দিয়ে ওর পায়ের ওপর জোরে পা দেয়। কিন্তু বনি হাসতেই থাকে। সুলতা খুব অপমানিত বোধ করে দ্রুত মাটির ওপর পা ফেলে লতাপাতার গুহা থেকে বের হয়ে যায়। পেছনে শুনতে পায় বনির খিক খিক হাসি।
ডাবের পানিতে ভেজা মাটিতে শুয়ে হাসতে হাসতে এক সময়ে হাসি থামায় বনি। উঠে বসে। বের হয়ে আসে গুহার বাইরে। একটু দূরে নদীতে দুই পা নামিয়ে দিয়ে বসে বসে নদী দেখছে। বাতাসে সুলতার চুল উড়ছে। বনি পাশে বসে দুই পা ঝুলিয়ে দিয়ে। কচা নদীতে ভাটা চলছে। ওপর থেকে ছান্দিজাল পাতা বড় বড় নৌকাগুলো নেমে আসছে নিচের দিকে। আর জেলেরা টেনে টেনে কচানদীর পেটে পেলা ছান্দি জাল তুলছে।
সুলতা!
তুই আমার লগে কতা কবি না, অন্যদিকে তাকিয়ে বলে সুলতা। তুই একটা খারাপ ছেলে। তোর লগে আমি আর আসুম না।
আসিস না, তয় তোর খিদা লাগলে এই গুহায় আসবি। সব সময়ে নারকেল থাহে।
কইচি তো, তোর লগে আর কতাই কমু না।
ঠিকাছে, আমার লগে কতা কইস না। আয় গাঙ্গের ঢেউ গুনি।
ঢেউ গোনা যায় নাহি?
আমি গুনতেছি, তুইও গুনতে শুরু কর, এক দুই তিন চার পাচ ছয়…কচানদীর ঢেউ গুনতে গুনতে দুজনে প্রতিযোগিতায় নামে। কিন্তু একটা ঢেউ গুনতে না গুনতেই ঢেউটি হারিয়ে যায় নিমিষে, পাশেই আর একটি ঢেউ জেগে ওঠে। ঢেউ জেগে উঠতে উঠতে বিলীন হয়ে যায়, বিলীন হতে হতে আবার জেগে ওঠে। এভাবে ঢেউ নদীর তীরে শক্ত মাটির ওপর আছড়ে পড়ে হারিয়ে যায়। দুজনে অভিমান ভুলে ঢেউয়ের জগতে ডুবে যায়।
আমি গুনলাম একশোডা—ঘোষণা দেয় সুলতা।
আমি একশো দশডা।
বনির ঘোষণায় ক্ষেপে যায় সুলতা, তুই গোনছোস আমার বালডা। তুই একটা মিথ্যুক।
তুই মিথ্যুক। আয়, আবার গুনি।
গোন…
দুজনে একসঙ্গে গুনতে শুরু করে। ঢেউ গুনতে গুনতে দেখা যায়, দুজনেই একই ঢেউ গুনছে।
তুই আমার ঢেউ গুনছিস ক্যান? প্রতিবাদ করে সুলতা।
কচানদী তোর বাপের? আমি আমার ঢেউ গুনতেছি, তোরডা তুই গোন—ক্ষিপ্ত বনি গুনতে থাকে, এক দুই তিন চার…
কানে ভেসে আসে স্কুল ছুটির ঘণ্টা।
সঙ্গে সঙ্গে দুজনের কচানদীর ঢেউগোনা থেমে যায়। আড়াইটা বাজে। নদীর ঢেউগোনা বন্ধ করে দ্রুত গুহায় ঢোকে। বই হাতে নিয়ে ছুটতে থাকে বাড়ির দিকে।
আব্বায় যদি জিগায়… দুজনে পাশে ছুটতে ছুটতে প্রশ্ন করে সুলতা।
কী জিগাইবো?
স্কুলে গেছিলি, কী কমু?
জীবনে জিগাইচে?
মাথা নাড়ে সুলতা, না।
তাইলে জিগাইবে না। বাড়ি যা, বলতে বলতে বনি আমিন কচানদীর পারের বেড়িবাঁধ পার হয়ে সামনের কোলায় নামে। পেছনে পেছনে নামে সুলতা। চেষ্টা করছে বনির সঙ্গে সঙ্গে থাকবে কিন্তু পারে না। বনি ছুটছে আরও গতিতে। পড়ে যায় মাটিতে সুলতা—ও মা গো!
ফিরে তাকায় বনি। সুলতাকে পড়ে কাৎরাতে দেখে এগিয়ে আসে। হাত বাড়িয়ে দেয়—নে, আমার হাত ধর।
সুলতা হাত ধরে কিন্তু উঠতে পারছে না, উহু, ব্যথা লাগছে হাঁটুতে।
দেখি, হাতের বই মাটিতে রেখে হাত বাড়ায় সুলতার ডান পায়ের হাঁটুতে। হাঁটুর একটু ওপরে একটু কেটে গেছে। পড়ার সময়ে মাটির সঙ্গে লেপ্টে থাকা কোনো কাঁটা বা চাড়ায় লেগে কেটে গেছে। রক্ত পড়ছে।
ইস রক্ত! অস্ফুট ভেজা গলা সুলতার। হাঁটুমুড়ে বসে সুলতার পাশে। মাথার ওপর ঝাঝালো রোদ। দুজনেই একটু একটু ঘামছে। দূরে কয়েকজনতে দেখতে পায়, গরু নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। পাজামা ছিঁড়ে গেছে। ছেঁড়া পাজামা সরিয়ে বনি আমিন দেখে, সুলতার কেটে যাওয়া জায়গা থেকে এখনো হালকা ধারায় রক্ত পড়ছে। ব্যথায় চোখে পানি আসছে সুলতার। বনি আমিন ওর কান্নাকাতর চোখের দিকে তাকিয়ে কী করবে ভেবে পায় না।
কান্দিস না, চোখে দেইখা আটতে পারো না, আবার কান্দে!
ফোস করে ওঠে সুলতা, তোর লাইগা আমার হাঁটু কাটছে।
আমার লাইগা? অবাক বনি আমিন। আমি কী তোরে দাও দিয়া কোপাইচি?
তুই অত জোরে জোরে দৌড় দিছ ক্যা? তোরে ধরার লাইগা আমি জোরে দৌড় দিচি, আর মাটিতে পাও বাইজা পইরা গেছি।
হাসে বনি আমিন।
তুই হাসোস ক্যা? আমার ব্যথা করতেছে তো।
বনি দাঁড়িয়ে আশে পাশে তাকায়। একটু দূরে ছোট একটা ঝোঁপে সবুজ যশোরে পাতা দেখে এগিয়ে যায়। চুইয়ে পরা নিজের শরীরের রক্ত দেখে আর বিমর্ষ চোখে মুখে ফোপায় সুলতা। যশোরে পাতা দুই হাতের মধ্যে পিষে পিষে গলিয়ে ফেললে এক ধরনের সবুজ রস বের হয়। সেই রস হাঁটুমুড়ে বসে সুলতার কাঁটা জায়গায় লাগিয়ে দিয়ে ভর্তা হয়ে যাওয়া পাতাসহ চেপে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যথার জায়গায় জ্বলে ওঠে,সুলতা চিৎকার দিয়ে কান্না করতে যায়। সঙ্গে সঙ্গে বুকের সঙ্গে সুলতার মুখটাকে চেপে ধরে। সুলতা স্থান কাল পাত্র বা পরিস্থিতি ভুলে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বনিকে। বনিও বুকের সঙ্গে আটকে রাখে ওর মুখটাকে, যেন চিৎকার না দিতে পারে।
একটু সহ্য কর সুলতা, খুব নরম আর মায়া মাখানো গলায় বলে আর ওর পিঠে হাত বুলায়। যদিও মাথার ওপর সুর্যের রোদ দুজনকে সেদ্ধ করে দিচ্ছে। যশোরে পাতার রস দিলাম তো,দেহিস ব্যথা থাকবে নানে। পেরথমে একটা কামড় দেয়, একটু সহ্য কর।
সুলতাও জানে, যশোরে পাতার গুণ। মিনিটখানে থাকার পর যশোরে পাতার রসের কামড়ের জ্বালা কমে গেছে। কিন্তু দুপুরের এই দপ্ত রোধের মধ্যেও সুলতার ভীষণ ভালো লাগছে বনি আমিনের বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকাটা। দুজন দুজনকে ছাড়ছে না। বনির মাথা বেয়ে ঘাম নামছে। সুলতাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে থাকতে বনি অপার একটা সুখানুভূতি অনুভব করে, শরীরে, মনে। ইচ্ছে করছে ওকে কেবলই জড়িয়ে রাখতে।
সুলতার মুখের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বনি খুব ধীরে জিজ্ঞেস করে, সুলতা, ব্যথা একটু কমছে?
নিজেকে একটু আলগা করে মাথা নাড়ায় সুলতা, একটু কমছে।
বাড়ি যাইতে পারবি?
আবারও মাথা নাড়ে, পারমু।
হাঁচাই?
ইতোমধ্যে দুজনের জড়িয়ে ধরার বাঁধন আর একটু আলগা হয়েছে। নিজের শরীর ও মুখটা সরিয়ে এনে সুলতা নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।
না পারলে তুই কী আমারে কোলে কইরা বাড়ি নিবি?
তুই চাইলে নিমু তোরে কোলে কইরা।
ইস, ঢং কত!
সত্যি তোরে কোলে কইরা তোর বাড়ি নিমু, বনি আচমকা সুলতার মুখটা তুলে ধরে ঠোটের ওপর পর পর কয়েকটা চুমু খায়। দুই জোড়া ঠোঁটের ঘামে চুমুগুলোর মধ্যে এক ধরনের নোনতা স্বাদ তৈরি করে দেয়। বনি আমিনের দেওয়া চুমু ঠোঁটে নিয়ে সুলতা কী করবে বুঝে উঠতে পারে না, বাড়ির কাছে, কচানদীর বেড়িবাঁধের পাশে দিন দুপরের এই প্রায় বিরান মাঠে। হতবম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। কয়েক মাস আগে বড় বোন আলেয়ার বিয়ে হয়েছে। একদিন বেড়ার ফাঁক দিয়ে সুলতা দেখেছে, বড় বোনের ঠোঁটজোড়া চুষতেছে দুলাভাই। আপাও জড়িয়ে ধরেছে দুলাভাইকে। সরে এসেছে বেড়ার কাছ থেকে। কিন্তু মিনিট খানেক পর এক দুর্মর আকর্ষণে আবার গেছে, বেড়ার কাছে, তখন যা দেখেছে—শরীরের মধ্যে এক ধরনের বীণ বাজতে শুরু করে। আপার বুকের ওপরটা খালি, দুলাভাই মুখ লাগিয়ে…
দুপুরের মাঠে বনি’র চুমু ওর সারাশরীরে এক ধরনের অলিখিত জ্বালা, দুরন্ত সুখ আর অকল্পনীয় লজ্জা এনে দিয়েছে। কী করবে ভেবে পায় না। বনি’র মুখের দিকে তাকাতে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে না। ওকে যে বকা দেবে, গালি দেবে—কিছুই করতে পারছে না।
হাত বাড়ায় বনি, ল বাড়ি যাই।
ল, কোনোভাবে বনি’র হাত ধরে উঠে দাঁড়ায় সুলতা। চেষ্টা করে সামনের দিকে কয়েক পা দিয়ে হাটতে। একটু ব্যথা লাগলেও হাঁটতে পারছে ও। সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে বনি। চুমু দিয়ে বনিও অনেকটা অগোছালো। কেনো দিলো, নিজেই বুঝতে পারে না। সমস্যাটা তৈরি করেছে বাড়ির দোতলায় পাওয়া এক ট্রাঙ্ক বই। বইগুলো গল্প উপন্যাস। একটা উপন্যাসে পড়েছে, নায়ক নায়িকা এভাবে চুমু খায়। বিশেষ করে কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখা মাসুদ রানা সিরিজের কয়েকটা বইয়ে…। আলবার্তো মোরাভিয়া—ইটালির লেখক। তার উপন্যাস—রোমের রূপসীতেও আছে… নায়ক মিথ্যা বলে নায়িকাকে বাড়িতে এনে আদর করে। আদরের ব্যাপারটা বুঝে গেছে বনি। কিন্তু এখন সুলতার কী প্রতিক্রিয়া হবে, বুঝতে পারছে না। বাড়িতে কী ওর বাবা মাকে বলে দেবে?
আমার বই! দুজনে কয়েক কদম হাঁটার পর থমকে দাঁড়ায় সুলতা।
পেছনে এসে মাটির ওপর রেখে দেওয়া সুলতার বইগুলো হাতে নিয়ে ওকে দেয় বনি। বই দিয়ে হাত ধরে সুলতার, হাঁটতে কষ্ট অইতেছে?
ইকটু ইকটু।
বাড়িতে কী কবি তোর মা-বাবারে?
কমু, বনি হারামজাদা আমারে লাডি দিয়া খোঁচা দিছে, সুলতার বলার মধ্যে এক ধরনের প্রশ্রয় ছিল, শুনেই হাসে বনি আমিন।
কইস।
কুমই তো—তুই একটা খাটাশ। তুই ভালো মানুষ না। তুই একটা বনমানুষ,একটা কুত্তা…।
সুলতা যত গালি দেয়, তত ভালো লাগে বনি আমিনের। বুঝতে পারে, দুজনের মধ্যে একটা অবাক পৃথিবী তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু এই অবাক পৃথিবীর কী নাম—জানে না বনি। জানে না সুলতা। দুজনে পাশাপাশি হাঁটছে কোলার মধ্যে দিয়ে নাড়ার শুকনো মুথা এড়িয়ে সমতল জায়গায় পা রাখতে রাখতে। সুলতার হাত ধরে রেখেছে বনি। কয়েকবার ঝারা দিয়ে হাত সরিয়ে নিতে চেয়েছে সুলতা, কিন্তু বনি শক্তভাবে ধরে রেখেছে। বনি’র এই আদর বা আগ্রহটুকুও ভালো লাগছে সুলতার।
দুজনে হাঁটতে হাঁটতে সুলতাদের বাড়ির কিনারে দাঁড়ায়।
বাড়ি যাইতে পারবি?
পারমু। নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে সুলতা বলে, তুই আর আমাগো বাড়ি আবি না। আইলে দাদোরে কইরা তোরে মাইর খাওয়ামু।
মুই আমু, পারলে তুই ফিরাইস—এক ঝটকায় প্রতি উত্তর দিয়ে বনি আমিন বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে। সুলতা আর একটু ভেতরে গিয়ে দাঁড়ায়, ফিরে তাকায়। বনি একটা দুরন্ত ঘোড়ার মতো দ্রুতহেঁটে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। সুলতাও ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিজের ঠোঁট জোড়ায় হাত দেয়। নিজের মনে হেসে ওঠে,দুষ্টু!
বাড়ি এসে বইখাতা রেখে বনি গামছা নিয়ে ছুটলো খালে। বাড়ি থেকে একটু দূরেই বোথলার বড় খাল। কিন্ত দূরে হলেও ডুবিয়ে সাঁতার কেটে গোসল করতে খুব পছন্দ করে বনি। গোসল সেরে বাড়িতে এসে ভাত খেয়েই দোড় মাঠে। দাড়িয়াবান্দা খেলা আছে। সারা বিকেল বাড়ির পশ্চিম পাশের মাঠে দাঁড়িয়াবান্দা খেলে সন্ধ্যার একটু আগে বাড়ি আসে।
বাড়ি আসার পরই মায়ের বকা—হারাদিন রামার গীত গাওয়া ছাড়া কোনো কাম নাই? উঠানে কলাই পিডাইবে কেডা?
উঠোন জুড়ে কলাইয়ে লতা ছড়িয়ে। নারকেলের ডগা দিয়ে কলাই লতা বাড়ি দিলে কলাই বোটা থেকে খসে পরে। উঠোনে বড় মা পাশের বাড়ির কয়েকজনকে নিয়ে কলাই পিঠাচ্ছে। মায়ের হাত থেকে পিঠ বাচানোর জন্য বনিও বসে যায় কলাইয়ের লতা পিঠানোর জন্য। পিটাতে পিটাতে যখন সন্ধ্যা পার হয়ে রাত নেমেছে, খানিকটা ক্লান্তও, মা এসে আবারও বকা শুরু করে, লেহাপড়া নাই? কলাই পিডাইলে অইবে?
ভালো ছেলের মতো উঠোন থেকে ঘরের মধ্যে ঢুকে হেরিকেন নিয়ে পড়তে বসে বনি। ইতিহাসের একটা পৃষ্ঠা মাত্র পড়া শেষ করেছে। চার ঘরের বাড়ির পূবের দিক থেকে হেরিকেন নিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢোকেন আফসার মামা। আফসার মামার বয়স প্রায় সত্তুর বছর। হালকা পাতলা শরীর। মুখে চাপ দাড়ি। আফসার মামা বড় মায়ের ফুফাতো ভাই। কিন্তু বলা নেই, কওয়া নেই—তিনি কেন বাড়িতে এসেছেন? আফসার মামা আসায় বড় মা এগিয়ে আসেন, আপনে এত রাইতে? আপনের তো শরীর খারাপ!
না, আইলাম তোমাগো দেখতে। এক কাম করো, আমারে অজুর পানি দাও।
বনি, বড় মা ডাকে, তোর মামারে এক বদনা পানি আইনা দে।
পড়া রেখে বনি পেছনের পুকুর থেকে এক বদনা পানি এনে দিলে, তিনি উঠোনের পাশে বসে খোদা, ও খোদা…করতে অজু করতে শুরু করেন। আফসার মামা আসার আগে মায়ের কাছে ভাত খেতে চেয়েছে বনি। মা বলেছে,এশার নামাজটা পইরাই দিতাছি।
পেটে খিদে,এখনই খেতে বসবে, অথচ আফসার মামা এসেছে…বিরক্ত খুব বনি। বড় মা বুঝতে পারছে না, হঠাৎ কেন তিনি এসেছেন? কেন গভীর বেদনার সঙ্গে আল্লাহ-খোদা বলছেন আর অনেক সময় নিয়ে অজু করছেন?
চলবে…

