পর্ব- দুই
আ রে চাচা, বাথরুম করতে এসেছি, প্রচণ্ড চাপ, সহ্য করতে পারছি না, দাঁতে দাঁত ঘষে তরুণ। আপনি বাথরুমে গেলে যান, না গেলে হা করে মাইয়া মানুষ দেখেন।
বয়স্ক লোকটার মধ্যে তরুণের প্রকৃতির ডাকের চাপের কোনো তাড়া সৃষ্টি করে না। অবাক ও তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নায়িকা মাত্রা মধুরিমার পেছনে। মাত্রা মধুরিমা শরীরে তুমুল ছন্দের ঢেউ তুলে যাচ্ছে সামনের দিকে। যেতে যেতে হারিয়ে যায় চট্টগ্রাম টু ঢাকাগামী ট্রেনের নির্দিষ্ট রিজার্ভ বাথে। বাথরুমের সামনে অপেক্ষারত বয়স্ক লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বাথরুমের মধ্যে ঢুকে যায় তরুণ। আঁতকে ওঠে বয়স্ক, অ্যাই অ্যাই আমার পেশাব পড়ে যাচ্ছে…
কিন্তু ততক্ষণে বাথরুমে ঢুকে যাওয়া তরুণ দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। বয়স্ক লোকটি কোমরের নিচে দুই হাত জড়ো করে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে, কখন বের হয়ে আসবে তরুণ।
বাথরুম সেরে রুমে এসে আয়েশ করে বসে মাত্রা। উল্টোদিকের সোফায় হেলান দিয়ে বই বের করে পড়ছে অনাবিল আনন্দ। উঁকি দিয়ে বইয়ের নামটা দেখে মাত্রা, অধ্যাপক কেন মানুষ হইতে চায় না! অবাককাণ্ড! বইয়ের এমন নাম হতে পারে? অধ্যাপক তো মানুষই, তার আবার মানুষ হইতে হইবে কেন? উপন্যাস? না কি প্রবন্ধ?
বইয়ের ওপর থেকে তাকায় অনাবিল, চোখে চোখ পড়ে দুজনের।
কী পড়ছেন?
উপন্যাস।
কার লেখা?
আমার এক বন্ধুর।
কিন্তু নামটা অদ্ভুদ। অধ্যাপক কেন মানুষ হইতে চায় না; এটা উপন্যাসের নাম হতে পারে না।
বইটা ভাঁজ করে রাখে সোফার ওপর, কেন হতে পারে না?
নামটা আমার কাছে যেন প্রবন্ধের বই মনে হচ্ছে।
তাই?
হ্যাঁ, আপনাকে একটা বিষয় জিজ্ঞেস করতে চাই?
হাসে আনন্দ, করো, এত দ্বিধা কেন?
বাথরুমে ঢুকতে আমার জন্য এতসব করতে গেলেন কেন?
কয়েক মুহূর্ত সোনার বাংলা ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে আনন্দ। কিন্তু মাত্রা দৃষ্টি ফেরায় না আনন্দের ওপর থেকে, তাকিয়েই থাকে। লোকটার চওড়া কপাল। মাথাভরা আধা সাদা আধা কালো চুল। দুই পাশ থেকে দুই কানের ওপর ঝুলছে, আর থেকে থেকে নড়ছে। চোখে চিকন কালো ফ্রেমের চশমা। নাকটা বেশ লম্বা, আর দৃশ্যসুন্দর। লোকটা, অনাবিল আনন্দ যখন কথা বলে, সুন্দর মেপে মেপে শব্দ চয়ন করে, শুনতে বেশ লাগে। লোকটা কি আবৃত্তি করে?
এমনিই করলাম। তোমার কোনো সমস্যা হয়েছে?
নাহ, আমার সমস্যা হবে কেন? বরং আমি ভীষণ এনজয় করেছি।
আমি ওটাই চেয়েছি।
মানে?
তুমি না বলেছিলে অন্যের ব্যবহার করা বাথরুম ব্যবহার করতে তোমার সমস্যা হয়। তাই…
কিন্ত আমার জন্য এতটা করলেন কেন? আমার ধারণা, কোনো স্বামীও এমন করে না, করবে না স্ত্রীর জন্য। আমি তো স্বামীর সংসারে ছিলাম আট বছর। দেখেছি স্বামীর ব্যবহার, যত্ন।
শোনো মাত্রা, আমিও বিবাহিত পুরুষ। আছে দুটি কন্যা আমার। বড় কন্যা হিমাগ্নি পড়ে নবম শ্রেণীতে, ছোট কন্যা মনশ্রী পড়ে ফোরে মানে চতুর্থ শ্রেণীতে। আমার স্ত্রী তমশ্রী একটা সরকারি চাকরি করে। আমি স্ত্রীর ওপর সংসার ছেড়ে ঘুরে বেড়াই, লিখি। নারীর প্রতি আমার সহজাত একটা সম্মান বা মমতা আছে। আমি নিয়মিত নাটক সিনেমা দেখি। অনেকের অভিনয় আমার ভালো লাগে। সবচেয়ে ভালো লাগে মাত্রা মধুরিমার অভিনয়, হাসে একটু, তুমি নিশ্চয়ই মাত্রাকে চেন। অসম্ভব মুগ্ধ হয়ে আমি মধুরিমার অভিনয় দেখি। মধুরিমার প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ আমার মনের মধ্যে এক ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করে। মাত্রা মধুরিমার সৌন্দর্য্যে আমি অনেক আগে থেকেই মগ্ন। মনে মনে আমি সেই সুন্দরের জন্য সুন্দর প্রার্থনা করি সব সময়ে। আমার সেই প্রিয় অভিনয় শিল্পীর জন্য আমি কী একটুকু দায় পালন করতে পারি না? অন্তত ভালোলাগার আনন্দ থেকে?
মাত্রা মধুরিমা জীবনের সব বিস্ময় দুই চোখে ধারণ করে তাকিয়ে থাকে অনাবিল আনন্দের দিকে। কে এই মানুষ? আমার বিধ্বস্ত বিপন্ন ব্যক্তিগত জীবনে কোন সংকেত হয়ে এলো? লোকটা কী জাদুকর? আমার শরীর মন বোধ থির থির কাঁপছে। শরীরের কোষে কোষে রক্ত প্রবাহ বাড়ছে, আমি উষ্ণ আর কামনাকাতর হয়ে উঠছি। মানুষটাকে আমার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। কী সাংঘাতিক মানুষ! আমার চোখের ওপর চোখ রেখে নিঃসংকোচে এমন করে বললো? বলতে পারলো? এক ফোটা সংকোচ নেই? ভাবতে পারে না, আমি ক্রুদ্ধ হতে পারি। আমি অপমানিত হতে পারি!
অবলীলায় চোখের সামনে বই রেখে সোফার ওপর আধশোয়া হয়ে পড়ছে। কী আছে উপন্যাসটার মধ্যে? এত মগ্ন হয়ে পড়ছে?
নাস্তা খাবেন না? ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে তো। মৃদু কণ্ঠ মাত্রার।
মুখের সামনে থেকে বই সরিয়ে উঠে বসে আনন্দ। এগিয়ে আসে ছোট টেবিলের কাছে। হাতে তুলে নেয় একটা বার্গার, অন্যটা বাড়িয়ে ধরে মাত্রার দিকে, নাও।
মাত্রা বার্গার হাতে নিয়ে ওপরের প্যাকেটটা খুলে মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে তাকায় আনেন্দর দিকে, আনন্দ অনাবিল বার্গার খেতে খেতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে না, এই সোনার বাংলা আন্তঃনগর ট্রেনের এই বাথে দ্বিতীয় কেউ আছে! মাত্রা বার্গার খাচ্ছে, কিন্তু ভালো লাগছে না। কেমন একটা গন্ধ আসছে…হয়তো গতদিনের বানানো। কিন্তু সামনে বসা মানুষটা নির্বিকার খেয়ে যাচ্ছে খুব মজা করে।
আপনি গন্ধ পাচ্ছেন না?
গন্ধ?
হ্যাঁ।
কিসের গন্ধ?
বার্গার থেকে গন্ধ আসছে না?
আসছে, একটু একটু…
রাগে মাথার রগ ছিঁড়ে যাওয়ার যোগাড় মাত্রার। লোকটা, অনাবিল আনন্দ একবারও ফিরে তাকাচ্ছে না জানালা থেকে। মনে হচ্ছে আমি মানুষ না, আমি তুচ্ছ, আমি…
শোনো মাত্রা, ফিরে তাকায় অনাবিল আনন্দ। গন্ধ একটু আসছে বটে কিন্তু খিদেও তো লেগেছে। খিদেটা দূর করার জন্য হাতের কাছে আপতত কিছু নেই। পারি ওই ফেরিঅলাকে খুঁজে বের করে ফিরিয়ে দিতে, পারি দুটো ধমক দিতে। তাতে এই বিশাল মানুষ্য সংসারের কিছু হবে? পরিস্থিতির কাছে অনেক সময়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে সামান্য ঝামেলা মেনে নিলে ল্যাটা চুকে যায়।
কফিটা দাও, বার্গারের ওপরের প্যাকেটটা পাশে রাখা ঝুড়িতে ফেলে হাত বাড়ায় কফির জন্য।
ভেতরে ভেতরে রাগে খইয়ের মতো ফুটতে থাকে মাত্রা, এমনভাবে হাত বাড়িয়ে কফির কাপ চাইছে, আমি যেন হ্যার বিয়ে করা বউ?
কই দাও।
দিচ্ছি, সামনে ঝুঁকে হাতের অর্ধেক খাওয়া বার্গার ঝুড়িতে ফেলতে যায় মাত্রা।
আরে আরে কী করছ? প্রায় আর্তনাদ করে উঠছে আনন্দ।
অবাক মাত্রা আরও অবাক হয়ে তাকায়, এটা ফেলে দিচ্ছি।
কেন?
খেতে ভালো লাগছে না, বললাম না গন্ধ আসছে।
ইসরে, মাইয়া মাইনষের মাথায় খোদা হিসাব নিকাশের অঙ্ক এত কম দিছে…দাও, আমার হাতে দাও।
আপনি কী করবেন?
আগে দাও, পরে দিখে কী করা যায়! দাও…
বার্গারের অর্ধেকের বেশি খেয়েছে মাত্রা । আকারে একটু বড়ই বার্গারটা। খাওয়া বার্গারের অবশিষ্টাংশ তুলে দেয় আনন্দ অনাবিলের হাতে। হাতে নিয়ে বার্গারটা একটু দেখে খেতে শুরু করে আনন্দ।
চিৎকার করে মাত্রা মধুরিমা, কী করছেন আপনি?
নির্বিকার আনন্দ বার্গার চিবুতে চিবুতে তাকায়, শোনো, বাইরে এই বার্গারের দাম ষাট টাকা। সোনার বাংলা আন্তঃনগর ট্রেনে সেই একই বার্গারের দাম একশো টাকা। তুমি অর্ধেক খেয়ে অর্ধেক ফেলে দিলে, নগদ পঞ্চাশ টাকা লস।
তাই বলে আপনি আমার মুখেরটা খাবেন? অবিশ্বাস্য গলায় প্রশ্ন করে মাত্রা।
আরে, খেলাম তো কী হলো? তোমার কোনো সমস্যা?
ঘাড় নাড়ে মাত্রা, না। আমার কোনো সমস্যা নেই।
বার্গার খাওয়া শেষ করে পানির বোতল তুলে নিয়ে কয়েক ঢোক পানি খায় আনন্দ। পানি খেয়ে কফির কাপ হাতে নিয়ে মুখে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে মুখের কফি রেখে দেয় কাপে।
কী হলো? উদ্ভিগ্ন মাত্রা।
আমি ঠাণ্ডা চা কফি খেতে পারি না। বিষাদ লাগে। মনে হচ্ছে বিষ খাচ্ছি। কফির কাপটা ঝুড়িতে রেখে আবার পানি খায় বোতল থেকে। খাওয়ার পর বইটা হাতে নেয়, শোনো মাত্রা ঘোড়াশাল পার হলাম। চট্টগ্রাম পৌঁছুতে পৌঁছুতে দেড়টা থেকে দুটো। এই ফাঁকে একটা ঘুম দাও। শরীর মন চাঙ্গা হয়ে উঠবে। আমি উপন্যাসটা শেষ করি…আবার বইটা হাতে নিয়ে সোফায় আধশোয়া হয়ে যায় আনন্দ।
রুমের মধ্যে একজন জলজ্যান্ত পুরুষ থাকার পরও মাত্রা একা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দ্রুত ধাবমান দৃশ্যবলী দেখতে দেখতে তাকায় অনাবিলের দিকে। লোকটার মুখের ওপর বই। মাত্রা মধুরিমা আটত্রিশ বছরের জীবনে অনেক জটিল পরিস্থিতির সম্মুখিন হয়েছে। রাতের অন্ধকারে সুটিং স্পট থেকে পালিয়েও আসতে হয়েছে, সে এক ভয়াল ঘটনা। মনে পড়লে এখনো শরীর কেঁপে ওঠে মাত্রার। অবশ্য সেই পলায়নে একা ছিল না, সেটের আরও কয়েকজন ছিল। আর প্রেমের প্রস্তাব তো; দিনে পায় আটটা নয়টা দশটা… বিশটা। বিশেষ করে শংকর সাহার সঙ্গে সংসার ভেঙে যাওয়ার পর। কয়েকজন ডিরেক্টরের সঙ্গে কাজ করা ছেড়েই দিয়েছে, ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেমের সংগীত গাওয়ার জন্য। মাত্রা বুঝতে পারে, যতটা না প্রেম তার চেয়ে অনেক বেশি ওরা চায় শরীরটা। একবার বিছনায় নিতে পারলে…
আর প্রযোজকরা তো এক কাঠি সামনে। কোনো প্রেম ট্রেম না; সোজা বিছনায় নিয়ে যেতে চায়। বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাবটা তো ডালভাত। কিন্তু এই মানুষটা কী চায়? মাত্রা দু’আড়াই ঘণ্টায় যা দেখিয়েছে…কল্পনার মধ্যেও ছিল না। ভাবনার মধ্যে ফিরে তাকায় অনাবিলের দিকে, বুকের ওপর বইটা রেখে ঘুমিয়ে রেখে। আর তখনই দেখতে পায়, কালো কভারের উপন্যাস; অধ্যাপক কেন মানুষ হইতে চায় না’র ঔপন্যাসিকের নাম, অনাবিল আনন্দ। হাসি ফোটে মাত্রার, মানুষটা নাটক জানে।
হাই তোলে মাত্রা, সত্যি একটু ক্লান্ত লাগছে। একটু ঘুমুতে পারলে ভালো লাগতো। সোফার ওপর দুই পা তুলে কেবল মাথাটা কুশনে রেখেছে, মোবাইলফোনে বেজে ওঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তুমি ডাক দিয়েছ কোন সকালে। মোবাইলফোন তুলে দেখতে পায় ডিরেক্টর রহমান লুসাইয়ের ফোন।
হ্যালো?
সবকিছু ঠিকঠাক? লুসাইয়ের গলায় জড়তা বা দ্বিধা।
মানে কী?
কোনো সমস্যা নেই তো?
সমস্যা হবে কেন?
না হলেই ভালো। এখন কোথায় এসেছ?
এই তো পনেরো বিশ মিনিট আগে ঘোড়াশাল ছাড়ালাম।
গুড। আনন্দ ভাই কই?
ঘুমুচ্ছে।
শোনো মাত্রা, ট্রেন চট্টগ্রাম পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুটো। তোমাদের জন্য গাড়ি থাকবে, আনন্দ ভাই সুটিং স্পট চেনেন। চট্টগ্রাম রেল স্টেশন থেকে পটিয়া আসতে আধাঘণ্টা লাগবে। এসে খাওয়া দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নেবে। ঠিক সাড়ে চারটায় তোমার শর্ট; ঠিক আছে?
ঠিক আছে।
স্কিপ্ট পড়েছ?
পড়েছি।
গুড। লাইন কেটে দেয় রহমান লুসাই।
মোবাইলফোন রেখে আবার শোয়ার চেষ্টা করে মাত্রা। ট্রেন চলছে দ্রুত গতিতে। হয়তো চোখ দুটো লেগে এসেছিল। কিন্তু দরজায় খট খট শব্দে ঘুমটা ভেঙে যায়। বিরক্তিতে উঠে বসছে মাত্রা। তাকায় ঘুমন্ত মানুষটার দিকে। কী শ্রান্ত ঘুম! ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করলো না ওর। সোফা থেকে নামার জন্য কেবল পাদুটো রেখেছে ট্রেনের মেঝেয়, উঠে বসে আনন্দ।
তুমি বসো। আমি দেখছি; হাই তুলে উঠে চলে যায় দরজার দিকে।
লোকটা কী ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সব দেখে না কি?
দরজা খোলার পর মাথা নুইয়ে দেখে মাত্রা, একটা সাত বছরের মেয়ে, সঙ্গে একজন বয়স্ক মানুষ। আলাপ করছে আনন্দ অনাবিলের সঙ্গে। একটু পরে মেয়েটা ও বয়স্ক লোকটা বাথের ভেতরে ঢোকে। আনন্দ দরজা বন্ধ করে এগিয়ে আসে হাসি মুখে, বুঝলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, এরই নাম খ্যাতি! নাও, পুতুলের মতো ছোট মেয়েটাকে একটা অটোগ্রাফ দাও।
এখানেও?
সোফায় বসতে বসতে হাসে অনাবিল আনন্দ, বললাম না খ্যাতির বিড়ম্বনা!
মেয়েটির বাবা হাত জোড় করে, আপনি কিছু মনে করবেন না। আপনার অভিনয় আমার মেয়েটি খুব পছন্দ করে। বাথরুম থেকে যাওয়ার সময়ে অর্পা আপনাকে দেখেছে। দেখার পর থেকেই…কী করবো, অর্পার বাবা তো, মেয়ের জন্য না এসে পারলাম না।
ঠিক আছে, হাসে মাত্রা, কাছে এসো।
অর্পা এগিয়ে যায় মাত্রার কাছে, হাতে একটা খাতা ও কলম। মাত্রা জড়িয়ে ধরে অর্পাকে। অর্পার বাবা দ্রুত মোবাইলফোন বের করে কয়েকটা ছবি তোলে। নিজের পাশে বসিয়ে মাত্রা জিজ্ঞেস করে, তুমি কোন ক্লাসে পড়ো।
থ্রি তে।
বিড়ি খেয়েছ কখনো?
বিড়ি! অবাক অর্পা।
খাতার সাদা পৃষ্ঠার ওপর মাত্রা খুব যত্ন করে লেখে, অর্পা মামনির জন্য অনেক ভালোবাসা। নিচে খুব সুন্দর করে নিজের নাম, ‘মাত্রা মধুরিমা’। খাতাটা হাতে দিয়ে মাত্রা বলে, একটা পরামর্শ, ঠিকভাবে পড়াশোনা করবে, কেমন?
মাথা নাড়িয়ে বাপের কাছে যায় অর্পা।
যাই, আমি খুব খুশি হয়েছি, আমার মেয়েটার আবদার রাখলেন!
দুজনে দরজার দিকে যায়,যেতে যেতে ফিরে তাকায় ভদ্রলোক, আপনাদের দুজনকে দারুণ মানিয়েছে। আপনি খুব ভাগ্যবান হাসবেন্ড, এমন সুন্দর আর বিখ্যাত একজন নারী আপনার বৌ!
বজ্রাহতের মতো চমকে ওঠে মাত্রা মধুরিমা, আপনি…
দাঁড়ায় আনন্দ, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ চমৎকার মন্তব্য করার জন্য। কিন্ত অনেকে বলে, আমার বয়সটা একটু বেশী ওর চেয়ে!
অর্পার বাবা তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকায় আনন্দ অনাবিলের দিকে, নাহ, বয়স একটু হতে পারে কিন্ত আপনি দারুণ হ্যান্ডস্যাম। বাই দা বাই, আপনিতো অভিনয় করেন না।
না, আমি ওর প্রাইভেট সেক্রেটারী হিসেবে কাজ করি।
অর্পার বাবা মাথা দুলিয়ে বলেন বিজ্ঞের মতো, এটা ভালো। বাইরের কেউ সেক্রেটারী হলে… ঝামেলা। আচ্ছা, যাই। দরজা খুলে দুজনে বের হয়ে গেলে বার্থের দরজা বন্ধ করে আনন্দ। দরজা বন্ধ করে আসতে আসতে তাকায় মাত্রার দিকে। মাত্রা আগুন চোখে তাকিয়ে আছে।
আপনি এমন বললেন কেনো?
হাসতে হাসতে সোফায় বসে আনন্দ, কী বললাম?
কেনো আপনি বললেন না- আমরা স্বামী স্ত্রী।
আরে বললেই হলো নাকি! মানুষটার সঙ্গে একটু মজা করলাম। আমি জীবনের ছোট ছোট মজা খুব আনন্দের সঙ্গে নিতে চাই। আর কিছু না। যদি ভুল করে থাকি… তাহলে আমি দুঃখিত।
আপনি একটা অদ্ভুত চিড়িয়া। বলা যায় গিরিগিটির বংশধরÑ মুহুর্তের মধ্যে রঙ পাল্টে ফেলেন। আপনার সঙ্গে আমার আজকেই দেখা, পরিচয়, তাও মাত্র কয়েক ঘন্টাÑ আপনি আমাকে কতোটুকু চেনেন? অভিনয় দেখে দেখে আপনি বুঝলেন, আমি খুব সহজ, খুব সস্তা? আপনার না স্ত্রী আছে, দুটো কন্যা আছেÑ সেই আপনি কিভাবে স্বীকার করলেন আমরা স্বামী স্ত্রী? আপনি আমার প্রাইভেট সেক্রেটারী? আসলে, পুরুষ মানুষ মানেই মাংশাসী প্রাণী। সরাসরি না পারলেও মনে মনে মেয়েমানুষের শরীরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে সুযোগ পেলে এক মুহুর্তও দেরী করেন না!
আমি তো বললামÑ ব্যাপারটা মজার মাত্র, তুমিও জানো, আমিও জানিÑ তাছাড়া এই ধরনের কতো দৃশ্য অভিনয় করেছোÑ
জীবনটা কেবলই অভিনয়? কেবলই অভিনয়?
মাত্রা মধুরিমার বেদনা, কষ্ট, অপমান আর মায়া মিশ্রিত অনন্য রাগত মুখের দিকে তাকিয়ে অহসায়বোধ করে আনন্দ অনাবিল।
জানেন, এখন আপনার সঙ্গে এক রুমে আমার থাকতে ইচ্ছে করছে না।
হতম্বব আনন্দ অনাবিল, তাই? আমি মাংশাসী?
হ্যাঁ। এতোক্ষণ আপনাকে ভয় লাগেনি কিন্ত এখন লাগছে। মনে হচ্ছে আপনি…
ঠিক আছে, সোফা ছেড়ে দাঁড়ায় আনন্দ। দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলে বের হয়ে যায় নিমিষে। দরজা দিয়ে এসি রুমের ভেতরে হু হু বাতাস ঢুকছে। দ্রুত উঠে দরজার দিকে যায় মাত্রা। মাথা বের করে তাকায় দুই পাশে, আনন্দ নেই কোথাও?
চলবে…

