॥ পর্ব-০৫ ॥
আমি তো সামনে কোনো উপায় দেখছি না। বনি ছোট, পড়ে ক্লাস নাইনে। সহজ সরল, বুদ্ধিশুদ্ধিও কম। আমাদের শত্রুর তো শেষ নেই,ঈমান যদিও বনি’র বড় কিন্তু আমি ওর ওপর ভরসা করতে পারি না। এত কষ্টের জমি, আব্বার ত্যাগ ও অপমানের জমি—হাতে আসার পরও কোনোভাবে হাতছাড়া হোক, আমি চাই না—ছোট মা। এখন আপনি যা বলেন—খুব গভীর আন্তরিকতা ও দরদের মিশেলে বলে থামে মাহবুব হোসেন।
পরিস্থিতি জটিল। গ্রামে সন্ধ্যা নেমেছে একটু আগে। তবিবুর রহমানের বিশাল দোতলা ঘরের নীচতলায় খাটালের ওপর এলি পাতার হোগলার ওপর বসা মাসুদা বেগম। ঘরের মাঝখানে জ্বলছে হ্যারিকেন। চারদিকে মৃদু আলো। মাসুদা বেগমের পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে বনি আমিন, দীপক। বনি আমিন মাসুদা বেগমের প্রথম সন্তান। ছোটটা দীপক। দুই ভাইয়ের পর দুটি মেয়ে—মায়া আর ছায়া। ছায়ার বয়স মাত্র সাড়ে চার বছর। মায়ার দুই বছরের ছোট।
মাহবুবের বাক্য শেষ হলে সবার মধ্যে এক অবাক নীরবতা নেমে আসে। কে কী বলবে, বুঝে উঠতে পারছে না। সংসারে আয় নেই বললেই চলে। আধপেটে খেয়ে দিন গুজরান চলছে। তবিবুর রহমানের হঠাৎ রূপকথার মতো গোটা সংসারে নিয়ে এসেছে অনিশ্চয়তা।
বনি আমিনের স্পষ্ট মনে আছে, আব্বা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছেন। একটু সৌখিন ধরনের মানুষ আব্বা ভদ্রলোক। গায়ের রঙ দুধে আলতা লাল। মাথার চুল কালো। ব্রাক ব্যাশ করে চুল আঁচড়ান। মা মাসুদা বেগম ভাত রান্না করে ডিম ভাজতে গেলেন। চুলোয় তাগাড়ির ওপর ডিম ছাড়ার আগে বাটিতে মালাই করার সময়ে দেখে, ডিমটা নষ্ট। নষ্ট ডিম ফেলে দিয়ে আর একটি ডিম ভেজে দেয়। গোসল করে বারান্দায় বসে রহমান গরম ডিম ভাজা আর গরম ভাত খেয়ে হাতে দুই ব্যাটারির একটা টর্চ লাইট নিয়ে বের হলেন। সকাল সকাল টর্চ লাইন নিয়ে বের হওয়া মানে, বাড়ি ফিরতে রাত হবে।
যাওয়ার সময়ে মাসুদা বেগম জানতে চায়, কই যাচ্ছ?
যাচ্ছি একটু রায়েন্দা। জমি রাখার ব্যপারে কথা বলতে।
রহমান যাচ্ছে, কী এক কৌতূহলে পেছনে পেছনে যায় বনি আমিনও। বাড়ি পার হয়ে হালটে নেমে পুব দিকে হাঁটতে থাকে রহমান। অল্প শীতের সকাল। চারবাড়ির হালট পার হলে সামনেই বিরাট কোলা। কোলাজুড়ে নাড়ার মুথামাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দাঁত কেলিয়ে। মুথার ওপর কুয়াশার হালকা চাদর। হালটের নরম হাটা পথের দুইধারে ছোট ছোট সবুজ শিশিরধোয়া ঘাস পার হয়ে আব্বা কোলায় উঠলেন। পেছনে পেছনে বনি। একটু সামনে যেতেই বনি’র মনে হলো, কখনো তো আব্বাকে, আব্বার মুখটাকে ভালো করে দেখি নাই। আজ দেখি—দ্রুত পা ফেলে হেঁটে সামনে এসে ঘাড় কাৎ করে আব্বার দিকে তাকায়। চিন্তিত আব্বা হঠাৎ ফিরে বনিকে দেখে অবাক, তুই কেন? বাড়ি যা।
বনি থেমে যায়। আব্বা সামনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে হালকা কুয়াশা আর কোলোর ওই পারে হারিয়ে যায়। চঞ্চল বনি আমিন কেমন এক অদৃশ্য সুতোয় স্থির দাঁড়িয়ে আব্বার শেষ চিহ্নটুকু দেখতে থাকে। এক সময়ে আব্বা দূরের পথে বিন্দুর মতো হারিয়ে যায়, বনি বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ি আসার সঙ্গে সঙ্গে মা মাসুদা বেগমের মুখোমুখি। উঠোনে ঝাড়ু দিচ্ছিল। ঝাড়ু বাদ দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, স্কুলে যা।
ঘাড় কাৎ করে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে বনি, আমি স্কুলে যামু না।
ক্যান? গলার স্বরে আগুন মাসুদা বেগমের, যাবি না ক্যান?
ইচ্ছা করে না।
তোর ইচ্ছার খাতাপুড়ি—হাতের ঝাড়ু নিয়ে মাসুদা বেগম এগিয়ে এলে বনি দৌড়ে বাড়ির বাউরে রাস্তার ওপর দাঁড়ায়। তোর কী সমস্যা? তুই ক্যান স্কুলে যাবি না? তোর ডিম দিয়া ভাত দিলাম না? কইলি ভাত খাইয়া স্কুলে যামু। এহন না করো ক্যান?
স্কুল বনি আমিনের ভালোই লাগে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আল আদাবুল জাদিদ—আবরি শিক্ষা। কী সব অদ্ভুত শব্দ, পড়তে হয়, মুখস্ত করতে হয়। না পারলে আরবি হুজুর এনায়েত করিম জোড়াবেত দিয়ে ডান হাতের তালু সোজা করে ধরে পেটায়, একের পর এক। ব্যথায় হাত, হাতের তালু পুড়ে তো যায়ই, কলিজাও পোড়ে। প্রতি মঙ্গল-বুধ আর বৃহস্পতিবার আল আদাবুল জাদিদ পড়ায় ক্লাসে হুজুর এনায়েত করিম। মাকে বললে, উল্টো রিয়্যাকশন শুরু হবে। বলবে, তাইলে হুজুরের কাছে আররিটা শিখে নে।
আরবি শিখতে তো শুরু করেছিল কিন্ত আরবি অক্ষরের প্যাচ, প্যাচের ওপর নোক্তা—সব মিলিয়ে পড়তে গেলেই মাথাটা বিগড়ে যায়। ঠিক একই অবস্থা গণিতের বেলায়ও। স্কুলের বন্ধু নজরুল আর জিয়া কী চটপট করে গণিতের সুদকষা ঐকিক সরল অঙ্ক করে খাতা ভরে রাখে। সবচেয়ে বিস্ময় লাগে—এক লাইনের একটা সরল অঙ্ক করতে করতে পৃষ্ঠার শেষে রেজাল্ট হয়—শূন্য! কোনো মানে আছে? আছে কোনো প্রয়োজন? কিন্তু মাকে বোঝাবে কে? মা তো সহজে ছাড় দেবে না। দুপুরের খাবার বন্ধ করে দেবে। বাধ্য হয়ে বনি আমিন পুকুরে গোসল সেরে জামা পরে হাতে বই নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। মায়ের চোখেমুখে খুশির আভা।
বনি?
জামার বোতাম লাগাতে লাগাতে দাঁড়ায়, কী?
এদিকে আয়।
ধীরে ধীরে মায়ের দিকে এগিয়ে যায়। মায়ের হাতে চিরুনি, চুল না আচড়াইয়া স্কুলে যাও ক্যা? মা নিজের হাতে বনি’র মুখ বাম হাতে ধরে ডান হাতে মাথা আঁচড়াতে থাকে। মিনিট খানেক চুল আঁচড়িয়ে ছেড়ে দেয়, যা।
বনি দৌড়ে বাড়ির বাইরে যায়। নিজেদের বাড়ি পার হয়ে ঢোকে সুলতাদের বাড়ি। সুলতাও পড়ে বনি’র সঙ্গে ক্লাস সেভেনে। বোথলা হাই স্কুল বনি’র বাড়ি থেকে প্রায় এক মাইল দূরে, উত্তর দিকে। সুলতাও রেডি হয়ে বের হয়ে আসে। দুজনে স্কুলের পথে হাঁটতে শুরু করে। স্কুলে যেতে পথে পড়ে একটা ছোট খাল। খালের ওপর কাঠের পুল। সেই পুল পার হওয়ার আগে থমকে দাঁড়ায় বনি। একপা পুলের ওপর দিয়ে ফিরে তাকায় সুলতা, কী অইচে?
স্কুলে যামু না?
চোখ দুটি অবাক করে তাকায় সুলতা, ক্যান যাবি না?
আরবি হুজুর পিডায়।
পুলের ওপর রাখা পা নামিয়ে এনে বনি’র পাশে দাঁড়ায় সুলতা, আমারেও পিডায়। এই দ্যাখ আমার হাত। চোখের সামনে বাড়িয়ে ধরে দুটি হাত। সাদা দুটি হাতের তালুতে কালশিটে দাগ। বনি নিজের হাত দুটো সামনে আনে। ওর হাতে দাগ নেই।
তোর হাতে দাগ নাই ক্যান?
জানি না। ল, কচানদীর পারে যাই।
স্কুলে যাবি না?
না। আরবি হুজুরের বেতের বাড়ি আর খাইতে স্কুলে যামু না। নদীর দিকে হাঁটতে শুরু করে। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে সুলতা হাঁটতে শুরু করে বনি’র পিছু পিছু। একটু দৌড়ে কাছে এসে চোখ বড় বড় করে তাকায় বনি’র দিকে, গাঙ্গের পারে যাইয়া কী করবি?
আগে ল গাঙ্গের পারে, গেলেই দেখবি।
তুই আগেও গেছিলি?
ঘাড় নাড়ে বনি, হ। মুই তো আরবি হুজুরের দিন স্কুলে যাই না। গাঙ্গের পারে বইয়া থাকি। স্কুল ছুটির পর আমি যাই।
অবাক সুলতা, স্কুল ছুটি হয় টের পাও কেমনে?
হাসে বনি, ছুটির ঘণ্টা হোনা যায়।
তুই একটা বজ্জাত পোলা—হাসে সুলতা।
কচানদীর পারের দিকে যেতে যেতে বেড়িবাঁধের কাছে পৌঁছে একটা দৌড় লাগায় বনি। পেছনে পেছনে দৌড়ায় সুলতা। দৌড়াতে দৌড়াতে বেড়িরাস্তার ওপর পৌঁছে যায় দুজনে। পৌঁছেই হাপায় দুজনে। রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে সামনে তাকিয়ে দেখে অবারিত নদী। কচানদী। হালকা বাতাসের সঙ্গে ঢেউ খেলছে নদীর জল। অলাকা হাত ধরে বনি, চল কাছে যাই?
চল।
দুজনে হাত ধরাধরি করে দৌড় শুরু করে কচানদীর দিকে। দৌড়ে একেবারে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। সুলতার মাথা ভরা চুল। হালকা বাতাসে চুল উড়ছে। জোয়ার আসতে শুরু করেছে। সামনেই দুটি বড় বড় ছান্দিজালের নৌকা। জেলেরা নদীতে জাল ফেলে দাঁড় বাইছে। সুন্দরবনের দিক থেকে বড় একটা কার্গো জাহাজ আসছে ভোঁ-ভোঁ শব্দ তুলে।
আয় বসি, বলতে বলতে হাতে বই পেছনে মাটির ওপর রেখে বনি নদীতে দুই পা নামিয়ে দিয়ে বসে পড়ে।
বনি’র দেখাদাখি বসে সুলতাও—আমার খুব ভালো লাগছে রে বনি।
কী ভালো লাগছে তোর? নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রশ্ন করে বনি।
নদী। আমি কিন্তু নদীর এত কাছে আগে আহি নাই আর।
তুই একটা বোদর। মুই তো সমায় পাইলেই নদীর কাছে আহি। তুই কান পাত তো—বনি নিজেই ডান কান নদীর দিকে ঘুরিয়ে দেয়।
সুলতাও নিজের ডান কান বনি’র মতো নদীর দিকে ঘুরিয়ে দেয়, কী শুনতেছো?
কথা, নদীর কথা শুনতেছি।
ফিক করে হাকে সুলতা, তুই একটা পাগল। নদী কথা কয় ক্যামনে?
তুই তো নদীরে ভালোবাসোস না, নদীরে ভালোবাসলেই কচানদী তোর কানে কানে কথা কইবো।
তুই কচানদীরে ভালোবাসো?
ঘাড় কাত করে বনি, খুব ভালোবাসি।
হতবাক সুলতা, মানুষ হয়ে মানুষকে ভালোবাসা যায়। মানুষের মনে মানুষের জন্য মায়া জন্মে। কিন্তু নদী কিভাবে ভালোবাসে মানুষকে? মানুষ কেমনে ভালোবাসে নদীকে?
তুই যে কস না?
শোন, তুই আমার মতো মাঝে মধ্যে কচানদীর পারে আসবি, এইভাবে বসবি। নদীর ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ গুনবি। দেখবি, এক সমায় নদী তোর বন্ধু অইয়া গেছে।
বুঝলাম কচানদী তোর বন্ধু। তো এহন তোরে কী কইলো?
হাসে বনি, হুনবি?
মাথা ঝাঁকায় সুলতা, হুনমু।
কচানদী আমারে কইলো, বন্ধু এইবার তুমি তিন দিন পরে আমার কাছে আইলা। আমি খুব রাগ করছি।
হিহিহি…
স্কুলে ক্লাস শুরুর ঘণ্টা শোনা যায়—এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ।
সুলতা চমকে তাকায় বনি’র দিকে, হাচাই স্কুলে যাবি না?
তুই যাবি? যা। ভারিক্কী গলা বনি’র।
এহন কেমনে যামু? ক্লাস শুরু হইয়া গেছে।
তাইলে চুপ কইরা থাক, কড়া ধমক দেয় বনি। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায় সুলতার। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়েও ভাবেনি এভাবে স্কুল কামাই করা যায়? মা বাবা শুনলে…পিটিয়ে হাড় গুঁড়ো-গুঁড়ো করে দেবে। আবার যা রাগ। আবার বাড়ি গিয়ে বলতে হবে, স্কুলে গিয়েছিলাম। বনি’র সঙ্গে আসাটাই ঠিক হয় নাই। কিন্তু আগে তো দুজনে মিলেই স্কুলে গেছি। বনি এসব করে কবে দেখে? চাচী যে কড়া মানুষ—জানতে পারলে ওরে…আর ভাবতে পারে না সুলতা। ওর মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। কেমন খারাপও লাগে, ইচ্ছে করছে বনিকে মারে। কিন্তু ওর সঙ্গে শক্তিতে পারবে না। আজদাহার মতো শক্তি বনি’র শরীরে। মন খারাপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে সুলতা। তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রশ্ন করে, বনি তুই কতদিন ধরে স্কুল পালাস?
মাস দুই অইচে।
আঁতকে ওঠে সুলতা, তুই দুই মাস ধইরা স্কুলে যাও না?
ধুর ছেমড়ি, তোর মাতায় গোবর। তুই মাস ধইরা স্কুলে যাই না তোরে কইচে? যেদিন যেদিন হুজুরের আরবি পড়া থাহে, হেইদিন হেইদিন যাই না। জোড়াবেতের বাড়ি খাইতে খুব কষ্ট লাগে। মনে লয়, কলিজা ছিঁইড়া যায়।
সমর্থন করে সুলতা, ঠিকই কইচো। আমারও ভালো লাগে না, সব পোলারা চাইয়া থাকে হুজুরে যহন জোড়াবেত দিয়া পিডায়।
গরম লাগতেছে রে, সুলতা ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে রাস্তার ওপর তাকায়, ল তালগাছের নিচের ছাওয়ায় বসি যাইয়া।
পেছনে রাখা বইগুলো হাতে নেয় বনি, আয় আমার লগে।
সুলতাও বই হাতে দাঁড়ায়। হাটতে শুরু করে বনি’র পিছু পিছু। বোথলা খালটা উঠেছে কচানদীর এক চিলতে বুক চিড়ে। খালের দিকে যাচ্ছে বনি। বুঝতে পারে না সুলতা, বনি কোথায় যাচ্ছে। ওর পেছন হাঁটতে হাঁটতে নদী ও খালের মোহনায়, তীরে বড় একটা কেয়ার ঝোপ। ঝোপের মাঝখানে একটা মাজারি আকারের নারকেল গাছ। নারকেল গাছটাকে ঘিরে কয়েকটা সুপারীগাছও দাঁড়িয়ে হালতা বাতাসে দুলছে। কেয়া ঝোপের কাঁটা আছে কিন্তু বনি নির্বিকার গতিতে সেই দিকেই ছুটছে। অবাক সুলতা, কই যাও?
ধমকে দাঁড়িয়ে হাত ইশারায় ডাকে, এদিকে আয়।
সুলতা আটকে পড়েছে বনি’র জালে। কোনো উপায় নাই ওর আদেশ না শুনে। মন খারাপ করে বনি’র পিছু পিছু এসে অবাক, কেয়া ঝোপের মধ্যে ছোট একটা পথ। ওপরে কেয়ার ঝোপ, ঝোপের ওপর সবুহ যশুরে লতা ও পাতার আস্তরণ। সঙ্গে রয়েছে বুনো লতাপাতা। পথের সামনে দাঁড়িয়ে অবাক সুলতার হাত ধরে বনি, আয়।
দুজনে সর্পিল পথে সাবধানে পার হয়ে ভেতরে ঢোকে। কয়েক পা যাওয়ার পর সুলতা দেখতে পায় গোল একটা জায়গা। দুই তিনজন মানুষ অনায়াসে বসে বা শুয়ে থাকতে পারে। ছোট ছোট ঘাস ছড়িয়ে আছে। খুব স্বাচ্ছন্দ্যে সেখানে বসে বনি। তাকায় সুলতার দিকে, কেমন? ভালো না?
ভালো না বলে উপায় নেই সুলতার। সত্যি, জায়গাটা খুব ভালো। বোঝার উপায় নেই কচানদীর পারে, বোথলা খালের ত্রিমুখীতে, কেয়ার কাঁটার ঝোপে এমন একটা সুন্দর জায়গা আছে, যেখানে মানুষ বসবাস করতে পারে।
বস না! অধিকারের গলায় বলে বনি।
বসে সুলতা। চারদিকে তাকায়, জায়গাটা খুব ভালো লাগে সুলতার। উপুড় হয়ে পশ্চিম দিকে তাকিয়েই চক্ষু জুড়িয়ে যায় সুলতার, দূরে কচানদীর স্রোত ঢেউ দেখা যায়। আবার সোজা হয়ে বসে, তাকায় বনি’র দিকে, তুই কিভাবে এই ঘরটা বানাইলি?
ঘর? শুয়ে পড়ে বনি, ভালোই কইচো ঘর। স্কুল পালাইতে পালাইতে এইহানে আইলাম। নদীর পাড়ে পা জুলাইয়া বইতে ব্ইতে একদিন ঝোপের আড়ালে আইলাম। আইয়া দেখি একটা পথের নাহান। পরের দিন বাড়ি দিয়া দা আইনা কাইটা কাইটা পরিষ্কার করলাম।
তুই একটা গাউচ্চা বান্দর বনি। তোর মাতায় কেবল খারাপ বুদ্দি।
হ, আমার মাতায় খারাপ বুদ্দি আর তোর মাতায় সোনায় বান্ধাইন্না বুদ্দি। তোর খিদা লাগছে?
খিদা লাগলে তুই এহানে খাওন পাবি কোথায়?
উঠে বসে বাম দিকে একটা গর্তের মধ্যে হাত দিয়ে একটা ডাব নারকেল তুলে আনে বনি, হতবাক সুলতা। ওর হতবাক দৃষ্টির সামনে তুলে একটা পাতলা দা। সুলতা কেবল তাকিয়ে থাকে বনি’র দিকে, তুই তো ডাকাইত। নারকেল কই পাইলি?
চলবে…
অঙ্গার ॥ পর্ব-০৪ ॥ মনি হায়দার

