॥ পর্ব: চার ॥
প্রধান সড়ক ছেড়ে গাড়ি পটিয়ার দিকে গ্রামীণ পথে ঢুকেছে।
যদিও গ্রামীণ পথ, তবু রাস্তা। সমৃণ। গাড়ি চলছে দ্রুত। কানে ভেসে আসছে পাখপাখালির ডাক। রাস্তার দুই ধারে সবুজ রঙের বিচিত্র গাছপালা। গ্রামীণ বাংলার এই লৌকিক সৌন্দর্য তাকিয়ে দেখতে দেখতে হৃদয়ের মধ্যে গান বাজে অনাবিলের।
আবুল সাহেব।
ড্রাইভার গাড়ি চালাতে চালাতে ফিরে তাকায়, জি স্যার।
আপনার গাড়িতে গান আছে না?
দুদিকে মাথা নাড়ায় আবুল, না স্যার।
ভাইয়া কী গান শুনবেন? ইলিয়াস বাবর মোবাইল বের করে।
রবীন্দ্র সংগীত শুনবো।
কোনটা?
আমার অন্ধ প্রদীপ…শূন্য পানে চেয়ে আছে…
ইলিয়াস ঘুরে ঘাড় বড় করে তাকায়, এটা কী?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটা গানের প্রথম চরণ এটা।
কখনো শুনিনি এই গান। কে শিল্পী?
কিশোর কুমার গেয়েছেন, তুই সার্চ দে, পেয়ে যাবি।
আচ্ছা!
কয়েক মুহূর্ত পরই গাড়িটার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ আছড়ে পরে কিশোর কুমারের ভরাট কণ্ঠে—‘আমার অন্ধ প্রদীপ শূন্য পানে চেয়ে আছে।’
গানটা ছোট, দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। সামনের সিট থেকে শরীর ঘুরিয়ে তাকায় বাবর, ভাইয়া এই গানের সন্ধান আপনি কোথায় পেলেন?
নেটে রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে শুনতে পেয়েছি। দারুণ না? প্রদীপ কিন্তু অন্ধ। আবার চেয়ে থাকে শূন্য পানে—এমন গভীর মনবিষাদী গান আমি আর শুনিনি। প্রকৃতপক্ষে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অসীম সমুদ্র—তুই যতই সাঁতার কাটিস রবীন্দ্রসমুদ্রে, কোনোদিন ঠাঁই পাবি না, ডুবে যেতে থাকবি অতলে।
আমিও সময় পেলে রবীন্দ্র সংগীত শুনি, কিন্তু এই গান প্রথম শুনলাম। সত্যি, আমার মনটা কেমন মধুর বেদনায় ভারী হয়ে গেছে—তাকায় মাত্রা গভীর দৃষ্টিতে।
হাসে অনাবিল, আমার খুব প্রিয় গান। আমার মন খারাপ থাকলে বিশেষ করে রাতে, লাইট নিভিয়ে এই গানটা বারবার শুনি।
এখন থেকে আমিও শুনবো—অনাবিলের হাতে চাপ দেয় মাত্রা।
অনাবিল আনন্দ হাসতে হাসতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। খোলা জানালা প্রচুর বাতাস ঢুকছে। অনাবিলের লম্বা চুল বাতাসে উড়ছে দিগ্বিদিক। গানটা আবার বাজে বাবরের মোবাইলে। ড্রাইভার ছাড়া তিন জনই রবীন্দ্রসুরে ও বাণীর ইন্দ্রজালে আটকে যায়।
তিন জনই ডুবে আছে রবীন্দ্রনাথে। গাড়ি চলছে পাকা সড়কে নিঃশব্দে কিন্তু একটা সৃজনের সুর ‘বহিয়া যায়’। গ্রামীণ পথে গাড়িতে এই যাত্রা অনাবিলকে অন্য ধরনের এক বিহারে নিয়ে যায়। মানুষ যদি সুর আবিষ্কার করতে না পারতো, বোধহয় অন্ধ অথবা বধির হয়ে যেতো। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ, হাসন রাজা, লালন সাঁই, শাহ আবদুল করিম— সুরে ও বাণীতে কী এক বিশ্ব রচনা করে গেলেন!
হাতে চাপ পড়ে, কী ভাবছেন?
জানালা থেকে ফিরে তাকায় অনাবিল আনন্দ, ভাবছি দুনিয়ায় যদি সুর না থাকতো!
আমি মরে যেতাম। মাত্রা মধুরিমা হাহাকার করে ওঠে, আমি গত কয়েকটা বছর গানের মধ্যে দিয়ে আমাকে ভুলিয়ে রাখছি। গান, একমাত্র গান। আমি সব ধরনের গানই শুনি কিন্তু সবার আগে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল। পরে অন্যান্য গান শুনি। কিন্তু এই গানটি আমাকে একদম ডুবিয়ে মারলো রবীন্দ্রনাথ—মনে হচ্ছে গানটি আমার জন্যই লিখেছেন।
কিন্তু গানে ভুলিয়ে রাখছেন মানে কী? তীক্ষ্ম স্বরে প্রশ্ন করে অনাবিল।
অনাবিলের দৃষ্টি থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয় মাত্রা। আবেগে গোপন সুড়ঙ্গের দরজা প্রায় খুলে দিচ্ছিল, নিজেকে সামলে নিয়ে বিপরীত দিকে তাকিয়ে বলে, আমি অবসরে গান শুনতে পছন্দ করি, সেটাই বললাম আর কী! যদিও শ্যুটিংয়ে শ্যুটিংয়ে জীবন ওষ্ঠাগত।
কিন্তু বাক্যটা ছিল আপনার নিজেকে ভুলিয়ে রাখছি!
তাই নাকি? হাসার চেষ্টা করে মাত্রা, মোবাইলফোন বাজলে নিজেকে সামলে নেয়, ফোনটা রিসিভ করে কথা বলি?
ঘাড় নাড়ে আনন্দ।
হ্যালো? কে বলছেন? নতুন ডিরেক্টর? কার সঙ্গে কাজ করেছেন বললেন, শান্তনু মামুন? আর ফাহমিদা চৌধুরী? আচ্ছা, নাম কী আপনার? পার্থ পথিক? স্ক্রিপ্ট কার? আপনার নিজেরই—শিডিউল কবে চাইছেন? একটু শুনলো মনোযোগ দিয়ে মাত্রা মধুরিমা, বললো—না, আগামী তিন মাসের মধ্যে আমার কোনো শিডিউল নেই। যদি আমাকে নিয়ে কাজ করতে চান, তিন মাস পরে যদি পারেন, তাহলে ভেবে দেখবো। আর হ্যাঁ স্ক্রিপ্ট পছন্দ না হলে কাজ করবো না কিন্তু!
আরও শুনলো মাত্রা, আমি এখন চট্টগ্রামে। ফিরবো তিন দিন পরে। ঢাকায় আসার পর যোগাযোগ করবেন, কেমন? বাই।
ইলিয়াস বাবর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, ভাই এসে পড়েছি। আর তিন মিনিট।
চোখ রাখে সামনের দিকে, রাস্তার পাশে নতুন একটা পাকা ড্রেন করছে, পাশের কাঁচামাটি রাস্তার ওপরে স্তূপাকৃত। গাড়ির সামনের অংশ উঁচুতে উঠে আবার দ্রুত নিচের দিকে নামতে নামতে থামে শহীদুল আলীমের বাড়ির সামনে। ইলিয়াস ম্যাসেজে জানিয়ে দেওয়ায় সামনে দাঁড়িয়ে আছে শহীদুল। স্বাস্থ্যবান লম্বা একহারা গড়নের শহীদুল আলীমের সঙ্গে একঝাঁক ছেলেমেয়ে। অনাবিল বুঝতে পারছে, ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে নায়িকা মাত্রা মধুরিমার জন্য। গাড়ি থামতেই ওরা চিৎকার করে গাড়ি ঘিরে দাঁড়ায়। ইলিয়াস বাবর জোর করে দরজা খুলে বের হয়ে পেছনে অনাবিলের দরজা খুলে দেয়। দ্রুত বের হয়ে আসে অনাবিল। জড়িয়ে ধরে শহীদুল, কেমন আছেন ভাইয়া?
ভালো, খুব ভালো। চলো আগে বাসার মধ্যে। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে।
আপনি ওপরে যান, সব রেডি আছে—আমি ওনাকে নিয়ে আসছি।
শহীদুলকে ছেড়ে দিয়ে অনাবিল আনন্দ বাসায় ঢুকে যায়। আড়াইতলার বিশাল বাড়ি বানিয়েছে, কাব্যকুঞ্জ। দোতালায় উঠে ডানপাশের বিশাল রুমে ঢুকেই ফ্যানটা ছেড়ে দিয়ে একটু বিশ্রাম নেয়। সিঁড়িতে লোকজনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাথরুমে ঢুকে পরিষ্কার হয়ে বাইরের বড় হলরুমে পাতা ডাইনিং টেবিলে বসে। টেবিলের ওপর বাটিভরা ভাত-মাছ, মাংস-ডাল-ভর্তা-ভাজি…। ইলিয়াস বাবরও বসে প্লেটে ভাত দেয়। অনাবিল নিজেই ভাজি আর বোয়াল মাছ নিয়ে খেতে শুরু করে। খাওয়া শেষে রুমে ঢুকে সোজা বিছনার ওপর শুয়ে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে যায়।
কাছে এগিয়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়ায় মাত্রা, আপনি আমার রাগ সর্ম্পকে জানেন না। পানির বোতলটা হাতে নেয়, আমার এখন কী ইচ্ছে করছে জানেন?
বাথরুমে ঢুকে পরিষ্কার হয়ে খাবার টেবিলে এসে মাত্রা একটু অবাক, অনাবিল খাবার টেবিলে নেই। জিজ্ঞেস করে জেনেছে, খেয়ে চলে গেছে নিজের রুমে। মনে মনে প্রশ্ন করছে, আমার জন্য অপেক্ষা করলো না? রাগ হয় উল্টো, কেন আমার জন্য অপেক্ষা করবে? আমি কী হই? ট্রেনের ব্যবহার তো ভুলে যাওয়ার নয়, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খেতে বসে। খাওয়ার মাঝখানেই ডিরেক্টর রহমান লুইস এসে পাশের চেয়ারে বসে, সব ঠিকঠাক?
খেতে খেতে হাসে মাত্রা, সব ঠিকঠাক।
আসলে এতদূরে কখনো শ্যুটিং করতে আসিনি তো। কোথায় ঢাকা আর কোথায় চট্টগ্রাম—দেশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত। যদিও শহীদুল ভাই দারুণ হেল্প করছেন।
শহীদুল ভাই কে?
এই বাড়ি যার, আর ‘চিন্ময়ের শাইর’ নাটকটা উনিই প্রোডিউস করছেন।
দাড়িঅলা লম্বা লোকটা?
পেছন থেকে সাড়া দেয় শহীদুল, ঠিকই ধরেছেন। আমিই সেই লোক।
তিন জনে হাসে।
মাত্রা, তোমার স্ক্রিপ্ট তো পেয়েছ?
খেতে খেতে ঘাড় নাড়ে, পেয়েছি।
পড়েছ?
পড়েছি তিনবার। অন্যরকম নাটক, মুক্তিযুদ্ধের। ভালো লাগছে আমি দেবী চরিত্রটা করতে পারছি।
এই চরিত্রে তোমাকে নেওয়ার জন্য আমাকে বারবার বলেছে অনাবিল ভাই, প্লেটে ভাত নিতে নিতে বলে লুইস। সত্যি বলি, তোমাকে মাত্রা, আমার কিন্তু অন্য চয়েজ ছিল। কিন্তু অনাবিল ভাই বুঝিয়েছেন, এটা তোমার জন্যই। সঙ্গে সায় দিয়েছে শহীদুল ভাই।
মাত্রা মধুরিমা নাকটের মানুষ। অভিনয়ের বয়স এগারো বছর। মুহূর্তকে কত দ্রুত ট্যাকেল করতে হয়, জানে। খাবার টেবিলে এমনিতে দুঃখ—অপেক্ষা করেনি অনাবিল। উপেক্ষা করে খেয়ে চলে গেছে। আবার জানলো, অসম্ভব চ্যালেঞ্জিং চরিত্রটা রূপায়নের জন্য সুপরাশি করেছে অনাবিল। সেই লোকটাকেই ট্রেনের বাথ ছেড়ে বাইরে যেতে বাধ্য করেছিল কয়েক ঘণ্টা আগে! আবার এসেছে তারই লেখা নাটকে, তারই বিশেষ বিশেষ আগ্রহে অভিনয় করতে! মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠতে উঠতে নিজেকে সামলে নেয় মাত্রা মধুরিমা। মুখের খাওয়া শেষ করে তাকায় শহীদুল আলীমের দিকে,এত সুন্দর একটা ক্যারেকটারে সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।
দাঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে হালকা হাসে শহীদুল, আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে লাভ নাই। সব পাওনা অনাবিল ভাইয়ের। এই লোকটা হলেন চলমান বুদ্ধির জাহাজ। শিল্প-সাহিত্য-ইতিহাস-সংস্কৃতি-গল্প-উপন্যাস-নাটক— এমন কিছু নেই, যা জানেন না। উনিই ছবি হোয়াটসঅ্যাপে আপনার ছবি পাঠিয়েছেন। বলেছেন, এই নায়িকার নাম মাত্রা মধুরিমা। দেবী ক্যারেকটারের সঙ্গে মিলে যায়। ভাইয়ের প্রস্তাবে আমিও রাজি হয়ে লুইস ভাইকে জানাই।
সত্যি আমি কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে—খাওয়া শেষ করে দাঁড়ায় মাত্রা।
মুখের সামনে থেকে পানির গ্লাস নামিয়ে লুইস তাকায় মাত্রার দিকে, তুমি কী এখন রেস্ট নেবে?
না ল্ইুস ভাই, ট্রেনে আমি দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছি। এখন শ্যুটিং হলে আমার কোনো সমস্যা নেই।
গুড, উৎফুল্ল গলা রহমান লুইসের—আমি তোমাকে সরাসরি বলতে পারছিলাম না। নাটকটা জটিল, প্রচুর কাজ। তুমি রেডি হও, আমি খেয়েই তোমাকে নিয়ে বের হয়ে যাবো।
ঠিক আছে, আমি রুম থেকে আসছি। চলে যায় পাশের রুমে। যে রুমটা নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে বিশিষ্ট নায়িকা মাত্রা মধুরিমার জন্য।
রুমে চলে গেলে শহীদুল আলীম তাকায় লুইসের দিকে, অনাবিল ভাই ঠিকই বলেছেন।
মানে? মুখের মধ্যে গরুর মাংসের ওপর কামড় বসাতে বসাতে প্রশ্ন করে রহমান লুইস।
দেবী চরিত্রে এই নায়িকা ঠিকই আছে। আমি ঘটনাটা যেভাবে শুনেছি, দেবী এই রকমই সুন্দরী ছিল। আমি যখন ঘটনাকে গল্পে সাজিয়েছি, তখন মেয়েটার জন্য আমার খুব কষ্ট হয়েছিল।দেবী এসেছিল বাঁচবার জন্য কিন্তু অলক্ষ্যে মৃত্যু দানব ছিল ওর অপেক্ষায়। এত করুণ, এত নৃশংস মৃত্যু…
খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে ধুতে বিষণ্ন গলায় বলে রহমান লুইস, একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে কত কোটি কোটি ঘটনা আর মৃত্যু ঘটেছে, আমরা হিসাবও রাখিনি। জাতির বা সরকারের উচিত—গ্রামে-গ্রামে বা ঘরে-ঘরে মানুষ পাঠিয়ে একাত্তরে পাকিস্তানি হায়েনা সৈন্যবাহিনী আর রাজাকার আলবদররা যত মানুষ হত্যা করেছে, সেইসব হত্যার বিবরণ নেওয়া। টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে আবার শহীদুলের পাশে বসে, কিন্তু কেউ এই কাজটা করবে না। করবে কেবল নিম্নমানের রাজনীতি।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে শহীদুল আলীম, আপনি ঠিকই বলেছেন লুইস। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে যত অপরাজনীতি হচ্ছে, পৃথিবীর কোনো দেশে এমনটি হওয়ার সুযোগ নেই।
আমি রেডি, রুমের দরজা খুলে দাঁড়ায় মাত্রা মধুরিমা। হাতে ব্যাগ।
চলো, দরজার দিকে এগুতে এগুতে তাকায় শহীদুল আলীমের দিকে, আপনি কখন আসবেন?
আপনারা যান, আমি আসছি।
ডিরেক্টর রহমান লুইসের পেছনে পেছনে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায় মাত্রা।
সেটে যাওয়ার পর নায়ক অমি পিয়াল আর বিশিষ্ট অভিনয় শিল্পী দিলারা জামানকে দেখে, শরীরে যেটুকু ক্লান্তি ছিল, মুছে যায়। জড়িয়ে ধরে দিলারা জামানকে, কেমন আছেন দাদি?
তোমার মত সুন্দরী সেটে এলে ভালো থাকা যায়? পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন দিলারা জামান। গলা ছেড়ে দিয়ে আড়চোখে তাকান অমি পিয়ালের দিকে, এতক্ষণ তো নায়ক আমাকে নিয়ে ছিল, এখন আর আমার দিকে তাকাবে?
সেটে ক্যামেরাম্যান, লাইটম্যান, মেকাপম্যান, উপস্থিত পাড়া প্রতিবেশীরা হাসিতে ফেটে পড়ে। সেট একটা পুরোনা বনেদি বাড়ি। চারপাশে প্রচুর গাছপালা, পাশেই বড় কিন্তু মজা একটা পুকুর।
দিলারা জামানের পাশে এসে দাঁড়ায় অমি, দাদি আপনিই আমার সব। এসব আধুনিক মেয়ে আমার একদম পছন্দ না।
তাই না কি!
আবার হাসে সেটে। লুইস সক্রিয় হয়ে ডাক দেয় সহকারী ডিরেক্টর জয়রাজকে, শট রেডি করো।
ক্যামেরাম্যান মুখের সিগারেট ফেলে দাঁড়ায়, কয় নম্বর শট লুইস?
এগারো নম্বর…
সেট চলে আমে ডিরেক্টরের নিয়ন্ত্রণে, জ্বলে ওঠে লাইট, নিজের চেয়ারে বসে রহমান লুইস। শর্টের পর শর্টের মধ্যে ঢুকে যায় মাত্রা মধুরিমা, অমি পিয়াল, দিলারা জামান, রাজাকার আলবদর-মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় এলাকার প্রায় বিশ পঁচিশ জন ছেলে-মেয়ে।
রাত বারোটায় রাতের শ্যুটিং শেষ করে কাব্যকুঞ্জে ফেরে রহমান লুইয়ের নেতৃত্বে গোটা ইউনিট। আগামীকালের শ্যুটিং প্ল্যান করতে করতে শ্যুটিং দলের পিছনে মাত্রা আর লুইস। কাব্যকুঞ্জের সামনের বড় রুমে বিশাল সোফায় রাজার মতো বসে আছে আনন্দ অনাবিল। আনন্দকে ঘিরে সাত-আটজন বসে-বসে গল্প করছে।
লুইস আজকের মতো শেষ শ্যুটিং?
অনাবিল আনন্দের প্রশ্নে সোফায় বসে উত্তর দেয় লুইস, জি ভাই।
দরজায় দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখছে মাত্রা মধুরিমা। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে, এক মুহূর্তের জন্যও ওর দিকে তাকাচ্ছে না অনাবিল। মনে হচ্ছে, মাত্রা মধুরিমা নামে একজন বিখ্যাত নায়িকা এখানে প্রবেশ করেনি।এগিয়ে আসে জয়রাজ, আপা চলুন আপনার রুমে। হাত থেকে নেয় ব্যাগটা।
জয়রাজের পেছনে পেছনে চলে যায় মাত্রা।
আগামীকালের শ্যুটিংয়ে শেষ হবে তোমার?
আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে জবাব দেয় রহমান লুইস, ভাই ঢাকা আর মফস্বলে নাটক শ্যুটিংয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য। আগামীকাল দিন ও রাতে শ্যুটিং করতে হবে। আর আপনি জানেন, আমি আধাখেচড়া শ্যুটিং করি না। খেয়েছেন আপনি?
আমি খেয়েছি, তুমি খাও।
যাচ্ছি, লুইস উঠে বাথরুমে ঢোকে।
মাত্রা মধুরিমা রুম থেকে খাবার টেবিলে আনে। আগেই বসেছে জয়রাজ, দিলারা জামান, অমি পিয়াল। একটু পরেই ঢোকে শহীদুল আলীম, ভাই ছাদে চলেন। অ্যাই পোলাপান তোমারা যাও। কাল সকালে আসো। ভাই বিশ্রাম নেবে।
ওরা দুদ্দাড় করে চলে যায়। খাবার টেবিলে এসে এক গ্লাস পানি খেয়ে অনাবিল রুম থেকে বের হয়ে ছাদে যায়। শহীদুল আলীমের কাব্যকুঞ্জের সাড়ে তিনতলায় সুইমিংপুলে পানি ভরা। পাশেই বিশাল একটা আম গাছ। আকাশের মাঝখানে আধখানা চাঁদ ঝুলছে। পেছনে একটা হালকা নিয়ন লাইট জ্বলছে। ডানপাশে বিশাল একটা টেবিলফ্যান চলছে।
সুইমিংপুলের পাশেই একটা টেবিল। টেবিলের ওপর গ্লাস, পানির বোতল, বাটিতে গরুর গরম মাংস, সিগারেটের প্যাকেট। একটা বোতলে ব্লাক লেবেল। ছোট গ্লাসে ঢেলে হালকা করে চুমুক দেয় অনাবিল আনন্দ, টানছে সিগারেট। অদ্ভুত মোহনীয় পরিবেশ।
আপনি সারাদিন কোথায় ছিলেন?
পেছনে তাকায় অনাবিল, দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মাত্রা মধুরিমা।
আপনি এখানে?
আমাকে আপনি বলছেন কেন? আমাকে তো তুমি বলতেন।
সেটা ভুল ছিল। আপনি সম্মানিত একজন অভিনয় শিল্পী, কোটি কোটি মানুষ আপনার ভক্ত। আপনার মার্কেট তো বাংলাদেশজুড়ে। আমি সামান্য একজন লেখক। আমার উচিত হয়নি আপনাকে তুমি সম্বোধন করা। ভুল করেছি না জেনে। আর ভুল করতে চাই না।
কাছে এগিয়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়ায় মাত্রা, আপনি আমার রাগ সর্ম্পকে জানেন না। পানির বোতলটা হাতে নেয়, আমার এখন কী ইচ্ছে করছে জানেন? আমার ইচ্ছে করছে—আপনার ওপর বোতলের পানি ঢেলে দেই। দেবো? বোতলের ছিপি খোলার চেষ্টা করে মাত্রা মধুরিমা।
চলবে…

