ইদানীং প্রায় শোনা যায়; কবিতার পাঠক কমছে। স্ট্যান্ডার্ড অব লিভিং না বাড়ালে কাউকে ইমপ্রেসড করা যায় না। বাস্তবে নেমে না এলে জীবন প্রতি-পদক্ষেপে বিশ্বাস ঘাতকতা করবে। কবিরা কাজকর্ম করবে না ভেক ধরে দিস্তা দিস্তা কবিতা লিখে মানুষকে এক্সপ্লয়েড করবে! খেটে খা দেখবি কবিতা উবে যাবে। যা ব্যবহারিক জীবনে একটুও কাজে আসবে না,তা পড়ে কী লাভ। কবিতার বই পড়ার চেয়ে বেণীমাধব শীলের পাঁজি পড়া ভালো।
এ প্রসঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘রাজাধিরাজ দর্শন’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে আমি যদি জিঞ্জাসা করি: ‘আপনার চেকবোই ছাড়া অন্য আর কোন্ বইটা আপনার খুব ভালো লাগে?’ উত্তর অনিবার্য, ‘সারাদুনিয়ার দুটি বই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়; একখানি বাইবেল, আর একখানি আমার অফিসের লেজার বই।’
এমন রাজাধিরাজেরা নির্বিকারে বলতে পারে, আমার মৃত্যুর পর গভর্নমেন্ট যদি আমার সেই লেজার বইখানা ছাপায়; তা হলে জগতের অনেক কল্যাণ হবে। লোকে একটা মহৎ দৃষ্টান্ত পাবে, কী করে সামান্য অবস্থা থেকে নিজেকে উন্নত করা যায়।
গোর্কির আর এক রাজা মনে করেন: ‘একটি জাতিকে শাসন করা হলো সবচেয়ে বড় আর্ট।’
বোহেমিয়ান কবিতা সম্পর্কে এই মানুষেরাই দাঁড় করান জটিল কঠিন ব্যাকারণের ব্যাখ্যা। বলেন, সত্যিকারের কবিতা হলো নিয়মতান্ত্রিকতা, বাধ্যতা, যাকে বলে ডিসিপ্লিন, বুঝলেন? সৈন্যদের কুচকাওয়াজ আর ছন্দবদ্ধ কবিতা একই জিনিস।
আরও সহজ-সরল ব্যাখ্যা বেরিয়ে আসে হৃদয়হীন অমানবিক অসাম্যবাদীদের মুখে। তারা বলেন, কবিতার মধ্যে যেমন শব্দ-প্যারেডের সারিতে তেমনি এক-একজন সৈনিক, ঠিক হয়ে সারি বেঁধে দাঁড়াও, বেয়নেট তুলে নাও, তারপর ফায়ার বুলেটের মতো অব্যর্থ লাগাবে হৃদয়ে…কতগুলো মগজ ফুঁড়ে বেড়িয়ে যাবে…এই তো কবিতা। এই সব রাজার মনে বিশ্বাস নেই; আছে সর্বদা সন্দেহ প্রগাড় বাসা বেঁধে।
এই সাম্যবাদী উৎকৃষ্ট মন ও মনন থেকেই কবিতার জন্ম হয়। তাই কবিতা লাভ-লোকসানের ফসল নয়; জীবন সৌকুমার্যের ফসল। একটা সুকুমার বৃত্তি। যদিও ফসল মাত্রই কমোডিটি। দুনিয়া বলবে উপভোগ্য হলে ভোক্তা নিশ্চয়ই আছে। আসলে সব কিছুকেই পণ্য বানিয়ে ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে বেনিয়া সম্প্রদায় পৃথিবীজুড়েই। ওদেরই প্রতিষ্ঠিত সুবিধাবাদী দর্শনের রঙিন চশমা পরানো রয়েছে সাধারণ মানুষের চোখে। পৃথিবীতে আজপর্যন্ত এমন কোনো সত্যিকার কবি জন্মায়নি, যাকে অপমানিত হতে হয়নি। কবি শৈলেশ্বর ঘোষ জানিয়েছিলেন, একবার এরকম একটা কথা, ‘কবি’ শব্দটা বিদ্রোহবাচক। জানিয়েছিলেন কবি মানে, যে বেঁকে বসে। আজ পর্যন্ত কবিতা লিখে ধনী হয়ে গেছেন, এমন কবির সন্ধান আমি পাইনি। তবু অন্যান্য শিল্পমাধ্যমগুলোর মতো প্রতিটি যুগে প্রতিটি কালে কবির মনের তাগিদ থেকেই জন্ম নিয়েছে কবিতা। বেঁচে থাকতে ভ্যানগঘের তো একটি ছবিও বিক্রি হয়নি, তবু তিনি এঁকে গেছেন, যেকোনো শিল্প এই তাগিদ থেকেই জন্ম নেয়; কবিতাও এর ব্যতিক্রম নয়।
এরিস্টটলের মতে শিল্প হচ্ছে জীবনের অনুকৃতি। আর ম্যাথু আর্নল্ডের মতে, সাহিত্য হচ্ছে জীবনের ভাষ্য। আর্টের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নজরুল বলেছেন, ‘আর্টের অর্থ সত্যের প্রকাশ।(execution of truth) এবং সত্য মাত্রই সুন্দর। সত্য চির মঙ্গলময়, আর্টকে সৃষ্টি, আনন্দ বা মানুষ এবং প্রকৃতি ইত্যাদি অনেক কিছু বলা যেতে পারে, তবে সত্যের প্রকাশ হচ্ছে এর অন্যতম উদ্দেশ্য।’
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সেটা সত্য হোক \শুধু ভঙ্গি দিয়ে যেন না ভোলায় চোখ \ সত্য মূল্য না দিয়েই সাহিত্যের খ্যাতি করা চুরি \ ভালো নয়, ভালো নয় নকল সে সৌখিন মজদুরি।’
গোর্কী শিল্প ও শিল্পী সম্বন্ধে অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘শিল্পী হচ্ছেন তাঁর দেশের –ও তার স্বদেশ ও সমাজের যেন চক্ষু, কর্ণ আর হৃদয়। এক কথায় তার যুগের বাণী বা প্রতিধ্বনি। তিনি যথাসাধ্য সব কিছু জানবেন। অতীতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় থাকবে যত বেশি, ততই তিনি নিজের যুগকে ভালোভাবে বুঝতে পারবেন, ততই তিনি তার কালের সর্বজনীন বিপ্লবী রূপে ও কর্তব্যের পরিধি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। জনগণের ইতিহাস তাঁর জানা উচিত, শুধু জানা উচিত বললেই হবে না, তাঁকে তা জানতেই হবে। রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কী, তাও তাকে বুঝতে হবে।’
শিল্পীর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে রমাঁ রোঁলা আরও সুন্দর করে বলেছেন। তাঁর মতে, ‘শ্রমিকেরা যে পথ গড়ছে বুদ্ধিজীবীদের তা আলোকিত করতে হবে। তাঁরা দুটি বিভিন্ন মজুরের দল কিন্তু কাজের লক্ষ্য এক। যে সংগ্রাম আজ নতুন পৃথিবীর সৃষ্টি করছে তার মহান যোদ্ধা হওয়ার চাইতে বুদ্ধিজীবীদের আর কোনো বড় কাজ নেই।’
এসব পথ ধরেই কবিতা কোনো রাজনৈতিক নেতার চিপ স্টান্ট দেওয়া বক্তব্য নয়; কবির হৃদয়ের জারণ, তার জীবন অভিজ্ঞান। পিকিউলিয়ার হ্যালুসিনেশন নয়, এক্সপ্রেশন অব হাট অ্যান্ট মাইন্ড ইন্টু দ্য সোসাইটি।
বিষ্ণু দে বলেছিলেন, কবিতা রচনা আসলে আত্মসচেতনতা। কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশ জানিয়েছিলেন; সত্যিকার কবিতা পড়ে আমাদের কী মনে হয়। মনে হয়, এ-জিনিস আমারও অভিজ্ঞতায় ছিল। যখন মানুষের ভেতরকার সমস্ত এক্সপ্রেশান হারিয়ে যাচ্ছে! কবিই ইনটেনসিভ কেয়ার নিচ্ছে সেরিব্রাল অ্যাটাক হওয়া আমাদের মস্তিষ্কের। ৬৯ সালে স্বদেশ সেনের লেখা একটা কবিতার পঙ্ক্তি ভীষণ বলতে ইচ্ছে করছে: ’পৃথিবীতে তুমি কখনো বলো না জায়গা নেই।’
কবিদের Mesmerism Power থাকে। কবিতা সরবরের জল; এতে স্নান করলে স্বস্তি মেলে। এই ইটকাঠ-লৌহ কপাটের পৃথিবী সুন্দর একটা উদ্যানে পরিণত হয়। অর্থের চেয়ে দারিদ্র্য, আলোর চেয়ে অন্ধকার কবিদের কল্পনাকে বেশি স্টিমিউলেট করে। ‘বিউটি ইউ ডেথ। বিউটি ইজ হেভেন। বিউটি ইজ লাইট। বিউটি ইউ ডার্কনেস।’
গোর্কী তার মা উপন্যাসে বলেছেন, ‘আর যে মানুষ ভালোবেসে সারাপৃথিবীকে কোল দিতে পারবে, যে মানুষ সর্ববন্ধন মুক্ত, সেই হবে পুরুষোত্তম। কারণ সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ওই মুক্তিতে। যারা এই নব জীবনের সাধনা করবে, তারাই হবে মহাজাতি।’
তাই কবি আমাদের ধূলাপড়া চেতনাকে ধুয়েমুছে সূক্ষ্ম বোধগুলোকে জাগিয়ে তোলে। কবিতার অভিঘাতের দ্যোতনা প্রতিনিয়ত তৈরি করে চলে দোলাচলের ব্যাবিলনের শূন্যউদ্যান। ফলে প্রস্ফুটিত হয় নিটোল সুন্দর জীবনদর্শনের। জীবন খুঁজে পায় তার এথিক্স!
আয়না মহল উপন্যাসে সুচিত্রা ভট্টাচার্য বলেছেন: ‘কেউ ভাবে যেমন আছি তাতেই সুখ। কেউ জীবনভর কোথায় সুখ, কোথায় সুখ বলে হাতড়ে বেড়াচ্ছে। আবার কেউ বা মনে করে, সুখ মানুষের জন্য নয়। ওটা একটা সাবহিউম্যান অনুভূতি।’
এই অস্তিত্বের ঘেরাটোপ থেকে বের করে কবিতাই আমাদের বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সম্মুখীন দাঁড় করায়। আমরা নির্নিমেষ চোখে দেখি, আমরা কত তুচ্ছ নগণ্য এ বিশ্বে। নিজেদের সুখ-দুঃখগুলো তখন মূল্যহীন হয়ে গিয়ে পাখির পালকের মতো হালকা করে হৃদয়কে। গোর্কি যেভাবে মা উপন্যাসে বলেন, ‘দুনিয়াজুড়ে পেষাই কলে ফেলে মানুষকে পিষে গুড়িয়ে রাত্তির দিন টাকা তৈরি হচ্ছে! গোটা দুনিয়াটাই টাঁকশাল।…মানুষের ইচ্ছার ও সীমা নেই, তবু পৃথিবী আত্মিক সম্পদে তেমন বড় হতে পারছে কই! তার কারণ হচ্ছে টাকার মাপকাটিতেই মাপা হয় সব। মানুষ ভাবে স্বাধীন হওয়া মানে অনেক টাকা জমানো। জ্ঞান সঞ্চয়ের চেয়ে অর্থ সঞ্চয়ের দিকেই তাদের নজর বেশি।’
কোনোভাবে রুটিরুজির একটা সিকিওরড বন্দোবস্ত। কড়া সিডেটিভ দিয়ে ঘুম পাড়ানো বর্তমান পৃথিবীতে কবিতা মনের ফিজিওথেরাপি। আয়নার সামনে এলে যেমন আমরা আমাদের চিনতে পারি, কবিতাও তেমনি আমাদের স্বরূপের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। মনকে নাড়া দিয়ে চাঙ্গা করে তোলে, সঞ্চয় হয় কিছু বিশুদ্ধতা। আত্মার স্বচ্ছতায় কনফিডেন্স লেবেলটা যায় বেড়ে। আজকের ইনার ক্রাইসিস, ম্যান্টল ক্রাইসিস; আত্মিক সংকটের দুর্দিনে কবিতা মহৌষধি। শেষ করব জয় গোস্বামীর ‘গোসাই বাগান’ থেকে একটা উদ্ধৃতি দিয়ে। জয় বলেছেন, ‘শতাব্দী শতাব্দী ধরে কবিকে তো দ্রষ্টা বলে আসছে পৃথিবী। জন্মান্ধ টাইরেসিয়স, তিনিও তো দ্রষ্টাই ছিলেন। দৈবজ্ঞ টাইরেসিয়স? যিনি ভবিষ্যৎকে দেখতে পেতেন? হ্যাঁ; দেখতে পেতেন। পাখির ভাষা বুঝতে পারতেন। দৈববাণী শুনতে পেতেন। কিন্তু নিজের বাঁচার পথ দেখতে পেতেন না। এক বালক তাঁকে হাত ধরে নিয়ে যেত।’
মন্তব্য


