॥ পর্ব-০৮ ॥
তবিবুর রহমানের তিন সংসার, মানে তিনজন স্ত্রী।
প্রথম স্ত্রী মাজেদা বেগমকে বিয়ে করেছেন একই বাড়িতে। মাজেদা বেগমের বাবা সোনামুদ্দিন সম্পর্কে তৈয়বের চাচা। তৈয়বের বয়স যখন দুই বছর তখন মারা যায় মা। শিশু তৈয়বকে নিয়ে বিপাকে পড়েন পিতা দলিলউদ্দিন। অনেকে বিয়ের পরামর্শ দিলেও দলিল রাজি হননি। প্রথম অনেক সাধনার সন্তান তৈয়ব। বিয়ের প্রায় এগারো বছর পর সন্তান আসে সংসারে। সন্তান হওয়ায় স্ত্রী আমিরুন নেছা খুশিতে আত্মহারা। কিন্তু আমিরুন নেছা যে ভেতরে ভেতরে অসুস্থ, কেউ বুঝতে পারেনি। এমনকী আমিরুন নেছাও নিজের শরীরে বাসা বাঁধা রোগের সন্ধান জানতেন না। দুপুরের ভাত খাবারের পরে বিছনায় শুয়ে ছিলেন প্রিয় পুত্রকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেলেও বিছানা থেকে উঠছেন না আমিরুন। মায়ের বুকের সঙ্গে ঘুমিয়ে আছে শিশু তৈয়ব। বোথলার হাট থেকে ব্যাগভর্তি সওদা এনে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অবাক দলিলউদ্দিন। তখন নিদাগ চৈত্র মাসের শেষের দিকে। আকাশে মেঘ থাকলেও বৃষ্টি হচ্ছে না কয়েকদিন ধরে। দমবন্ধ গরম চারদিক থেকে ঝাপটে ধরেছে। দলিলউদ্দিন ভাবছেন, ছেলেকে কোলে নিয়ে মাঠের ধারে গেছেন আমিরুণ বাতাস খেতে।
দরজা খুলে ঘরের ভেতরে দেখেন, কেউ নেই। হঠাৎ কানে শুনতে পেলেন শিশুর হালকা আর্তনাদ। তিনি ঘরের মেঝের ওপর বাজারের ব্যাগ রেখে আতর্নাদ লক্ষ করে পেছনের দিকের বারান্দায় ঢুকলেন। অবাক হয়ে দেখেন, তৈয়বের মা গভীর ঘুমে। আর ছেলেটি পাশে বসে মায়ের বুকের দুধ খুঁজছে দুটি ছোট হাতে। দলিলউদ্দিন অবাক, সন্ধ্যার সময়ে তো তখনোই ঘুমায় না তৈয়বের মা। অন্ধকার হওয়ার আগেই তৈয়বের মা ঘরে ল্যাম্প জ্বালান। ঘটনার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে তিনি তৈয়বকে কোলে নিয়ে হালকা ধাক্কা দিলেন আমিরুন নেছাকে, অ্যাই তৈয়বের মা!
কিন্তু হালকা ধাক্কায় আমিরুন নেছা সোজা হয়ে গেলেন, গোটা শরীর হিমের মতো ঠাণ্ডা। দলিলউদ্দিনের মনে হলো, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। কোলে তৈয়ব কাঁদতে শুরু করেছে। তিনি কী করবেন, বুঝে উঠতে পারেন না। তৈয়বকে কোলে নিয়ে ঘরের বাইরে এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করেন দলিলউদ্দিন, ভাই আমার সব শেষ হইয়া গেচে। আমার সব শেষ অইয়া গেচে…
তিন ঘরের বিশাল বাড়ি তিন ভাইয়ের। আফিলউদ্দিন, নেয়ালউদ্দিন আর দলিলউদ্দিন। সন্ধ্যার অন্ধকারে উঠোনে ছোট ভাইয়ের কাতর চিৎকার শুনে আফিলউদ্দিন, নেয়ালউদ্দিন ল্যাম্প হাতে বের হয়ে আসেন। সঙ্গে বাড়ির অন্যরা। নেহালউদ্দিন হাতের ল্যাম্ব বাড়িয়ে ধরে ভাইয়ের দিকে, কী অইচে? তুই কান্দো ক্যা?
কোলের তৈয়বকে দেখিয়ে আতর্নাদের সঙ্গে জানায়, তৈয়বের মা আর নাই!
কও কী তুমি? দুপুরে না পুহুরে নাইতে দেকলাম, বড় ভাই আফিলউদ্দিন বিস্ময়ভরা গলায় প্রশ্ন করে। বাড়ির অন্যরা দৌড়ে ঘরের মধ্যে ঢোকে এবং অনেক নারী পুরুষ ও শিশুদের কান্নার একটা স্রোত ওঠে। কিন্তু পিতার কোলে থেকেও তৈয়ব ক্ষুধায় কাঁদছে। বিচলিতবোধ করেন দলিলউদ্দিন, এখন দুই বছরের শিশুকে কি খেতে দেবেন? বাড়ির মধ্যে হঠাৎই একটা গজব নেমে এসেছে। তৈয়ব দুই দিকে দুই হাত প্রসারিত করে কাঁদছে আর এদিক-ওদিকে তাকিয়ে মাকে খুঁজছে। বুকের মধ্যে পুত্রকে আঁকড়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মুখের কথায় ও বুকের সঙ্গে ঝাপটে রাখলে তো তৈয়বের পেটের খিদে মেটে না। চিৎকার ক্রমেই বাড়ছে। দলিলউদ্দিনের মৃত স্ত্রীকে দেখে ঘরের মধ্যে থেকে হয়ে আসেন বড় ভাই আফিলউদ্দিনের স্ত্রী সায়েরা বানু। তিনি সামনে এসে দু’হাত বাড়িয়ে দেন, ছোডমেয়া আপনে তৈয়বরে আমার কাছে দেন।
ক্রন্দনরত পুত্রকে বড় ভাইয়ের স্ত্রীর কোলে দিলে, পুত্র এক মুহুর্ত কান্না থামিয়ে আবার চিৎকার শুরু করে। সায়েরা বানু সদ্য মা হারানো পুত্রকে বুকের সঙ্গে ঝাপটে ধরে দ্রুত ঘরের দিকে যান। ঘরে ঢুকেই পাতিলে রান্না করা কিন্তু ঠাণ্ডা গরুর দুধ বাডিতে ঢেলে তৈয়বের মুখের কাছে ধরেন। একচটা চুমুক দিয়ে আবার কাঁদতে শুরু করলে চাচি বিছানার ওপর বসে আড়াআড়ি কোলে রেখে তৈয়বের মুখে দুধ ঢেলে দিতে থাকলে, আপন মনে দুধটুকু খেয়ে নেয়। কান্না থামিয়ে স্বাভাবিক হয়।
স্ত্রীকে দাফন করে মধ্যরাতে ঘরে ফিরে দলিলউদ্দিন বিছনায় শুয়ে পড়েন। বুকটা হাহাকারে কেমন যেন মোচড়াতে থাকে। ঘরটা খালি খালি লাগছে। তোরাবজান বিবি ছিলেন এই সংসারের মালিক। আকারে মানুষটা ছিল ছোট কিন্তু হাসিতে মুখখানি ভরে থাকতো চব্বিশ প্রহর। পান খেয়ে মুখটা সব সময়ে লাল করে রাখতো। শুধু দুঃখ ছিল সন্তানের। একটা সন্তানের জন্য খোদার কাছে কত প্রার্থনা করেছে বউটা।
শেষ পর্যন্ত শেষ বয়সে তোবারজান বিবির গর্ভে এলো তৈয়ব। অসীম আনন্দে বউ সারাদিন ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কারও কোলে দিতেও চাইতো না, যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখতো বুকের সঙ্গে। সেই সন্তানকে রেখে কোথায় গেলো তোরাবজান বিবি? সেই নয়নের নিধিকে অকূল পাথারে রেখে কোথায় গেলো তৈয়বের মা? এখন তৈয়বকে নিয়ে কী করবে দলিলউদ্দিন? বুক ফেটে কান্না আসতে চায়, কিন্তু নিজেকে সামলে রেখে বিছনার ওপর গড়াগড়ি খান। ছোট ভাইয়ের জন্য ভাত, মাছ আর আলুভর্তা নিয়ে ঢোকেন বড় ভাই আফেলউদ্দিন। পেছনে বড় ভাইয়ের ছেলে জালালউদ্দিন। জালালের হাতে ল্যাম্প। দপদপ করে জ্বলা ল্যাম্পের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
ছোটচাচা? জালালউদ্দিন পাশে দাঁড়ায়। ওঠেন, চাইরডা খাইয়া লন।
হ দলিল, জালাল ঠিকই কইচে। ওঠ ভাই, খা। তোর ভাবী আইতাছে…আফিলউদ্দিনের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই ঢোকে জালালের মা সায়েরা বানু।
মেঝো ভাই নেয়ালউদ্দিন একটু অসুস্থ। বুকে প্রচণ্ড ব্যথায় কাতর। সারাদিন বিছনায় শুয়ে থাকেন। কিন্তু ছোটভাইযের এই নিদারুণ দুঃখের সময়ে বউ ছেলেমেয়েদের নিষেধ না মেনে উঠে পড়েন। লাঠি ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এসে বসেন চৌকির ওপর, আহারে এত সুন্দর বৌডা খোদায় লইয়া গেলো? আমি বুড়া মানুষ, আঁটতে পারি না, আমারে লইয়া যাইয়া বৌডারে রাইখা গেলে… ফুপিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বড় ভাই আফেলউদ্দিন এগিয়ে আসে মেঝো ভাইয়ের কাছে, তুমি যদি কান্দাকাটি করো দলিল কী করবে? চুপ থাহো।
ভাইরে, কেমনে চুপ থাহি? তৈয়বের কী হবে? অতটুকু পোলা, এহনও মায়ের দুধ খায়, নেহালউদ্দিন আছড়ে পড়েন খাটের ওপর।
দলিলউদ্দিন খাটের ওপর হাঁটু ভেঙে বসেছেন ভাত খেতে। কিন্তু মেঝো ভাইয়ের কান্নার ধমকে হাত তুলে বসে আছেন। তিনিও কাঁদছেন। দুপুর রাত অতিক্রম করছে। সবার চোখে ঘুম। কিন্তু সদ্য স্ত্রী হারানো ভাইকে অভুক্ত রেখে বড় ভাইয়েরা কেমনে ঘুমায়?
ঠিক আছে ভাই, খাটের ওপর শোয়া থেকে উঠে বসেন নেহালউদ্দিন, দলিল, তুই খা ভাই। আমি ঘরে যাই। খাট থেকে নেমে কাঁদতে কাঁদতে চলে যান তিনি।
দলিলউদ্দিন ভাত মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে সামনে ল্যাম্প হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইপো জালালকে জিজ্ঞেস করেন, তৈয়ব? তৈয়ব কই?
দলিলের জবাব দেওয়ার আগেই জবাব দেন সায়রা বানু, ছোডমিয়া তোমার তৈয়ব আমার বিছনায় ঘুমাইতেছে। ওরে দুধ খাওয়াইয়া ঘুম পড়াই দিছি। তুমি খাও, পোলার চিন্তা করতে হবে না।
আইচ্ছা ভাবি, দলিলউদ্দিন চুপচাপ খেতে থাকেন। খাওয়া শেষ হলে এটোঁ থালাবাসন নিয়ে চলে যান সায়রা বানু আর জালাল। ছোট ভাইয়ের কাছে থাকেন আফেলউদ্দিন। ভাত খাওয়ার পর ক্লান্তি অনুভব করেন দলিল, ভাই আমি শুই?
তুমি শুইলেই আমি ঘরে যামু, খাটের পাশে দাঁড়িয়ে শশ্রূমণ্ডিত বড় ভাই আফেলউদ্দিন ছোট ভাইকে পরম স্নেহের স্বরে বলেন।
দলিলউদ্দিন বিছনায় শুয়ে পড়েন।
তোরে একটা কথা জিগাই?
কন।
তোর ভয় লাগলে ক, আমি তোর পাশে শুই?
একটু হাসেন দলিলউদ্দিন, আরে না ভাই। আমার ভয় লাগবে না। আপনি যান।
আইচ্ছা, ল্যাম্পটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যান আফেলউদ্দিন। অন্ধকারে ঘরের মধ্যে একটা শুয়ে থাকেন দলিলউদ্দিন। শুয়েই অন্ধকারে হাত রাখেন ডান পাশে, শূন্য বিছানা। কেউ নেই। এই বিছনায় পাশে শুয়েছিলেন গতরাতে স্ত্রী তোরাবজাব বিবি। তিনি এখন আন্ধার কবরে, একলা। অন্ধকারকে বুকের সঙ্গে দুহাতে ঝাপটে ধরে ডুকরে ওঠেন দলিলউদ্দিন, তুমি আমারে রাইখা কই গেলা? আমারে রাইখা গেছো সমেস্যা নাই, তৈয়বরে লইয়া কই যামু? কে ওরে পালবে? আহারে তোমার সাধনার পুত্র কার বুকের দুধ খাবে?
দলিলউদ্দিন অবাক হয়ে দেখলেন, প্রিয় পুত্র তৈয়বুর রহমান খুব দ্রুতই মাকে অনেকটা ভুলে চাচি সায়রা বানুর সঙ্গে মিলে গেছে। দুই বছর বয়সের পুত্র চাচির হাতে পেতলের গ্লাসে গরুর দুধ খাওয়ার অভ্যাস করে ফেলেছে। সারাদিন বাপের কোলে কাঁখে থাকে, খিদে পেলে কান্না শুরু করলে বাড়ির ছোট-বড় সবাই ছুটে আসে তৈয়বের কাছে। বড় চাচা আফিলউদ্দিন কোলে একবার পেলে আর ছাড়ে না, বুকের সঙ্গে ঝিম মেরে রাখেন। আদরে আদরে দিন কাটে তৈয়বের। সংসারের কাজও নেই তেমন, দলিল ছন্নছাড়া একটা ঘুড়ির মতো নিজেকে দেখতে পান বাড়ির উঠোনজুড়ে। এক ধরনের উদাসীনতাও চলে এসেছে জীবনে। কোনো কিছু ভালো লাগে না। ভাইয়ের উদাসীনতায় উদ্ভিগ্ন বড় ভাই দুপুরে ভাত খেতে খেতে প্রস্তাব করেন, দলিল ল জুইধারা ঘুইরা আহি? যাবি?
থালার শেষ লোকমা মুখে দিয়ে চাটতে চাটতে জবাব দেয় দলিলউদ্দিন, কেমনে যামু? তৈয়ব আছে না?
দলিলের পাতে ভাত আর চিংড়ি মাছের সঙ্গে রান্না করা ডাটা শাক দিতে দিতে হাসেন সায়রা বানু, ছোট মেয়া যে কী কন! আপনের তৈয়ব এহন হারাদিনেও আপনারে খোঁজে না।
হ, তোর ভাবি ঠিকই কইচে রে দলিল, খাওয়া শেষ করে আফিলউদ্দিন পেতলের গ্লাসে পানি পান করার পর বলেন, তৈয়বরে লইয়া চিন্তা হরতে অইবে না তোর। তুই তো দুই বচ্চর অ্ইচে হরতিকতলা জুইধারা যাস না। এইবার ল, মনডা ভালো অইবে। আর সেটেলমেন্টের কাগজপত্রও নতুন কইরা দিতাছে, আনতে অইবে। দেরি অইলে সমেস্যা অইতে পারে।
সেটেলমেন্টের কাগজপত্র বলায় দলিলের মধ্যে এক ধরনের ভাবনা জেগে ওঠে। বিবাহের ছব্বিশ বছরেই যখন তোরাবজানের পেটে বাচ্চা এলো না, তখন বুঝে গেছেন, আর পিতা মাতা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। চিন্তা হলো, জমিজমার কী হবে? আশেপাশের ময়মুরিব্বরা পরামর্শ দেয়, তোমরা যখন থাকবা না, জমিজমা তো হিলাল কুত্তায় খাইবে। হের ছাইয়া বড় ভাইয়ের পোলা জালালউদ্দিনরে লেইখ্যা দেও। তোরাবজানেরও অমত নাই। তিন বছর আগেই জালালউদ্দিনের নামে জমিজমার সবই লিখে দিয়েছেন দলিলউদ্দিন, কেবল বাড়ির অংশটুকু ছাড়া। জালালউদ্দিনকে জমিজমা লিখে দেওেয়ার প্রায় বছর খাকে পর তোরাবজান মা হলেন, তৈয়বের আগমন ঘটলো দুনিয়ায়।
পিরোজপুর মহাকুমায় ঘনবসতি গড়ে ওঠায় জনসাধারণের মধ্যে বিকল্প জায়গা খোঁজা শুরু হয় আঠারো শতকের দিকে। সেই সময়ে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ রায়েন্দা এলাকায় সুন্দরবনের বিশাল জঙ্গল কেটে ব্রিটিশ সরকার আবাদি জমি বের করার একটা উদ্যোগ নেয়। জনগণের মধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়, যারা মোড়েলগঞ্জ রায়েন্দা গিয়ে সুন্দরবন কেটে পরিষ্কার করে আবাদি জমি বের করতে পারবে, তাদের চিরদিনের জন্য আবাদি জমির মালিকানা দেওয়া হবে। সরকারের এই ঘোষণায় পিরোজপুর মহকুমার ভাণ্ডারিয়া থানার ইকড়ি ইউনিয়নের উজানগাঁও গ্রামের তোমের হাওলাদারের বড় পুত্র আফিলউদ্দিন নতুন একটা দিশা পায়। উজানগাঁও হাট থেকে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যার পর বৈঠকখানায় বসেন হুক্কার গুড়গুড়ি হাতে। ডাকে ছোট দুই ভাই নেয়ালউদ্দিন আর দলিলউদ্দিনকে। জলচৌকির ওপর একটা ল্যাম্প জ্বলছে।
নিজে হুক্কার শেষ টান দিয়ে গুড়গুড়ির নলটা বাড়িয়ে দেন ছোট ভাই দলিলের দিকে, দলিলউদ্দিন হুকার নলটা হাতে নিয়ে একটু মুছে মুখে দিয়ে টানতে থাকেন। হুকার গোড়ায় পানি থাকায় প্রতিটি টানের সঙ্গে গুড়-গুড়-গুড় শব্দ হয় সংক্ষিপ্ত পরিসরে।
কী কইবেন দাদো? নেয়ালইদ্দিনই প্রথম প্রশ্ন করে।
আইজকো আডে একটা খবর হোনলাম। ঢোল পিডাইয়া সরকারের পক্ষ থেকে কইলো সুন্দরবনের জমি…
আফেলউদ্দিনের কথা শেষ হতে পারে না, মুখ খোলে নেহালউদ্দিন, দাদো মুইতো হুনচি আডে ঢোল পিডানোর শব্দ। তয় কাছে যাই নাই, মুরগি বেচতেছিলাম তো!
ও, ছোট ভাইয়ের বাক্য অনুমোদন করেন তিনি।
হুকা টান শেষ করে নল হুকার আংটার সঙ্গে বেঁধে দলিলউদ্দিন প্রশ্ন করে, সুন্দরবনের কোন এলাকায় গেলে জমি পাওয়া যাইবে?
এলাকা তো অনেক বড়। আগে যাইতে অইবে মোড়লগঞ্জ। হেইহানে সেটেলমেন্ট অফিসে যাইয়া এলাকার মানচিত্র দেইখা, কাগজপত্রে সই কইরা যাইতে অইবে। যাবি তোরা? প্রশ্ন করে থামেন আফেলউদ্দিন।
দুই ভাই চুপ।
কী রে? কথা কস না ক্যা? তাড়া দেন বড় ভাই।
দলিলউদ্দিন খুক করে একটা কাশি দেন, অত দূরে যাইয়া মোরা কী জমিজমা পামু? ওই দ্যাশে লোকজন আছে না?
ওই দ্যাশে লোকজন তেমন নাই। ছাড়া ছাড়া হুনচি দুই তিন মাইলের মইধ্যে একটা দুইডা বাড়ি। হেও জঙ্গলের মইধ্যে। দিনে দুপারে বাঘ আহে…
চমকে ওঠে নেহালউদ্দিন, কন কী দাদো?
ভয় পাওয়ার কিছু নাই, অভয় দেওয়ার চেষ্টা করেন আফেলউদ্দিন, লোকজনে লেজা টোঁটা রানদা লইয়া রেডি থাহে। কিন্তু বাঘের ভয়ে বইসা থাকলে চলবে? এইহানে যে জমিজমা আচে, বংশ বড় অইতাছে, পোলাপান লইয়া থাকবি ক্যামনে? বিনা পয়সায় যদি মেহনত কইরা জমিজমা পাওয়া যায়…
কিন্তু জঙ্গলের গাছপালা কাটা তো সহজ না, এক ধরনের আপত্তি জানায় দলিলউদ্দিন।
আরে দলিল, যদি মোরা কোথাও জমিজমা পাই, হেই জমিতে যদি জঙ্গল সুন্দরী গাছপালা থাহে, মোরাতো নিজেগো আতে কাটমু না। কামলা লইয়া যামু। হ্যারা কাটবে, জঙ্গল পরিষ্কার করবে, মোরা ঠিহা হিসাবে কামলাগো টাহা পয়সা দিমু। পরিষ্কার করে বুদ্ধি বাতলে দিলেন আফেলউদ্দিন।
ছোট দুই ভাই বড় ভাইয়ের বুদ্ধির কাছে অনেকটা পরাজিত। চুপ করে থাকে। ভাবে দুজনে। বাইরে অন্ধকারের মধ্যে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। বাড়ির সামনে ছোট খালের ওপারের জঙ্গল থেকে তারস্বরে বিকট চিৎকারে জানান দিচ্ছে পাতিশিয়াল, হুক্কা হুয়া হুক্কাহুয়া। শিয়ালের হাঁক কমে গেলে দলিলউদ্দিন জানায়, আপনেরা যান আমি যামু না।
ক্যা? তুই যাবি না ক্যা? বড় ভাইয়ের আগেই প্রশ্ন ছোড়ে মেঝো ভাই নেয়ালউদ্দিন।
বাইরের অন্ধকারের দিকে দৃষ্টি রেখে উদাস গলায় জবাব দেয় দলিল, মুই যাইয়া কী হরমু?
এইডা কোনো কথা কইলি তুই? চৌকির ওপর একটা বালিশে ঠেস দিয়ে বসেছিলেন বড় ভাই আদেলউদ্দিন। আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে বসেন, বোগ্ধাডার কতা হোনচো নেয়াল? ক্যা, তুই আমাগো লগে সুন্দরবনে যাবি না ক্যা? মোরা যে কামই হরি, জায়গা জমি রাহি, এক লগে তিন ভাই মিইল্লাই তো রাহি। রাহি না?
মাথা নাড়ান দলিলউদ্দিন, হয় তিন ভাই এ লগেই কাম হরি।
তাইলে যাবি না ক্যা?
যাইয়া কী হরমু? মুইতো একলা মানুষ। সোংসার নাই….
হো হো হাসিতে ফেটে পড়েন বড় দুই ভাই। অনেক দিন ধরে মনের মধ্যে কষ্টটা আটকে রেখেছিলেন দলিলউদ্দিন। মা মনোয়ারা বেগম মারা যাওয়ার সময়ে দলিলের বয়স ছিল সাড়ে ছয় বছর। ছোট ছেলের হাত বড় ছেলের হাতে দিয়ে মনোয়ারা বেগম মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন, তুমি বড় ভাই, ছোড ভাইরে দেইখা রাইখো। মা মারা গেছেন এগারো বছর। দলিলের বয়স সতেরো বছর। আফেলউদ্দিনের ঘুম ভাঙে। সংসারের নানা কাজে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, ছোট ভাইয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে। কৌশলে ছোট ভাই জানিয়ে দিয়েছে।
আইচ্ছা, বুঝতে পারছি। হাসির শেষে নিজেকে সামলে নেন আফেলউদ্দিন। তাকান মেঝো ভাই নেয়ালের দিকে, নেয়াল বড় বুল অইয়া গেচে। দলিলের লাইগা মাইয়া দ্যাখ।
মেয়ে দেখার প্রসঙ্গ উঠতেই দলিলউদ্দিন চুপচাপ উঠে চলে যায় পেছনের দরজা দিয়ে, নিজের ঘরের দিকে। সায়রা বানু, আদেলউদ্দিনের স্ত্রী দরজায় এসে দাঁড়ান, হাতে ল্যাম্প, কী খাওয়া দাওয়া লাগবে না? খাওন লইয়া বইয়া রইচি।
তুমি এদিকে আহো, ডাকেন আফেলউদ্দিন।
ক্যা? মোর কাম আচে, যদিও বলেন তিনি কিন্তু দরজা থেকে হেঁটে স্বামীর কাছে আসেন। কী কইবেন কন।
ভাবি, আপনার ছোড দেওরার তো বিয়া দেওয়া লাগে, হাসতে হাসতে বলেন নেয়ালউদ্দিন, মাইয়া দেহেন।
আমিওতো কইচি, সায় দেন বড় ভাবী সায়রা বানু, বয়স অইচে ছোডমিয়ার বিয়া দেন। অনুযোগের সঙ্গে তাকান স্বামীর দিকে, আপনে তো কথা কানে তোলেন না!
চলবে…
অঙ্গার ॥ পর্ব-০৮ ॥ মনি হায়দার

