ঝিঁঝিলাগা দিনগুলো-১২॥ শিল্পী নাজনীন | চিন্তাসূত্র
৮ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১ এপ্রিল, ২০১৯ | রাত ১০:২৫

ঝিঁঝিলাগা দিনগুলো-১২॥ শিল্পী নাজনীন

রাতের বাসে উঠে বসে তারা। তিতলি আর অরুন্ধতী পাশাপাশি, পাশের সিটে বাদল। নিঃশব্দে বসে থাকে তিতলি। অরুন্ধতী একটু পরেই এলিয়ে পড়ে ঘুমে। একহাতে তাকে জড়িয়ে নিয়ে জানালা দিয়ে ছুটে চলা অন্ধকার দেখে তিতলি। বুকের মধ্যে তারচে’ ঢেরগুণ বেশি অন্ধকার হামাগুড়ি দেয়। তিতলির মনে হয়, সে নয়, অন্য কেউ বসে থাকে বাসে, অন্য কেউ আগলে রাখে অরুন্ধতীর ঘুমন্ত শরীর। তার তীব্র ইচ্ছে করে দুম করে নেমে যায় বাস থেকে, হারিয়ে যায় রাস্তার দুই পাশে ফুটে থাকা চাপ চাপ অন্ধকারের মধ্যে, কিংবা ঝাঁপিয়ে পড়ে চলন্ত ট্রাকের নিচে। আর কোনোদিন কেউ খুঁজে পাবে না তাকে, আর কোনোদিন কেউ রক্ত ঝরাবে না তার বুকের বাম পাশের নরম, কোমল ভিটেয়। একজীবনে কেন যে এত যন্ত্রণা বইতে হবে তাকে! কেন যে সেখানে এত পাশবিকতায় অপমানের, অবহেলার তীক্ষ্ণ, তীব্র লাঙল চালানোর ইজারা নেবে কেউ! চোখ বেয়ে উষ্ণতা গড়ায় তার। তার মধ্যেই মাথা নেড়ে মনে মনে বলে, না! ইজারা তো নেয়নি কেউ! সেই দিয়েছে অনবধানে কখন! কেন দিয়েছে সে? কেন? ঠোঁট কামড়ে তীব্র কান্নার বেগ সামলায় তিতলি। ঠিক তখন কোত্থেকে মুখ বের করে দেয় আধখানা ফিকেরঙা চাঁদ। কেমন রহস্যময় করে তোলে ছুটে চলা পথটাকে। তিতলির বুকের মধ্যে কেমন ছটফট করে ওঠে। ডানা ঝাপটে ওঠে ঘোর অন্ধকার।

অনেকদিন হলো। আর মন বসছে না এখানটায়। সরে পড়তে হবে। দূরে চলে যেতে হবে আরও। অনেক অনেক দূরে। যেখানে হুট করে জোহরা এসে ঘাই দেবে না তার চৈতন্যে। ঢেউ তুলবে না তার নিরাকার মনে। সেদিনের পর থেকে মন বড় অস্থির হয়ে আছে। বড় উচাটন। তারার সাথেও আর সহজ হতে পারছে না তেমন। তারার মধ্যে অবশ্য কোনো আড়ষ্টতা নেই। সে আগের মতোই সহজ, স্বাভাবিক, আন্তরিক। কিন্তু তরুণের নিজের মনেই পাপ, তার নিজের মধ্যেই অনুশোচনার তীব্র জরা। তারা না জানুক, অন্য কেউ না জানুক, সে নিজে তো জানে, তারা নয়, সেদিন মনে মনে সে আসলে জোহরাকেই…

ভাবতেই, মনের মধ্যে অনুতাপের গ্লানি উঁকি দেয়। অনুশোচনার কাঁটা খচখচ বেঁধে। তার তো কোনো অধিকার নেই তারাকে এভাবে অপমানের! এ যে নারীত্বের চূড়ান্ত অপমান! জোহরাকেও নয় কি! ছিঃ! ছিঃ ছিঃ! কী করে পারলো সে! না, আর নয়! অনেক বাবুয়ানা করা গেছে এখানে থেকে এতদিন। এবার শরীর বাবাজিকে একটু কষ্ট দিতে হবে। আট কুঠুরি নয় দরজার খাঁচাটিকে এবার একটু বাগে আনতে হবে। পাত্তাড়ি গুটাতে হবে এবার এ তল্লাটের।

অদূরে কানাই বাউল কালিঝুলিতে একাকার মাটির হাঁড়িতে চাল-ডাল মিশিয়ে খিচুড়ি চড়িয়েছে। ধোঁয়ায় কাশছে খকখক। তার মধ্যেই খিচুড়িও গন্ধও ছড়াচ্ছে জম্পেশ। তারা আজ এখনো ওঠেনি। এত বেলা করে ঘুমুনোর স্বভাব নয় তার। আজ কেন উঠছে না এতক্ষণেও কে জানে! শরীর খারাপ হয়নি তো? আড়চোখে একবার দূরে, তারার ঘুমুনোর জায়গাটিতে দেখে নেয় তরুণ। সারি সারি বেশক’টা মশারি তখনো ঝুলছে। তার মধ্যেই নিজেদের পোটলাপুটলি, পাশে আরেক পোটলা হয়ে ঘুমুচ্ছে তারার মতো আরও অনেক বাউল। আহা! সংসারে এরচে’ মধুর দৃশ্য আর কী হতে পারে! পৃথিবীময় মানুষ যখন স্বার্থের জন্য একে অন্যের বুকে হাসতে হাসতে ছুরি বসিয়ে দিচ্ছে, ভয়াবহ মারণাস্ত্র নিয়ে উন্মত্ত ঝাঁপিয়ে পড়ছে একদল আরেক দলের ওপর, যুগের পর যুগ যুদ্ধের ভয়াবহ অভিশাপ বহন করে চলছে যখন মানবসভ্যতা, তখন এই হাতেগোনা কজন মানুষ, সমাজ ছেড়ে, সংসার ছেড়ে, কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে শুধু একটা একতারা হাতে ঘুরছে পথে পথে। কিছু নয়, কণ্ঠের সুরটুকুই সম্বল এদের, মানবতার বাণীই পাথেয়। কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষা নেই, কোনো জাগতিক উচ্চাভিলাষ নেই, পৃথিবীর পথই এদের বাড়ি, পৃথিবীর ভূমিই এদের ঘর। এদের দেখেও কেন শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয় বিষয়াসক্ত মানুষগুলো!

‘আমি অপার হয়ে বসে আছি, ওহে দয়াময়/ পারে লয়ে যাও আমায়…’—একতারায় টুংটাং সুর তুলে গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে তরুণ। কানাই বাউলের খিচুড়ির গন্ধ এড়াতে আখড়া ছেড়ে দূরে গিয়ে বসে। শরীর ব্যাটার বড্ড লোভ। কানাইয়ের খিচুড়িতে নজর পড়েছে আজ। ব্যাটাকে জব্দ করতে হবে এইবেলা।

আখড়ার এদিকটাতে মানুষজনের আনাগোনা কম। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেউ আসে না তেমন। তরুণ যুত করে বসে। সম্ভব হলে আজ রাতেই এখানকার আবাস গুটোবে সে। বেশিদিন থাকলে মায়া পড়ে যায়। মায়াকে বড় ভয়। জড়াতে চায়, স্থবির করে দিতে চায়। তাছাড়া, সেদিন জোহরাকে দেখেছে সে। আশেপাশেই থাকে, দেখে তেমনই মনে হয়েছে। তার মানে আবার আসতে পারে। অনর্থক ঝামেলা তাতে, অহেতুক বিপত্তির আশঙ্কা। তারচে’ সে দূরে চলে যাবে, অনেক দূরে। তার কাছে সব জায়গা-ই এক। জোহরার তা নয়। সে খুঁটোয় বাঁধা গরু। তার কাছে স্থান, কাল, পাত্র সবই সমান গুরুত্ববহ।

হাহাহা! গলা ছেড়ে একবার হেসে ওঠে তরুণ! জোহরা! কী হাবাগোবা মেয়েটাই না ছিল সে। অবশ্য রূপ ছিল তার। ছিল কূল উপচানো যৌবন। তরুণের প্রেমে পড়ার কোনো কারণই ছিল না জোহরার। তরুণ অন্তত অমন দুঃস্বপ্ন দেখেনি কোনোদিন। তার মতো বখাটে ছেলের জন্য অমন দুঃস্বপ্ন মানানসইও ছিল না তেমন। ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া মা, বদ্ধ উন্মাদ বাপ, সরকারি শিশু পরিবারে বড় হওয়া বোন আর সে, তরুণ, প্রায় রাস্তার কুকুরের মতো বড় হওয়া জীবন তার। গ্রামের চেয়ারম্যানের সুশ্রী, একমাত্র কন্যা জোহরা বেগম তার প্রেমে পড়বে, তেমন ভাবা তার জন্য কষ্টকল্পনা ছিল বৈকি। তাছাড়া ছোট কাকার সঙ্গে তার ছিল সাপে-নেউলে সম্পর্ক। একটু বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই ছোটকাকার মুখোশটা সরিয়ে মুখটা দেখে নিয়েছিল সে। ফলে তাকে আর বাড়িতে ঠাঁই দেননি কাকা। পথে পথে ঘুরে, মানুষের বাড়িতে বাড়িতে থেকে দিন কাটত তার। বাউণ্ডুলে, বেকার। অন্যদিকে চেয়ারম্যানের সাথে কাকার ছিল গলায় গলায় পিরিত। জোহরার দিকে তাকানো তাই তার পক্ষে ছিল বিরুদ্ধপক্ষের শিবিরে প্রবেশের শামিল। তাছাড়া নারীতে আসক্তিও ছিল না তেমন। বাবার পাগলামি আর উন্মাদদশা দেখে দেখে তার খানিকটা বুঝিবা তরুণের মধ্যেও ঢুকে গেছিল। ছোটবেলা থেকেই তার ঝোঁক ছিল গানবাজনার দিকে। এলাকার ভুবন পাগলার আস্তানায় গিয়ে রাতদিন পড়ে থাকত। তার কাছেই গানের তালিম নিয়েছিল তরুণ। ভুবন পাগলার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা ছিল না। স্বশিক্ষিত ছিলেন তিনি। উদাত্ত গানের গলা ছিল তার। লালনের গানে জুড়ি ছিল না আর। ভুবন কাকার মৃত্যুর পরই এলাকা ছেড়েছিল তরুণ। না ছেড়ে আর উপায়ও ছিল না কিছু।

কলেজে যাওয়ার পথে ভুবন কাকার বাড়ি পড়ত। আসতে, যেতে সে বাড়িতে গানের আসর দেখত জোহরা। ভদ্রজনেরা তেমন একটা সে বাড়িতে ভিড়ত না। নাকই সিঁটকাত বরং। হঠাৎ হঠাৎ বাইরে থেকে দুই-চারজন আসত, ভুবনকাকাকে নিয়ে যেত দূরের সব গানের আসরে, সাথে যেত তরুণও। সেই সময়টা কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কাটত তরুণের। ভুবন কাকা আর গান, এ ছাড়া কিছু ছিল না তার পৃথিবীতে তখন। বাবার উন্মাদদশা তাকে হতাশ করত, ব্যথিত করত, তিতলির এতিমখানায় বড় হওয়ার গ্লানি আর ক্ষোভ তাকে অশান্ত, অস্থির করত। আর এসব কারণে তার সব আক্রোশ, সব ক্রোধ গিয়ে জমা হত ছোটকাকার ওপর। লোকটাকে রীতিমত ঘৃণা করত সে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে, যতটুকু স্মরণ করতে পারে তরুণ, তাতে এটুকু স্পষ্ট যে, সুখী, সুন্দর একটা সংসার ছিল তাদের। সুস্থ, স্নেহময় অন্যসব বাবার মতই ছিলেন হাবিবুর রহমান খান। মানুষের মস্তিষ্ক সম্ভবত খুব আনন্দের আর খুব বিষাদের স্মৃতি ব্যাখ্যাতীত কোনো উপায়ে সংরক্ষণ করে। নইলে অত অল্প বয়সের, দুই আড়াই বছরের স্মৃতি কেন জমা করে রেখেছে তার মস্তিষ্ক অত নিপুণভাবে?

আরও পড়ুন: ঝিঁঝিলাগা দিনগুলো-১১॥ শিল্পী নাজনীন

মায়ের কোলে সে, বাবা সামনে, তারা যাচ্ছে বৈশাখী মেলায়, পায়ে হেঁটে। তার পরের দৃশ্যে তার হাতভর্তি রঙবেরঙ এর বেলুন, বাবার হাতে অনেক রকম মিষ্টান্ন, মার হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি, বাজছে রিনিঝিনি, শব্দটা স্পষ্ট শুনতে পায় সে এখনো কান পাতলে। মার মুখে হাসি উপচে পড়ছে। তাদের সঙ্গে ছোটকাকা। ছোটকাকার হাতে সংসারের অনেক টুকিটাকি জিনিস, মেলা থেকে কেনা। কাকার মুখেও হাসি। কাকা হেসে হেসে তরুণের সাথে কথা বলছেন। আগড়ুম বাগড়ুম কথা, যেমন বড়রা ছোটদের সঙ্গে করে থাকেন। কেন কে জানে, তরুণের স্মৃতি থেকে এই দৃশ্যটা মোছে না। বড় হয়ে, যতবার দৃশ্যটা চোখে ভাসে, চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে তার। দৃশ্যটা প্রমাণ করে, বাবার অবস্থা ভাল ছিল, বাবার অসুস্থতার, অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছেন কাকা, নইলে কাকার ছেলেমেয়েরা রাজার হালে বড় হল, অথচ তাকে আর তিতলিকে কেন ঠাঁই নিতে হল সরকারি শিশু পরিবারে, অনাথাশ্রমে? যখনই এ প্রশ্নটা মাথায় এসেছে তার, সে পালিয়েছে আশ্রম থেকে। আর ফিরে যায়নি। কাকার ছেলেমেয়েদের মতো পড়াশোনার সুযোগ না পেলে স্কুলমুখো হবে না সে, সাফ জবাব ছিল তার। তিতলিকেও চেষ্টা করেছিল বোঝানোর। তিতলি বোঝেনি। সে তিতলির ব্যাপার। কিন্তু ছোটকাকার ওপর ঘৃণা বেড়েছে আরও, বেড়েছে ক্ষোভ।

সম্পত্তিতে সমান ভাগ ছিল বাবা আর ছোট কাকার, বাবা নিজেও কিছু করেছিলেন, বড় হয়ে জানতে পেরেছে সে, ছোট কাকা সব গ্রাস করে নিয়েছেন। তাদের বঞ্চিত করেছেন, এমনকি তার বাবার কোনো চিকিৎসা পর্যন্ত করাননি। এত সব রাজনৈতিক নেতাদের সাথে ওঠা-বসা কাকার, অথচ তার বাবা, তার মুক্তিযোদ্ধা বাবা, যুদ্ধের বিভসৎতা সইতে না পেরে যিনি পাগল হয়ে গেলেন, তার কথা কি তিনি তুলতে পারতেন না তাদের কাছে? পারতেন না কি বাবার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে তাকে সুস্থ করে তুলতে? মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে তার আর তিতলির জন্য রাষ্ট্রীয় বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে কি পারতেন না তিনি? পারতেন। করেননি। তাতে বাবার সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যেত তার। কী ঘৃণ্য মানসিকতা!

ঘৃণায় গা রি রি করে উঠত তরুণের। কাকা নিজে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, বরং শান্তিবাহিনীর সঙ্গে গোপন গাঁটছড়া ছিল তার এমন কানাঘুষা আছে গ্রামে। অথচ ছোটকাকা এখন মুক্তিযোদ্ধার তকমা এঁটে ঘোরেন, নিয়মিত ভাতা পান, তার ছেলেমেয়েরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে বড় সরকারি চাকরি বাগিয়ে নিয়েছে। অথচ তিতলি বড় হল অনাথাশ্রমে। সে নিজে, কুকুর বিড়ালের মত বড় হল পথে পথে। বাবা মারা গেলেন বিনা চিকিৎসায়, দু পায়ে বেড়ি পরা, উন্মাদ অবস্থায়। আর মা? আহারে! মা! তার অভাগা, অসহায় মা! মা যেন কীভাবে মারা গেলেন? গলায় দড়ি, না-কি বিষ? হবে কিছু একটা অমনি।

চলবে…

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন