ওয়াজিব আলী মাস্টার ও একটি সুপারি গাছ ॥ ফরিদুর রেজা খান | চিন্তাসূত্র
৮ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১ এপ্রিল, ২০১৯ | রাত ৮:২২

ওয়াজিব আলী মাস্টার ও একটি সুপারি গাছ ॥ ফরিদুর রেজা খান

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান আধিকারিক হরিদাস মুখার্জী হতাশাগ্রস্ত বদনে বসে আছেন। কয়েকদিন যাবত কাবিখার বরাদ্দ নিয়ে এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে যে হানাহানি চলছিল, দুর্ভাগ্যবশত তিনিও সে হানাহানির জালে ফেঁসে গেছেন। নিজেকে ছাড়িয়েও নিতে পারছেন না। এক কথায় ‘বজ্র আঁটুনি, ফস্কা গেরো’। বজ্র আঁটুনি তো নির্ঘাত, কিন্তু ফস্কা গেরোর কোনো লক্ষণ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।

তার সামনে একটি দরখাস্ত হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তারই দপ্তরের একজন জুনিয়র অফিসার। ব্যক্তিগতভাবে তিনি এই দুরন্ত অফিসারকে খুবই পছন্দ করেন। দাপ্তরিক কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো সুযোগ এই তরুণ তুর্কি রাখেন না—বস্তুত তার কোনো কাজ বিচার করার যোগ্যতাই হরিদাস মুখার্জীর নেই। ছেলেটা জয়েন করেই মহেশখালী খাদ্য গুদামের এক যুগের ঝুলে থাকা সমস্যাগুলো কঠিন হাতে সামাল দিয়েছে। তার হাতে ধরা দরখাস্তটা অবশ্যই ছুটির জন্য না। নৈমিত্তিক ছুটির দরখাস্ত হাতে সে এভাবে ইতস্তত বোধ করবে না। তবে কি বদলির জন্য আবেদন? নাকি ডিপার্টমেন্টাল লোনের জন্য?

—স্যার, আমার কিছু কথা বলার ছিল।
চোখ তুলে তাকান হরিদাস মুখার্জী—হ্যাঁ রেজা, বসো।

চেয়ার টান দিয়ে হরিদাস মুখার্জীর সামনে বসে পড়ে রেজা। হাতের আবেদনপত্রটা এখনো দৃপ্ত হাতে ধরা। সেই হাতের আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে কম্পন খেলা করছে। এবার একটু ভ্রূ কোঁচকান হরিদাস মুখার্জী।

—রেজা, তুমি কিছু বলতে চাচ্ছিলে। কিসের আবেদন ওটা? দাও দেখি।

দরখাস্তটা হাতে নিয়ে হরিদাস মুখার্জীর স্নায়ুচাপ আরও বেড়ে যায়৷ আবেদনটা কোনো ছুটি বা ডিপার্টমেন্টাল লোনের জন্য লিখা হয়নি৷ তার দপ্তরের আপাতদৃষ্টিতে দেখা সবচেয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনে অসম্মতি জানিয়ে পদত্যাগপত্র লিখেছেন। হতাশ ভঙ্গিতে মাথা ঝোঁকান হরিদাস মুখার্জী।  তাকান সামনে বসা রেজার দিকে। তার ভাবলেশহীন মুখ হরিদাস বাবুর হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয়।

হতবাক দৃষ্টিতে নিজের দপ্তরের সবচেয়ে পদস্থ কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে আছে রেজা। হাতে থাকা তার পদত্যাগপত্রটি একটু আগেই এই ভদ্রলোক ছিঁড়ে কুটিকুটি করেছেন৷ এখন তার কেবিনের জানালা দিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। এতটা অপমানিত হয়েও রেজা রাগান্বিত হতে পারছে না, সে একটা ঘোরে ডুবে আছে।

জগন্নাথ কলেজ থেকে ভূগোলে অনার্স সার্টিফিকেটটা হাতে নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছিল রেজা। ময়মনসিংহ অঞ্চলের ছোট্ট মফস্বল শহর নেত্রকোণার দরিজাগী গ্রামে তার বাড়ি। প্রতিদিন মাইল খানেক পায়ে হেঁটে ক্লাস করতো দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে। খুব বেশি ভালো ছাত্র সে ছিল না। ক্লাসের অন্য ছাত্ররা তার বিশুদ্ধ আঞ্চলিক উচ্চারণের কারণে খুব হাসিঠাট্টা করতো তাকে নিয়ে। অনেকে আবার দাদাগিরি ফলাতে চাইতো। সবাই শার্ট প্যান্ট পরে ক্লাসে গেলেও রেজা যেতো তার বাবার একটা পুরাতন লুঙ্গি পরে। সেই সময়ের নেত্রকোণায় লুঙ্গি পরে স্কুলে যাওয়া দোষণীয় কিছু ছিল না। সাদা জমিনের পাড়ের ওপর কালো কালো ছোপ যেন তার বার্ধক্যের জানান দিতো। দত্ত হাই স্কুল থেকে ফার্স্ট ক্লাসে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তার আত্মবিশ্বাস খানিকটা বাড়লো। ঢাকা সিটি কলেজ বা ঢাকা কলেজ চোখের সামনে অনেকবার হাতছানি দিলেও স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চাকরি থেকে সামান্য মাইনে পাওয়া তার বাবা তাকে সেখানে ভর্তি করতে পারেননি। শেষ সহায় নেত্রকোণা সরকারি কলেজ। দিনগুলো খুব রঙিন ছিল। হিরণপুরের রেললাইন ধরে হেঁটে হেঁটে আসতো সে নেত্রকোণা বড় স্টেশনে। স্টেশনের পাশেই কলেজ। ততদিনে তার জন্য দুটি হাওয়াই প্যান্ট আর পলিয়েস্টার কাপড়ের একটি শার্ট বরাদ্দ হয়েছে। বগলে বই চেপেও আর আসতে হয় না। তার বাবা কোনো এক পুরাতন ছাত্রের থেকে একটি শান্তিনিকেতনি ব্যাগ পেয়েছিলেন। সেটাই এখন কাঁধে ঝুলিয়ে কলেজ আসে সে। ‘প্রাইভেট টিউশানি’ শব্দটার সঙ্গে তখন মফস্বলবাসী আস্তে আস্তে পরিচিত হলেও রেজা প্রাইভেট পড়েছিল নির্বাচনি পরীক্ষার পরের দুই মাস৷ ইংরেজি ও গণিত।

আরও পড়ুন: ঝিঁঝিলাগা দিনগুলো-১০॥ শিল্পী নাজনীন

দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করার পরও স্বপ্ন দেখতে ভয় পাচ্ছিল রেজা। তার স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে বটে, বাস্তব হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি একটা নেই। স্কুলমাস্টার বাবা আর কতই বা করবেন! পাঁচজন ভাইয়ের পর এখন আবার একটা বোন হয়েছে। মাইনেই বা কত পান? বাবার কাছে কিছু বলার সাহস হয় না রেজার।

একদিন সন্ধ্যায় তামাক সাজিয়ে বসেন ওয়াজিব আলী মাস্টার। তামাকে টান দিতে দিতে ছেলের ভবিষ্যত পরিকল্পনা শুনতে চান। সব শোনার পর রেজা বোঝে, ঢাকা শহরে থাকতে হলে তার বাবা তাকে সাহায্য করতে পারবেন বটে, তবে সে সাহায্যটুকু হয়তোবা যথেষ্ট নয়। তবু রোখ চাপে রেজার, দমে যাবে না সে। একদিন ময়মনসিংহ স্টেশন থেকে একটা ট্রেনে চেপে চলে আসে ঢাকা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বুঝতে পারে, জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ই হয়তোবা তার উপযুক্ত গন্তব্য৷ পছন্দের বিষয় ভূগোলের একটা ফরম তুলে সেটা পূরণ করে জমা দিয়ে আসে৷ ঢাকার দিনগুলো খুব সুখকর ছিল না রেজার৷ হাতখরচ জোগাড়ের জন্য টিউশনি ছিল দুটো। কিন্তু এমনও হয়েছে টানা দুই মাসেও সে মাইনে পায়নি। বৃহস্পতিবার রাতে ট্রেনে করে চলে আসতো নেত্রকোণা—বিনাটিকিটে। আবার শনিবার সকালে পৌঁছাতো ঢাকায়। সেটাও বিনাটিকিটে। উদ্দেশ্য খাবারদাবার বাবদ কয়েকটা টাকা বাঁচানো। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অতিবাহিত করে পাওয়া অনার্স পাশের সার্টিফিকেট নিঃসন্দেহে খুব দামি একটা অর্জন—যেন বাসবদেব ইন্দ্র নন্দনকাননের পারিজাত তুলে দিয়েছে তার হাতে। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে বসে একটা চাকরির বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে রেজার। খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে কয়েকজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (খাদ্যগুদাম) নিয়োগ দেওয়া হবে।

আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে ওঠে রেজা। তার রুমমেট সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন বাথরুমে গোসল করছেন। এই ভদ্রলোক বাথরুমে চুপচাপ কিছু করতে পারেন না। গোসলের সময় তিনি সমসাময়িক বাংলা সিনেমার সুপারহিট গানগুলো গেয়ে সঙ্গীত চর্চা করেন। আজ শুক্রবার। অন্যান্য দিন সহ্য করা গেলেও আজ বিরক্তিকর লাগছে। দরজায় নক করার পর দরজা খোলেন রুহুল।

—রেজা ভাই, পানি তো সেইরাম ঠাণ্ডা। গোসল কি আইজকা এইনে করবেন নাকি? আপনে তো মিয়া ছেনালী লোক, যান সইরা দাঁড়ান। দেখেন না গোসল করতাছি?

মুখের ওপর ঠাস করে দরজা লাগান রুহুল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় রেজা। কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সে যাচ্ছে উপজেলা কোয়ার্টারের পুকুর ঘাটে, দীর্ঘদিন পুকুরে গোসল করার অভ্যাসটা সে ছাড়তে পারেনি। পুকুর ঘাটে পৌঁছানোর পর কিছুটা হতাশ হয় রেজা। টিএনও সাহেব তার মেয়েদের সাঁতার শেখাচ্ছেন, এই অবস্থায় কি তার পুকুরে নামা ঠিক হবে?
—আরে! ওসি এলএসডি সাহেব? নামবেন নাকি? নেমে আসুন।

আরও একটু সময় ভাবে রেজা।

—কাকু, নেমে আসুননা! পানিটা খুব গরম। শীতের দিনে আরাম পাবেন৷

টিএনও সাহেবের ছোট মেয়ের কথায় আহ্লাদিত হয় রেজা। রেজা যে কেন নামছে না সেটা বোঝার বয়স হয়নি তার এখনও।

এবার সে এগোয় পুকুরের দিকে। লাফিয়ে পড়ে তার মনে পড়ে একটা অসভ্যতা হয়ে গেছে। তার সিনিয়র অফিসারের সামনে এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়াটা উচিত হয়নি—নিঃসন্দেহে এটা অশ্লীলতার পরিচয়।

হঠাৎ হা হা করে হেসে ওঠেন টিএনও সাহেব। তার মেয়েরাও তার সঙ্গে যোগ দেয়। বোঝা গেলো, টিএনও সাহেব ও তার মেয়েরা এই ঘটনাটিতে আনন্দই পেয়েছে, বিরক্ত হয়নি। প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলে রেজা।

নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে মাইলখানেক এগোলেই একটি বাজার। বাজারের নাম সাকুয়া। বাজারের উত্তর দিকে হাসেম মিয়ার দোকানঘরটায় বসে আছেন ওয়াজিব আলী মাস্টার। তার হাতে এক কাপ চা—এখনো ধোঁয়া উঠছে। বয়স আর অসুস্থতা আচমকা এমনভাবে আক্রমণ করবে, তিনি কখনো কল্পনা করেননি। লিভার ড্যামেজড—জবাব দিয়ে দিয়েছে ডাক্তার। ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমিগুলো বিক্রি করলে মাদ্রাজ গিয়ে ভালো চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। কিন্তু তিনি চাচ্ছেন না জমিগুলোতে হাত দিতে। তার সন্তানসন্ততি ৬ জন। ৫ ছেলে আর ১ মেয়ে। ছেলেমেয়ের জন্য এই কাঠাখানেক জমি বাদে তেমন কিছুই রেখে যেতে পারছেন না তিনি। বয়সের ভারে চোয়াল ঝুলে পড়েছে, শরীরের এখানে সেখানে ঝুলে পড়া গায়ের চামড়া দেহঘড়ির শেষ সময়ের পাগলাঘণ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তার না আছে বিদেশ গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ধৈর্য, না আছে ইচ্ছা। অবশ্য ছেলেমেয়েরা খুব ঘাঁটাচ্ছে তাকে এ নিয়ে।

আরও পড়ুন: সেলিব্রেটি অন্ধকারের রোশনাই ॥ রুমা মোদক

৬ ছেলেমেয়ের ৫ জনই বলতে গেলে উচ্ছন্নে গেছে। সবার ছোট দুই ছেলেমেয়ে এখনো পড়াশোনা করছে—স্কুলের গণ্ডি পার হয়নি। তার বড় একজন গ্রামের এর-ওর বাড়ির গাছের ফলপাকুড় চুরি করে বেড়ায়। অন্য একজন চাকরি পেয়েছে বিডিআর-এ। তবে খুব বেশিদিন টিকতে পারবেন না তার আন্দাজ। এরকম উড়নচণ্ডী একটা ছেলে এরকম কঠোর শৃঙ্খলায় খুব বেশিদিন টেকার কথাও না। সবার বড় ছেলে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর টইটই করে ঘুরে বেড়ায়। দ্বিতীয় ছেলেটার কিছুটা গতি হয়েছে। ওসিএলএসডি হিসেবে আছে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী খাদ্যগুদামে৷ দ্বীপের ভেতর একটা ছোট অফিসঘরে একা একা পড়ে থাকে তার ছেলে। বেতনভাতা ভালো হলেও চাকরিটা পছন্দ নয় ওয়াজিব আলী মাস্টারের। এই চাকরিতে হয় অনিয়ম করতে হয়, নয়তো বেঁচে থাকতে হয়। ঘুষ লেনাদেন একদমই পছন্দ না ওয়াজিব আলীর। ছেলে গতবার আসার পর শুনেছে সেখানকার উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে। তার মনে খুব ভয়—অনিয়মে না জড়িয়ে পড়ে৷ অনিয়মে না জড়ালেও সমস্যার শেষ হয়ে যায় না—স্থানীয় রাজনীতিবিদদের অনিয়মে সঙ্গ না দিলে তাদের রোষের মুখে প্রাণও যেতে পারে। তিনি অবশ্য ছেলেকে বলে দিয়েছেন যেন এই চাকরিটা সে ছেড়ে দেয়। পড়াশোনার খরচ বাদে অন্য কিছুই দিতে পারেননি সন্তানদের তিনি—পড়াশোনার খরচও কতটুকু দিতে পেরেছেন সেটা তার জানা নেই।

৭১ এর রণাঙ্গনে ৩০ লাখ বাঙালির তাজা রক্তে ভেজা একটা পতাকা পাওয়া গেছে ঠিকই—কিন্তু সে পতাকা যারা নিয়ে ঘোরেন, আগলানোর সামর্থ্য তাদের নেই৷ থাকলেও এখন পর্যন্ত কেউই দেখাতে পারেননি৷

পিজি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মাসখানেক। শরীরটা একদম ভেঙে পড়েছে। নিজের দেশে লিভারের প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুরও ব্যবস্থা নেই। অথচ দুইদিন পর পর রেডিও বাংলাদেশ দখল করে আগন্তুকদের কণ্ঠে মিথ্যে আশার বাণী শোনা যায়। ‘আমি জেনারেল অমুক’—বলেই প্রতিশ্রুতির যে ফিরিস্তি দেন, তার কোনো সুরতহাল করা হয়নি। হলে দেখা যেতো আইয়ুব থেকে এরশাদ—সবাই মিথ্যাবাদী। খুব লুকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ওয়াজিব আলী মাস্টার।

রেজার অফিসে প্রতিদিন দুটো পত্রিকা আসে৷ দুটোই শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক। দ্বীপঘেরা এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে খবরের কাগজ পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যায়। সে তাকিয়ে আছে একটা নোটিশের দিকে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় হাজারখানেক কর্মচারী নিয়োগ দেবে জানিয়ে একটি সার্কুলার ইস্যু করেছে। সবগুলো পদই প্রধান শিক্ষকের। প্যাড কলম নিয়ে চিঠি লিখতে বসে যায় রেজা। দোয়াতে কালি নেই। পিওন শামসুলকেও দেখতে পাচ্ছে না।

—শামসুল! হাঁক ছাড়ে রেজা।

একটু পরে শামসুল এসে রুমের দরজায় টোকা দেয়। তার চোখ লাল, শরীর ঢুলুঢুলু—সালাম সাব! শরীর স্বাস্থ্য কেমন?

রেজার বুঝতে বাকি থাকে না ঘটনা কী!
—দিনদুপুরে গাঁজা খেয়ে বসে আছ নাকি?
—আমি তো স্যার সারাদিন খাই না। সকালে বিসমিল্লাহ কয়া বাঁশিতে দুইটা টান দেই৷
—বিসমিল্লাহ বলে বাঁশিতে টান দিতে হয়, সেটা কোন হাদিসে বলা আছে?

এবার কোনো জবাব পাওয়া যায় না শামসুলের কাছ থেকে। অপ্রকৃতিস্থের মতো বিরক্তিকর ভঙ্গিতে হাসতে থাকে। শামসুলকে ধমকে বিদায় করে নিজেই দোয়াতে কালি ভরে নেয় রেজা। প্রথম চিঠিটা তার বাবাকে লিখবে সে। তার বাবার এই চাকরিটা নিয়ে অনেক অভিযোগ—তার মতে, তার ছেলের অফিসার পরিচিতি খুব বেশি একটা জরুরি কিছু নয়। এই চাকরিতে চরিত্র বজায় রাখা যায় না। চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের খবরটা বাবাকে জানাতে হবে। দ্বিতীয় চিঠিটা লেখার আগে খানিক জিরিয়ে নেয় রেজা। এই চিঠিটা যাবে তার বন্ধু দবিরুলের কাছে। জগন্নাথ কলেজে সে তার ক্লাসমেট এবং হলে বেডমেট ছিল। উত্তরবঙ্গের মানুষ ভালো হয় না—এ কথাটি যে পুরোপুরি সত্যি নয়, তার প্রমাণ দবিরুল। প্রতি সপ্তাহে ক্লাস নোট থেকে শুরু করে যত দরকারি হ্যান্ডনোট, সব সে প্রতি রবিবার রেজাকে ঢাকা থেকে ডাকযোগে পাঠায়৷ মহেশখালী আসতে আসতে বেশ কয়েকদিন সময় নিলেও এটুকু উপকার অস্বীকার করা যায় না৷

ওয়াজিব আলী মাস্টারের শরীরটা খুব বেশি একটা ভালো নয়৷ পেটের পীড়া তো অনেক আগে থেকেই ছিলো—কয়েকদিন যাবত সেটা চক্রাকারে বাড়ছে। স্ত্রী-সন্তানদের জানিয়ে বিব্রত করতে চাননি। কিছু মানুষ তার জীবনের শেষ দিনগুলোতে খুব বেশি একাকী বোধ করে। বোধহয় ওয়াজিব আলী তাদের দলভুক্ত নন। গত তিন দিনে তিনি তিনটি পালাগানের আসরে তিনটি রাত পার করেছেন৷ সারারাত পালাগান শোনার পর গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সরু সড়কটি ধরে বাড়ির পথে এগোন৷ তখন তার মনে থাকে না যে তিনি একজন মৃত্যুপথযাত্রী। বাড়িতে ঢোকার পর কোলাহলমুখর সংসারজীবনের ব্যস্ততায় তার সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ির লোকদেরও বিস্মিত করে৷ তারা ভাবেন হয়তোবা আস্তে আস্তে সেরে উঠছেন তিনি। ডাক্তাররা মানুষের চিকিৎসা করেন, মানুষ তৈরি করতে পারেন না। হয়তোবা পরম করুণাময় খোদাতায়ালার কোনো বিশেষ করুণায় এযাত্রায় প্রাণে বেঁচে যেতে যাচ্ছেন আলী সাহেব। মানুষের চিন্তাচেতনা খুবই অদ্ভুত। প্রায় সব মানুষই এটা ভাবতে খুবই ভালোবাসে যে স্রষ্টা আছেন এবং পরম করুণায় তিনি এই তাকে আগলে রাখছেন। একজন ঘোর নাস্তিকও বিপদে পড়লে খোদাতায়ালার নাম অবচেতন মনে হলেও কিঞ্চিত স্মরণ করেন।

আরও পড়ুন: পরাজয় ॥ ফারহানা রহমান

ওয়াজেদ আলী যে ঘরটিতে থাকেন, সেটি আগে এ বাড়ির বৈঠকঘর ছিল। এখন বাড়ি বড় হওয়ার পর ওয়াজেদ আলী ঘরটিকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছেন৷ চে গুয়েভারা, দপ্তভয়েস্কি, আর্নেস্ট হোমিং, বিভূতিভূষণ, মানিক, আনা ফ্রাঙ্ক, শেক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, কাজী নজরুল ইসলাম—কী নেই সেখানে! ন্যূনতম অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন যে কোনো একজন এই ঘরটিতে একবার ঢুকলে তার চোখ ছানাবড়া হতে বাধ্য। এই ঘরটিকে তিনি তার নিজের মতো সাজিয়েছেন৷ নিজের পৃথিবীটাকে তিনি এই ঘরে থেকেই কল্পনা করতে ভালোবাসেন৷ জীবনের শেষ দিনগুলোতে হাতের কাছেই কত লাল নীল রঙিন আলোর ছড়াছড়ি, কত বৈচিত্র্য—আর কী চাই? এক কাপ চা, এক পৃষ্ঠা রবিঠাকুর বা লাইন কয়েক কাজী নজরুল—জীবন সুন্দর হতে বাধ্য। এ অঞ্চলের প্রথম আইএ পাস এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হয়েও বাস্তবিক অর্থে কিছুই করতে পারেননি তিনি। তার জীবনটা কেটেছে একটা মায়াবী ঘোরে৷ যে ঘোরের নায়িকা আনা ফ্রাঙ্ক বা কামিনী রায়। যে ঘোরে রবি ঠাকুর বা কাজী নজরুলরা বাঁশির সুরে ঝঙ্কার তুলে প্রলয়কাণ্ড করে—কখনো কখনো কুরুক্ষেত্রে৷ তার জীবন পালাগান মহুয়ার কোনো এক বিদ্বেষী নারী চরিত্র—যে কিনা জীবনের প্রতিকূলতায়ও বৈচিত্র্য খুঁজে পায়। বা কীর্তন গানের হরিনাম—যা তার এক জীবনের পূর্ণতার সমার্থক। হরিণ স্বভাবে বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনি৷ পেরেছেনও বটে৷ এমন কোনো কাজ নেই, যা তিনি তার জীবনে করেননি। জগতের বৈচিত্র্য আঁচ করতে গিয়ে নিজেই কখন একটা কড়ই গাছের শুকনো পাতা হয়ে গেছেন, খেয়ালও করেননি। কোনো জলবাসী ক্ষিপ্র গতির মাছ—যারা ছুটে চলে সবসময়। বিপদে বা আনন্দে। সুখে বা দুঃখে। সবসময় ছুটে চলে। শুধুই ছুটে চলে।

আজ একটা টেলিগ্রাম পেয়েছে রেজা। তার পাঠোদ্ধার সে পুরোপুরি করতে পারেনি। তবে যতটুকু বুঝতে পেরেছে, তার বাবা তাকে জরুরি তলব করেছেন। টেলিগ্রাম হাতে পেয়েই ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছিল সে। সন্ধ্যার ট্রেনেই ঢাকা এসে দুই থান পত্রিকা বিছিয়ে রাতটা কমলাপুরেই পার করে দেয়। সকাল ১০ টার ট্রেনে ময়মনসিংহ পৌঁছে চলে যায় বড়বাজার। ঈদের ছুটি কাটিয়ে আসার সময় সে খেয়াল করেছে তার বাবা পুরনো পাঞ্জাবি পরেই ঈদটা কাটিয়েছে। সেবার বাড়ির সবার জন্য কেনাকাটা করলেও বাবার জন্য কিছু নেয়নি। কয়েক দোকান ঘুরে তসরের ভালো একটা পাঞ্জাবি আর কিছু ফলমূল নিয়ে নেয়। গ্রামের বাজারে তো দূরে থাক, শহরের ঘুষের বাজারেও ভালো ফলমূল পাওয়া যায় না। নেত্রকোনা পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। তিনটার দিকে হিরণপুর স্টেশনে নেমে বাড়ির পথে এগোতে থাকে সে৷ আচ্ছা, কী হতে পারে টেলিগ্রামের কারণ? তার জন্য কি পাত্রী খোঁজা হয়েছে? নাকি বিলের পাড়ের জমিটা নিয়ে মুখলেসদের সঙ্গে ঝগড়াটা এমন কোনো সংকটের সৃষ্টি করেছে, যার সমাধানে তার সাহায্য প্রয়োজন হতে পারে? জামালদের বাড়ির পাশ দিয়ে এগোনোর সময় একবার তাকায় ওদের বাড়িটার দিকে—শৈশবের বন্ধু জামাল দিন কয়েক আগেই খুনের একটা মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ড পেয়ে এখন ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি আছে৷ প্রাণ নেওয়ার অধিকার শুধু সৃষ্টিকর্তার—তিনি নিলে সেটা দোষণীয় কিছু নয়। সৃষ্টিকর্তা যা করেন, ভালোর জন্যই করেন৷ সৃষ্টিকর্তা কাউকে খুন করেন না, তিনি প্রাণ নেন।

আরও পড়ুন: মানুষ এবং মানুষদিগের বচনসমূহ ॥ শিমুল মাহমুদ

বড্ড সুন্দর একটা জোছনা ঠিকরে পড়ছে মাটির রাস্তায়। মাটির রাস্তার ওপর চাঁদের আলোর সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা নিয়ে কেউ জন্মাননি৷ প্রকৃতিপ্রেমী কবি-লেখকরা গানে-কবিতায় অনেক চেষ্টা করে যতটুকু দাঁড় করাতে পেরেছেন, সেটা তাদের আপন সৃষ্টির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। আক্ষরিক অর্থে জোছনার সৌন্দর্য ফোটাতে পারেনি। নিজের ছায়া মাড়াতে মাড়াতে এগোতে থাকে রেজা। কাঁধের ব্যাগটার ওজন যেন হঠাৎই বেড়ে গেছে। শিউলী কামিনী হাসনাহেনার গন্ধে পুরো বাতাস ভরে আছে। আশেপাশের কোনো একটা বাড়ির বাগানে ফোটা গোলাপও যেন তাতে অনধিকার চর্চা করে বসেছে। রজনীগন্ধার গন্ধের সঙ্গে কৃষকদের খড়ের আঁটি থেকে ছুটে আসা বুনোট গন্ধ মিলেমিশে এক অপূর্ব মায়াজাল সৃষ্টি করেছে। চাঁদের আলো মাথায় নিয়ে নিজের ছায়া মাড়াতে মাড়াতে একসময় বাড়ির কাছাকাছি চলে আসে রেজা। বাড়ির সামনের পুকুর ঘাট পেরিয়ে পারিবারিক কবরস্থানের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়।

সেখানে কার যেন একটা নতুন কবর গজিয়ে উঠেছে। বাঁশের চাটাই ঘেরা অপরিচিত কবরটায় রোপন করা নবপরিণীতা একটা সুপারি গাছের পাতা দোল খাচ্ছে। বাতাসের গোলাপ-হাসনাহেনার গন্ধ হঠাৎ যেন উবে যায়৷ সুপারি গাছের তীক্ষ্ণ কর্কশ একটা গন্ধ এসে রেজার ঘ্রাণেন্দ্রিয়র দখল নেয়। আশ্চর্য হয় রেজা। অপরিচিত এক সুপারি থেকে গজিয়ে ওঠা শিশুবৃক্ষটি থেকে ছুটে আসা ঘ্রাণে সে যেন পরিচিত কোনো এক গন্ধই খুঁজে পাচ্ছে।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন