আলো-ছায়া ॥ মঈনুল সানু | চিন্তাসূত্র
৮ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১ এপ্রিল, ২০১৯ | রাত ৯:০৪

আলো-ছায়া ॥ মঈনুল সানু

এক.
নক্ষত্রখচিত আকাশ থেকে রূপালি জ্যোৎস্না নেমে এসেছে বৈশাখী পূর্ণিমা রাতে। রেল স্টেশনের হলদে আলো এড়িয়ে চোখ তুলে তাকালে মনে হয় পুবে ও পশ্চিমের বিস্তৃত প্রান্তরে সুরভিত জ্যোৎস্না ধূসরতার ছবি আঁকছে। এখনো শেষ রাতের ট্রেন এসে দাঁড়ায়নি স্টেশনে। কিন্তু প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, এই ট্রেন আরও কিছু দেরি করে এলেও ক্ষতি নেই।

বোহিমিয়ান জীবনের ক্লান্তিহীন ছুটে চলায় মফস্বলের ছোট্ট একটা রেল স্টেশনে এমন কাব্যিক রাত এর আগে খুব বেশি আসেনি আমার জীবনে। সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগী হওয়ার মতো সে জ্যোৎস্নারাতে সারাদিনের অবসাদ ভুলে মুহূর্তেই চাঙা হয়ে উঠেছিলাম। দেশলাই জ্বেলে সিগারেট ধরিয়ে দুটো টান দিতেই দূর থেকে ট্রেনের হর্নের শব্দ ভেসে এলো। মন খারাপ হয়ে গেলো আমার।
ট্রেনের কামরায় উঠে টিকিটের নাম্বার মিলিয়ে দেখতে পেলাম আমার সিটে বসে আছে সুশ্রী এক মেয়ে। এক মুহূর্তে চোখ আটকে গেলো। এ হয়তো স্বর্গের অপ্সরী নয়, তিলোত্তমা নয়, মোহিনী নয় কিন্তু একে চোখে দেখে নিঃসন্দেহে মুগ্ধ হওয়া যায়। যদি কোনো পুরুষ হঠাৎদেখায় চোখের পলক না ফেলে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মেয়েটির দিকে, তবে সে পুরুষকে অপরাধী করা চলে না।

মাঝেমাঝে নিজের প্রাপ্যটুকুও দাবি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এও ঠিক তেমন একটা অবস্থা। এই শেষ রাতের ঢাকাগামী সিল্কসিটি ট্রেনে এক যুবতীকে দাঁড় করিয়ে নিজের সিট লুফে নেওয়ার মতো সামন্ত প্রভুর মনোভাব বিসর্জন দিয়ে ট্রেনের দরজার কাছে এসে দাঁড়ালাম। ক্রমশ ট্রেনের গতি বাড়ছে। বাইরে তাকালাম। ফকফকে জ্যোৎস্নার আশ্চর্য মোহমায়ায় কতক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম মনে নেই। ভোরের আলো ফোটার আগেই কমলাপুর রেল স্টেশনে এসে পৌঁছলাম।

আরও পড়ুন: ঝিঁঝিলাগা দিনগুলো-১১॥ শিল্পী নাজনীন

প্লাটফর্ম থেকে বেরিয়ে এসে রেল স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে রিকশা খুঁজছিলাম। পাশেই দেখি মেয়েটিও দাঁড়িয়ে আছে। তাকালাম। চোখে চোখ পড়লো, সেই প্রথমবার! মেয়েটি কাছে এসে সংকোচে সুশ্রী মুখশ্রীতে কাচুমাচু ভাব এনে বললো—দুঃখিত। একইসঙ্গে আপনাকে ধন্যবাদও দিচ্ছি।
—আমাকে?
—হুঁ।
—কেন?
—প্লিজ! লজ্জা দেবেন না। ইব্রাহিমাবাদ পর্যন্তই আমার টিকিট ছিলো। বাকি পথটুকু আপনার সিটে বসে এসেছি। কেননা ওই স্টেশনে আপনি ছাড়া আর কেউ ওঠেনি আমাদের কামরায়।
—এতটা খেয়াল করেছেন?
—বিনা টিকিটে ভ্রমণ করলে না খেয়াল করে উপায় কী? বলুন।
—তা কেটে নিলেই পারতেন।
—এত রাতে নেমে যেতে সাহস পাইনি। আর শুরুতে কাটিনি। কেননা আমার ঢাকায় আসার কথা ছিল না। হঠাৎ বিশেষ একটা প্রয়োজন পড়ে গেলো। কিন্তু একটা কথা কী জানেন! আমি খুব অবাক হয়েছি।
—কেন?
—এই যে কেউ একজন সমস্ত পথ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তার সিট আমাকে ছেড়ে দিলো অথচ একবার দাবিও করলো না। ভাবা যায়!
—আমার দাঁড়িয়ে না থেকে উপায় ছিল না।
—সে কী! কেন?
—কারণ আমি টিকিট ছাড়াই এসেছি।
ভোরের অস্ফুট আলোতেও স্পষ্ট দেখতে পেলাম, মেয়েটি লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো!

দুই.
আত্মভোলা মানুষ! সারাদিন টুকটাক কাজ সারতে সারতে ভুলেই গিয়েছিলাম আজ মেঘলার এনগেজমেন্ট। মেঘলা আমার বড় খালার ছোটো মেয়ে। যখন মনে পড়লো তখন রাত দশটা। যদিও সকল আনুষ্ঠানিকতা তখন শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। তবু নিজের কাছেই নিজের দায় এড়ানোর জন্য রাত এগোরটার পরে বড় খালার মগবাজারের বাসায় এসে হাজির হলাম।

কলিংবেল চাপতেই যে দরজা খুলে দিলো, তাকে দেখে আমার বিস্ময়ে সীমা নেই। গতরাতের ট্রেনের সেই রমণী। তবু অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে মনে একটা হিসাব মিলিয়ে ফেললাম। মেয়েটি যেহেতু সিল্কসিটি ট্রেনে এসেছে কাজেই রাজশাহী থেকেই আসবে এবং নিঃসন্দেহে মেঘলার বান্ধবী হবে। মেঘলা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় মাস্টার্স করছে। তবে মেয়েটিও প্রতিক্রিয়া দেখাতে কম যায়নি! ছানাভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বললো, আরে আপনি?

আরও পড়ুন: বসন্ত এসে ফিরে যায়॥ রিঙকু অনিমিখ

দুষ্টুমি করার লোভ সামলাতে না পেরে বললাম, সেই কাক ডাকা ভোরে ধন্যবাদ দিয়ে রেখেছেন, স্বাগতম জানাতে এলাম।
ভেবেছিলাম মেয়েটি কথা খুঁজে পাবে না কিন্তু এ মেয়ে আমার ভাবনার বিপরীত। নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে জবাব দিলো, ডাকাতি করতে যে আসেননি, সেটা বুঝবো কী করে?
—এমন মূল্যবান রত্ন বারবার চোখের সামনে পড়লে যেকোনো সাধু সন্ন্যাসীরও ডাকাত হওয়ার সাধ জাগতে পারে অবশ্য!
—রত্নের নিজের কোনো মূল্য নেই কিন্তু, মানুষেরাই মিছেমিছি আরোপ করে।
—না করে উপায় আছে? এ তো চোখ ঝলসে যাওয়ার মতো অবস্থা!
—যা! কী সব বলছেন!
—আবোল তাবোল! মুখ ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে আর কী!
—মুখে লাগাম টেনে দিতে হবে এইবার।
—তাই দিন। তবে এই নিয়ে পরে না আবার আফসোস করতে হয়?
—আফসোস করবো কেন?
—লাগামহীন কথা শুনতে না পেয়ে পাগল পাগল লাগে যদি?
—লাগবে না। নিজেকে খুব ভালো করেই চিনি আমি।
—আমিও চিনি।
—কী চিনেন?
—টিকিট না কেটে পরের সিটে বসে আসেন।
—হাহাহ। খুব পাজি তো আপনি। খোঁটা দিচ্ছেন।
—কিন্তু রঙ তো দিচ্ছি না।
—মানে?
—তবু লাল হচ্ছেন যে?
—যা! অসভ্য!
—কাল রাতে দাঁড়িয়ে থাকার এই প্রতিদান?
—টিকিট না কাটলে তো দাঁড়িয়েই থাকতে হবে।
টিকিটখানা পকেটেই ছিল আমার। বের করে মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, যে বসে এসেছে সেই রাখুক এটা যত্ন করে!
শীতের শুকিয়ে যাওয়া পাতায়ও বসন্তের হাওয়া এসে দোলা দেয়, বহুদিন আত্মবিস্মৃত মানুষের মনেও কখনো কখনো দিক ভুলে প্রেম এসে উঁকি দেয়! একে কি ঠিক প্রেম বলা চলে?

সেই নির্জন রাতে যাকে দু পলক দেখেই ভালো লাগার একটা আবেশ তৈরি হয়েছিল, দৈবক্রমে আবার তার দেখা পেয়ে ভালো লাগাটা তীব্র হলো। একা পুরুষ হঠাৎ দেখায় সুশ্রী কোনো রমণীকে হয়তো পুরোপুরি ভালোবেসে ফেলতে পারে না, কিন্তু সুন্দরের কাছাকাছি থাকা নিঃসন্দেহে উপভোগ করে।

আরও পড়ুন: নজরুল ও লোকায়ত চেতনা ॥ তপন বাগচী

আমাদের সে রাতেও কথা হয়েছিল। মেঘলা পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো, আমার বান্ধবী রাত্রি! সহাস্যে বললাম, আমিও নিশাচর। একা জেগে থাকি।
রাত্রি কথা জানে। জিজ্ঞেস করেলো, জেগে থেকে কী করেন?
—রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করি।
—আর অমাবস্যা রাতে?
—মন খারাপ করে বসে থাকি।
—এরপর থেকে কবিতা লিখবেন মশাই।
—কবিতাই কেন?
—কেননা কবিতায় আনন্দ বেদনা দুইয়েরই সংমিশ্রণ থাকে।
—কাব্যে অরুচি আমার।
—আর রুচি কিসে?
—সবজি ছাড়া আর কিছু খাই না। নিরামিষভোজী।
—হাহাহ। কথায় আর পারে কে!
—জানেন তো, কথায় জিতে আনন্দ নেই মোটেও!
—তবে শুনি আনন্দটা আছে কিসে?
—মন জয়ে!
—আমার মনের ত্রিসীমানায় কড়া পাহারা! বুঝেছেন জনাব?
—দাবা খেলেছেন কখনো? ডিঙিয়ে চাল দেওয়া ঘোড়ার কাজ।
মেঘলা কাছেই ছিল। টিপ্পনী কেটে বললো, অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি! শেষমেশ কে আটকে যায়!

তিন.
এক মানুষ, তার ভেতরে বাস করে আরও একশ মানুষ! এক মানুষ আউল বাউল ভবঘুরে-এক মানুষ বাঁধা পড়তে চায় প্রবল আবেগে। কেন জানি না আমার তখন অষ্টপ্রহরজুড়েই রাত্রি নামে। দূরে দূরে থাকি তবু সদাই, পাছে ফের বন্ধনে জড়াই!
মনের ভেতরে চলছে তখন মিথস্ক্রিয়া, রাত্রিকে আমি একেবারেই মুছে ফেলতে পারি না। ফোনে কথা হয় টুকটাক, ছোট ছোট আশা দানা বাঁধে!

কিন্তু সে আশার বীজ অঙ্কুরেই মূলোৎপাটিত হয়। কেননা দ্বিধাগ্রস্ত পথিক আমি, তখনো জীবনের পথ জানা নেই। একটা বিশ্বাসই সব সময় তাড়া করে বেড়ায় আমাকে, মুক্ত বিহঙ্গের স্থির হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনো সুফল বয়ে আনতে পারে না।

এরমধ্যেই একদিন হঠাৎ করে রাত্রির সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। জৈষ্ঠের এক দুপুরে প্রচণ্ড খরতাপের মধ্যে রাত্রি দেখি নিউমার্কেটের গেটে দাঁড়িয়ে আছে। দু হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ! একটু অভিমান হলো আমার। যদিও রাত্রির সঙ্গে খুব বেশি সখ্য আমার হয়ে ওঠেনি, তবু কথা তো হয়ই মাঝেমধ্যে। রাত্রি ঢাকায় অথচ আমাকে একবারও জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি। কাছে গিয়ে অভিমান গোপন করে খোঁচা দিয়ে বললাম, কী সৌভাগ্য আমার! দিনে দুপুরে অমাবস্যার চাঁদ!

রাত্রির মধ্যে স্বাভাবিক সেই স্বতঃস্ফূর্ততা নেই। আমাকে দেখে যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। শুকনো মুখে একটুখানি জোর করে হাসি এনে বললো, কেমন আছেন?

পথে ঘাটে ঘুরে বেড়িয়ে নানান মানুষের সঙ্গে পরিচয়, কত রকম মুখশ্রীও জানা হয়ে যায়। আমি অপেক্ষা করছিলাম! খুব দ্রুতই সেই অপেক্ষার অবসান হলো। এক সৌষ্ঠব যুবক আরও কী কী সব কিনে এনে রাত্রির পাশে এসে দাঁড়ালো। রাত্রি পরিচয় করিয়ে দিলো, ইনি রাফা। আসছে শ্রাবণে আমাদের বিয়ে।

মুখে একটুখানি হাসি এনে বললাম, দাওয়াত দিতে ভুলবেন না যেন! গোটা গোটা কদমফুল নিয়ে হাজির হবো! ভদ্রলোক হেসে ফেললেন, বোধকরি রাত্রিও হাসলো এমনকি আমি নিজেও!

কোথায় যেন পড়েছিলাম, হাসিতে আমার দুঃখ ঝরে! তারপর আমার সামান্য পরিচয়টুকুও নিজেই দিলাম। বললাম, আমি রাত্রির ফ্রেন্ড মেঘলার কাজিন। ভদ্রলোক সৌজন্য দেখিয়ে বললেন, আমাদের বিয়েতে এলে সত্যিই খুব খুশি হবো।

আরও পড়ুন: একটি হলুদ চিরকুটের গল্প॥ শারমিন রহমান

খুশি সেদিন আমিও খানিকটা হয়েছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না তার কত সহজ একটা সমাধান হয়ে গেলো কিন্তু কে জানতো নজরুলের কথাটা এতোটা তীব্রভাবে প্রভাব রেখে যাবে আমার জীবনে—‘তোমারে যে চাহিয়াছে ভুলে একদিন/ সে জানে তোমারে ভোলা কি কঠিন!’

কিন্তু কাউকে ভুলে যাওয়া যত কঠিনই হোক, মানুষ কাউকেই চিরকাল সমানভাবে মনে রাখে না। সংবেদনশীল মন থেকে ধীরে ধীরে স্মৃতিও মুছে যায়। আর এই ভুলে যাওয়ার জন্য চোখের আড়ালে থাকাটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
এরপর প্রায় একমাস কেটে গেছে।

কোনো কারণ নেই কিংবা আত্মাভিমানই হবে হয়তো, রাত্রির সঙ্গে আর যোগাযোগ করা হয়নি। রাত্রি নিজে থেকেও আর ফোন দেয়নি আমাকে। আমার জীবন থেকে রাত্রির অধ্যায়টা একপাশে সরিয়ে রেখে নিজের সঙ্গে একরকমের বোঝাপড়া সেরে প্রতিদিনের যাপিত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম আগের মতো। এরমধ্যেই একদিন আষাঢ় মাসের এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় দরজায় কলিং বেলের শব্দ।

মালিবাগে একটা বাড়ির নিচের তলায় দুই রুমের ছোট একটা বাসা ভাড়া নিয়ে কোনোরকমে দিন কাটাই, একে ঠিক ভদ্রভাবে বাঁচা বলে না। সঙ্গত কারণেই দু একজন কাছের বন্ধু ছাড়া আর কেউ তেমন আসে না এখানে। সেদিন দরজা খুলে দিয়েই অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম, মেঘলা ও রাত্রি।

মেঘলা বললো, ভাইয়া এখন থেকে রাত্রি তোর প্রতিবেশী। কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, কী রকম প্রতিবেশী? মেঘলা বললো, আমাদের মাস্টার্স ফাইনাল হয়ে গেলো। রাত্রি ঢাকায় শিফট হতে চাইলো। আমাদের বাসায় থাকতে বললাম, কিছুতেই থাকবে না। তাই ওকে এখানেই, এই যে তোমার বাসার পাশেই যে লেডিস হোস্টেল, ওখানে উঠিয়ে দিলাম।
বললাম, সামনের মাসেই তো উনার বিয়ে। আবার লেডিস হোস্টেল কেন?
জবাবটা রাত্রিই দিলো। তবে কিছুটা ঘুরিয়ে।
—অন্যের ঘাড়ে চাপানোর জন্য একেবারে অস্থির হয়ে আছেন দেখছি।
—আমি চাপালাম? কেউ যদি নিজেই কারও ঘাড়ে চাপার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে, তাকে আটকায় সাধ্য কার!
কথাটুকু আমার নিজের কানেই রূঢ় শোনালো। বিষয়টিকে হালকা করার জন্য আবার বললাম, না হলে বেছে বেছে বর্ষাই কেন? কত প্ল্যান প্রোগ্রাম করে বিয়ে! বাপরে!
কিন্তু আমি কোনো কিছু বলেই বিষয়টাকে হালকা করতে পারলাম না।

রাত্রির তীক্ষ্ম কণ্ঠস্বর! ও বললো, নাচতে নেমে ঘোমটা খুলবো কি খুলবো না এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা মোটেও পছন্দ নয় আমার।
কিছুটা আহত হয়ে বললাম, দ্বিধা ঝেড়ে ফেলাই ভালো।
রাত্রি বললো, হুম। ভালো।

এরপর কয়েক মিনিটের নীরবতা। হঠাৎ রাত্রি সেই নীরবতা ভেঙে উঠে চলে গেলো, কিছুক্ষণ বসে মেঘলাও। হতভম্বের মতো একা দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। রাত্রি এভাবে কেন চলে গেলো কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না।

চার.
তার দিন দুয়েক বাদে বড় খালার বাসায় এলাম। উদ্দেশ্য ছিলো মেঘলার সঙ্গে দেখা করা। দেখাও হয়ে গেলো। এরপর কথায় কথায় অনেক কথা। গল্পের পূর্বেও যেন গল্প থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার যোগাযোগ উপন্যাসে যথার্থই বলেছেন, ‘আরম্ভের পূর্বেও আরম্ভ আছে। এ যেন সন্ধ্যাবেলায় দীপ জ্বালার আগে সকালবেলায় সলতে পাকানো।’ মেঘলা বললো, রাত্রি খুব ছোটোবেলায় বাবা মা কে হারায়। এরপর চাচার সংসারে বড় অনাদরে মানুষ। এক্ষেত্রে রাত্রির চাচাকেও দোষ দেওয়া যায় না। তার আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। রাত্রির চাচারও তিন সন্তান। তাদের মানুষ করতে যেয়েই লোকটা হিমসিম খেতো।

রাত্রি বরাবরই টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতো৷ রাজশাহীতে যে বাড়িতে রাত্রি দীর্ঘদিন টিউশনি করতো সেই বাড়ির কর্ত্রীর ছোটো বোনের ছেলে রাফা। রাফা পড়াশোনা শেষ করে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করছে। ভালো টাকা মাইনে তার। কিন্তু বিয়ে করতে কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিলো না। কে জানে বৎস্য কার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

একদিন সুযোগ বুঝে রাফাকে ডাকা হলো সেই বাসায়। ছেলেটা রাত্রিকে প্রথম দেখেই তার সিদ্ধান্ত পাল্টালো। নিজেই শুরু করে দিলো বিয়ের তোড়জোড়! মেয়েদের মন নাকি আকাশের রঙ; ছেলেদের মন বলতে আদৌ কিছু আছে নাকি কে জানে!

এর মধ্যেই রাত্রির সঙ্গে সেদিন তোর দেখা হলো। তারপর মাঝেমধ্যেই রাত্রি তোর কথা এটা সেটা জিজ্ঞেস করতো আমাকে। আমিও ঠাট্টা তামাশাও করতাম এ নিয়ে। জানি না রাত্রির মনে তোর প্রতি কোনো অনুভূতি জন্ম নিয়েছিল কিনা। কিছুটা চাপা স্বভাবের জন্য রাত্রিকে বুঝতে পারতাম না মাঝেমধ্যেই। কিন্তু রাত্রির মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করেছিলাম।

আরও পড়ুন:

রাত্রিকে যখন বিয়ের কথা বলা হলো ও হয়তো ব্যাপারটিকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যেই ওর পরিবারের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। বলেছিল, চাচা অনেক কষ্টে মানুষ করেছেন। এ ব্যাপারে ওর নিজের কোনো মত নেই। কিন্তু ওই যে বললাম, রাফা রাত্রিকে দেখেই বিয়ে করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। সে রাত্রির চাচার কাছে প্রপোজাল দিয়ে লোক পাঠালো। রাত্রির চাচা এই প্রপোজালে রাজি না হওয়ার মানুষ নন। কিন্তু রাত্রি সময় নিলো মাস তিনেক। বললো, এর মধ্যে মাস্টার্স শেষ করে নিজেও পেশাগত জীবনে প্রবেশ করবে। তারপর বিয়ে। কেননা যে মেয়ে নিজে স্ট্রাগল করে বড় হয়েছে সে পয়সাওয়ালা ছেলে পেলেই ঘাড়ে চড়ে বসবে এমনটি ভাবার কোনো অবকাশ নেই।
বললাম, বেশ তো। কিন্তু সেদিন ওমন করে তোরা উঠে এলি কেন?
মেঘলা বিরক্ত হয়ে বললো, আচ্ছা ভাইয়া তুই কি কখনো স্থির হবি না দুদণ্ড? এমন ছন্নছাড়াই থাকবি চিরকাল?

কোনোমতে দীর্ঘশ্বাস গোপন করে জিজ্ঞেস করলাম, এর সাথে ছন্নছাড়া হওয়া না হওয়ার কী সম্পর্ক থাকতে পারে? তোর বোঝার সাধ্য নেই। রাত্রি বেশ ক’দিন ধরেই তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল। আর যেতে না যেতেই তুই ওর বিয়ে নিয়ে খোঁচা দেওয়া শুরু করলি! ওর দুঃখ পাওয়া স্বাভাবিক!

ও কি নিজের ইচ্ছেয় বিয়ে করছে? আর তাছাড়া তুই বা কেমন? সারা জীবন কি দায়সারাভাবেই কাটিয়ে দিতে চাস?

সেদিন বড় খালার বাসা থেকে বেরিয়ে এসে বেশ হালকা লাগছিল। মনের ভেতর দীর্ঘদিন ধরে যে ঘুমোট মেঘ জমে ছিল, তাই যেন কেটে গেলো। খুশি হওয়ার মতো যদিও তেমন কিছু ঘটেনি, তবু মনটা চাঙা হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত আমার অবচেতন মনে এই ধারণাটাই ছিল, আমার একারই দুর্বলতা আছে রাত্রির প্রতি। আমার প্রতি রাত্রির কিছু নেই। কিন্তু আজ যখন আমার ব্যাপারে রাত্রির আগ্রহের কথাও জানতে পারলাম তখন আর সাত পাঁচ ভেবে দেখবার মতো মনের অবস্থা আমার নয়!

সেদিন বিকেলে বাসার ছাদে উঠে রাত্রির হোস্টেলের ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এক বিকেল রাত্রির হোস্টেলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মনের মধ্যে মেঘ জমলো। এ মনকে তখন বোঝা বড় দায়! অকারণেই ভালো হয় আবার কারণ ছাড়াই বিষণ্নতা এসে ছুঁয়ে যায়!

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই ছাদে থেকে নিচে নেমে এলাম। নিচে এসেই দেখি রাত্রি আমার বাসার সামনে লাল রঙের সালোয়ার কামিজ পরে দাঁড়িয়ে আছে। সুন্দর যে লালেই ফুটে উঠে রাত্রিকে না দেখলে জানা হতো না! নিজেকে লুকিয়ে রাখা গেলো না আর। মুখ ফুটে বলেই ফেললাম, ভালোবাসা যে প্রচণ্ড আত্মভিমানী করে তোলে জানতাম না আগে!
—আর কী জানলেন?
—অনেক কিছুই। এই যেমন জীবন হচ্ছে জটিল সমীকরণ, এ জীবনের হিসাব মিলে না কভু!
—এসব হিসাব কষা রাখুন এখন। ছোট্ট একটা ভালো খবর আছে। যদিও সামান্যই তবু আপনাকেই সবার আগে দিতে ইচ্ছে করছে।
—আমাকেই কেন?
—কে জানে! শুধু মনে হচ্ছিল সেদিন ওভাবে চলে যাওয়াতে আপনি দুঃখ পেয়েছেন। মনের ভেতরে খচখচ করছে খুব।
—দুঃখ পেয়েছিলাম হয়তো কিন্তু এখন ওসব কিছু মনে নেই। ফুরফুরে মেজাজে আছি!
—তাই বুঝি? কারণটা জানতে পারি?
—ওসব থাকুক এখন। আপনার গুড নিউজ শুনি।
—এখানে আসার আগেই মতিঝিলে একটা স্কুলে অ্যাপ্লাই করে রেখেছিলাম। এর মধ্যে চাকরিটা হয়ে গেছে। স্যালারি খুব ভালো না হলেও চলে যাবে আমার।
—বাহ! তবে তো মিষ্টি খাওয়াতে হয় আপনাকে।
—মিষ্টি আমার পছন্দ না। অন্য কিছু খাওয়ান।
—কী খাবেন বলুন।
—চা খাওয়াতে পারেন।
—চিনি ছাড়া?
—হাহাহ।
বাস্তবতা উপলব্ধি করেও রাত্রির কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারছিলাম না। ছোট ছোট ঘটনা, টুকটাক কথাবার্তা, এটা ওটা নিয়ে মান অভিমান, কখনো সেই অভিমান ভুলে মুক্তোঝরানো হাসির স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া! এসবই মিশে যাচ্ছিল প্রতিদিনের যাপিত জীবনে। কিন্তু জীবন একভাবে চলে না। একসময় বাস্তবতা এসে ঠিক মুখোমুখি দাঁড়ালো!
সেদিন বৃহস্পতিবার।

মালিবাগেই একটু কাজ ছিল। কাজ সারতে সারতে প্রায় সন্ধ্যা। রাস্তায় প্রচণ্ড ট্রাফিক থাকার কারণে রিকশা না নিয়ে ফুঁটপাথ ধরে হাঁটছিলাম। হোসাফ টাওয়ারের সামনে এসে দেখা হয়ে গেলো রাত্রির সঙ্গে, রাত্রির সঙ্গে সেদিন রাফাও। দুজনেই ফুচকা খাচ্ছে।
রাত্রি কি একটু হোঁচট খেলো আমাকে দেখে? ভদ্রলোক কথা পাড়লেন।
—আমরা যেদিন দেখা করি, কাকতালীয়ভাবে আপনার সঙ্গেও সেদিন দেখা হয়ে যায়। রহস্য কী বলুন তো?
—রহস্যের কিছু নেই। সামনেই আমার বাসা। চলুন চা খেয়ে আসবেন।
—না। আজ থাক। আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালোই হলো। তেরোই শ্রাবণ আমাদের বিয়ে। আপনাকে ইনবাইট করতে গিয়ে চা খেয়ে আসবো।
—বেশ তো। অভিনন্দন আপনাদের দুজনকেই।
সেদিন বাসায় ফেরার পথে; পথ এসে থেমে যাচ্ছিল পায়ে। উদ্দেশ্যহীন পা ফেলতেই বুঝতে পারলাম সামনের পথটুকু ঝাপসা! শুধু অখ্যাত এক কবির একটা কবিতার বেশ কিছু লাইন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল।

বৃত্তাবন্দি পথে
হাঁটতে হাঁটতে
মানুষ ফিরে যায় গৃহে
বেলাশেষে পাখিও তার নীড়ে।
দীপ জ্বেলে যে নবোঢ়া চেয়ে থাকে পথে
চুমো এসে ছুঁয়ে দেয় তার উষ্ণ ঠোঁটে।

দীর্ঘ বিরহ বেলা কাটিয়ে
যে রমণী এসেছে ঘাটে
পুরুষও তার সুখ খোঁজে
অবগাহন যমুনার শিহরিত স্তনে।

একা পথিক ফিরে যাবে নীরবে বিষপানে
তোমাদের রোমন্থিত চুম্বনের নীল দংশনে।

পাঁচ.
কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহ।
ঢাকায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তিনদিনব্যাপী লিট ফেস্ট উৎসবের শেষদিন। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই বেড়েছে সাহিত্যবোদ্ধাদের ভিড়, লেখক পাঠক মিলে বহু লোকের সমাগম। নানা রঙের আলোর ঝলকানিতেও প্রয়োজনীয় বই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর! অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা স্টলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ পেয়ে গেলাম। বইটা হাতে নিয়ে পাশে ফিরেই দেখি, রাত্রি!
বুকের ভেতর ঝড় উঠলেও নিজেকে সংবরণ করে নিলাম। রাত্রির পরনে জলপাই রঙের শাড়ি। চোখ দুটোয় গভীর মায়া! ও মায়াজাল থেকে বেরিয়ে আসে সাধ্য কার!

রাত্রিই প্রথম জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছেন?
—ভালো। আপনি?
—ভালো। এতদিন কোথায় ছিলেন? এখনো মনে হয় আপনার সেলফোনটা বন্ধই আছে, তাই না?
—বেখেয়ালি মানুষ! এত কিছুর কি খেয়াল থাকে?
—কিন্তু সব মানুষ তো আর আপনার মতন বেখেয়ালি নয়, কারও কারও খেয়ালজুড়ে হয়তো শুধু আপনিই ছিলেন!
—কী যা তা বলছেন!
—যাই বলি না কেন, বেখেয়ালি মানুষ কি চার মাস ধরে নিজের বাসায়ও না এসে থাকে? নাকি যখন-তখন বাসাও বদলে ফেলে?
—বদলে ফেললেই বা কার কী! এতে করে কারও কিছু আটকে থাকেনি নিশ্চয়ই।
—বটেই!
—আপনার কথা বলুন। কেমন চলছে আপনার সংসার জীবন?
রাত্রি জবাব না দিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসার বৃথা চেষ্টা করলো মাত্র। তারপর বললো, বাউণ্ডুলেদের অন্যের কথা শোনার আগ্রহ থাকে তবে?
—থাকে বৈ কি! যদি এতে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের ব্যত্যয় না ঘটে!
—এই দুঃখের সময়েও হাসালেন আপনি!
—মানে?
—বলছি। আমার সাথে একটু বসবেন প্লিজ? ওই যে পুকুরঘাটের সিঁড়িতে? যদিও এতে আপনার মূল্যবান কিছু সময়ের অপচয় হবে!
বুঝতে পারলাম, আমার প্রতি রাত্রির অভিমান বেশ গাঢ়।
বাংলা একাডেমির এপাশটা বেশ নির্জন। মানুষের কোলাহল এড়িয়ে পুকুরঘাটের সিঁড়িতে বসলাম দুজন। তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা! হঠাৎ রাত্রি মাথা নিচু করে সংকোচে জানালো, বিয়েটা হয়নি। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বিয়ে হয়নি? কিন্তু কেন?

রাত্রি আবার চুপ করে রইলো। রাত্রিকে দেখে মনে হলো এ যেন মিইয়ে যাওয়া কোনো বাসি ফুল! কিছুক্ষণ পর রাত্রি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুরু করলো, সে অনেক কথা। অনেক দিনের পুরনো ব্যথা! কিন্তু তার আঁচড় এখনো জীবন্ত মনে হয় আমার কাছে। সেই দুর্বিষহ দিনটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না। খুব ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারাই। তারপর চাচার পরিবারে বাড়তি উপদ্রব হিসেবে মানুষ। নির্দয় পৃথিবীর নির্মমতার সাথে আমার তখন থেকেই পরিচয়। এর মধ্যেই একদিন ঘটে গেলো আমার জীবনের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনাটি।

আরও পড়ুন:

আমি তখন পাড়া-গাঁয়ের স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া সদ্য কিশোরী। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি চাচির ভাই এসেছে। আমি তাকে নিজের মামার মতোই দেখতাম কিন্তু আমার সেই দেখায় তার কিছু আসে যায়নি। চরিত্রহীন লম্পট তার আসল রূপ দেখিয়ে গেছে।

দুপুরের পর চাচি বাড়ি থেকে কিছু দূরে পুকুরে গোসল করতে যেতো। চাচাতো ভাইয়েরা বাড়িতে ছিল না। চাচা গঞ্জে। সেই দুঃস্বপ্নের দুপুরে লম্পটটা আমার রুমে এসে আমার সর্বনাশ করে গেলো। ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। জ্ঞান ফিরলে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলাম, মুখ চাপিয়ে ধরলো চাচি। এই দেশে ধর্ষিত হওয়া লজ্জার, কলঙ্কের! চেপে যেতে না পারলে সেই মেয়ের কপালে যা জোটে, তা যে মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।

জীবনের ওই বিভীষিকাময় দিনটি সবসময় তাড়া করে বেড়াতো আমাকে। খুব কাছের বন্ধুদের সাথেও শেয়ার করতে পারতাম না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এ নিয়ে পীড়া অনুভব করতাম সব সময়। বিয়ের কথা উঠলেই নিভে যেতাম।

রাফার সাথে যখন বিয়ের কথা হলো তখন জীবনের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটি নিয়ে অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম জানাবো না কিছু কিন্তু এ নিয়ে দ্বিধা হচ্ছিল। কিছুতেই সেই অস্বস্তিবোধ, দ্বিধা থেকে মুক্তি পাচ্ছিলাম না। আর তাছাড়া জীবনের এই দূর্ঘটনার কথা গোপন রেখেও নতুন জীবন শুরু করতে মন সায় দিচ্ছিল না কিছুতেই।

মাঝে আপনার সাথেও পরিচয় কিন্তু আপনাকে বুঝে উঠতে পারি এমন সাধ্য আমার কোথায়? কাছে আসতে চাইলেন বটে কিন্তু ধরা দিলেন কই?

এর মধ্যে বিয়ের সময় ঘনিয়ে আসছিল। বিক্ষিপ্ত মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তেই আসতে পারছিলাম না। তবু সেদিন দুঃসাহস করে সত্যের মুখোমুখি হলাম, মুখোমুখি হলাম রাফারও!

ভেবেছিলাম রাফা যেহেতু এত পছন্দ করে, এত ভালোবাসার কথা বলে, নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে আমাকে, আমার অসহায়ত্বকে। কিন্তু সে বুঝলো না রবং খুব ভদ্রভাবে এভয়েড করে গেলো। বুঝলাম জেন্টলম্যান আর মানুষ হওয়ার মধ্যেও তফাত আছে অনেকখানি! জীবনের অত্যন্ত কঠিন সেই সময়ে কেন জানি আপনার কথা খুব মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, আর কিছু না হোক অন্তত বন্ধুর মতো আপনাকে পাশে পাওয়া আমার ভীষণ প্রয়োজন! কিন্তু আপনি তখন কই?

রাত্রি কাঁদছে!
রাত্রিকে বলার মতো আপাতত কোনো ভাষা খুঁজে না পেয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম। সেই আলো ঝলমলে সন্ধ্যার নিয়ন আলোয় রাত্রির মুখে অন্ধকার! গাল বেয়ে ঝরছে অশ্রু। আমি ঠিক জানি এ অশ্রুতে পাপ নেই; কলঙ্ক নেই, কালিমা নেই। এ অশ্রু কেবল ধর্ষক পুরুষের প্রতি অভিশাপস্বরূপ নেমে আসছে মর্ত্যের ধরণীতে, অঝর ধারায়!

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন