বিদ্রোহী ॥ কাজী মহম্মদ আশরাফ | চিন্তাসূত্র
৮ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১ এপ্রিল, ২০১৯ | রাত ৮:৫৩

বিদ্রোহী ॥ কাজী মহম্মদ আশরাফ

রফিকুল আজ অফিসে এসেছে অনেকের চেয়ে আগে। যাদের সে অপছন্দ করে, তাদের কয়েকজন এসে তাকে দেখে গেলো। যেন আজ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। আড়চোখে বিষয়টা সেও দেখেছে। কেউ কথা বলেনি, সেও না। তবে, যে বসের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করে, সে হলো রিমন হাসান। আজ তাকে দেখা গেলো না। গত বৃহস্পতিবার দেখা গেছে ম্যানেজারের নামে অনেক আ-কথা বলে গেছে। রফিকুলও কথার পিঠে কিছু বলেছে। আজ তার সেই সব কথা থেকে কোনো কথার শেকড় গজিয়েছে—সকাল বেলাই দেখা যাচ্ছে। বরাবরই সে দেখে এসেছে যারা বসের সমালোচনা বেশি করে তারাই গিয়া কথা লাগায়। রিমন দৈর্ঘ্য-প্রস্থে-ওজনে বেশ বড়লোক, ভারী লোক কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে এত হালকা, যে শুকনা ডালিম পাতার মতোই ওড়ে। নিজের ভেতর কোনো কথাই রাখতে পারে না। যা শোনে, তার সবই বলে দেয়। তবে সে কিন্তু নির্বোধ না। নিজে যা বলে ভুলেও সে বোকার মতো তা বলে ফেলে না।

মানুষ যে কত রকমের হতে পারে, তা এ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে এসে দেখছে রফিকুল। বসের কথা কী আর বলা যায়! সর্বক্ষণ তার স্ত্রী আর ছেলের কথা অফিসে গেয়ে বেড়ায়। এরমধ্যে বেশিরভাগই মিথ্যা কথা। এত পেটবানান্তি কথা একজন শিক্ষিত লোক যে কেমন করে বলে! স্ত্রীর পরিবার, নিজের ভাই-বোন—এসব পারিবারিক প্যাঁচাল শুনে অনেকেই বিরক্ত হয় কিন্তু কেউ সামনা-সামনি কিছু বলে না। রফিকুল এসব জারিজুরি বিশ্বাস করে না বলে ছোট বাক্যে মন্তব্য করলেও সে কথা বিশাল অনুচ্ছেদ হয়ে সেখানে পৌঁছে যায়।

গতকাল শুক্রবার যারা বসের তীব্র সমালোচক তাদের অনেকেই বসের বাসায় গিয়েছিল। বসের ছেলে কী এক কার্টুনমুভি দেখে ভয় পেয়ে কয়েকদিন ধরে সে অসুস্থ। এটা নিয়েই সারা অফিস ব্যস্ত। এদিকে অফিসের কাজ কতটুকু কী হচ্ছে নাকি হচ্ছে না, এটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। বসের ছেলের জন্য সবার প্রাণ যেন যায় যায়।

সাড়ে এগারোটার দিকে বস অফিসে এলেন। ছেলেকে ওষুধ গেলানোর চেষ্টার কথাই বলে বেড়ালেন আধঘণ্টা ধরে। চামচা-পরিষদ সেখানেই যেন হৃদয় বিগলিত করে বসকে চোখের জলে শুচিয়ে দিচ্ছে। এই অধিবেশনে রফিকুল উপস্থিত থাকেনি। সে একটা কাজে গিয়েছিল কিন্তু দ্রুত চলে এসেছে। আরেকটা কাগজে বসের সাইন আনতে রফিকুলকে আবার বসের রুমে যেতে হলো। সে শুনেছে, বস আবার দ্রুত বাসায় চলে যাবেন। এবার সে রুমে ঢুকেই দেখল সবাই কেমন করে তার দিকে তাকাচ্ছে। বোঝা গেলো দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয়েছে। আলোচ্যবিষয় যারা কাল বসকে সহানুভূতি দেখাতে ফল-মিষ্টি-পুতুল-খেলনা-হরলিক্স-ওভালটিন-চকলেট ইত্যাদি নিয়া যায়নি, তারাই এখন আলোচ্য বিষয়।

রফিকুলকে সবার সামনেই বস বলে বসলেন, ‘রফিকুল মিয়া, আমি ভাবছিলাম তুমি আমার ছেলেটাকে দেখতে যাবে। কিন্তু বুঝলাম তোমার পাঁজরের ভেতর কোনো হৃদয় নাই।’

রফিকুল উত্তর দেবে কী দেবে না সময় নিলো। এই সুযোগে উপস্থিত সবাই তার পরাজয় হয়েছে মনে করে মনে মনে খুশি হয়েছে। আর মনের সে খুশির ভাব চেহারায়ও ফুটে উঠেছে। রফিকুল শুধু বললো, ‘স্যার এখানে একটা সই লাগবে। আপনি যদি বাসায় চলে যান, তাই এখনই ফাইলটা সই করিয়ে নিচ্ছি।’

বস বললেন, ‘তুমি কি মনে করো আমি সাধে বাড়িতে যাচ্ছি?’

রফিকুল এবার চুপ থাকতে পারলো না। সে বলে উঠলো, ‘স্যার আপনার ছেলে অসুস্থ এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। আমি তার কষ্ট অনুভব করি। তার সুস্থতা কামনা করি। আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়াও করি। এজন্য আমাকে আপনার বাসায় যেতেই হবে? স্যার আমারও একটা ছেলে আছে কোনোদিন আপনি জানতে চাইছেন আমার ছেলেটার কথা? সে ঠিকমতো খেতে পায় কিনা, বেঁচে আছে কিনা। সুস্থ আছে কিনা? আপনার ছেলে মানুষের বাচ্চা আর আমার ছেলে কি শিয়াল-কুকুরের বাচ্চা? আপনার বেতন মাসে একলাখ বিশ হাজার টাকা আর আমার বেতন মাত্র সাড়ে ছয় হাজার টাকা। আমরা কেমন আছি কোনোদিন তো জানার চেষ্টাও করেন নাই।’

কথা কয়টি বলে রফিকুল রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। সবাই হতভম্ব। বসের স্বাক্ষরও শেষ হয়নি। মাত্র প্রথম টানটা দিয়েছেন,  কলম থেমে গেছে। সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

বস অফিস ছেড়ে চলে গেলেন কিছুক্ষণ পরে। অফিসের সবাই যেন রফিকুলকে বিদায় জানানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে লাগলো। তার তো চাকরি গেছেই বেতন-ভাতা-ফান্ড ইত্যাদি সবই বুঝি গেলো। অনেকেই শূন্যপদে নিজের আত্মীয়দের মধ্যে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে দিয়েছে।

তিনদিন ধরে অফিসে এই পরিবেশদূষণ নিয়াই কথা চালাচালি হতে লাগল। চামচা-পরিষদের অনেকে রফিকুলের কাছে ভিড়তে চেষ্টা করেছে কিন্তু পারেনি। রফিকুল একেবারে একা হয়ে গেছে। বস এই তিন দিন আসেননি। চতুর্থ দিন বস এলেন। সবাই ঝড়ের পূর্বাভাস দেখতে দেখতে তাণ্ডব দেখার অপেক্ষায় রইলো। কিন্তু বস তার অফিসে কাউকেই ডাকলেন না। বিকালে শুধু পিওনকে দিয়া রফিকুলকে কিছুক্ষণ থাকার অনুরোধ পাঠালেন। সবাই আড়চোখে চাইতে চাইতে বেরিয়ে গেলো।

রফিকুলকে বস ডেকে পাঠালেন নিজের কক্ষে। বললেন, ‘রফিকুল, তোমাদের প্রতি আমার অবিচার বড় বেশি হয়ে গেছে। আসলে তোমার মুখে যা ক্ষোভের কথা, ডাক্তারের কাছে তাই শুনলাম ব্যবস্থাপত্র হিসাবে। তোমাদের কষ্টটা বুঝতাম না। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছ। তোমার প্রমোশনের ব্যবস্থা করব। তুমি কাগজপত্র যা যা লাগে, পূরণ করে আমার কাছে জমা দাও।’

কথা শেষ করে বস সিগারেট ধরিয়ে অন্য দিকে চেয়ে রইলেন। রফিকুলের চোখ লাল হয়ে উঠলো। সে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। বসের চোখে বিষয়টা ধরা পড়লো না রফিকের চোখগুলো হঠাৎ এমন লাল হলো কেন? রাগে, ঘৃণায়, না কি কান্নায়!

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন