ঠিকানা ॥ কামরুন নাহার শীলা | চিন্তাসূত্র
৯ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৩ মার্চ, ২০১৯ | সকাল ৬:৪২

ঠিকানা ॥ কামরুন নাহার শীলা

[কামরুন নাহার শীলা। শীলা বৃষ্টি তার ছদ্মনাম। এই ছদ্মনামেই তিনি এতদিন লিখেছেন। এখন থেকে তিনি স্বনামেই লিখবেন।]

মেয়েটি যখন ট্রেন থেকে নামে, তখনো সূর্য ভালোভাবেই রয়েছে—শহরটাকে দেখাচ্ছে শহরের মতোই। মাত্র কয়েকটি শব্দই তার সম্বল, যেগুলোর ওপর ভরসা করে জীবনে প্রথমবারের মতো তার এই শহরে আসা। শব্দগুলো তার করোটিতে চক্রের আবর্ত নিয়ে ঘুরতে থাকে—ইয়াকুব সওদাগর, ষোলশহর চৌরাস্তার মোড় ও গলির মুখে সেলুন। স্টেশন ষোলশহর নয়। কাজেই তাকে প্রথমেই ষোলশহরের খোঁজ করতে হয়। রিকশাওয়ালা বললো, জায়গাটা তার চেনা, কিন্তু মেয়েটি রিকশাওয়ালাকে এমন একটা ভাব দেখালো, যেন সে বুঝতে পারে যে, সে ওখানটায় থাকে অথবা তার প্রায়ই যাওয়া হয় ওখানে। ষোলশহরে এসে সে দেখলো জায়গাটা ঢাকা শহরের মতোই গমগমে আর হইচইয়ে ভরা। আন্দাজে একটা পান দোকানদারের কাছে গিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা ভাই, ইয়াকুব সদাগরের বাড়িটা কোন্ দিকে বলতে পারেন?’ মাথা নেড়ে দোকানি তার অজ্ঞতা জানায়। তবে সে মেয়েটিকে একটি ক্ষীণ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। রাস্তা পেরোলেই মসজিদ। কাছেধারে সেই নামের কেউ থাকলে মসজিদের লোক নিশ্চয়ই তাকে চিনবে। মুয়াজ্জিনও চিনতে পারেন, ইমাম সাহেবও চিনতে পারেন। তখন নামাজের ওয়াক্তের খানিকটা দেরি থাকায় মেয়েটির মনে মসজিদের লোকদের পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে দেখা দেয়।

হ্যাঁ, মুয়াজ্জিনই চিনলেন এবং আশাপ্রদ ব্যাপার, গলির মুখেই সেলুন। সেলুন বামে রেখে তিনশো গজ গেলেই কথিত সওদাগর বাড়ি। এত সহজে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে ভেবে মেয়েটি অল্পক্ষণের জন্য তার যাত্রার ক্লান্তি ভুলে যায়। মজার ব্যাপার, বাড়িটির নামও ‘ইয়াকুব ভিলা’, যেন তার বাড়ি খুঁজে পাওয়ার সুবিধার জন্যই এমন নাম রাখা। সহজেরও সহজ, গেটে দেখা দেন স্বয়ং ইয়াকুব সওদাগরই। মেয়েটি সালাম দিয়ে বলে, ‘আমার নাম মিনা, আমি আপনার ছেলে মালেকের সাথে দেখা করতে আসছি।’ শুনে সওদাগর প্রথমে আকাশ থেকে পড়েন, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়ান। আল্লাহ তাকে কোনো ছেলেসন্তান দেননি এবং তার চারটে কন্যা। তারা সবাই স্বামীর ঘরে এবং তার চার মেয়ের কারও স্বামীর নামই মালেক নয়। নিশ্চয়ই কোথাও একটা গলদ হয়েছে। মেয়েটি সরল বিশ্বাসে সওদাগরকে তার অসহায়তার কথা জানায়। মালেককে তার খুব দরকার, এতটাই দরকার যে, তাকে না পেলে তার জীবনে দেখা দেবে চরম বিপন্নতা। শুনে ইয়াকুব সওদাগরের দয়া হয় এবং তিনি মেয়েটিকে জানান, আল ফালাহ গলিতে একজন ইয়াকুব সওদাগর আছে, তবে তার সাংসারিক খোঁজখবর তার জানা নেই। মেয়েটি বেরিয়ে আসে ইয়াকুব ভিলা থেকে। লোকটাকে তার অবিশ্বাস হয় না, তবু সে কাছের লন্ড্রিতে বসে থাকা এক লোককে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা ভাই, ইয়াকুব সাবের কি কোনও ছেলেসন্তান নাই?’ সেই লোক সমর্পিত ভঙ্গিতে বলে, ‘ওয়রওয়ালা ন চাইলে থাইব হডেত্তুন!’

যাত্রার ক্লান্তি আর ক্ষুধাতৃষ্ণার সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হওয়া আশাভঙ্গের বেদনায় ভীষণ বিধ্বস্ত দেখায় তাকে। সংযোগ পাওয়া যাবে না জেনেও আরেকবার ডায়াল করে মালেকের নম্বরে।

আল ফালাহ গলিটা দূরে নয়, তবে খানিকটা হেঁটে রাস্তা পেরোতে হয়। যাক, এখানেও গলির মুখে সেলুন আছে, তবে পাশাপাশি দুটি। প্রথম সেলুনের একটা লোক মিনাকে আশ্বস্ত করে, পাঁচটা বাড়ি পরেই ইয়াকুব সওদাগর থাকে। কাছে গেলেই মনে বেশ একটা ইতিবাচক আবহ জেগে ওঠে মিনার। বাড়িটা লোকে ভরপুর। কেউ একজন জোরে গান শোনে, ‘ও আমার রসিয়া বন্ধু রে, তুমি কেন কোমরের বিছা হইলা না!’ মিনাকে তখন ক্লান্তি একটু-একটু করে আচ্ছন্ন করছে। তার তীব্র পিপাসা বোধ হয়, ক্ষুধা তাকে আক্রমণ করেছে আরও আগেই। একটা চায়ের দোকানে বড় কড়াইতে পেঁয়াজু ভাজা হচ্ছে। মজাদার তৈলাক্ত ঘ্রাণ তার ক্ষুধাকে উসকে দেয়। কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে সে ইয়াকুব সওদাগরের বাড়ির দিকে যায়। জানা গেলো, এটা ‘ইয়াকুব’ নামের সওদাগরেরই বাড়ি, তবে বাড়িওয়ালা নিঃসন্তান। গোটা বাড়িতে তাদের তিন ভাইয়ের সংসার বিন্যস্ত এবং এই দুর্দিনেও সেটি একটি উল্লেখযোগ্য একান্নবর্তী পরিবার। মিনাকে দেখে বড় বউয়ের মনটা আর্দ্র হলে সে তাকে একটা সন্দেশ আর একগ্লাস পানি খেতে দেয়। কথায়-কথায় মিনার মনের সঞ্চিত দুঃখের কথাও তার অনেকখানি জানা হয়ে যায়। মালেক তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং শিগগিরই তাদের মধ্যে বিয়ে হওয়ার কথা। কিন্তু মাসখানেক হলো তার কোনো সংবাদ নেই। এখন হতে পারে, সে তাকে বিয়ের ফাঁদে ফেলে চম্পট দিয়েছে অথবা সে কোনো দুর্ঘটনার শিকার। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং দিনে-রাতের কোনও সময়েই সংযোগ মেলে না সেটির। মেজো বউ আবার খানিকটা সন্দেহবাতিকগ্রস্ত। শুনে বলে, ‘বউতকিয়া এইল্যা কয়। কই মন গলাইতু চায়, পরে কইবু, আঁই বড়ো মুসিবতত পইজ্জি, আঁরে এককানা সাহাইয্য গরন!’ দুর্বোধ্যপ্রায় বাক্যগুলোর মানে বুঝতে মিনার কষ্ট হয় বেশ এবং এর বিরোধিতায় মিনা দৃঢ়তার সঙ্গে তার অবস্থান ব্যক্ত করে। কোনো করুণা বা অর্থের সহায়তা নয়, সে কেবল ‘মালেক’ নামের যুবকটিরই খোঁজ করছে।

দ্বিতীয় ইয়াকুব সওদাগরের বাড়ি থেকেও বের হয়ে আসে মিনা। যাত্রার ক্লান্তি আর ক্ষুধাতৃষ্ণার সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হওয়া আশাভঙ্গের বেদনায় ভীষণ বিধ্বস্ত দেখায় তাকে। সংযোগ পাওয়া যাবে না জেনেও আরেকবার ডায়াল করে মালেকের নম্বরে। মিনা মনেপ্রাণে চায়, মালেকের ফোনটা অন্তত একবার বাজুক। মিনার এখনো বিশ্বাস, তার খোঁজে মিনা এত দূর এসেছে জানলে মালেক ছুটে আসবে তার কাছে। কিন্তু না, এবারও কোনো আশার সংকেত দেয় না সেটি। মিনার মনে পড়ে, একসময় তার নিজের ফোন বন্ধ থাকলে কী রাগটাই না করতো মালেক! তাদের পরিচয় শুরু হয়েছিল রং নাম্বারের ফাঁদে পড়ে। কিছু ফাঁদ যে এমন মধুর হতে পারে, তা মালেকের  কথার ফাঁদে না পড়লে মিনা টেরই পেতো না। বাপের মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে হালুয়াঘাট ছেড়ে রাজধানীতে এসেছিল গার্মেন্টসের হেলপার হয়ে। চাকরিটা পাওয়া গেছে অবশ্য আগে থেকেই ঢাকায় বসবাসরত গার্মেন্টসকর্মী বোন আর দুলাভাইয়ের সুবাদে। সব ভালোই চলছিল। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তার প্রতি দুলাভাইয়ের আগ্রহ টের পায় মিনা, যা অজানা থাকে না মিনার বড় বোনেরও। নিজের স্বামীকে কিছু না বললেও মিনার জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল আপা। এই সংসার ছেড়ে সে দূরে চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু বেতনের বিপরীতে অচেনা শহরের বুক-কাঁপানো ডামাডোলে তার ডান পা এগোয় তো বাম পা পিছায়। তার ওপর প্রতিনিয়ত সুপারভাইজার মোস্তাক আর লাইন চিফ সোবহানের ইশারাইঙ্গিতে মনে হয়েছে এই শহরটা ভরে আছে লুইচ্চা আর বদমাশে। সহকর্মী শেফালী তাকে তার সঙ্গে বাসাভাড়া করার বুদ্ধি দিলেও সে চুপ থেকেছে। শেফালীও বিবাহিত এবং ওখানেও যে ‘দুলাভাই ঘটনা’র পুনরাবৃত্তি ঘটবে না—এ নিয়ে তার মন নিশ্চিত হতে পারেনি। ঘরে ফিরলেই আপার কালো মুখ দেখতে দেখতে আর মুখঝামটা খেতে খেতে তার মনে হতো এর চেয়ে বরং গাঁয়ে ফিরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু দারিদ্র্যের উৎকট হা আর বুড় মায়ের হাহাকার যেন গিলে নেয় মিনার সমস্ত বর্তমান। অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ—এই তিনকালই আসলে টাকার জোরে টিকে থাকে, মিনা বুঝতে পারে। বেতন পাওয়ার দিনটাই শুধু আপা ভালো থাকে। বেতনের অর্ধেক টাকা আপার হাতে তুলে দেয় সে অনেকটা ভয়েই, যেন এটা তার থাকা-খাওয়া বাবদ খরচ নয়—এই বিরূপ শহরে অসহ্য বোনকে সহ্য করে নেওয়ার ঘুষ মাত্র। দুলাভাইয়ের ছোঁকছোঁকানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আপা টের পেয়ে যাওয়ার পরপরই, কিন্তু আপার মনে সন্দেহের যে বীজ বোনা হয়েছিল, সেটি দিনে-দিনে শীতের শিমগাছের মতোই লকলকিয়ে বেড়ে চলেছিল কোনো আলগা যত্ন ছাড়াই। এমন দিনে আবদুল মালেক যেন বেহেশতের চাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল মিনার সামনে। মালেক চিটাগাঙের ছেলে। খাতুনগঞ্জে নিজেদের ব্যবসা—এমনই বলেছিল সে। সম্পর্কের কথাটা জানতে পারার পর আপার প্রশ্রয়ের ব্যাপারটা ছিল অচিন্ত্যনীয়! বোন আর দারিদ্র্যকে একসঙ্গে বিদায় করার এমন অভাবনীয় সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি মিনার বোন নাজমা।

টুংটুং শব্দে সম্বিত ফেরে মিনার। জায়গাটায় লোকসমাগম নেহায়েত কম নয়। যদিও মানুষের কৌতূহল তাকে বিব্রত করে, তবু এই জনমানুষের ভিড়ই তাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে—এমনই ভাবে সে। নতুন উদ্যমে খোঁজ শুরু করে সে আবদুল মালেকের।

মিনার সৌভাগ্যই বলতে হবে। আরেকজন ইয়াকুব সওদাগরের খোঁজ পাওয়া যায় এবং তার সম্ভবত চারটে ছেলে আছে। যদিও আল ফালাহ গলির ইয়াকুব সেই ইয়াকুব সম্পর্কে এর বেশি জানে না। যতটুকু তার জানা, তাতেই মিনার সামনের অনিশ্চিত রাস্তাটা একলাফে বেশ খানিকটা সরু হয়ে আসে। তখন সে হাতের কাপড়ের ব্যাগটাকে গুছিয়ে নিয়ে উল্টোদিকে রহমান নগরের গলির দিকে পা বাড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে ভেতরের ক্ষুধাটাকে আশ্বস্ত করার প্রাণপণ চেষ্টা চালায় সে। হয়তো সূর্য নিভে যাওয়ার ইঙ্গিতে সে তার পথের শেষেরও একটা মিল খুঁজে পায়। আর নিশ্চয়ই কোনো ইয়াকুবকে খুঁজতে হবে না তার। এই তার শেষ ইয়াকুব এবং এই ইয়াকুব যদি আসল ইয়াকুব হয়, তবে তার মূল লক্ষ্য মালেকও হবে আসল মালেকই। কাজেই এক আসলের মধ্যে দুই আসলের লুকিয়ে থাকা মিনার মনের আশাকে কেবলই প্রেরণা জোগাতে থাকে।

আল ফালাহ গলির ইয়াকুবেরা যেমনটি বলেছিল, তেমনই বড় বাড়ি, আলিশানই। চারদিকে অনেক নারকেলগাছ দেখে মনে হয়, এরা নারকেল কিনে তো খায়ই না, পারলে বিক্রিও করে। ভারী লোহার গেট বাড়ির আভিজাত্যকে বেশ গম্ভীরভাবে ধরে রেখেছে। একজন মাঝবয়সী দারোয়ান এসে তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কারে চন যে?’ ইয়াকুব সওদাগরের ছেলে মালেকের খোঁজ জানতে চাইলে দারোয়ানের মধ্যে একধরনের চাঞ্চল্য দেখা দেয়। তাকে সে বড় বাড়ির সামনের যে-ঘরে বসতে দেয়, সেটাও বিশাল কক্ষ। মুহূর্তের মধ্যে, গোটা বাড়ি ছেঁকেই, লোকজনের আগমন ঘটে এবং তারা এসেই সামনের সেই ঘরে জড়ো হয়, যেখানে মিনার অবস্থান। দেখে মিনার আনন্দ ধরে না—সবাই এত উৎসাহ নিয়ে দেখতে এসেছে তাকে! ভেবে অনেক কষ্টের মধ্যেও মিনার ভালো লাগতে শুরু করে। কিন্তু সেটা স্বল্পস্থায়ী হয়। সপ্তাহখানেক আগে গৃহপরিচারিকার কাজে যোগ দেওয়া এক যুবতি বাড়ির সবাইকে খাবারের সঙ্গে ধুতুরা বা কিছু একটা মিশিয়ে টাকাপয়সা ও সোনাদানা নিয়ে পালিয়েছে। তারই জের তখনো বিদ্যমান সারাবাড়িতে। কেউ মারা না পড়লেও বিশাল ধকল বয়ে গেছে সবার ওপর দিয়ে। বাড়ির বড় বউ তখনো হাসপাতালে। ইয়াকুব সওদাগরের ছোট ছেলে আবদুল মালেক হাসপাতালে তার বড় ভাবির তদারকিতে ব্যস্ত। ঘটনাটা মর্মান্তিক হলেও মিনার জেনে ভালো লাগে যে আবদুল মালেকের দেখা মিলেছে। তারা চার ভাই, অন্য তিনজন—আবদুল মোতালেব, আবদুল আজিজ ও আবদুল মাবুদ। বাপের নামে ‘আবদুল’ না থাকলেও প্রতিটি ছেলেই ‘আবদুল’যুক্ত। মিনার স্থির বিশ্বাস, আবদুল মালেকের খোঁজ মিলেছে।

কোনো প্রতারণার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা দূরে থাকুক, তার কাছঘেঁষাও সম্ভব নয় ‘প্রতারণা’ বলে কথিত জিনিসটার।

মিনার কথা শুনে ইয়াকুব সওদাগর ও তার অন্য ছেলেরা এবং বাড়ির অন্য লোকেরাও ঠিক বুঝতে পারে না তাদের মধ্যকার সম্পর্কের সূত্র। শুনে মিনা বলে, যদি তারা মনে করে যে, সবই তার বানানো গল্প, তাহলে তারা অন্তত আবদুল মালেকের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুক। তারা মালেকের নিজের মুখেই শুনুক যে, সে মিনাকে বিয়ে করবে বলে কথা দিয়েছে কি না। মালেক তার সঙ্গে এমনই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সেতুতে দাঁড়ানো যে, আজ বলতে গেলে মিনা বাধ্য হয়ে তার খোঁজে বেরিয়েছে, যখন তার অনুপস্থিতিতে সেতুর অন্য দিকটির ধসে পড়ার উপক্রম। তবু ইয়াকুব বাড়ির লোকেরা কেমন বোকা-বোকা দৃষ্টি নিয়ে মিনাকে পরখ করে। কারণ তাদের কাছে বাড়ির সবচেয়ে বোকা-সরল ছেলেটির নাম আবদুল মালেক। এমন দুর্দিনে কেউ যখন একটা মিনিট সময় দিতে চায় না, তখন একমাত্র আবদুল মালেকই ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালে গিয়ে বসে থাকে বড় বউয়ের বেডের পাশে। সেই মালেক এক রমণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়েছে এবং  তাকে বিয়ে করবে বলেও কথা দিয়েছে। কথা দিয়ে হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেছে—এমন জটিল ধারাবাহিকতার কথা মালেকের সূত্রে ভাবতে পারাটা সত্যি তাদের সাধ্যে কুলোয় না। তারা কেউ মিনাকে বিশ্বাস করে, কেউ করে না। তারা ভাবে, মিনা সেই রমণীদের একজন, যে সুযোগ পেলে আবারও তাদের সবাইকে খাবারের সঙ্গে ধুতুরা মিশিয়ে অজ্ঞান করে বাতাসে মিশে যাবে। ঠিক আছে, আবদুল মালেক কখন আসে তার কি কোনও ঠিক আছে! বরং তাকে খবর দেওয়া হোক। সে এসে দেখুক যে একজন নারী তার খোঁজ করছে এবং ব্যাপারটা বাড়িময় কেমন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

আসে আবদুল মালেক এবং দেখে এক ছিপছিপে যুবতি তাদের বাড়ির বসার ঘরের হলুদ সোফার মধ্যে বসা এবং তার পাশে দামি মোজাইকের মেঝেতে একটা কাপড়ের ব্যাগ রাখা। আকাশ থেকে পড়ে মালেক। কিছুকাল আগে এরকম এক যুবতিই তাদের বসার ঘরে এসে ঢোকে কাজের খোঁজে। তারপর তো সবটাই জ্ঞান-হারানো কাহিনি। শুনে আকাশ থেকে পড়া মালেক উল্টো আবার আকাশে গিয়ে ওঠে এবং আবার সে পড়ে আকাশ থেকেই, দ্বিতীয়বার। বলে কি ইয়াকুব বাড়ির লোকেরা! মেয়েটি তারই খোঁজ করে অথচ জীবনে তাকে কখনো দেখেছে কি না, মালেকের মনে পড়ে না। আকাশ থেকে পড়ে মিনাও। এই যদি হয় প্রকৃত আবদুল মালেক, তাহলে সেও আজই প্রথম তাকে দেখলো। সে স্থির নিশ্চিত ও হতাশ স্বরে বলে, ‘আমি যারে খুঁজি সেই আবদুল মালেক এ না!’ জেনে ইয়াকুব বাড়ির লোকদের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। তারা অন্তত সবাই নিজেদের এ-কথা বলে আশ্বস্ত করতে পারে যে, পৃথিবীর সবচেয়ে সরল প্রকৃতির ছেলে এখনো আবদুল মালেকই। কোনো প্রতারণার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা দূরে থাকুক, তার কাছঘেঁষাও সম্ভব নয় ‘প্রতারণা’ বলে কথিত জিনিসটার। ওদিকে ঘাম দিয়ে মিনার যেন জ্বরই আসে। মালেককে দেখে এবং নিশ্চিত হয় যে, তাকে আবারও বেরোতে হবে মালেকেরই খোঁজে, তার আগে আবার ইয়াকুব সওদাগরের খোঁজে। সমস্ত অনিশ্চয়তা ও তার পাশাপাশি মিনার পিপাসা ও ক্ষুধা তাকে চূড়ান্ত নোটিশ দিতে থাকলে মিনার মাথার ভেতরটায় একটা প্রবল ঘূর্ণন তাকে কাবু করে ফেলে। তার মনে পড়ে যায়, ‘আবদুল মালেক আমরার লাইগা আল্লার খাস নেয়ামত’—আপার এ-কথার উত্তরে মালেক নিচুমুখে ভাত মাখাচ্ছিল ডালচচ্চড়ির সঙ্গে। খাওয়ার পর খানিকটা বিশ্রামের নামে মিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে হতে বলেছিল, ‘ভালোবাসা আর নেয়ামত এক কথা না। ভালোবাসা টিকাইতে জোর কপাল লাগে। কপালে ছিল না বলেই লাইলি-মজনুর প্রেম কোনো ঠিকানা পায় নাই।’

কপালের দোহাই দিলেও সেদিন আবদুল মালেকের প্রেমে আত্মহারা মিনা তাদের ভালোবাসার ঠিকানা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেনি। সন্দেহ এসেছিল প্রথম সেদিন, যেদিন পরপর তিনদিন ধরে আবদুল মালেকের মোবাইল ফোনটি অনবরত বন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। সেদিন মিনার মগজে কুটকুট করে কামড় বসিয়েছিল মালেকের সঙ্গে শেষ দেখার দিনটির ঘটনা। শুক্রবার হলেও দুলাভাই সেদিন জেনারেল ডিউটির উদ্দেশ্যে ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিল। সাধারণত এমন দিনগুলোকেই কাজে লাগাত মিনা আর মালেক। সেদিন মিনার হাতের ডিমখিচুড়ি খাওয়ার আগেই তার ঠোঁটে চুমু খেয়েছিল মালেক। বলেছিল, ‘ভাই-ভাবি তোমাকে দেখতে চায়।’
—আমারে নিয়া চলো একদিন তাদের কাছে।
—নাহ, আমি বলছি, দেখতে হলে একবারে বউ বানানোর মন নিয়াই দেখতে হবে আমার মিনাকে। বলে গাল টিপেছিল সে মিনার।
লজ্জা পেয়ে বলেছিল মিনা, সেইটা আবার কেমন!
—কেমন আর কী! ওরা আসবে, তোমারে আংটি পরায়ে যাবে।

মুহূর্তেই ‘কলোনি’ নামের ইটকাঠের এই আধুনিক বস্তিকেই স্বপ্নপুরী মনে হয়েছিল মিনার। মালেকের সঙ্গে সত্যি তার বিয়ে হবে! দুই বোন ও বাড়ির অনেকের মধ্যে মিনাই কিছুটা রূপসী ছিল বলে তার বিয়ের ব্যাপারে সবাই নিশ্চিন্ত ছিল—আমাগো মিনার বিয়া রাজঘরে হইব। আমরার রূপের কইন্যা মিনারানি রাজরানি হইব! এমন বলে কত ঘুম পাড়িয়েছিল বুড়ি দাদি। কিন্তু বাস্তবতা দাদির আদরের মতো কোমল নয়। এখানে সবাই শুধু ভোগে বিশ্বাসী, কেউ সংসারের স্বপ্ন দেখায় না। কী করে দেখাবে, বেশিরভাগই যে দুলাভাই, মোস্তাক আর সোবহানের মতো। যারা এদের বাইরে তাদের চোখে আবার মিনার গরিবানা কদর্য হয়ে ধরা পড়ে কিছুদিনের মধ্যেই। এমন স্বার্থপর, লুইচ্চা, বদমাশ আর লম্পটে ভরা পৃথিবীতে একমাত্র মালেকের সঙ্গ আর আশ্বাসই মিনাকে এক রঙিন আর নিজস্ব রাজ্যের সন্ধান দিয়েছিল। সেদিন আংটি পরানোর কথায় মিনা যেন সেই রাজ্যের একমাত্র রানি হয়ে উঠেছিল।
—ভাবিকে বলছি, সামনের সপ্তাহেই য্যান তোমাকে আংটি পরায়ে যায়।
আহ্লাদে আটখানা হয়ে মিনা ভেবেছিল—উচিত শিক্ষা হবে দুলাভাইয়ের!
—কিন্তু জানো! মালেকের কথার উদ্বেগে থমকে যেতে হয়েছিল তাকে।
—এক হারামজাদা তিরিশ হাজার টাকার মাল নিছে দুইদিনের মধ্যে টাকা শোধ করবে বলে। আজ দেয়, কাল দেয় বলে খালি ঘোরাচ্ছে। এদিকে হাতও একদম খালি। অ্যাংগেজমেন্টের খরচ, আংটি কেনা, কিভাবে যে সামলাই সব! মিনার উৎকণ্ঠিত চেহারার পানে চেয়ে এবার অপরাধী ভঙ্গিতে বলে উঠেছিল মালেক—না, না। তুমি টেনশন নিয়ো না। আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। নইলে অ্যাংগেজমেন্টের তারিখ হয়তো পিছাইতে হইতে পারে কিছুদিন।

তবু এটা তো সত্যই, মিনা শোনে তার ভিতর থেকে কেউ তাকে বলছে—এভাবে বসে থাকলে বমি কি আর তোমাকে ছাড়বে!

‘ঠিক ম্যানেজ করে নেব’—কথাটায় মিনা শঙ্কামুক্ত হলেও পর-মুহূর্তেই বিমর্ষ হয়ে গিয়েছিল, অ্যাংগেজমেন্টের তারিখ পেছানোর প্রসঙ্গে। ক্ষীণস্বরে বলেছিল, কত টাকা খরচ হইতে পারে অ্যাংগেজমেন্ট বাবদ?

—তোমার জন্য ভালো একটা শাড়ি, কিছু কসমেটিক, আংটি, দই, মিষ্টি সব মিলিয়ে কত আর হবে! এই ধরো হাজার বিশেক। আধশোয়া হয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কোলে রাখা মিনার চুলে হাত বোলাচ্ছিল মালেক।

মিনা একটুক্ষণ ভাবলো। জমানো টাকাগুলোর কথা ভাবলো। বহুদিন ধরে তিল-তিল করে জমিয়েছে সে টাকাগুলো। কত হতে পারে মোট? দশ, বারো, না চৌদ্দো? খাট থেকে ধীরে-ধীরে নেমে সে বাথরুমের পাশের অন্ধকারাচ্ছন্ন আলনার পিছনে রাখা বাকশোটা খুলে কাপড়ের তলা থেকে বের করে আনল বেগুনি রঙের পুটলিটা। আলুসেদ্ধর মতো দলা-পাকানো কিছু নোট। জলদি গুনে দেখলো। সব মিলিয়ে তেরো হাজার চারশো তিরিশ টাকা। ভালোবাসার মানুষ যদি ঝামেলায় পড়ে, বিশেষত ঝামেলা যখন তাকেই নিয়ে, তখন কী লাভ এই টাকা আঁকড়ে রেখে? টাকা তো টাকা, মালেক যদি তার কলিজাটাও চেয়ে বসে সেটাও তার হাতে তুলে দিতে পারতো সে অম্লানবদনে।

অকস্মাৎ এতগুলো টাকা পেয়ে প্রথমত বিস্মিত ও মুখে ‘না না’ করলেও টাকাগুলো পকেটে নিয়ে মিনার কপালে শেষ চুমু খেয়ে বের হয়ে গিয়েছিল মালেক। আগামী সপ্তাহের মোহময়ী আহ্বানে ব্যাকুল হয়েছে মিনা। আগামী সপ্তাহ আর আসেনি। তবু মিনা ভেবেছিল ব্যস্ততায় মালেক বেচারার বেশামাল অবস্থা, যা সে ফোনেও বলেছিল বারবার। কিন্তু বাহাত্তর ঘণ্টা একনাগাড়ে মোবাইল ফোনের অচল অবস্থায় আশঙ্কায় তার বুক কেঁপেছিল। শেষ যোগাযোগের পর আজ দুমাস মালেকের কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। মিনার বোন নাজমা তাদের মুঠোলব্ধ সুদিনের এহেন অপঘাতজনিত মৃত্যুতে যে-রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিল তা সহ্য করা মিনার বর্তমান অবস্থায় দুঃসাধ্য ছিল। তাছাড়া আবদুল মালেকের খোঁজ পাওয়া মিনার অস্তিত্বকে এবং তার সঙ্গে বয়ে বেড়ানো আরও এক অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য অবশ্য খুব জরুরিও ছিল। তাই এক কাকডাকা ভোরে কাপড়ের কালো ব্যাগটায় তার সমস্ত সম্বল নিয়ে ও সবচেয়ে বড় সম্বল আবদুল মালেকের ঠিকানাসংবলিত শব্দ তিনটিকে হৃদয়ে ধারণ করে চিটাগাঙের ট্রেনে চেপেছিল মিনা। তারপরের কাহিনী এই। আজ সারাদিনের ইয়াকুব সওদাগর ও আবদুল মালেক গোলকধাঁধা এবং পূর্ববর্তী ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সূক্ষ্ম সংযোগের ইঙ্গিত পেয়ে মিনা ঘামতে থাকে। এগুলোর সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষায় অস্বীকৃত হয়ে পেটের সন্দেশ হঠাৎ বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসে। তার মাথার মধ্যেই ইয়াকুব বাড়ির বসার ঘর এবং তার মধ্যে থাকা লোকজন ও আসবাবপত্র সবকিছু ঘুরতে থাকে। মিনা ভাবলেও জানে যে এটা ভূমিকম্প নয়, তার নিজেরই কম্প। সেই কম্পমানতা সরাসরি তার উপরেই হামলে পড়ে, একমাত্র সে-ই যে সব উৎপাতের হেতু সে-কথাটাকে প্রমাণ করার জন্য।

মিনা হড়হড় শব্দে বমি করতে শুরু করে, যদিও এমন সুন্দর দামি মোজাইকের মেঝেটাকে সে বমি করে নষ্ট করতে চায়নি। বাড়ির মানুষের হতবিহ্বল অবস্থার মধ্যে সে উঠে দাঁড়াতে যায়। বাথরুমটা কোথায়—বলে ক্লান্ত গলায়, যদিও অদৃশ্য সুতোয় ঝুলতে থাকা প্রায় উপলব্ধিহীন এক আশায় এখনো আশান্বিত আছে সে। কিন্তু নতুন উদ্যম ধারণ করার মুহূর্তেই পুনরায় সে হতোদ্যমই হয়ে পড়ে যেন। এই নিয়ে তিন-তিন ইয়াকুবকে পেলেও আসল ইয়াকুবকে তার পাওয়া হয় না। আবার তিনবারের পর মালেককে পাওয়া গেলেও শেষপর্যন্ত আবারও ইয়াকুব এবং আবারও মালেককেই তাকে খুঁজে বের করতে হবে। এমন জট সে খোলে কী করে! বরং তার চেয়ে বমি অনেক সহজ একটা কাজ বলে মনে হয়। মিনা আবার বসে পড়ে ধুপ করে। ‘ওয়াক’ শব্দে যেন উপড়েই ফেলতে চায় সমস্ত সমস্যার মূলটাকে।

মিনা বমি করতে করতে দেখে সুন্দর মোজাইকের ওপরে ছিটকে পড়া তরল ও কঠিনের মিশ্রণ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে কেমন একটা মানচিত্র-মানচিত্র ভাব তৈরি করেছে, যেখানে অনেক কিছুকেই চেনা-অচেনা রাস্তাঘাটের মতোই দেখায়। তবু এটা তো সত্যই, মিনা শোনে তার ভিতর থেকে কেউ তাকে বলছে—এভাবে বসে থাকলে বমি কি আর তোমাকে ছাড়বে! তোমাকে তো একটা পথ খুঁজে বের করতেই হবে যেখানে থাকে ইয়াকুব সওদাগর এবং তার ছেলে আবদুল মালেক।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


২ Responses to “ঠিকানা ॥ কামরুন নাহার শীলা”

  1. আনোয়ার রশীদ সাগর।
    জানুয়ারি ৬, ২০১৯ at ২:০৪ অপরাহ্ণ #

    ভাল লাগল গল্পটি।আরো পড়তে চাই শীলার গল্প।

    • শীলা
      জানুয়ারি ৮, ২০১৯ at ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ #

      অনেক ধন্যবাদ, পড়ার জন্য। 🙂
      আনোয়ার রশিদ সাগর

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন