ঝিঁঝিলাগা দিনগুলো-৬॥ শিল্পী নাজনীন | চিন্তাসূত্র
৮ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১ এপ্রিল, ২০১৯ | রাত ১০:২০

ঝিঁঝিলাগা দিনগুলো-৬॥ শিল্পী নাজনীন

অরুন্ধতীকে নিয়ে বসে তিতলি। সাধারণত বাদলই পড়ায় তাকে অফিস থেকে ফিরে। তিতলির সঙ্গে অরুর পড়াশোনার বনিবনাও নেই তেমন। পান থেকে চুন খসলেই রেগে আগুন হয়ে ওঠে সে। নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না নিজের ওপর। গায়ে হাত তোলে মেয়ের। সে কারণে তিতলিকে অন্তত পড়াশোনার ব্যাপারে ভয় পায় মেয়ে। পড়াশোনায় কোনো ভুলচুক সহ্য করতে পারে না তিতলি, জানে মেয়ে। তবে মেয়েকে কখনোই চাপ দেয় না তিতলি পড়ার ব্যাপারে। সে সব সময় বলে, তোমাকে ক্লাসে প্রথম হতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু যেটুকু পড়বে, শুদ্ধভাবে পড়বে, যা শিখবে, ঠিকঠাক শিখবে, বুঝে শিখবে।

অরুন্ধতী সে কারণে আরও ভয় পায় মাকে। সারাক্ষণ মনে হয়, এই বুঝি কোনো প্রশ্ন করে বসবে মা, আর সে ভুল উত্তর দিয়ে ধোলাই খাবে আচ্ছা করে। সে তুলনায় বাবার সঙ্গে সে অনেক সহজ, অকপট। সব আব্দার-আহ্লাদ বাবার জন্য তুলে রাখে অরু। দিনশেষে উজাড় করে বাবার কাছে।

আজ ফিরতে দেরি করছে বাদল। অফিসের মিটিং সেরে বের হতে দেরি করেছে, পথে আটকে আছে জ্যামে। ফলে তিতলিকেই বসতে হয় অরুন্ধতীকে নিয়ে। পরীক্ষা, আসছে সপ্তাহ থেকে। তিতলি পড়াশোনায় ভালো। কিন্তু তার মন সারাক্ষণ পড়ে থাকে দুষ্টুমি আর খেলায়। তবে তার মধ্যে একটা ব্যাপার ভালো। সে পড়াটা নিজ দায়িত্বেই করে। তাড়াহুড়ো করে খুব, ভুলভাল করে, কিন্তু বাবা বা মায়ের আশায় ফেলে রাখে না। অথচ তার বয়সী অন্য শিশুরা কোন দিন কী পড়তে হবে, সেটুকুও বুঝতে পারে না। এটা অবশ্য তিতলির কারণেই হয়েছে। সে চায় অরুন্ধতী আত্মনির্ভরশীল হতে শিখুক এখন থেকেই। ছোটবেলা থেকে যে তিক্ত, যন্ত্রণাদায়ক সব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে, সে চায় না তার মেয়েকে সেসব তিক্ততা গিলতে হোক, যন্ত্রণা ভোগ করতে হোক। সে তাই ইচ্ছে করেই অরুন্ধতীকে কিছু কিছু ব্যাপারে একা ছেড়ে দেয়। বাদল এ নিয়ে আপত্তি জানালেও সে-সবে পাত্তা দেয় না তিতলি। সে মনে রাখে, এখন আছে, কিন্তু এক মিনিট পরেই নাই হয়ে যেতে পারে সে। তখন ভীষণ অকরুণ, অমসৃণে এই পৃথিবীতে অরুন্ধতীকে একা পাড়ি দিতে হবে পথ। সেই পথ যেন কিছুটা অন্তত মসৃণ হয়, সে কারণেই তার এই আপাত উদাসীনতা। যে স্নেহ তার সন্তানের পথ চলায় বিঘ্ন ঘটাবে, প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে, অমন স্নেহদান থেকে সে বিরত রাখে নিজেকে। সব স্নেহ কল্যানকর নয়, জানে তিতলী।

অরুন্ধতী মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছে তার পড়াগুলো, দেখে মনে মনে কিছুটা স্বস্তি অনুভব করে সে। কিছুক্ষণ এটা-ওটা প্রশ্ন করে মেয়েকে। তারপর বই রেখে মেয়েকে নিয়ে অন্য আলোচনায় যায়। অরুন্ধতীকে সে আবৃত্তি আর গান শেখায়। নাচে আগ্রহ নাই অরুর, ছবি আঁকায়ও নাই। তিতলি চেষ্টা করেছিল কিছুদিন, যেন অরুন্ধতী নাচ আর ছবি আঁকাটা শেখে। কিন্তু অরুন্ধতীর অনাগ্রহ দেখে সে নিজেও আগ্রহ হারিয়েছে অল্প দিনেই। শুধু শুধু সময় আর অর্থের অপচয়, মেয়ের মধ্যেও এ বিষয়ে ভীতি আর বিতৃষ্ণা তৈরি হচ্ছিল মিছিমিছি। হিতে বিপরীত।

অরুন্ধতীকে নিয়ে বসলেই নিজের শিশুবেলাটা মনে পড়ে। মনে পড়ে সরকারি শিশু পরিবারের সেইসব নিরানন্দ, নিরাবেগ দিন। অনিবার্যভাবে মনে পড়ে বাবার মুখ। মনে করতে চায় না তিতলি। স্মরণ করতে চায় না। তবু মনে পড়ে, তবু আচমকা জেগে ওঠে মনের ক্যানভাসে। মাথাটা তখন ভারী হয়ে যায় অকারণ। যন্ত্রণা মাথাচাড়া দেয় বুকে। তার শিশুবেলাটা তার কাছে এক বিভীষিকা, নিদারুণ অবহেলা আর অবজ্ঞায় কেটেছে তার শৈশব, কৈশোর। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সে দেখেছে তার বাবার উন্মাদ দশা, শিকলবন্দি বিভৎস জীবন। সে জীবন ছিল উপহাস আর অবজ্ঞায় ভরা, ছিল সীমাহীন তাচ্ছিল্য আর অপমানে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত। সে-সব দেখে দেখে তার নিজের শৈশব, কৈশোরের অবহেলা আর বঞ্চনার কথা সে সময় মনেই পড়েনি তার। বরং মনে হতো জীবনের কাছে এরচে’ বেশি কিছু প্রাপ্য নেই তার, এরচে’ অধিক কিছু সে কখনো কল্পনায় আনারই সাহস পায়নি ওই সময়। সকাল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে সকাল যে গৎ বাঁধা, ঢেউহীন নিরানন্দ জীবন ছিল তার, জীবনের কাছে সেটুকুই বেশি পাওয়া মনে হতো তখন। মনে হতো, উন্মাদ, পরনির্ভরশীল, অসহায় এক বাবার সন্তান হিসেবে সে বরং বেশিই পাচ্ছে। এতটা তার প্রাপ্য নয়। এতটা তার পাওয়া উচিত নয়। ছোট কাকা তার কাছে ছিলেন সাক্ষাৎ ফেরেশতা। তার উন্মাদ বাবাকে আশ্রয় দিয়ে যে মহত্বের পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন, তাতে সেই বয়সে কাকার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠত তার শিশুমন। পৃথিবীর কুৎসিত অঙ্কগুলো, নোংরা হিসাবগুলো তখন পুরোটাই ছিল তার অজানা আর অপরিচিত। কিন্তু তরুণ তেমন ছিল না। সেই বয়সেই কাকার প্রতি ছিল তার সীমাহীন ক্ষোভ আর ঘৃণা। ছিল অদ্ভুত রকমের ক্রোধ আর অবজ্ঞা। সে সময়ে তিতলি বুঝত না তরুণের সেই ক্ষোভ আর ক্রোধের কারণ, ধারণা ছিল না তার ঘৃণা আর অবজ্ঞার উৎস সম্বন্ধেও। বরঞ্চ সে বিরক্ত ছিল ভাইয়ের প্রতি। বিরক্তি আর অসহায়তা নিয়ে সে ভাইকে নিয়ে ভেবে মরত। তার শিশুমন কিছুতেই কিনারা পেতো না ভেবে, কেন তার একমাত্র ভাইটা কাকার কোনো কথা শুনতে চায় না, তিতলির বড় হয়েও কেন অমন অবাধ্য-গোঁয়ারের মতো সরকারি শিশুপরিবারে থাকতে অস্বীকার করে পালিয়ে আসে সে গ্রামে। কেনই-বা গ্রামের স্কুল ছাড়া পড়বে না গোঁ ধরে স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দেয় তরুণ।

দিন যত গেছে, জীবনের কাদামাটি যত এসে আছড়ে পড়েছে মনের শুভ্র-সফেন ভূমে, তত চোখ খুলেছে তিতলির। তত শিউরে উঠেছে জীবনের পুঁতিগন্ধময় রূপে। আহা জীবন! আহারে জীবন!
অরু আবৃত্তি করছে,

আমি আমার কথা বলছি
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি…

কান পেতে শোনে তিতলি। ভাবে, কোন পূর্বপুরুষের কথা বলছেন কবি? কোন কিংবদন্তির কথা? না, তার উন্মাদ ব্যাধিগ্রস্ত, শিকলপরা পাগল বাবার কথা কোনো কবি তো বলেননি! বলবেন না কোনোদিন! কিংবদন্তি হতে হলে অত নরম মন হলে চলে না। শত্রুর প্রাণভিক্ষা আর চোখের জল অগ্রাহ্য করে মুহূর্তে তার বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে দিতে হয় ছুরি, ঢুকিয়ে দিতে হয় টুকরো শিশা। কোনো ভাবালুতা, দয়ার স্থান নেই সেখানে। দয়া মানে কাপুরুষতা। ভাবালুতা মানে অযোগ্যতা। কাপুরুষদের ক্ষমা করে না ইতিহাস, ভাবালুতা স্থান পায় না কোনো বীরত্বগাথায়। তার বোকা বাবা বোঝেনি সে কথা। বোকা হাবিবুর রহমান খান! তার মাথার মধ্যে আজীবনের মতো ঢুকে থাকল ভয়ার্ত, বাঁচার আকুতিসজল এক পাকসেনার দুটি চোখ, জীবনভিক্ষায় আকুল, অধীর এক মানুষের মুখ। হৃদয় গলেছিল তার, শেষ মুহূর্তে তার মন চিৎকার করে বলে উঠেছিল, ছেড়ে দাও! মৃত্যুভয়ে ভীত, ফ্যাকাশে, রক্তশূন্য এক মুখে বাঁচার যে বিপুল তৃষ্ণা দেখেছিলেন তিনি, সীমাহীন সমর্পণ আর দয়াভিক্ষায় ব্যগ্র, অধীর যে মুখ তাকিয়ে ছিল তার চোখে, সেদিকে চোখ রেখে মুহূর্তে চিত্তচঞ্চল হয়েছিল। হৃদয়দৌর্বল্য দেখা দিয়েছিল হঠাৎ। মন বলছিল, আহা! কুকুরের চেয়ে নিকৃষ্ট এ জীবটাকে বাঁচতে দাও! দেখছ না, বাঁচার কী বিপুল আকাঙ্ক্ষা পশুটার!

কিন্তু তার হাত! সে মনের নির্দেশ মানেনি। মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ, হিসাবী হাত সময়ের নির্দেশ মেনেছিল। হাবিবুর রহমানের মনের নির্দেশ আসার ঢের আগেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সে হাত পাকসেনাটার বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে দিয়েছিল ধারাল, চকচকে ছুরি। হতভম্ভ, বিস্মিত হাবিবুর রহমানের মুখে ফিনকি দিয়ে এসে লেগেছিল উষ্ণ, টকটকে লাল রক্তের ধারা। লোকটার চোখ বিস্ময়ে অথবা ব্যথায় কোটর ছেড়ে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছিল, হা হয়ে গেছিল তার ফর্সা, ফ্যাকাসে মুখ। হাবিবুর রহমান চমকে সরে এসে একবার লোকটার মুখের দিকে আর একবার নিজের রক্তমাখা ছুরি আর পোশাকের দিকে তাকাচ্ছিলেন। হাত আর মনের ভেতরকার এই দ্বিধা আর দ্বন্দ্বে তিনি মাথার ভেতর ভীষণ ভোঁতা একটা যন্ত্রণা টের পাচ্ছিলেন। বাঁচার আর্তিতে ব্যাকুল, ভয়ার্ত এক মুখ আর বুকে ছুরি বসা বিস্ময়ে প্রায় বিস্ফারিত দুটি চোখ, হা করা, ফ্যাকাসে, ফর্সা একটি মুখ, এ দুইয়ের মধ্যে কোনটা বাস্তব, কোনটা নয়, সে দ্বিধায় তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর, রক্ত! রক্ত!- বলে ভীষণ চিৎকারে কাঁপিয়ে তুলেছিলেন সে স্থান। মাথার মধ্যে যে ঝড় শুরু হয়েছিল তা আর থামেনি বাকি জীবন। দিনে দিনে বরং বেড়েছিল সে ঝড়ের তাণ্ডব, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল হাবিবুর রহমানের বাকি জীবন।

কলিংবেলটা বাজতেই চমকে ওঠে তিতলি। বাদল এল। সাবধানে চোখ মুছে উঠে পড়ে সে। চোখের জল সবাইকে দেখাতে নেই। ওটা সবার জন্য নয়।
চলবে…

ঝিঁঝিলাগা দিনগুলো-৫॥ শিল্পী নাজনীন

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন