আমার পুত্রের প্রতি ॥ তুহিন তৌহিদ | চিন্তাসূত্র
৮ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১ এপ্রিল, ২০১৯ | রাত ১০:২২

আমার পুত্রের প্রতি ॥ তুহিন তৌহিদ

তোমার জন্মের মধ্য দিয়ে আমি পুনর্বার জন্ম
নিলাম। সূর্যরশ্মির আভা ছড়িয়ে পড়লো এই
তামাম জগতে, ক্রমে সকল তমসা কেটে গেলো,
বৃষ্টিস্নাত বর্ষাভোরে গাছের সবুজ পাতাটির
মতো হেসে উঠলাম—এতটাই প্রতিভা তোমার!

বদলে দেওয়ার এক আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে তুমি
এসেছ। আমার বুক ভেদ করে বেরিয়ে পড়ছে
কুণ্ডলীপাকানো যত সর্প, যত হতাশার বিষ
মোমের মতোন গলে পড়ে যাচ্ছে। আমি মুগ্ধচিত্ত
চেয়ে থাকি বারবার ছোট্ট মুখপানে অপলক—
অলৌকিক জোছনায় ভরে যায় সমগ্র উঠান!

কচি ধানগাছ হাত, হাসো—যেন আমের মুকুল
ফুটে আছে; হরিণশাবক তুমি পা নাড়িয়ে নাচো।
তাইতো তোমার জন্য আমি এক অভয়ারণ্যের
খোঁজ করি, যেখানে নিশ্চিন্তে তুমি বড় হবে, কোনো
দুরূহ তোমাকে এসে গুরুতর আঘাত দেবে না।

বাসযোগ্য গ্রহটির নাম যে পৃথিবী আর নয়
সে কথা তোমাকে বলি কী করে বলো তো; বিশেষত
এশিয়া-আফ্রিকা জুড়ে অভাবের বাহারি ছোবল—
কেউ কেউ সম্পদের সুবিশাল পাহাড় গড়ছে
এর নিচে চাপা পড়ে আর্তনাদ করে কতো লোক;
কত লোক ঝরে যায়, কত লোক ঢলে যায় শেষে—
রোগ-ক্লান্তি, অবসাদ এইখানে তিমিরের বেশে
জেগে আছে; অথচ তোমাকে আমি আগলে রাখতে
চাই সযতনে, যেনো প্রসূনে না বিঁধে কোনো কাঁটা!

ভাবতেও পারবে না আমরা কতটা আত্মঘাতী!
সারাক্ষণ সংঘাত বাধিয়ে রাখছি চারপাশে,
শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে করি ক্ষমতার অন্যায্য লড়াই—
এতে, মানুষের রক্তে কারবালা ফিরে ফিরে আসে;
সিরিয়ায় বোমা পড়ে, ইয়েমেন হয় খান খান,
আগ্রাসী আগুনে পোড়ে বসরার গোলাপ বাগান—
বেন আলী নেই আর, নেই আর সাদ্দাম হোসেন
জর্জ বুশ ঘরে বসে আজকাল বেড়াল পোষেণ।

আমরাই সব পুড়িয়ে ফেলছি—মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে
বেরিয়ে আনছি এর প্রাণটাকে! তোমাদের কথা
কেউ ভাবছি না, শুধু নির্ভেজাল অপচয়ে ধ্বংস
করে দেই সব; উন্মত্ত অশ্বের ন্যায় ছুটে চলি!

বানের জলের মতো বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল
নামে নিখিলের পথে—তারা চায় অভয়-আশ্রম;
তারা খোঁজে স্বস্তি-স্থিতি—ন্যূনতম শান্তির ঠিকানা।
মসনদ দখলের লড়াইটা রক্তপাতে হয়,
জনতার রক্তে ভেজা জামা গায়ে নেতা হেঁটে
যান সংসদের দিকে।

তুমি যে সারল্য নিয়ে এসেছো, ঠোঁটের কোণে ঝুলে
আছে বেহেস্তের হাসি, তা আমি রাখতে চাই ধরে
আজীবন; যেনো এই জগতটা হয়ে ওঠে এক
অনিন্দ্য বাগান, তাতে তুমি ফুল হয়ে হাসো, পাখি
হয়ে ওড়ো!

তথাপি, তোমাকে কথা দিলাম, একটা উপযোগী
পৃথিবীর নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাব, যেন
তুমি ও তোমরা সেথা স্বাভাবিক প্রস্ফূটিত হও।
যেভাবে আমার সব রিক্ততা গোছালে তুমি, দেবদূত
সেভাবে আমিও যেন তোমার বিকাশ সাবলীল
করি—পুত্র, পুঁইশাখ ডগার মতোন বেড়ে ওঠো!

তুমি কত কিছুই তো দিয়েছ আমাকে। হাসি দিয়ে
ভরেছ আমার ঘর—সরেছে শূন্যতা। অতপর
তোমার এ আগমন অনেকটা সহজ করবে
আমার প্রস্থান, আমি ফিরে যেতে পারবো নির্বিঘ্নে—

মাথা উঁচু করে তুমি বেঁচে থেকো সহস্র বছর
মানুষের পাশে থেকো, ভালোবেসো—এই মূলমন্ত্র
তোমাকে দিলাম, তুমি কখনোই বিভেদ করো না।

প্রত্যাবর্তনের দায় নিয়ে আমরা জগতে আসি,
যেভাবে শীতের কালে পরিযায়ী পাখিদের ঝাঁক
আসে—শেষে, চলে যাই নিতান্ত বেফানা হয়ে একা—
তবু সন্তানের রক্তে-মাংসে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখি
হারিয়ে গিয়েও থাকি জগতের আলো ও বাতাসে।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন