অরণ্য ॥ গোলাম কিবরিয়া পিনু | চিন্তাসূত্র
৮ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২১ এপ্রিল, ২০১৯ | সকাল ১১:৪৪

অরণ্য ॥ গোলাম কিবরিয়া পিনু

কোন্ বনে এসে পড়লাম—
যেখানে বুনোশুয়োর ও খাটাশের রাজত্ব চলে
শজারুর হাঁটাহাঁটি ও ভুজঙ্গ উড়ে
.                 কাঠবিড়ালী পালায় পালায়
ডানাওয়ালা ঈগল ঈর্ষা নিয়ে দূর থেকে আসে
হিংসা-বিষ নিয়ে দংশন করে কীট
আকাশেও কুড়ুলে ও পেঁজামেঘ নাচে
এইখানে আমি
.              —দুমড়েমুচড়ে পড়ি!

আমলকি বনে—
অশ্বরক্ষকেরা ঘোড়ার বদলে নিজেরাই হ্রেষাধ্বনি দেয়,
অরণ্যনিবাসে—
দমকল বাহিনীর লেকেরা আগুন না নিভিয়ে
.                 নিজেরা আগুন ছড়ায় দিগ্বিদিক,
বানপ্রস্থাশ্রমে—
চিকিৎসকেরা চিকিৎসার বদলে
ক্ষতিকর অনুজীব ছড়ায় রোগীর দেহে,
অভয়ারণ্যে—
শান্তিরক্ষীরা শান্তির বদলে
.              নিজেরা অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে!

আমি বনমল্লিকাকে খুঁজতে এসে
এখন কোথায় এসে পড়লাম—
.             শ্বেতকরবীর পাচ্ছি না কোনো খোঁজ
সেবন্তীরও দেখা নেই!

স্বপ্নের দু’চোখে পিঁচুটি জমেছে বেশ
চোখের রেটিনা নষ্ট হবে বলে মনে হয়
টুটপেস্ট তো দাঁতের গোড়ায় লাগছে না—
.                শুধুই চালাকি ও কূটকৌশল!
লেজওয়ালা পাখি কাকাতুয়া কাছে আসে
তার লেজ ধরে কি পালাবো?

কার জন্য কতটুকু ভরসার স্থল হয়ে উঠি আমিও
.               জলে-স্থলে-বনে?
আমিও বুনোফলের লোভে—
অদৃশ্য বনবিবির গুণগান গাইতে গাইতে
যুক্তি-বুদ্ধি-জ্ঞান—প্রজ্ঞা ও বিবেক বর্জন করে
বিশ্বাস স্থাপন করি কিসে?
শেষমেশ আমিও বনহত্যাকারীদের সাথে মিশে যাই!
.           স্ববিরোধী হই—বনে থিতু হই!
আমারও জীবনাচরণ—
কত বৈপরীত্যের সমষ্টি হয়ে ওঠে!

বনপালকের বেশে—
এখন আমিও হরিণ-হরণকারী হয়ে যাই
হিংস্রতা ছড়িয়ে দিয়ে
.            শীতের শিশির নষ্ট করি—
শক্তিমত্ততায় কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে শুধুই নিজের ভাণ্ড ভরি।
অন্ধকারে কুপি-লণ্ঠনের আলো পর্যন্ত গ্রাস করি
হনন-ধর্ষণ ও লুণ্ঠনে মাতোয়ারা হয়ে উঠি
.             মনের এক অদ্ভুত আঁধি-অন্ধকারে ডুবে যাই।

স্বর্ণপুষ্প দেখার পরও
শ্বেতজবা দেখার পরও
পুষ্টি নেই—বলবৃদ্ধি নেই—নীরোগ স্বপ্নের দেখা নেই
প্রকৃতির ঋতুতে বৈচিত্র্য থাকলেও
.             আমি একই ঋতুতে হয়ে পড়ি স্থির—
শুধু নিমোনিয়া নিকটবর্তী
          ভূমিকম্পে জলস্তম্ভ নিয়ে দাবানল ছোটে
.                    মেঘজাত শিলা ঘনীভূত হয়
কারও ঘর পোড়ে—কারও গোশালা পোড়ে
ঘর ভাঙানি লোকের উৎপাতও বাড়ে।

অযৌক্তিক নিন্দার শর কতবার
.           নিক্ষেপিত হয়েছে কতজনের ওপর
সর্বক্ষেত্রেই মানুষ কি জিগীষু?
মানুষই উৎকর্ষের ও শ্রেষ্ঠত্বের গান গেয়ে
অগ্নিমুখ খুলে দিয়ে
কাশবন—বাঁশবন—শালবন তছনছ করে
.         বুনো ও জংলি হয়ে
               নাচতে থাকে
হত্যা করে নিরীহ মানুষ
অস্ত্র ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে—
বনের নতুন বাসিন্দা হয়ে
কমলা ও আপেল ব্যবসায় আমারও মন ভরে না!

অন্যের ক্ষয়ক্ষতিতে আনন্দ পাই
অন্যের দুর্ভাগ্যের জন্য
.             জগদ্দল হয়ে উঠি
অপরের পরাজয়-বিপর্যয়ে খুশি হই
.              কী বিকৃত রুচি!
মৃতকল্প-শবযাত্রী ও মুর্দাফরাসের বাণিজ্যনীতি ভালোবাসি
কিসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিয়ে ক্ষুৎপিপাসায় ক্ষুদ্র হয়ে যাই!

বিপিনবিহারে—
হাতি-ঘোড়া-কুকুর-বানর ও ডলফিন খানিক প্রশিক্ষণ-শিক্ষা পেয়ে
সভ্য ও পরিশীলিত হয়ে ওঠে—
.             মানুষের অনিষ্ট করতে মেতে ওঠে না তখন তারা,
আর মানুষের জন্য কত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থাকার পরও
আমিও হয়ে উঠছি বনের ভেতর আরও হিংস্র-শ্বাপদ।

শুধু ভয় ও লোভে কতদূর যাবো?
নিজের অর্ন্তমুখিতায় কোনো ফুল ফোটালাম না!
শ্বেতজবা ও কাঠালচাঁপা দেখলাম না!
চামেলি ও সন্ধ্যামণি দেখলাম না!
বনমল্লিকা ও পঞ্চমুখী জবা দেখলাম না!
              নিজের প্রজ্ঞায় ফুল ফোটালাম না!
আত্মবোধ নিয়ে সমুদ্র ও পাহাড়ের বিশালত্ব দেখি না—
কুনো ব্যাঙের মেএতা বনের কুয়োয় থাকি।

দজ্জালের গাধায় চড়ে খুনি হয়ে ঘোরাঘুরি করি
.                        —বনের ভেতর,
অরণ্যকে অরণ্যের মতো থাকতে দেই না—
                            কিসের আকর?
নির্বাণ প্রদীপের শিখার মতো হতে পারিনি!
কোথায় আমার অস্তিত্ব থাকে!

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


One Response to “অরণ্য ॥ গোলাম কিবরিয়া পিনু”

  1. Tuhin
    জানুয়ারি ২, ২০১৯ at ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ #

    যুগসন্ধিক্ষনের কবি পিনু ভাই কিছু কবিতা কালোত্তীর্ণ নি:সন্দেহে ।

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন


webcams Etudiantes Live Jasmin Forester Theme