লালবেজি ॥ শীলা বৃষ্টি | চিন্তাসূত্র
৪ মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ | বিকাল ৩:০০

লালবেজি ॥ শীলা বৃষ্টি

টিভির সামনে বসে রিমোট চেপে চ্যানেল ঘুরিয়ে যান মোস্তফা মিয়া। চোখমুখে জাগতিক বিতৃষ্ণা নিয়ে নির্দিষ্ট চ্যানেলটি খুঁজতে থাকেন। সেটি পাওয়া গেলে একটু আগে পকেট থেকে খসে যাওয়া তিন হাজার টাকার জ্বলুনি ভুলে নড়েচড়ে বসেন সোফায়। ‘প্রথমেই সংবাদ শিরোনাম’—ব’লে যে মেয়েটি তার শাড়িতে লক্ষ ইঞ্চির ভাঁজ তুলে পর্দায় আবির্ভূত হয়, তাকে দেখে হতাশ হন তিনি। পরক্ষণেই সেটি প্রশমিত হয়ে যায় পাশের দ্বিতীয়টিকে দেখে। তার ডানে-বাঁয়ে ক্রমাগত মাথা ঝাঁকিয়ে খবর পড়ার প্রতিভায় তিনি একইসঙ্গে মুগ্ধ ও মর্মাহত হন—আহা, দুইন্যাত কত সোন্দর-সোন্দর মাইয়া! খালি হরান হোড়ে!

তিনি একবার স্ত্রীর কথা ভাবেন। বড় ছেলে সুমনের নামের আড়ালে স্বনাম-হারানো সুমনের মা সংসারধর্মে অভিজ্ঞ আর বিছানাধর্মে অজ্ঞ এক রোবট যেন। খসে যাওয়া টাকার দুঃখ মোস্তফা মিয়া প্রায় বিস্মৃতই হচ্ছিলেন টেলিভিশনের বহুবর্ণিল সংবাদের প্রাচুর্যে। হঠাৎ তাকে ধড়মড়িয়ে উঠতে হলো দোতলার জানালা  হয়ে-আসা মাহবুবুল হক মাস্টারের বিকট চিৎকারে—ওই মোস্তফা মিয়া, ওই মিয়া, ওই! বার অন! মোস্তফা মিয়া একলাফে জানালার সামনে চলে আসেন।

আমনের বাসার উডানে মানুষ মরি ভূত অই থায়, আমনে থান কন্ডে?—ধমকে ওঠে মাহবুবুল হক মাস্টার, বলার সুবিধের জন্য যার বর্তমান নাম ‘মাবুলক মাশটর’। নিচের পঁচিশ ওয়াটের হলুদ বাতিটি বরাবরের মতোই চোরের দখলে, তারপরেও আশপাশ থেকে জোগান দেওয়া আবছা আলোয় মোস্তফা মিয়ার বুঝতে কষ্ট হয় না—মাবুলক মাশটর ও আরও কিছু নারী-পুরুষের সম্মিলনে জায়গাটি ভিড়াক্রান্ত, যারা বুঝি তারই বিভিন্ন ভাড়াটে। ঘটনার রকম বোঝার জন্য মোস্তফা মিয়া চোখদুটো রগড়ে নেন একবার, তাতেও ঠাহর করতে না পেরে দোতলা থেকেই হাঁক দেন, কিয়া অইসে?

মিয়া, নামেন—হুকুম ঝরে যেন মাবুলক মাশটরের কণ্ঠে। তার ধাঁতানির ঠ্যালায় কুঁকড়ে যান মোস্তফা মিয়া। স্ত্রী-পুত্র-কন্যার সামনে যতই হামকে-তোমকে করুন না কেন, মোস্তফা মিয়া আদতে ভীতু প্রকৃতির মানুষ, তার ওপর মাশটর আবার নেতা গোছের। তার বুক অজানা আশঙ্কায় ধড়ফড় করে।

কী অইল, কী অইল’র অতলান্তিক হাহাকারে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দরজা বরাবর ছুট দেন; আল্লাহ-খোদার নাম নিতে নিতে সিঁড়ি ভাঙেন আলগোছে ধরে লুঙির খুট, ঘটনার ঘনঘটায় যেটার অবস্থা এখন বিপর্যস্ত। পেছন-পেছন দৌড়ান তার বউ, তার পেছনে মেয়েরা। সবার আগে অবশ্য দৌড় দিয়েছে তাদের কিশোরী গৃহকর্মী সখিনা। ছেলেরা সন্ধ্যাকালীন গুলতানির উদ্দেশ্যে বাসার বাইরে, নইলে তাদের দৌড় উসাইন বোল্টকেও হার মানাতো। হাঁপাতে হাঁপাতে নিচে নামে পুরো পরিবার।  তাদের সবাই প্রায় একইসঙ্গে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। সন্ধ্যায় গ্রাম থেকে আসা মিজান নামের সুবোধ ছেলেটা, যে কিনা মায়ের চিকিৎসার কথা বলে মোস্তফা মিয়ার কাছ থেকে তিন হাজার টাকা সাহায্য নিয়েছে, তাকে ব্যাঙের মতো হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখে তারা খোয়া-বিছানো উঠোনে। ছেলেটিকে দেখেই বোঝা যায়, সে সংজ্ঞাহীন। মিজান বাসা থেকে বের হয়েছে মিনিট পনেরো হবে। দোতলা থেকে নিচতলার এই সামান্য পথটুকুতে কী এমন ঘটল যে, তার এমন অবস্থা হতে পারে, ভাবনার কূলকিনারা পায় না তারা। অবশ্য পাড়া-প্রতিবেশীর কোলাহলে সেই অবকাশও হয় না তাদের। ছেলেটিকে সকল প্রকার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েও জ্ঞান ফেরাতে ব্যর্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা ওঠে। এর মাঝেই অবশ্য মিজানের অজ্ঞান হওয়ার কারণ বের করে ফেলেছে মোস্তফা মিয়ার বোকাসোকা স্ত্রী।

বড় ছেলেটি অবশ্য এর মধ্যেই পৌঁছে গেছে এবং ঘাড়ের রগ ফুলিয়ে তার স্বভাবসুলভ ধমক দিয়ে যাচ্ছে মিজান নামের ছেলেটির মাকে, এইচ্যা চিল্লান কিল্লাই? চিল্লাইলে কি আন্নের হোলা ভালা অই যাইবনি? না মনে কইচ্যেন ইয়েন বাংলা সিনেমা, আন্নের চিল্লানির ম্যাজিকে আন্নের হোলা উডি বইব!

দোতলা ও একতলার সিঁড়ির মাঝামাঝি একটুকরো সানশেড বানানো হয়েছিল বাড়ির সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য। সুমনের মা-ও অল্প পরিমাণ চাল, হলুদ, মরিচ প্রভৃতির গুঁড়ো এই মিনিছাদরূপী সানশেডেই শুকাতে দেন। এখানে তাদের আহ্লাদী ছোটো মেয়ে সিজন অনুযায়ী বড়বড় তাজমহল গোলাপের পাশাপাশি নয়টার ফুলগাছও লাগিয়েছে, তবে লাগানোই সার। গাছের যত্নের বেলায় লবডঙ্কা। এর ভার সখিনার কাঁধে। অবশ্য সখিনাও এ-কাজে বিমলান্দ উপভোগ করে। গাছে পানি দেওয়ার উসিলায় পাশের বাড়ির জয়নাল নামের ড্রাইভারের সঙ্গে তার চোখাচোখি খেলা চলে। ব্যাপারটি তাদের অজানা থাকায় এবং সময়ের প্রশ্রয়ে এখন ফুল ছোড়াছুড়ির পর্যায়ে। মোস্তফা মিয়ার বউ জানায়, এই সানশেডের দরজাটিকেই ছেলেটি বাড়ি থেকে বের হওয়ার দরজা মনে করে খুলে বরাবর হাঁটা দিয়েছে আর দু-কদম পরেই ধাপ্পুশ করে পড়েছে। সানশেড থেকে মাটির দূরত্ব কমপক্ষে দশ ফুট, ছেলেটির কোন্ জায়গায় বেশি আঘাত লেগেছে, ঠাউর পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ছেলেটির জ্ঞানহীন অবস্থা দেখে তাদের এই ভয় হয়, আঘাতটা কি তবে মাথাতেই!

সুমনের মা প্রথমদিকে এই অতর্কিত হামলায় দিশেহারা হয়ে গেলেও এখন বেশ সামলে উঠেছেন। ছেলেটির জন্য তার কষ্ট হচ্ছে কি না, বোঝা যায় না। তবে, তিনি হাতের তসবির ঘূর্ণন বাড়িয়ে দিয়ে সখিনাকে পাঠিয়েছেন গলির মুখের চা-দোকানে ছেলেদের খোঁজে। হাতের ক্রিয়া অক্ষুণ্ন রেখেই দুই মেয়েকে সমান তালে বকে যাচ্ছেন। ঘরে কোনও অঘটন ঘটলেই মেয়ে দু’টি বকা খায়। তাদের মায়ের ধারণা, তারা ঠিকমতো ধর্মকর্ম করে না বলেই এই সংসারের যত দুর্দশা! মেয়েরা প্রায়ই অবাক হয়, ধর্মেকর্মে তাদের দুই ভাইয়েরও বিশেষ মতি নেই, কিন্তু কেন যে মা ভাইদের বেকসুর খালাস দিয়ে শুধু তাদের দুই বোনকেই দোষী বানিয়ে স্টিম রোলার চালায়! আপাতত সেতু ও মিতু নামের দু’বোনই শুধু ছেলেটির জন্য ব্যথিত হয়। তারা ধরে নেয় যে, ছেলেটি মরে গেছে কিংবা সম্প্রতি দেখা ‘কিল বিল’ ছবির নায়িকার মতোই সে কোমায় চলে গেছে। তা-ই যদি হয়, তাহলে সে হয়তো ‘কিল বিল’-এর নায়িকার মতোই বহুবছর পর কোমা থেকে ফিরে দেখবে পকেটে রাখা তিন হাজার টাকা উধাও এবং সেতু ও মিতু নামের মেয়ে দুটোও বুড়ো হয়ে গেছে। দুই বোন এবার ছেলেটির বর্তমান কষ্ট থেকে নিজেদের বৃদ্ধাবস্থা নিয়ে ব্যথিত হয়, তাদের মায়ের তিরস্কার তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না।

হালনাগাদ এই পরিবারের আনন্দে থাকা একমাত্র ব্যক্তি বিবি সখিনা। সে ইতোমধ্যেই আফসারের চায়ের দোকানে বড় কিংবা ছোট কোনও ভাইজানেরই সন্ধান না পেয়ে ফিরে এসে আপাদের কাছে ছেলেটির পতনদৃশ্য অভিনয় করে দেখানোর চেষ্টায় আছে। সখিনার এহেন হৃদয়হীনতায় সেতু চুপ করে থাকলেও মিতু ধমকে ওঠে—এইচ্যা ভ্যাডাই ভ্যাডাই টাঙ্কিবাজি করিচ্যান। যাহ্, শিগগির বাসাত যা। অজু করি নামাজ হইরতি বয়, হোলার লাই দোয়া কর গোই, যাহ্!

সখিনা মনে-মনে মুখ বাঁকায়, আমনে হড়েন না কিল্লাই! কিন্তু বাস্তবে নিরুদ্যম হয়ে ওপরে উঠে যায়। ছোট্ট আপাকে সে ভয় পায় ভীষণ। ছোট্টাফা হেই বেডির চ্যাতাইন্যা রূপের মতোই বিষালনি! মাথা গরম হইলে ইগ্গা গাইলও মাটিত হালায় না। বড্ডাফা যেমন কম সুন্দর, তেমনি তার মেজাজও নিভাইন্যা! মেজাজের সঙ্গে সৌন্দর্যের কোনো-না-কোনো যোগসূত্র থাকে, সেটি এতদিনে সখিনা বুঝে ফেলেছে। তবে যেটা মেয়েদের ক্ষেত্রে, সেটা আবার ছেলেদের ক্ষেত্রে উল্টো। অসুন্দর পোলাগুলার ঘাউয়া মেজাজ, যেমন বড্ডা ভাইজান। আর সুন্দরগুলা আবার বড্ডা আফার মতোই ঠাণ্ডা, যেমন ছোট্ ভাইজান। ছোট্ ভাইজানের ভাবনাতে মনে পুলক জাগে সখিনার, ছোট্ ভাইজান যে কত সুন্দর! কী লম্বা! আর কী নরম হেই মিয়ার কতা, জগতের ব্যাক হোলা যদি এইচ্যা অইত! দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরে ঢোকে সখিনা। নামাজ পড়ায় ব্যস্ত থাকার আদেশ পেলেও সময়মতো ভাত রান্না না হলে ছোট্টাফার চিল্লানিতে পাড়ার ব্যাক কাউয়া জাগি যাইব!

দুই.
হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে ক্রমাগত উচ্চ-নিম্নচাপের সৃষ্টি করছে মিজান নামের ছেলেটির মায়ের গগনবিদারি চিৎকারে। মহিলার নাকি অসুখ; অসুস্থ শরীর এত জোর-চিৎকারের পাওয়ার কিভাবে সাপ্লাই দিচ্ছে মোস্তফা মিয়া ভেবে পান না। ছেলেটির পকেটের তিন হাজার টাকা ইতোমধ্যেই মহিলা আঁচলে বেঁধে ফেলেছে। ছেলেটি মরে গেলে এই টাকা জলে যাবে। কোনো নাম হবে না, সঙ্গে যাবে তার চিকিৎসা বাবদ খরচের টাকাও। কিন্তু হোলা মরি গেলে গোষ্ঠীসহ জেলে ঢুইকতে অইব—কথাটি মোস্তফা মিয়ার মাথাতেই ছিল না এতক্ষণ। হুট করে আসা আশঙ্কায় তিনি এইবার মুষড়ে পড়েন। ডাক্তার-নার্সের ছোটাছুটিতে তার নার্ভাস লাগে; ঘাড়ের কাছের চিনচিনে ব্যথা উচ্চরক্তচাপের আগাম সংকেত জানায়। তার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। কিন্তু যে-অবস্থা এখানে—এক মুহূর্তের জন্যও নড়ার উপায় নেই তার। বড় ছেলেটি অবশ্য এর মধ্যেই পৌঁছে গেছে এবং ঘাড়ের রগ ফুলিয়ে তার স্বভাবসুলভ ধমক দিয়ে যাচ্ছে মিজান নামের ছেলেটির মাকে, এইচ্যা চিল্লান কিল্লাই? চিল্লাইলে কি আন্নের হোলা ভালা অই যাইবনি? না মনে কইচ্যেন ইয়েন বাংলা সিনেমা, আন্নের চিল্লানির ম্যাজিকে আন্নের হোলা উডি বইব!

এইবার একটু থেমে মহিলাকে নকল করে গলা ফাটায় সুমন, মারিয়ালাইসে রে! মারিয়ালাইসে রে! কী কইতেন চান? আন্নের হোলারে কি আন্ডা ধাক্কা দি নিচে হালাই দিসি? হোলার হকেটেত্তুন যেই তিন হাজার টেয়া হামাইলছেন, হিয়েনো তো আঁর বাপের টেয়া। হেতের হিছে অনতরি ছ হাজার টেয়া খরচ অইসে, আরও অইব, আর আব্বায় টেয়া খরচ কইত্যে কি ওনা-হানা করের?

মারিয়ালাইসে রে! মারিয়ালাইসে রে!—এবার ভেংচি কেটে ওঠে সুমন, হ্যাতে কন! হ্যাতে ভিপি জামাল, না লোডা-শাকিল্যা? আন্ডা এলাকা দখল কইত্যো আইছে? হেতেরে মারি আন্ডা কী লাভ? না কি আন্নের হোলায় আঁর বাপের সম্পত্তির ওয়ারিশ!

চোখে লালমরিচের রঙ আর গলায় তার ঝাঁজ তুলে তর্জনি উঁচিয়ে এইবার মহিলাকে শাসায় সুমন, আর একটা আওয়াজ বাইর কইরবেন তো আব্বারে লই সোজা বাইর অই যামু হাসপাতালেত্তুন! ছেলের স্বভাব ও পূর্ববর্তী রকম-সকমে মোস্তফা মিয়া ক্রমাগত বিরক্ত থাকলেও আজ পুত্রের জন্য গর্বে তার বুক ফুলে যায় আধ-ইঞ্চি। প্রতিটি পরিবারে এমন একটি পাণ্ডা থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি, কেননা সুমনের নাচনকোঁদনে মিজানের মায়ের হল্লাহাটি থেমে এক্কেবারে টাব্বুশ অবস্থা! মহিলা মিনমিনে স্বরে বলার চেষ্টা করছে, ও বাই রে! তোঙোরে দোষ দিয়ের না তো, দোষ তো আঁর কোয়ালের।

মহিলা ইনিয়েবিনিয়ে কথার সুতো কাটে, কান দেন না মোস্তফা মিয়া। তিনি সুমনের কর্মকাণ্ড দেখেন। সুমন তার একদল বন্ধুবান্ধব মজুদ রেখেছে, মিজানের অবস্থার অবনতি হলে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ট্যাকেল দিতে। এর মধ্যেই সে শহরের বড় নেতাকে দিয়ে থানায় ফোন করিয়েছে ছেলেটির ভালোমন্দ কিছু হলে পুলিশি-ঝামেলা এড়াতে। এক তলারও কম দৈর্ঘ্যের সানশেড থেকে ছেলেটি পড়েছে। এমন উচ্চতা থেকে পড়ে কেউ মরে যেতে পারে—এটা কল্পনারও অতীত, বিশেষত মিজানের মতো এমন তাগড়া জোয়ানের বেলায়। কিন্তু মোস্তফা মিয়ার কপাল বলে কথা! দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি, সেইসঙ্গে টের পান বড় ছেলের গোছগাছের কারণে ঘাড়ের ব্যথা নেই আর। এবার তিনি স্ত্রীকে ফোন করে পূর্ণ উদ্যমে হম্বিতম্বি শুরু করেন। এই বাড়ির প্রধান পুরুষটি তার অপছন্দের যেকোনও ঘটনার জন্য প্রধান নারীটিকেই দায়ী করে থাকেন সবসময়। বড় ছেলে কেন এমপি সাবের ডেয়ারিং কমিটিতে নাম উঠিয়েছে, মেয়েদের কেন লেখাপড়ার চেয়ে সাজগোজে মন বেশি, ছোট ছেলে কেন জুম্মার দিনেও মসজিদে যায় না—ইত্যাদির সমস্ত দায় সুমনের মায়ের। এগুলো এখন ডালভাত হয়ে গেছে মহিলার কাছে এবং অনবরত নিজের দোষের কথা শুনতে শুনতে তিনিও নিজেকে এসবের জন্য দায়ী ভাবতে শুরু করেছেন ইদানীং। আর তাই কোনোভাবে সম্পৃক্ত না থেকেও অন্ধকারে মিজান ছেলেটির পড়ে যাওয়াতেও নিজের সম্পৃক্ততার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেন না তিনি। ভাবেন, সানশেড বানানোর সময় তিনি বারণ করলেন না কেন! তারই তো দোষ! মনে-মনে নিজের অদৃষ্টের উদ্দেশে ক্রমাগত—‘হিছা দি হিঠ, হিছা দি হিঠ’ ধিক্কার তুলে কানে চেপে রাখেন ফোনের রিসিভার।

হেই বেডির আদরের হোলা কন্ডে না কন্ডে রাইত কাডার হেই দুঃখে হেই বেডি কান্দে, রাইচ্যা গুম যাইতো হারে না। বেকুব বেডি এককানা বুঝেও না, আন্ডা অইলাম পাড়ার বখাইট্যা হোলাহাইন; আঙো কি থাকনের জায়গার অভাব আছেনি!

এবার পিডিবি-র ইঞ্জিনিয়ার মোস্তফা কামাল মিয়াকে আপাতত তার নির্বিষ স্ত্রীকে অপারবিক্রমে নিধন করতে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে আসা যাক সুমনদের পাড়া থেকে, কারণ মিজান ছেলেটি দুদিন অবচেতন থেকে কোঁ-কোঁ সুরে জেগে উঠবে। মোস্তফা মিয়া সতেরো হাজার টাকার আক্কেলসেলামি ভুলে গিয়ে তারও সাতদিন পর এই মাতাপুত্রের পাছায় লাথি মারার প্রবল ইচ্ছেকে দমন করে মিজানের মায়ের হাতে আরও হাজার দুয়েক টাকা গুঁজে দিয়ে গুণবতী গাঁয়ের উদ্দেশে বাসে উঠিয়ে দেবেন এবং এভাবে জলের মতো টাকা খরচের ব্যাপারগুলো তার ঘাড়ে লালপিঁপড়ের কামড় বসালেও এহেন বিপদ ও বদনাম থেকে বাঁচার দ্রুতগতিতায় তিনি যারপরনাই কৃতজ্ঞ থাকবেন সৃষ্টিকর্তার প্রতি। তার প্রতিদানরূপ দশজন মিসকিন খাওয়াবেন এক শুক্রবারে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও পূর্ববর্তী আরও আরও অঘটনের জন্য স্ত্রীর প্রতি অঙ্গুলি হেলন তার অব্যাহত থাকবে। এই কদিন বড় ছেলে ছাড়া সামনে যে-ই পড়বে না কেন মোস্তফা মিয়া তারই ঠিকুজি নির্ণয় করে ফেলবেন লম্ফঝম্প আর গালাগালির মিলিত উল্লাসে।

তিন.
আন্ডা অইলাম ফাড়ার বখাইট্যা হোলাহাইন। কেউ কিচ্ছু করি না। বাপের হোটেল বই-বই খাই আর আফসাইর্যা র চায়ের দোয়ানে আড্ডা মারি। ও আইচ্যা, ইগ্গা কাম আন্ডা হগলে করি, ভাইছার হিছে-হিছে গুরন। আঙো মইদ্যে যেতারা ভাইছার ডেয়ারিং কমিটির মেম্বর হেতারা এককানা ঠাঁটে থাই বাইছার লগে মিটিং করন, গলা ফাডাই ভিপি জামালের গোষ্ঠী উদ্ধারের লাই মিছিলের সামনে থাইকতে হারার ইজ্জতে। বাঁইয়া সময় আন্ডা বাপের গালি খাই, মা-র আদর। আঙো বাপেরা যত গাইল্যাক না কিল্লাই আন্ডারে, আঙো মা-অগল মুরগির রান, মাছের মাতা, গরুর শুদগোস্ত আন্ডা হাতে তুলি দি ব্যাক ফোষাই দেয়। আন্ডা চেতি গেলে আঙো আম্মাগো সাজানো শোকেসের ব্যাক বাসন-কোসন আছাড় মারি ভাঙি বাইত্তুন বার অই যাই। আঙো আম্মারা বাসনের কষ্টতুন আঙোরে লই বেশি টেনশনে থায়। হেই বেডির আদরের হোলা কন্ডে না কন্ডে রাইত কাডার হেই দুঃখে হেই বেডি কান্দে, রাইচ্যা গুম যাইতো হারে না। বেকুব বেডি এককানা বুঝেও না, আন্ডা অইলাম পাড়ার বখাইট্যা হোলাহাইন; আঙো কি থাকনের জায়গার অভাব আছেনি!

ওহ্ হো, আরেককান কাম আন্ডা অতি দায়িত্ব লই করি, আঙো বইনেগোরে শাসন। হেতিরগো ছাদে ওডন, কলেজে যাওন, পোশাক-আশাক লই সুযোগ হাইলেই আন্ডা বড্ডা-ভাইগিরি ফলাই। কিন্তু হেতিরগোরে লাডির আগাত রাইকতে চাইলেও বন্ধুর বইনেরগো কামে-বেকামে ছাদে ওডন, কলেজে যাওন দেইখতে আন্ডাত্তে ভালা লাগে। রানার বইন ঝিলিক যন লাল-নীল এস্কাটের ঝিলিক মারি হেতির শাদা-শাদা ঠ্যাং দেখাই ফাইভেট হইত্যে যায় হিয়েন দেইখতে আন্ডা বড়ো সুখ লাগে! হেতি যাওন তলক আন্ডা হেতিরে রেনি রেনি চাই, চোখের আড়াল হইলে নিয়শ হালাই আর মনে-মনে ভাবি, আহা রে, দুইন্যাত কত সোন্দর-সোন্দর মাইয়া! আন্ডা কোয়ালে কি আছে এত রূপসী!

ভুল্লা হালার মুখ আবার হায়খানার টাংকিরত্তুনও খারাপ! শালার ফুত শালা! হেতিরে দেইখলেই শিষ মাইরতো চায়, হেতি গেলেগই হেতির কাঁইল আর হোন্দের সাইজ লই নকশা-কাডন শুরু করে, ভেংচাই কইতে থায়:

লডশ ফাইভের মূল গোয়া
জাগাজমি ছ-কোয়া
মাইয়া হয় লডশ ফাইভ
হোলা হয় সিক্কো ফাইভ।

আঁই থাইকলে ধমক মারি হ্যাতেরে। ঝিলিকেরে লই কেউ খারাপ কিছু কইলে আঁরতে বড়ো ব্যথা লাগে! আড্ডায় রানা থাইকলে আর ঝিলিক গেলে অবইশ্য ভিন্ন কতা। হেদিন হগলে আন্ডা সুফিসাব! রাজনীতির বাইরে হেইসময় কোনও কতা নাই, ঝিলিক নামের কোনও মাইয়া যে আন্ডা সামনে দি আঁডি যার ইয়েন যন আন্ডা জানিই না!

আঁর নাম সুমন। ভাইছা এমপি সাবের হরে নেতা আকরাম ভাই, আকরামের ভাইর হরের নেতা মিল্টন ভাই। আন্ডা মিল্টন ভাইর লগে থাই। ভাইয়ে আঁরে পয়েন্ট থার্টি টু দিসে ইগ্গা। আঁই হিয়েন ফকেটে রাই। সেতুরে একবার দেখাইসিলাম জিনিশকান এককানা ভাব লইবার লাই। হেতি লাই-চাই কয়, ‘ইগা বুঝি হাছা-হাছা ফিস্তল! মিত্যুক! সাদমানের খেলনা ফিস্তলও ইয়েত্তুন বেশি ফাংশনওয়ালা।’

থার্টি টু ক্যালিবারের তুলনা দের তিরিশ টেয়াইয়া খেলনার লগে। ঢিলুনিরে কিয়া বুঝাইতাম! ‘হার-অ এডেত্তুন!’ ধমকাই মাতা ঠান্ডা কইচ্যি হেত্তে।

এতক্ষণ খাওই আসিলাম আফসাইর্যা র চায়র দোয়ানে। মেহেদি, ভুল্লা, রাজন, মাসুদ আর হুদামিয়ার (নাজমুল হুদা) লগে। আইজ্যা হোলাহাইন কারও মনেরই ভেলিবিশন নাই, মন অবইশ্য আঁরও খারাপ। হইত্যেদিন আব্বার এক রেকর্ডের ভ্যানভ্যানানি আর আম্মার নাকি কান্দন হোয়াদ লাগে না। আন্ডার হড়ালেখার যেই অবস্থা তাতে করি টেয়া-হইসা খরচ করি আঙো আব্বারা বিদেশ ন হাডাইলে, নয়তো ব্যবসা ন ধরাই দিলে আন্ডার ভবিষ্যৎ এই কান্দাকান্দি আর ভ্যানভ্যানানিতই আটকি থাইকব। ভাইছা আর ভাইজানগো হোন্দে-হোন্দে থাইকলে চা-হানির টেয়া উইঠব ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যৎ থাইকব অমাবইস্যার চান্দের নানিই কালা চাদইর! আন্ডা ব্যাক জানি, হিয়ার হরেও ভাইজানগো লগে থাই। কারণ আঙো হুরা ফাড়ার রগে ঢুকি গেছে তালা মার্কা। আঙো সৎ-সাধু বাপেরা হইয্যন্ত তালা মার্কায় জালভোট দেওনরে অন্যায় মনে করে না। হেতারগো যুক্তি, ‘কলস মার্কার লগে ভদ্রতা করি কী কাম? রামপুরওয়ালারা কি আন্ডা ভালামানুষির সম্মান রাইখব? হেতারা তো ঠিকই কলসি ভইরতে কলসির কানা হইয্যন্ত জালভোটের জাল বিছাই দিব!’

—এক্কেরে হাছা কতা!

এতক্ষণ আফসাইরায় চায়ের দোয়ানে আঙো আন্ধাইরা ভবিষ্যৎ লই নিয়শ-উয়শ হালাইলাম। মেহেদির চান্দি য্যান আতে ঘুরা লোডেড বত্রিশ, এই ছুইটল বলি। একদলা ছ্যাব হালাই হ্যাতে ছুডাইলও গুলি, ‘শালার বয়স অই যারগই আটাইশ-উনতিরিশ, অনও বিয়ার কতা তোলে না বাইত।’ ভুল্লা দরজার লগে খায়ই আছিল, এই টাইমে মাইয়াঅগল যতীন স্যারের বাসাত্তুন ইংরেজি ফাইভেট হই হিরি আইয়ে, হেতে হেই ধান্ধায় আছে। দরজাতুন টিটকারি মারে হেতে মেহেদিরে, ‘ঢিলাইয়া-চোদা! বাপের হোটেলে খাস, আবার বিয়া কইরতি চাস। তোরতে মাইয়া দিব কোন হাগলে?’

মেহেদি কিছু কইবার আগেই রাজইন্যা ভুল্লারে উদ্দেশ করি পিন মারে মেহেদিরেই, ‘অডা, এন্নে কইচ্যান। ভগবানে চাইলে হ্যাতে ব্যাক হাইব! সুন্দরী বউ, টেয়াওয়ালা হওর। হেতের হওরেই হেতেরে বিজনেস ম্যাগনেট বানাই দিব।’

কইআরি ভ্যাকভ্যাকাই আঁসন ধরে রাজইন্যা। এতক্ষণে চ্যাতি ওডে মেহেদি, রাজইন্যার মুই চোখ গোড়াই কয়, ‘এরই অডা, এত রং মারিচ্যান!’

এককানা চুপ থাই আবার হেতে রাজইন্যারে ঠেশ মারি কয়, ‘তোর তো রাজ-কোয়াল! তোর ভগবান তো তোর লাই ধোয়া-হইর রেডি রাইকসে। কাপড় আছার মাইরবি, শাদা বানাইবি আর মাইনসের ঘরে-ঘরে ডেলিভারি দিবি। নইলে সুযোগমতো ইন্ডিয়া ভাইগবি। হেট্টে তো ভট্টাচারী, অধিকারী বাউরা বই-ই রইসে তুলসী-ধোয়া কইন্যা কোচ্ছাত লই। যাইবি আর ফটাফট সাতপাক মাইরবি! তোর আর চিন্তা কীয়া!’

মেহেদির কতায় চুপ মারি যায় রাজন, হেতে ধোয়া-বাড়ির হোলা। হেতারগো সাত-পুরুষের ধোয়া-ব্যবসা ফাড়ায় বছর দুই ধরি চলা মিল্টন ভাইর রমরমা লন্ড্রির ব্যবসার লগে টিকতো ন হারি অন লাডে উডের। জ্ঞাতিরা ব্যাকেই ইন্ডিয়া হার অই গেলেও রাজইন্যারাসহ আরও দুইতিন ঘর অনও টিকি রইসে আশায়-আশায় যে নির্বাচনের হরে হেতারগো সুদিন আবার আইব। মেহেদির কতা হেতের কাঁটা-ঘাত নুনের ছিডা দি দিছে লাগের, জ্বলুনির চোডে কতা বন্ধ অই গেছে ইন্দুইয়ার! এইসব কতা-বাত্তায় আঁরও হুরাইন্যা যখমের বেদনায় খাঁ-জিলিক মারি ওডে। বিদেশ যাইবার নাম করি আব্বার বহুত টেয়া নষ্ট কইচ্যি। অন বিদেশের কতা হুনলেই হেই মিয়া আগের কতার সিউলি টানে—কন্ডে কত টেয়া নষ্ট কইচ্যে আঁর লাই। হালাত্থালার বাপ! গুণবতী গেরামের কারও কোনও দরকার লাইগলেই হেই মিয়ার হিশাব বে-হিশাব অই যায়। হালার নাম কামানি! ইয়ারতুন বাল-কামানি…।

‘মাগো! হুইনছোনি, আঁই বলে এস্কাটের লগে ওড়না হরি বাইর অইতাম!’ আহ্লাদের লাদি মিতুর হডইক্যা কান্দোনে মনে কয় যে হেতির ঘেডি বাই মারি ইগ্গা! মারামারির রাগ হামালি জোরে ধমকাই, ‘নাইনে উইঠসোস। অনও হাফপ্যান ছাড়োস না কিল্লাই’ এস্কাটের লগে ওড়না হিন্দলে এশটাইল নষ্ট অই গেলে, জামা-হায়জমা হিন্দ। হিয়ার লগে ওড়না। আর অন চুমকিগো বাসাত তোর কাম কীয়া, হেট্টে কিল্লাই যওরি?’

আন্ডা চিল্লাচিল্লির চোডে মা পাক-ঘরেত্তুন বাইর অই আইয়ে কাঁইলে জিরার বারকোশ লই। বেডির কোনও কাম নাই আর, হলুদ ভাঙো, মইচ্যের বডু হালাও, জিরা বাছো… মা বারকোশেরে টাইট করি ধরি আঁরে ধমকায় মিতুনিরে মাতাত তুলি, ‘এমা, এতে কীয়া কয়! হায়জমা-ওড়না হিন্দবার বয়স অইসেনি হেতির! ওড়না-হায়জমা হিন্দবো আর হাকনামি হিকবো। যা তুই এডেত্তুন!’

মা ধমকাই ওডে। হিয়ার হরেই সুরেরে নরম করি কয়, ‘টেবিলে শিন্নি আছে, খাগোই যা।’

টেবিলের মুই যাইতে যাইতে মনে-মনে মারে কই, ‘তোয়ার মাইয়াগো হাকনামির হিশটোরি তুঁই যদি জাইনতা!’

কাওন চাইলের শিন্নি মুখো দিতে দিতে মিতুর গজগজানি হুনি, ‘এহ্! আইসে এডে আঁর লগে টাউডারি মাইরতো! নিজে যে ফ্যাশন কইরবার লাই নতুন ফ্যান্টের রানের কাছে ছেনি দি হোচাই হালায়, হেগাইন কিচ্ছু ন!’

রানা ভাই অবশ্য তার সুন্দর আর হ্যান্ডসাম ভাব নিয়েও রেহাই পায় না। পাড়ার কোনো মেয়েই তার প্রেমে পড়ে না। উলটো তার ঈষৎ বোঁচা নাক, সঙ্গে চেহারার চাকমা ধরন আর গোলাপি গাত্রবর্ণের জন্য পাড়ার মেয়েরা তার নাম দিয়েছে ‘লালবেজি’।

ইচ্ছা করে শিন্নির বাডি মাতাত ডালি হেতির! কিন্তু কাইল্যা মাসুইদ্যার বাপের কাছে হুইনছি আব্বা নাকি আঁরে ইতালি হাডাইবার ব্যাফারে কতাবাত্তা কইসে হেই মিয়ার লগে। মাসুইদ্যার বাপ আদম-ব্যায়ারি। হইত্যে কেলাশে ফাস্ট অয়নের লাই মিতু আবার আব্বার কইলজার টুকরা! অন হেতির লগে ভ্যাজাল করি আব্বারে চ্যাতাই দিলে ইতালির কাড়ি-কাড়ি নোট অধরাই রই যাইব। দিলেরে বুঝ দি, ‘হারামজাদি! বিমানে উইডবার আগে তোরে যদি মনের সুখে ধুনি ন লইসি।’

চার.
রোদ পড়ে গেছে। বিকেলের মিঠে আলোয় সেতু তার প্রতিবেশী ছবি আপার সঙ্গে ছাদের রেলিংয়ে ঠেশ দিয়ে গল্প করে। ছবি নামের সদ্যতারুণ্যপ্রাপ্ত মেয়েটি পাড়ার আশিকানদের আরাধ্য। এই পাড়ায় অবশ্য তিনজন আছে যারা রূপের ছটায় ছবিকেও হারিয়ে দিয়েছে আহম্মদ উকিলের বোন রুমানা, রানার ছোটোবোন ঝিলিক আর সালাউদ্দিন কাকার মেয়ে রেক্সোনা। ও হ্যাঁ, তার নিজের বোন মিতুও কম সুন্দর নয়! রেক্সোনা অবশ্য এখন পাড়ায় নেই আর। মাস খানেক আগে বাঁশপাড়ার রাজু ভাইর সাথে ভেগে গেছে। সেই লজ্জায় সালাউদ্দিন কাকারাও সপরিবারে পাড়া ত্যাগ করেছেন। এই শহরটার এলাকাগুলোর নাম যাচ্ছেতাই। অন্তত সেতুর তা-ই মনে হয়। মাস্টার পাড়া, বাঁশপাড়া, ডাক্তারপাড়া, উকিলপাড়া—যার কিনা পূর্ব ও পশ্চিম নামে দুইটা ভাগও আছে।  একমাত্র ডাক্তারপাড়াই তার নামের সাথে সঙ্গতিবিধানে সমর্থ। পূর্ব উকিলপাড়ায় আহম্মদ উকিলই একমাত্র উকিল, পশ্চিমের ললাটে মুহুরিও জোটেনি। তবে আহম্মদের কারণে এ-পাড়ার নামকরণ হয়নি। আহম্মদ পরিবার এই দাবি তুললে এলাকাবাসী চ্যালাকাঠ মারবে নিশ্চিত; আহম্মদ প্র্যাকটিসই শুরু করেছে বছর দুই হয়। এলাকাটিতে রাজনীতির ফাঁকতালে পড়ে বিভ্রান্ত হওয়া ছেলে যেমন আছে, তেমনই আছে মেধাবীরাও। আহম্মদের ছোটোভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। হুদামিয়ার বোন গতবার বুয়েটে চান্স পেয়েছে, মজুমদার বাড়ির ছোটোছেলে ফাহিম নাকি এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ইউনিটে মেধা তালিকায় তৃতীয় হয়েছে—এমনই নানাবিধ আলোচনা-সমালোচনায় মেতে থাকে সেতু আর ছবি। এবার সেতু তিন গোয়েন্দার নতুন সিরিজ, হ‌ুমায়ূন আহমেদের নতুন উপন্যাস হয়ে মৌসুমীর নতুন সিনেমার প্রসঙ্গ তুলতে তুলতে আড়চোখে তাকায় পাশের ছাদে। মাবুলক কাকার ছেলে বাহার ভাই ছাদে উঠেছে অনেকক্ষণ। কতবার যে চোরাচোখে দেখলো ছবি আপাকে! ছবি অবশ্য একটু মুডি টাইপের, ছেলেঘটিত সুড়সুড়ানি বোঝা যায় না। সুন্দর গানের গলা ছবির। গানই তার ধ্যানজ্ঞান। দুপুর বেলায় পাড়ার মানুষ যখন ভরপেট খেয়ে নাক ডাকাচ্ছে তখন হঠাৎ-হঠাৎ সুর ওঠে ছবির হারমোনিয়ামে। গান সেতুর ভালো লাগলেও ছুটির দিনের মধ্যদুপুরের আরামকে হারাম বানানোর এই অত্যাচারে প্রায়ই তার মনে হয় তাদের ছাদে টাল করে রাখা বাঁশের একটা নিয়ে ছবির মাথা বরাবর মেরে তার ভবলীলা সাঙ্গ করে আসে!

বাহারকে পাত্তাই দেয় না ছবি। সে অভ্যেসবশত দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে মৌসুমী-অভিনীত সিনেমাটির বিশেষ একটি গানের সুর-তাল-লয়ের ব্যবচ্ছেদ করে যায়, যার আগামাথা কিছুই ঢোকে না সেতুর মগজে। সে শুধু বাহার ভাইয়ের দোমড়ানো হৃদয়কে কল্পনা করে মজা পেতে থাকে। এবার সেতুর নজর যায় নিচের রাস্তায়। ঝিলিকের ভাই রানা হেঁটে যাচ্ছে। ঝিলিকেরা তিন ভাইবোন, সবাই দুধশাদা। খালাম্মা আর ছেলেমেয়ে মিলে এই ঘরে রঙের বন্যা বইয়ে দিয়েছে যেন! শুধু রানার বাবাটাই আলকাতরার ড্রাম! রানা ভাই অবশ্য তার সুন্দর আর হ্যান্ডসাম ভাব নিয়েও রেহাই পায় না। পাড়ার কোনো মেয়েই তার প্রেমে পড়ে না। উলটো তার ঈষৎ বোঁচা নাক, সঙ্গে চেহারার চাকমা ধরন আর গোলাপি গাত্রবর্ণের জন্য পাড়ার মেয়েরা তার নাম দিয়েছে ‘লালবেজি’। সেতুর দৃষ্টি লক্ষ করে ছবিও নিচের দিকে তাকায়, বলে ওঠে, ওমা, লালবেজিয়ে না! আইজ্যা তো দেখি লালশাট হরি এক্কেরে নামের ইজ্জত রক্ষা কইচ্যে!

লালবেজি অবশ্য তিনতলার ছাদের বৈকালিক আসর সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে না। সে পাড়া পেরিয়ে পশ্চিম উকিলপাড়ার বরাবর এগিয়ে যায়। সেতু তার লম্বা চুলে খোঁপা আঁটতে আঁটতে তাকিয়ে থাকে লালবেজির গমনপথের দিকে, তার নিখুঁত চোখ সমকোণে ধরে রাখে বাহার ভাইয়ের গতিবিধিও। বাহার তার সমগ্র মনোযোগ তিন বছরের ভাগ্নে সাদমান বরাবর নিমগ্ন রাখার ভানে ব্যস্ত। সেতু মনে-মনে হাসে। ছবি আপা তার দুই বেণী দুলিয়ে এবার লালবেজির অগ্রাহ্যতাকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করে। দুই তরুণীর দ্বৈত মনোবৃত্তির কোনোটাই টের পায় না রানা কিংবা বাহার। তরুণীদ্বয়ের আলাপচারিতার প্রসঙ্গ সিনেমার গান থেকে নায়িকার ঠোঁট বাঁকানোর ঢঙে পালটে যায়। তারা বহুধাবিস্তৃত এমন অনেক হাবিজাবি কাহনে বিরতিহীনভাবে নিজেদের মগ্ন রাখতে পারতো, যদি না হঠাৎ করে পশ্চিম দিক থেকে আগত গোলাগুলির শব্দ তাদের থতমত করে দিতো। তারা চুপশে যায় খানিক। একটু পরেই পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গিতে নড়েচড়ে ওঠে আবার। এমন শব্দ এদের গা-সওয়া। এলাকাগুলোই এমন—মারামারি-কাটাকাটি আর গোলাগুলি। পশ্চিমে পশ্চিম উকিলপাড়া, তার পেছনে রামপুর। এই এলাকার অ্যান্টি পার্টির দখলে রামপুর। বিনা নোটিশে আসা ইন্টারভেলের শেষে ওরা আবার গল্পে ফিরে যাবে—এমন সময় হঠাৎ ছবি আপা বলে ওঠে, আইচ্ছা, লালবেজি না কতক্ষণ আগে হচ্চিমমুই গেলো?

রামপুর তো আর যাইতো ন। পশ্চিম উকিলপাড়াত গেছে আরি—একটু চিন্তিত শোনায় সেতুর কণ্ঠ।

তারা আবার গল্প শুরু করে, যদিও দুজনই বুঝতে পারে দুজনের মন। তারা রানাকে নিয়ে উৎকণ্ঠিত, গল্প জমে না আর। সন্ধ্যা হয়-হয়; ছাদ থেকে নেমে যাবে—দুই তরুণীর এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে-সঙ্গেই পশ্চিমদিক থেকে উদিত হয় পাঁচ-সাতজনের একটি দল। ছেলেদের চেঁচামেচি এত দূর থেকেও শোনা যায়। তারা একটি ছেলেকে চ্যাংদোলা করে দৌড়াচ্ছে। ছেলেটির ঝুলে পড়া মাথা দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে সে সংজ্ঞাহীন। এতদূর থেকে ছেলেটির চেহারা বোঝার উপায় নেই, কিন্তু গোধুলির শেষ রঙ তার গায়ের লালশার্টকে আরও টকটকে করে তুলতেই যেন অন্তিম পরশ বুলিয়ে যায়। নজর পড়ে দুজনেরই। সেতু কিছু বলার আগেই অসহায়ের মতো চিৎকার করে ওঠে ছবি আপা, আল্লা রে! রানা ভাইয়ে না!

ঘরভর্তি বেজি। লাল-লাল বেজি। রাইচ্যা গুম যাইতাম হারি না। শইল্লে বেজি উডি যায়। এক ইগ্গা এক আত লম্বা-লম্বা! বেডি এইচ্যা অখরিস্ত, ইগ্গা বেজিও যদি মাইরাবার লাই দেয়!

তারপরের সন্ধ্যায় সেতু, মিতু আর সখিনা পোস্টমর্টেম-শেষে-ফিরে-আসা রানাকে শেষবারের মতো দেখতে রানাদের ছোট্ট উঠোনটায় উপচেপড়া দর্শনার্থীর মধ্যে নিজেদেরও আবিষ্কার করেছিল। মৃত রানাকে দেখতে আসা উৎসাহী জনতাকে ধারণ করা সেই অপরিসর আঙিনার পক্ষে নিতান্তই দুষ্কর ছিল। তাদের তিনজনের চ্যাপ্টা হওয়ার দশা হয়েছিল সেদিন। ছবিকে দেখা যায়নি, পরে জানা যায় ওইদিন ছবি আসেইনি। ছবি এরপর আর সেতুদের ছাদেও আসেনি। তবে লালবেজি নিহত হওয়ার চৌদ্দদিন পর সেতু-মিতু ভগ্নিদ্বয় উপলব্ধি করে যে লালবেজির জন্য তার মায়ের চেয়ে ছবির শোকটাই বেশি ছিল। কারণ ঠিক চৌদ্দদিন পরই রানার রূপবতী মাকে তার অতিশয় রূপবতী মেয়েকে নিয়ে কটকটে হলুদ শাড়ি পরে কোহিনুরের গায়ে হলুদে আসতে দেখা যায়। পুরুষগণ তাদের আবির্ভাবের এমন অভাবনীয় মূর্তিতে টাশকি খেয়ে বিমুগ্ধ থাকলেও নারীমহলে ঢিঁ-ঢিঁ পড়ে যায়। এরপরেও এলাকাবাসী মহিলাকে লাল-নীল-বেগুনি—এমন নানা রঙে নিজেকে রাঙাতে দেখতো। যেহেতু তাদের পক্ষে স্বাভাবিক ছিল রানার মৃত্যুকে ভুলে গিয়ে তার মা-বোনের সৌন্দর্যের ঈর্ষায় কাতর হওয়া কিংবা ভালো লাগায় বুঁদ হয়ে যাওয়ায়, তারা তা-ই করতো।

পাঁচ.
বাঁধাই-করা খাতাটির বাকি পাতাগুলো বেশ খানিকক্ষণ ধরে উলটে যায় পারভেজ। হতাশ আর বিরক্ত হয়ে পাশের ঘরে ঝুল ঝাড়তে থাকা স্ত্রীকে উদ্দেশ করে চেঁচায়, অ্যাই, কই গেলা! এরপরে কিসব হাবিজাবি লিখে রাখসো? রানার পরিবারের কথা আর নাই কেন?

ঝাড়ু-হাতে শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়ায় সেতু। চোখে উষ্মা। চাকরি দু’জনে করলেও ছুটি ভোগ করে পারভেজ একা, এই নিয়ে খোঁচা দেয় বরাবরের মতো, কাজে তো হেল্প করো না একটুও, তারপর আবার বাগড়া দাও ক্যান!

—আরে ফালাও তো তোমার কাজ! এরপর রানাদের পরিবারের কী হইলো বলো। পরের পাতাগুলোতে তো আর এই নিয়ে কিছুই পাইলাম না। রানার মা কি বেমালুম ভুলে গেলেন ছেলেরে?
—নয়তো কী! সারাক্ষণ বসে বসে কাঁদবেন না কি! সেতুর গলায় ঝাঁজ।
—তাই বলে চৌদ্দদিনের মাথাতেই এমন রঙিন সাজ! অবাক প্রশ্ন পারভেজের।
—একেক মানুষের শোকপ্রকাশের ভাষা একেকরকম। সেতু বিজ্ঞের মতো ভঙ্গি করে ঝাড়ুর মাথায় লেগে থাকা ঝুল ফেলে।
—সুন্দরী বোনটার কী হইলো? তার কণ্ঠে কৌতূহল।
ডান ভ্রূ খানিক ওপরে তুলে কটাক্ষ করে সেতু, তারপর টেনে টেনে বলে, আচ্ছা, সুন্দরীদের নিয়ে আগ্রহের শেষ নাই তাইলে!
—আহ, বলো না! এবার বিরক্ত হয় সে। স্ত্রীর নাটক দেখায় মন নেই।
—কী আর হবে! আন্টি দিনদিন আরও সুন্দর হইতে লাগলেন। ঝিলিকের বিয়ে দিলেন বড় এক ব্যবসায়ীর সাথে। দুই বছর পর সেই বিয়ে ভাঙাই নিয়াও আসলেন। পরে আবার বিয়ে দিলেন। শেষ সংবাদ পাওয়ার আগ পর্যন্ত…

সেতুকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল পারভেজ, বিয়ে ভাঙল কেন?
—ওই যা হয় আর কি! অধিক সুন্দরী না পায় বর! ব্যাটা খালি সন্দেহ করতো ঝিলিককে। এ নিয়ে অশান্তি। একমাত্র মেয়ে, তাই আন্টিদের সহ্য হয় নাই মেয়ের কষ্ট।
—তারপর?
—তারপর, ঝিলিকের ছোটভাই রামিমও বড় হইল। দেশে থাকলে বড়ভাইয়ের মতো অবস্থা হইতে পারে ভেবে চাচা তারে ইতালি পাঠাই দিলেন। একদিন রামিমকেও টেলিফোনে বিয়ে করানো হইলো, তাদের পরিবারের নাম রক্ষায় তাদের চাইতেও বেশি শাদা এক কন্যার সাথে। রামিম দেশে আসত বছর-বছর। অতঃপর তাহারা সকলেই সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল। একনিশ্বাসে কথাগুলো বলে দম নেয় সেতু, শেষ বাক্যে রূপকথার ঢঙ।

—তুমি আন্টির কথা বলো, ছেলেকে নিয়ে মনখারাপ করতে দেখো নাই কখনো?

—‘অত কিছু জানা নাই তো। ততদিনে ভার্সিটি ভর্তি হয়ে গেছি। ছুটিছাটায় বাসায় আসি। খবর যা পাইতাম সব সখিনার কাছ থেকেই। আন্টিদের কাজের মেয়ে কুলসুমের সাথে ভাব ছিল সখিনার, সেই সুবাদে কুলসুম আসতো আমাদের বাসায়। বাসায় থাকলে ওই পরিবারের আপগ্রেড জানতে আমরা দু-বোনও মাঝেমাঝে শামিল হইতাম তাদের আড্ডায়।

—কী বলতো কুলসুম?
—এত মনে আছে না কি!

সেতু চলে যেতে উদ্যত হলে পারভেজ তার কামিজের কোণা টেনে ধরে, রোমান্টিকতার ছলে বলে, এত যাই-যাই করো কেন বাবু! সারা সপ্তাহ পাই না তোমাকে। ছুটির দিনে কই একটু আরাম করে গল্পগুজব করবা, তা না, খালি ঝাড়াপোঁছা!

পারভেজের কণ্ঠে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, কিন্তু সেতু তার উদ্দেশ্য ঠিকই ধরে ফেলে, কনুইয়ের গুঁতো দেয় তার পেটে, আহা রে আমার আহ্লাদের প্রহ্লাদ! তারপর স্বামীর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, আসলেই মনে নাই সোনা। তুমি এমন জেঁকে ধরবে জানলে সব টু দ্য পয়েন্ট লেইখা রাখতাম। একটু ভেবে আবার বলে, তবে যতদূর মনে পড়তেসে…সব কাজের মেয়ের মতোই কুলসুমও খুব বিরক্ত ছিল তার মালিকের ওপর। সারাক্ষণ বদনাম করতো আন্টির। বলেই দৌড় দেয় রান্নাঘরে। চুলায় তরকারি ছিল। পারভেজের খপ্পরে পড়ে মনে ছিল না সে-কথা। পোড়া গন্ধে হুঁশ হলো। পারভেজ পেছন-পেছন চলে আসে, হাঁড়ি নামাতে সাহায্য করে আবার শুধায়, কী বদনাম?

—তুমি কিন্তু এখন ডালঘুটুনির বাড়ি খাবা!

সেতু শাসায় তাকে, তরকারি তো জ্বলেনি, জ্বলছে তার মগজ! কিন্তু স্বামীর বিমর্ষ ভাবে মায়া লাগে পরক্ষণেই, পোড়া-সবজির হিল্লে করতে করতে বলে, কুলসুম বলতো আন্টি না কি বাইরেই ফিটফাট আর ভেতরে সদরঘাট। আমার বিশ্বাস হতো না যদিও।

‘ঠাশ’ শব্দে সেতুর কথার মাঝে ছেদ পড়ে এবার। শব্দ বরাবর দেয় দৌড় দুজনেই। খাবারঘরে খেলছিল তাথই। কখন টেবিলে উঠে মানিপ্ল্যান্টের ঝাড় উলটে দিয়েছে। সারা টেবিল পানিতে সয়লাব। মেয়েকে একটা ধমক দিয়ে কোলে তুলে নেয় সে। কিন্তু পারভজের বিকার নেই, সে আন্টি-পালায় নিমগ্ন। তাড়া খেয়ে এবার মুখঝামটা দেয় সেতু, কী শুরু করলা তোমরা বাপ-বেটি মিলে! মেয়েকে বাপের হাতে ধরিয়ে দিয়ে টেবিল মোছে সে। তারপর টবে আবার পানি দিয়ে মানিপ্ল্যান্ট সাজিয়ে রাখে। এরপর শোবার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়, তাথই বাপের সঙ্গে বিছানায়। লেগোর সেট বিছানাময় প্রবল প্রতাপে সাম্রাজ্য বিস্তার করে তাথইয়ের নির্দেশে। পারভেজের উৎসাহ স্তিমিত কিছুটা। বিব্রত সে। ভাবে, বেচারি বউকে সাহায্য করা দরকার। কিন্তু কিভাবে কী করবে হিসাব মেলাতে পারে না আর। দরজা ধরে দাঁড়ায় সেতু, স্বামীর দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসে। তারপর, ‘তুমি ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি’ রকম ভাব করে বলতে থাকে, কুলসুম কী বলতো জানো? কুলসুম বলত, এরপর যেন কুলসুম কথা বলছে এমন ঢঙে বলে যায়, ‘হায় রে আফারা! খালাম্মা ওঁচে-ওঁচে যত রূপসী, ভিত্তে-ভিত্তে তত খাডাই! ঘরভর্তি বেজি। লাল-লাল বেজি। রাইচ্যা গুম যাইতাম হারি না। শইল্লে বেজি উডি যায়। এক ইগ্গা এক আত লম্বা-লম্বা! বেডি এইচ্যা অখরিস্ত, ইগ্গা বেজিও যদি মাইরাবার লাই দেয়!

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন