মধ্যরাত শেষ হতে কিছু সময় বাকি ॥ মাহরীন ফেরদৌস | চিন্তাসূত্র
৩ মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ | সন্ধ্যা ৬:১৬

মধ্যরাত শেষ হতে কিছু সময় বাকি ॥ মাহরীন ফেরদৌস

দেয়ালের দক্ষিণ কোণার তারকাঁটা নড়বড়ে অবস্থায় কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো দিন খুলে আসবে। রেবেকা রান্নাঘর থেকে মসলা বাটার শিল নিয়ে আসে। তারপর তারকাঁটাটি সোজা করে দেয়ালে গেঁথে দেওয়ার জন্য আস্তে আস্তে বাড়ি দিতে থাকে। ঠক-ঠকা-ঠক শব্দ হচ্ছে। তারকাঁটার দু’পাশেই দেয়াল। সেখানে শিলের মাথাটুকু ভালো করে পৌঁছাচ্ছে না। তাও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সে। যতটা সম্ভব সাবধানে, যেন আঙুলে ব্যথা না লাগে। রাত বাড়ছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝি পোকার একঘেয়ে ডাক থেকে থেকে ভেসে আসছে। ভ্যাপসা গরম। কোনো বাতাস নেই। মাথার ওপরে যে পাখা চলছে, কেউ বুঝতে পারবে না। খাবার ঘর থেকে খুটখাট শব্দ হচ্ছে। নিশ্চয়ই চম্পার মা, রাতের খাবার খেয়ে বাদবাকি সবকিছু গোছাতে শুরু করেছে। কিছু খাবার কি বাইরে রেখে দেওয়া উচিত? সে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে। গা থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অবশ্যই গোসল করতে হবে। না করলে হবে না। এই গরমে নিজের নিঃশ্বাসও আগুনের তাপের মতো মনে হচ্ছে। ঝিঁঝি পোকার ডাকের সঙ্গে একটা রাতজাগা পাখি করুণ সুরে ডেকে ওঠে হঠাৎ। রেবেকা ওড়নার এক প্রান্ত দিয়ে কপালের ঘাম মোছে। আজকাল মশারি টাঙাতে গিয়েই এত ক্লান্ত কেন লাগে? মনে হয় সারাদিনের সবচেয়ে বিরক্তকর কাজ এটি। অথচ একটা সময় নানুবাড়ি গেলে সবার ঘরের মশারি সেই টাঙিয়ে দিতো। প্রতিঘরের মশারি টাঙিয়ে এক টাকা করে পেতো। এখন মনে হয় এই ক্লান্তিকর কাজের জন্য কেউ হাজার টাকা দিলেও সে রাজি হবে না। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায় সে। ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে বহুদিন। ব্যাটারি দেওয়া হয়নি। বিকেল চারটা পাঁচ বেজে থেমে আছে। তাও ভালো সারা দিনে দু’বারের জন্য হলেও তো ঘড়িটি ঠিক সময় জানায়। প্রতিদিন অন্তত দু’বার তো চারটা পাঁচ বাজে।

ঘড়ি থেকে চোখ সরিয়ে আবার তারকাঁটা সোজা করে গাঁথার চেষ্টা করতে থাকে। পারা যায় না, বরং শিলের চাপে হালকা বাঁকা হয়ে যায়। রেবেকা সেভাবে রেখেই মশারির শেষ প্রান্তটি আটকে দেয়। বিছানা থেকে নেমে এসে বসার ঘরে যায়, আম্মা টেলিভিশন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে গেছেন। সে ক্ষীণস্বরে ডাকে, ‘আম্মা ঘুমাতে আসুন।’ আম্মার ঘুম পাতলা। নিমিষেই জেগে যান। গায়ের ম্যাক্সি আর ওড়না ঠিক করতে করতে তিনি রেবেকার হাতে ভর দিয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করেন। তাকে সাবধানে ধরে এনে বিছানায় শুইয়ে দেয়। বাতি নিভিয়ে দেয়। বাইরে থেকে তোষকের নিচে মশারি গুঁজে চলে আসার সময় আম্মা বললেন, ‘আমার বালতি রাখছিস?’ রেবেকা নিঃশব্দে বাথরুমে চলে যায়। কল ছেড়ে ছোট একটি নীল বালতিতে অল্প একটু পানি নেয়। তারপর ফিরে এসে খাটের নিচে মাথার কাছে রেখে দেয়। আম্মার অ্যাসিডিটির সমস্যা আছে। রাতে অল্প বমি করলে আর বাথরুমে যান না। বালতিতেই ফেলে দেন। সে চলে যাচ্ছে, এমন সময় আবার আম্মার স্বর ভেসে এলো।
—পানির বোতলটা রাখছিস?
—জ্বি।
—আর অ্যাসিডিটির ওষুধটা?
—সেটাও রাখছি।
—তসবিহ?
—হুঁ।
—একশত দানা আর হাজার দানা দুইটাই রাখছিস?

রেবেকা হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, হাজারদানাটা বসার ঘরে আছে, নিয়ে আসতেছি।

হাজারদানার তসবিহ রাখার পরে তিনি বলেন, কপালে একটু বাম লাগায়ে দে। মাথা চিন চিন করতেছে। রেবেকা ড্রয়ার থেকে বাম নিয়ে এসে অন্ধকারেই মশারির ভেতরে গিয়ে বসে।

মশারির ভেতরে পুরা আয়। মশা ঢুকব তো—আম্মার কণ্ঠে বিরক্তি। সে মশারির ভেতরে পা গুটিয়ে নেয়। তারপর হাতের তর্জনিতে অল্প একটু বাম নিয়ে কপালের চারপাশে ঘড়ির কাঁটা এবং উলটো ঘড়ির কাঁটার মতো করে লাগিয়ে দেয়। হালকা আরামে আম্মা উহ-আহ শব্দ করেন। বিড়বিড় করে সুরা পড়েন। রেবেকা মিনিট তিনেক কপাল টিপে দিয়ে চলে আসে। আম্মা এখন ঘুমিয়ে যাবেন দ্রুত। আর চিন্তা নেই।

বসার ঘর বাদে আর কোথাও আলো জ্বলছে না। আলো আঁধারির মায়াজালে ডুবে আছে এ বাড়ির বাকিসব বিবর্ণ ঘর। রেবেকা খাবার ঘরের জানালা খুলে দেয়। বাইরের বাতাসে ধূলার ঘ্রাণ। কেমন যেন গুমোট হয়ে আছে চারদিক। প্রচণ্ড ঘামে বুকের মাঝটুকু ভিজে একাকার হয়ে আছে। জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকায় সে। বড় বড় সাদা মেঘ জাহাজের মতো ভেসে যাচ্ছে আকাশে। এত এত মেঘ, অথচ কোনো বাতাস নেই কেন? আজ কি তাহলে মাঝরাতে ঝড়-বৃষ্টি হবে? চাঁদ কি উঠেছে? দেখা যায় না। তবু কেমন যেন একটা হালকা অপ্রাকৃতিক আলো চারপাশে। জানালা গলে সেই হালকা আলো মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে আলো অন্ধকারের ছায়া মিলিয়ে কেমন যেন একটা নকশা হয়ে যায়। যেন একটা অচেনা ফুল, এখনই সুবাস ছড়াবে।

রেবেকা পায়ে পায়ে হেঁটে রান্নাঘরে যায়, চম্পার মা বিছানা করে শুয়ে পড়েছে। লম্বা আর গভীর নিঃশ্বাস ফেলছে। বেচারিকে খুব ভোরে উঠতে হবে। তারপর চারবাড়ি ছুটা কাজ করতে হবে। এভাবেই চলে সপ্তাহের ছয়দিন। সাত নম্বর দিনে শুধু সে আধাবেলা কাজ করে বাকি দিন বিশ্রাম নিতে পারে। কষ্টের জীবন। রেবেকা রান্নাঘর থেকে খাবার ঘরে এসে শেষ প্রান্তে রাখা বেসিনের কল ছেড়ে দেয়। বড় বড় পানির ঝাপটা দিয়ে মুখ ধুতে থাকে। ঠাণ্ডা পানির প্রলেপ এসে জলরঙের মতো ক্লান্তি সরিয়ে দেয়। ভাগ্যিস ছাদের পানির ট্যাংকিটা এমন জায়গায় আছে, যেখানে পাশের বাড়ির দেয়াল আর মস্ত বড় বটগাছের জন্য রোদ পড়ে না। সে জন্যই পানি ঠাণ্ডা থাকে। তা না হলে এই পানিও উত্তপ্ত হয়ে যেতো।

হঠাৎ চারপাশ কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে যায়। রেবেকা ভেজা মুখ তোয়ালে দিয়ে মোছে না। ভেজা রেখেই কল বন্ধ করে দেয়। বসার ঘরে আলো জ্বলছে। আর থেকে থেকে ফিসফাস কথার শব্দ আসে। পায়ে পায়ে হেঁটে যায় সে, গিয়ে দেখে রাবিতা কানে এয়ারফোন দিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাসছে। তাকে দেখেই অপ্রস্তুত হয়ে বলে, ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে। এই জন্য তোমার ঘর থেকে এ ঘরে এলাম। কালকে একটা কুইজ আছে বলে টিনার সাথে কথা বলছি।

রোকেয়া আপার নামটা আব্বার দেওয়া। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামে। তার নামটিও আব্বার দেওয়া। তবে কোনো মহান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে নয় বরং শুধুই বড় আপার নামের সঙ্গে মিলিয়ে।

রেবেকা কিছু বলতে গিয়েও বলে না। এ বাসায় শুধু দু’টি ঘরে আইপিএস আছে। বসার ঘরে আর খাবার ঘরে। বাকি কোনো ঘরে নেই। আম্মার ঘরে শুধুই ফ্যান চলে। বাতি নেই। লোডশেডিং হলে তাই বাকিসব ঘর জমাট অন্ধকারে ডুবে থাকে। রান্নাঘরে আছে একটা চার্জার। যা চম্পার মার কাছেই থাকে। খাবার ঘরের বাতিটা আজকাল প্রায়ই টিমটিম করে জ্বলে-নেভে। তাই এমন অবস্থায় বসার ঘরই সম্বল। রাবিতাকে দেখে যদিও মনে হয় না টিনার সাথে কথা বলছে। কিন্তু তার ইচ্ছে করে না আগ বাড়িয়ে খতিয়ে দেখতে। জটিলতা বাড়িয়ে লাভ কী? পাশের বাড়ি থেকে ছোট্ট শিশুর কান্নার শব্দ ভেসে আসে। এতরাতে জেগে আছে কেন কে জানে? নাকি ঘুম ভেঙে গেছে?

রাতের খাবার খাওয়া হয়নি। পেটের ভেতর খিদে আছে কিন্তু কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। এরচেয়ে গোসল করে ফেলা যাক। নিজের ঘরে গিয়ে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে কাপড়ের ড্রয়ার খোলে। কোনোক্রমে আন্দাজ করে একটা আরামদায়ক কামিজ-সালোয়ার বের করে নেয়। কাপড় ও তোয়ালে নিয়ে বসার ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আবার রাবিতার হাসির শব্দ ভেসে আসে। রেবেকা ঘরে উঁকি দেয়। রাবিতা কান থেকে এয়ারফোন সরিয়ে বলে, কিছু বলবে?

—আমি গোসল করতে যাচ্ছি। আম্মার যদি ঘুম ভেঙে যায়, যদি আমাকে ডাকে, তুই খবর নিস।
কথা শুনে রাবিতা কোনো উত্তর না দিয়ে ঘাড় বাঁকা করে কেমন যেন একটা ভঙ্গি করে। বাড়ির পাশ দিয়ে একটা বড় মাইক্রোবাস যাওয়ার জন্য মোড় নেয়। তার তীব্র হেডলাইটের আলো বাসার ভেতর চলে আসে। আধখানা একটা মোমবাতি জ্বালায় রেবেকা। তারপর বাথরুমে চলে যায়। পাঁচটাকা দামের দুর্বল মোম। বারকয়েক চেষ্টা করার পরেও বেসিনে পাশে আটকে রাখা যায় না। বাধ্য হয়ে ব্রাশ-পেস্টের ঝুড়ির মধ্যে কোনো রকমে মোমটাকে আটকে রাখে। অদ্ভুত এক মরা আলোয় ভরে ওঠে স্যাঁতস্যাঁতে বাথরুমটা। সে জানে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আম্মার ঘুম ভেঙে যেতে পারে। তারপর তিনি রাবিতাকে না ডেকে তাকেই ডাকবেন। রাবিতা সেই ডাক শুনেও না শোনার ভান করে বসে থাকবে। একপর্যায়ে আম্মা রাতের সব নৈঃশব্দ্য খান খান করে জোরে জোরে ডাকবেন এবং কারও সাড়া না পেলেই গালাগালি শুরু করবেন। তাকে দ্রুত গোসল সারতে হবে। একবার যদি আম্মা জেগে ঠিকমতো সাড়া না পান, এ নিয়ে তিনি বাকি রাত কথা বাড়াবেন। এক সময় হয়তো এটাই বলবেন, সে তখন মশারির ভেতরে পুরোপুরি বসেনি বলে মশা ঢুকেছে। সে জন্যই তিনি ঘুমাতে পারেননি। তিনি আগেই জানতেন রেবেকা মায়ের জন্য যত্ন নিয়ে বিছানা গোছায় না। আসলে আম্মা আগের-পরের সব কিছুর সঙ্গে যোগসূত্র জুড়ে দিতে সক্ষম। হয়তো চম্পার মা একটা গ্লাস ভেঙে ফেললো, তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বলবেন, একটা দুর্ঘটনা ঘটবে আজ। সারাদিন মন্দ কিছু না ঘটলে দেখা যাবে রাতে তিনি নিজেই খাটে বসতে গিয়ে কাঠে ধাক্কা খেয়ে কোমরে ব্যথা পেয়েছেন। সে ঘটনা নিয়েই চম্পার মাকে আর গ্লাস ভাঙার ঘটনা নিয়ে শাপশাপান্ত করবেন। আম্মার খাটটা তুলনামূলকভাবে বেশ উঁচু, সেকেলে একটা খাট। নানাভাইয়ের বানিয়ে দেওয়া। বহুদিন সে বলেছে খাট বদল করে তাদের ঘরেরটা নিতে। আম্মা রাজি হননি। সেই খাটই তিনি রাখবেন। দুর্ঘটনা ঘটাতে ইচ্ছে হলে বার বার উঠতে গিয়ে হাঁটুতে বা কোমরে ব্যথা পাবেন, তবু নিজের জেদ ছাড়বেন না।

রেবেকা মগভর্তি পানি নিয়ে ঝুপ ঝুপ করে মাথায় ঢালতে থাকে। ঝর্ণা ছাড়তে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ঝর্ণাটা আগের মতো ভালো নেই। বেশি পানি বের হয় না। অল্প অল্প করে পড়ে। গোসল করে শান্তি পাওয়া যায় না। ঠিক করাবে করাবে ভেবেও করা হয়নি। গরমে, উত্তাপে ডুবে থাকা শরীরে ঠাণ্ডা পানি আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রশান্তি ছড়িয়ে যায়। হঠাৎ টুং করে শব্দ হয় বাইরে। কলিংবেল বাজল কি? না কি শোনার ভুল? না কি পাশের বাড়ির বেড়ালটা আবার এসে কিছু ফেলে দিয়েছে। আর পারা গেলো না। দ্রুত অল্প কিছু পানি ঢেলে পোশাক বদলে রেবেকা বের হয়ে আসে। বসার ঘর বাদে এখনো সারাবাড়ি অন্ধকার। তোয়ালেতে ভেজা চুল জড়িয়ে সে আম্মার ঘরে যায়। আম্মার বিছানা থেকে হালকা নিঃশ্বাসের শব্দ আসছে। নিশ্চিন্ত হয়। এই মানুষটা জেগে থাকলে কেন যেন পৃথিবীটাকে খুব ভারী মনে হয়, মনে হয় যেন একটা ভীত হরিণ এসে তার বুকের মধ্যে প্রাণপণে আশ্রয় খুঁজছে। অচিন বনের মতো শূন্যতা কাজ করে মনে। আম্মা কী চান আসলে? রোকেয়া আপার মতো সেও যদি স্বামীর মার খেয়ে খেয়ে শ্বশুরবাড়িতে পড়ে থাকতো, তাহলে কি তিনি খুব আনন্দিত হতেন? আপস করলে সবাই ভালো, আর আপস করতে না পারলেই খারাপ? রোকেয়া আপা তো স্কুলে শিক্ষকতা করে, শিশুদের নীতিবাক্য শেখায়; তারপর মাস শেষে সবটুকু বেতন তুলে দেয় স্বামীর কাছে। শ্বশুরবাড়ির নানা অপবাদ শোনে, ঝগড়া হলে স্বামীর মার খায়। তবু পড়ে থাকে সেখানে। আম্মাকে দেখতে আসতে পারে না প্রায় বছর তিনেক হলো। অথচ এখান থেকে খুলনার দূরত্ব কত? বছর তিনেকের ব্যবধান হওয়ার মতো? তবু প্রথম সন্তান রোকেয়া তার দৃষ্টিতে ভালো। নামের মতোই মহান নারী। যে নারী সংসারের মর্ম বোঝে। পরিবার নামের ফুলবাগানে যে ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত গোলাপ হয়ে গেলেও বাইরে স্নিগ্ধ হলুদ-সাদা ফুল হয়ে সুবাস ছড়ায়।

রোকেয়া আপার নামটা আব্বার দেওয়া। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামে। তার নামটিও আব্বার দেওয়া। তবে কোনো মহান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে নয় বরং শুধুই বড় আপার নামের সঙ্গে মিলিয়ে। একমাত্র রাবিতার নাম আম্মা দিয়েছিলেন। স্কুল পেরিয়ে অবশ্য সে নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে বিখ্যাত চরিত্র খুঁজে পেয়েছিল। আলফ্রেড হিচককের সিনেমার চরিত্র, রেবেকা। যদিও বাসায় কাউকে বলতে পারেনি, তবে মনে মনে খুশি হয়েছিল। বড় আপার মতো কখনো হতে চায়নি সে। হতে পারবেও না। আর তাই তো মহসিন যেদিন প্রথম গায়ে হাত তুললো, সেদিনই সে বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে চেয়েছিল। তারপর বাধা পেয়ে থেকে গিয়েছিল। সারারাত বসে ছিল বারান্দায়। পতঙ্গের মতো সেঁটে ছিল দেয়ালের সঙ্গে। নিজের নিঃশ্বাসে নিজেকেই বার বার ছুরিকাঘাত হচ্ছিল। মাছের মতো নিস্পলক হয়ে যাচ্ছিল সময়। কাটছিলই না। এভাবে আরও কিছুদিন গেলো। এরপরেরটি অবশ্য ঠিক সরাসরি গায়ে হাত তোলা ছিল না। তুমুল ঝগড়ার মাঝে একটা আচমকা ধাক্কা এসেছিল অন্যজনের থেকে। রেবেকা তাল সামলাতে পারেনি। হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল শক্ত মেঝেতে। এরপর শুরু হলো, সন্দেহ সন্দেহ খেলা। যাদের হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়, তারা কি আর কোনো কিছুতে থামে? সেই সন্দেহ সন্দেহ খেলায় তাই মহসিন নিজেই পরাজিত হলো। এক গোপন বাক্স থেকে বের হলো ছবি, হোটেলের টিকিট। সেদিন প্রশ্ন তুলতেই মহসিন পালটা আক্রমণ করেছিল। একটা চড় সশব্দে। এড়াতে পারেনি রেবেকা। তবে নিজেও আর চুপ করে থাকেনি। কোনো এক বিচিত্র উপায়ে সারা শরীরে সেদিন ওর আগুন জ্বলে উঠেছিল। যেন সে একটা মশাল কিংবা বারুদ, জ্বলছিল সে নিয়ত। ঠিক কতগুলো আঘাত মহসিনকে করতে পেরেছিল মনে নেই ঠিক। কিন্তু এটা দিব্যি মনে আছে স্তম্ভিত মহসিন আঘাত করা তো দূরের কথা, বাধা দিতে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিল। কোনোদিন কল্পনাও করেনি নিজের স্ত্রী এমন করতে পারে। আর রেবেকা? সে তখন থেকে থেকে স্বামীকে আঘাত করছিল আর অচেনা এক পথ খুঁজছিল। ফেরার কিংবা হারিয়ে যাওয়ার। একটা অচিন শাড়ির আঁচল ফেলে চলে এসেছিল সে। যে আঁচলে আর কোনোদিন তার এই সত্তা বাঁধা পড়বে না।

আম্মা ঘুমের ঘোরে কাকে যেন বিড়বিড় করে গালি দিলেন। তারপর পাশ ফিরে আবার শুয়ে পড়েন। রেবেকা নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার বিরুদ্ধে মহসিন ও তার পরিবারের দেওয়া মামলা চলছে। এতে তার নিজের কিছু যায় আসে না কিন্তু এই পরিবারের অনেক চিন্তা। আম্মার ভাষ্যমতে, অনেক বড় পাপ আর অন্যায় করে এসেছে সে। অপবাদ তার প্রাপ্য। তার জন্যই পরিবারের পতন ঘটছে। অথচ পতন শুরু হয়েছে বহু আগেই। বেদনার নীল আকাশ ছড়িয়ে পড়েছে বহু বছর থেকেই। রোকেয়া আপাকে যখন পড়া শেষ করতে না দিয়েই বিয়ে দেওয়া হলো, যখন তাকে মেডিক্যালের ভর্তি কোচিংয়ে না দিয়ে বিউটি পার্লারের কাজ শিখতে পাঠানো হলো। উপার্জন বাড়াতে হলে শিক্ষা বাড়াতে হয়, এই জ্ঞানটুকু যদি আরও আগে থেকে থাকতো তাদের, তাহলে হয়তো সময়টা অন্যরকম হতো। এই ছায়াঘেরা পুরনো বাড়ি, একলা চাঁদ, মলিন জীবন, মরচে পড়া জীবনের হাহাকার শুনতে হতো না। যেমন চম্পার মাকে বেতন দেওয়া হয় না বহুদিন। দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। তাই সে থাকা আর খাওয়ার বিনিময়ে রয়েছে। বাইরে চারটি বাড়িতে ছুটা কাজ করে উপার্জন করে, এরপর গ্রামে টাকা পাঠায়। থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে এ বাড়ির অল্প কিছু কাজ করে দেয়। যেটুকু না করলেও চলে। সে চলে যেতে পারে, তাকে রাখার মতো এ বাড়ির অবস্থা চলে গেছে বহু আগেই। আব্বার নীরব মৃত্যু পরেই। তবু কী এক অচেনা মায়ায় মানুষটা পড়ে আছে। মাসের শেষে যখন বাজার থাকে না ঘরে, রাবিতার কলেজের বেতন দেওয়ার সময় চলে আসে, বাড়ির গ্যাস, পানি, আলোর বিল বাকি পড়ে, তখন মাঝে মাঝে আম্মা হুট করে অবুঝের মতো বড় মাছ কিংবা শিং মাছের সঙ্গে তিতা শাকের ঝোল খেতে চান। রেবেকার তখন দু’চোখে পৃথিবী তলিয়ে যায়। ঝড়ে দুলে ওঠা ঝাউবনের মতো হাহাকার ওঠে অন্তরে। অতি সন্তর্পণে তখন চম্পার মা কাজ শেষে সন্ধ্যা করে বাড়ি ফেরার পথে বাজার থেকে অল্প কিছু শিং মাছ কেনে। দূরের মিয়া বাড়ির বাগানে গিয়ে মুঠোভরে তিতাশাক নিয়ে আসে। তারপর কাউকে কিছু না জানিয়ে রেঁধে ফেলে। রেবেকা জানে না এই অনুভূতির নাম কী? কৃতজ্ঞতা, করুণা না কি ভালোবাসা। তবে শেষের শব্দটাই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। যদিও রাবিতা বলে, ‘এই সময়ে একঘরের ভাড়ার যা দাম, তার কিছুই তো খরচ করতে হয় না এই মহিলাকে। সেইসঙ্গে একবেলার খাওয়া আর নিরাপত্তা পাচ্ছে। এই সুবিধা পাবে কোথায়?’

রেবেকা পা টিপে টিপে আম্মার ঘর থেকে চলে আসে। কেন যেন তার মনে হয় মহসিনের প্রতারণা বা আঘাতও তাকে অতটা দুর্বল করতে পারেনি, যতটা তার আম্মা বা রাবিতার সামনে গেলে লাগে। কেন এমন হয়? কাছের মানুষদের কাছেই নাজুক আর একলা হয়ে যেতে হয়! খুট খুট করে শব্দ হয় আবার কোথাও। বিদ্যুৎ আসেনি এখনো। ভেজা তোয়ালেটা খাবার টেবিলের চেয়ারের ওপর মেলে দিয়ে রেবেকা বড় দরজার কাছে চলে আসে। দরজায় আবার হালকা খুট খুট শব্দ হচ্ছে।
—কে?
—আমি। চাপা স্বর ভেসে আসে।
—আমি কে?
—আপা, দরজা খোল।
রেবেকা দরজা খুলে দেয়। বসার ঘর থেকে রাবিতা ছুটে আসে। বাইরে একরাশ অন্ধকারের মাঝে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গোঁফ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রক্তিম। রাবিতা ‘দাদা’ বলে রক্তিমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রক্তিম ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েই রাবিতাকে এক হাতে শক্ত করে আগলে রাখে আর রেবেকার দিকে তাকিয়ে বলে, ভালো আছিস?
বুকের মধ্যে মেঘের গুরুগুরু আর চোখের পাতায় বিষাদ নিয়ে রেবেকা খোলা দরজার এক পাশে সরে যায়। এই গুমোট, বন্ধ আবহাওয়ায় কোত্থেকে যেন মিষ্টি বাতাস বয়ে যায়। রাতের আকাশকে ঘুলঘুলি বানিয়ে চকমকে কিছু তারা কৌতূহল ভরে উঁকি দেয় যেন। রেবেকার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে।
এখনো লোডশেডিং বাড়ি ছেড়ে যায়নি। তাই বসার ঘরের সেন্টার টেবিলে খাবারগুলো রাখতে হয়। আয়োজন খুব বেশি না। ছোট ছোট বাটিতে সবজি ভাজি, দুই টুকরা মুরগির মাংস, ডিমের তরকারি আর ভাত। রেবেকা মনে মনে নিজেকে ধন্যবাদ দেয়। ভাগ্যিস রাতে সে খায়নি। তাই তো এখন খাবারগুলো দেওয়া গেলো। রক্তিম আসায় চম্পার মা মধ্যরাতে বিছানা গুটিয়ে আম্মার ঘরে ঘুমাতে যায়। অন্যরাত হলে আম্মা এর মাঝে দু’তিনবার জেগে যেতেন। আজ কী হলো কেন জানে, এখনো ঘুমাচ্ছেন। রক্তিম হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে। ফর্সা চামড়া রোদে পুড়া তামাটে হয়েছিল বহু আগেই। এখন সেই তামাটে রঙের ওপরেও কালচে প্রলেপ পড়ে আছে। গা ভর্তি তামাকের চাপা গন্ধ। একটা চেকশার্ট আর জিনস পরে আছে। চুলগুলো পেছন দিয়ে সুন্দর করে কাটা। সামনে ঈষৎ এলোমেলো। ভাত খাচ্ছে বড় বড় লোকমা নিয়ে। রাবিতা পাশে বসে বক বক করে যাচ্ছে কলেজে কী হয়েছে, এবার কোথায় ওদের পিকনিকে নেওয়া হবে, কোন পরীক্ষায় সবচেয়ে বাজে গার্ড পড়ে, তার বান্ধবী নতুন কোন ফোন কিনেছে—এসব। এতকথা তার সঙ্গে কখনো বলে না রাবিতা। অথচ আজ রক্তিমকে দেখে যেন গল্পের পসরা সাজিয়ে বসেছে। খেতে খেতে রক্তিম বলে, আমাকে একটু চা বানিয়ে দিবি?

রাবিতা ছুটে রান্নাঘরে চলে যায়। রেবেকা আড়চোখে দেখে মুঠোফোন আর ইয়ারফোনটা নিমিষেই কি অবহেলায় ফেলে চলে গেলো রাবিতা। অথচ সে হাজার বলেও এই কাজ করাতে পারতো না ওকে দিয়ে।
—আপা বসবি না একটু? কতক্ষণ থেকে দাঁড়িয়েই আছিস।

রেবেকা মুখোমুখি চেয়ারে বসে।
—আমার ওপর অনেক রাগ করে আছিস?
—তুই কিংবা তোরা কি আমার ওপর রাগ করে আছিস? পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় রেবেকা।
—আর কারও কথা জানি না। তবে আমি রাগ করে নেই। কেন থাকব?
—তোরা কি আসলেও বিশ্বাস করিস আমি মহসিনকে চাকু দিয়ে আঘাত করে ও বাড়ি থেকে চলে এসেছি?
—আমি বিশ্বাস করি না। কোনোদিন করব না। যদিও বা করি, ভাবব তুই নিজেকে বাঁচাতেই এমন করেছিলি। আম্মার কথা বা আত্মীয়দের কথায় কান দিস না। চলে এসে ভালো করেছিস। আমি তো বাসায় থাকি না। আম্মা অসুস্থ, রাবিতার বাড়ন্ত সময়। কে দেখতো এসব?
—কবে থেকে আবার বাসায় থাকবি তুই? এমন জীবন কি হওয়ার কথা ছিল তোর?
খাওয়া থামিয়ে কিছুটা চুপ করে থাকে রক্তিম। তারপর প্লেটের অবশিষ্ট খাবারটুকু নিঃশব্দে খেয়ে নেয়। শূন্য থালায় আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে হঠাৎ কিছুটা আনমনা হয়ে বলে, এমন জীবন কি আমাদের কারও হওয়ার কথা ছিল, বল?

রোকেয়া পর্যন্ত এরচেয়ে বেশি সচেতন। এত মার খেয়ে শুধু সংসার ও সন্তানের জন্য সে থেকে যায়নি। বরং এখানে ফিরে এলে যে অনিশ্চয়তার জীবন শুরু হবে, সেই ভীতিটুকুই তার স্বামীর বাড়িতে রয়ে যাওয়ার শক্ত কারণ।

রেবেকা ভেতরে ভেতরে অলিখিত এক পথের রেখা খুঁজতে থাকে। হয়তো কিছুটা ভাঙতেও থাকে। তার মনে হয়, এই কথার উত্তর দেওয়ার চেয়ে নিঃশব্দে দরজার হুড়কো খুলে হাট খোলা দরজা রেখে অনেক দূরে কোথাও হারিয়ে গেলে ভালো হতো। কিংবা কোনো জলাশয়ের মাঝে নেমে শরীর ডুবিয়ে তলিয়ে গেলে হয়তো আরও ভালো হতো।
—কী হলো আপা? কথা বলবি না? তোকে কিন্তু আমি বলিনি, যেদিন শুনেছি তুই চলে এসেছিস, আমি মনে মনে প্রচণ্ড খুশি হয়েছি। মনে হয়েছে যা আমি তোকে বলতে চেয়েছিলাম, তুই তাই করেছিস।

এটুকু বলেই রক্তিম চুপ করে যায়। চুপ করে থাকে রেবেকাও। একটা নিঝুম ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। রান্নাঘর থেকে শুধু চায়ের কেতলির তপ্ত পানির শোঁ শোঁ বাতাস আর রাবিতার গুনগুন করা গানের শব্দ ভেসে আসে।

আম্মার খুব ছেলে সন্তানের শখ ছিল। দু’টো মেয়ের পর যখন এক পড়ন্ত বিকেলে টকটকে লাল সূর্যের মতো রক্তিম জন্ম নিলো, আর তারস্বরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি মাথায় তুলে ফেললো সেদিনের মতো আনন্দের দিন এ বাড়িতে খুব কমই এসেছে। এমনকি রাবিতার জন্ম আরেকটি পুত্র সন্তানের প্রত্যাশাতেই হয়েছিল। সে কারণেই হয়তো তার জন্মের পর আশেপাশের বাসায় মিষ্টি পর্যন্ত বিলানো হয়নি। এমনকি আকিকাও হয়নি ঠিকমতো। সব ভাই বোনের মধ্যে রক্তিম ছিল, আদুরে, কোমল। এত কোমল তাদের মধ্যে আর কেউই ছিল না। রোকেয়া পর্যন্ত এরচেয়ে বেশি সচেতন। এত মার খেয়ে শুধু সংসার ও সন্তানের জন্য সে থেকে যায়নি। বরং এখানে ফিরে এলে যে অনিশ্চয়তার জীবন শুরু হবে, সেই ভীতিটুকুই তার স্বামীর বাড়িতে রয়ে যাওয়ার শক্ত কারণ। রক্তিম সেখানে শিশুকাল থেকেই খুব স্পর্শকাতর। পাড়ার নেড়ি কুকুর মরে গেলে সে দাওয়ায় বসে ভরদুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত কাঁদতো। সেই রক্তিমের মতো একজন কিভাবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে সব ভুলে রাজনীতি শুরু করে দিল কে জানে! এরপর শুধু দল আর দল, মিটিং, আড্ডা, সম্মেলন, আরও কতকিছু। রেবেকার মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করে রক্তিম এসবের কী বোঝে? ওর চেয়ে বছর তিনেকের বড় হয়েও তো আজ পর্যন্ত বুঝতে পারলো না সে।
—আপা, চাকরির খবর আছে কোনো?
—গত সপ্তাহে একটা ইন্টারভিউ ছিল। এখনো আর কিছু বলেনি। দেখি কী হয়।
—সব জায়গাতেই আসলে নেটওয়ার্ক লাগে রে। এবারের নির্বাচনটা যাক। আশা করছি, তোর চাকরির জন্য কোথাও বলতে পারব।
—তোর সুপারিশ লাগবে না আমার।
—আমি নিজে করব কে বলল? এখনও সে সময় আসেনি আমার। বলব এক বড় ভাইকে। একটা প্রাইভেট ব্যাংকের এমডি উনি। একসময় তুমুল দল করতেন। এখনো করেন। তবে প্রকাশ্যে আসেন কম। উনাকে বললে একটা ব্যবস্থা হবেই। এরপর যখন আমার নিজের অবস্থানটুকুও শক্ত হবে। তখন আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।
—কবে শেষ হবে তোর এসব? কবে নিয়মিত বাড়ি থাকবি তুই? যেভাবে আছিস এটাকে কি থাকা বলে?
—আর অল্প ক’টা দিন। সময় বদলে যাবে। সামনেই তো নির্বাচন। দলটা ক্ষমতায় আসলেই এতদিনের শ্রম সার্থম হবে।
—তোদের দল নিয়ে লোকে নানা কথা বলে। ভালো কথা তো কমই শুনি।
—সব দল নিয়েই ভালো-মন্দ কথা থাকে। আমি এখন যাদের সাথে কাজ করছি তারা খুবই ভালো আপা। দেশ নিয়ে কিছু স্বপ্ন আছে, পরিকল্পনা আছে। অন্যদের মতো শুধুই নিজেদের উদরপূর্তি করার পরিকল্পনা করছে না এরা। দেখবি ভালো কিছু হবেই।
রক্তিম হাত ধুতে খাবার ঘরে চলে যায়। বাতি জ্বালাতে চেষ্টা করে। বাতি টিম টিম করে জ্বলতে নিভতে থাকে। টিউব লাইট না কিনলে একটা একশ ওয়াটের বাতি লাগানো উচিত। নাহ! কালই লাগাবে। রাবিতা একটা বড় মগে চা নিয়ে আসে। এত রাত হয়েছে অথচ চোখে মুখে কোনো ঘুম নেই। বরং আনন্দের আভা ছড়িয়ে আছে।
—চা খাবি রাবিতা?
—খাবো দাদা। আমার চা’টুকু কেটলিতে আছে। তুমি মগটা নাও। আমি কাপে করে নিজের জন্য আনছি।
—আপার জন্য চা আনিসনি? রক্তিমের প্রশ্ন শুনে রাবিতা কিঞ্চিত থমকায়। অপ্রস্তুত হয়ে বলে, সে তো বলেনি।
রাবেয়া গতিহীন স্বরে আলতো করে বলে, লাগবে না। এখন খেলে রাতে ঘুম হবে না।
—অ্যাই, দৌড় দিয়ে একটা কাপ নিয়ে আয় তো রান্নাঘর থেকে। আপা তুই আমার থেকে নিস।
রাবিতা রান্নাঘরে চলে যায়। আগের মতো আর অত গরম লাগছে না। বসার ঘরের দুর্বল পাখাটা দিয়েই কাজ চালানো যাচ্ছে। কিন্তু চা খেলেই হয়তো আবার গরম লাগবে। রক্তিম কে কি আজ রাতটা তাদের ঘরে থাকতে বলা উচিত? ড্রয়িং রুমের খাটটা কে সে রাগ করে নামিয়ে ফেলেছিল কিছুদিন আগে। পাতলা তোষকটা ঠিকই দু ভাঁজ করে সুন্দর চাদর দিয়ে বিছানো আছে কিন্তু খাট নেই। পা লম্বা করে আরাম করে শোয়া যাবে না।
—রক্তিম, আমাদের ঘরে গিয়ে খাটের ওপর আরাম করে বসবি? অবশ্য ওঘরে আইপিএস নেই। জানালা খুলে দিলে বাতাস পাবি হয়তো। চাইলে এখানেও বসতে পারিস। ঘুমানোর সময় ও ঘরে চলে যাস। বসার ঘরে আমি আর রাবিতা ঘুমাব।
আনমনা হয়ে কী যেন ভাবে রক্তিম। তারপর বলে, চল ও ঘরে গিয়ে বসি। খাটে পা তুলে বসে, চা খেতে খেতে তিনজন গল্প করব।
রেবেকাদের ঘরের জানালাটা বেশ বড়। বলা যায় ঘরের একটা দেয়ালের পুরোটা জুড়েই জানালা। কেন এমন বিচিত্রভাবে এই ঘরের নকশা করা হয়েছিল কে জানে। অনেকটুকু আকাশ দেখা যায়। তবে বৃষ্টি এলে পুরনো জানালা বন্ধ থাকলেও কাচের পাশ গলে বিছানায় পানি ঝরতে থাকে। সব জানাল খুলে দিয়ে হালকা অন্ধকারে ওরা তিনজন খাটে এসে বসে। রক্তিম জানালার কাছে চলে যায়। এরপর হালকা স্বরে বলে, একটা সিগারেট খেতে হবে। তোরা অনুমতি দিলে এখানেই খাবো। নইলে বাইরে থেকে খেয়ে আসি। খাওয়ার পর অন্তত একটা না খেলে হয় না।
—দাদা, এখানেই খাও। যেতে হবে না কোথাও। অন্ধকারে দেখা তো যাবে না। রাবিতা কলকল করে বলে ওঠে।
—খা এখানেই। শান্তস্বরে বলে রেবেকা। তারপর নিঃশব্দে নেমে গিয়ে ঘরের দরজা টেনে দেয় যেন আম্মার ঘরে ঘ্রাণ না যায়। অন্ধকারে ঘরটাকে বড় অচেনা লাগে। সিগারেটের পোড়া ঘ্রাণ আর জোনাকপোকার মতো ছোট্ট আগুনের ওঠানামা দেখতে দেখতে বিষণ্নতার ভাঁজ খুলে ফেলে রেবেকা। ইচ্ছে করে রক্তিমকে বলে কাপড় বদলে ঘুমাতে যা। কিংবা জিজ্ঞেস করে এভাবে রাতের পর রাত বাইরে থেকে কিভাবে বাঁচিস। কিছুই বলা হয় না। মনে পড়ে একটা সীমপাতার রঙের ফতুয়া ছিল রক্তিমের। পরলে এত সুন্দর লাগতো। কতদিন হয়ে গিয়েছে ওর কাপড়গুলো আলমারি বন্দি হয়ে আছে। মাঝে মধ্যে এসে এসে ও কিছু নিয়ে যায়। এভাবেই চলছে। বাইরে থেকে হু হু করে বাতাস আসে। অনেক শীতল নয়, আবার খুব উষ্ণও নয়। হালকা ঠাণ্ডা, ভালো লাগে। রাবিতা থেকে থেকে হালকা শব্দ করে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। ওরা তিন ভাই-বোনই কোনো অজ্ঞাত কারণে চুপ করে থাকে। রোকেয়ার কথা মনে পড়ে। সে এখন কী করছে? গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে না কি বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছে? আগে রেবেকাদের এই ঘরের পেছনে ছোট্ট লেকের মতো ছিল। ছোট ছোট মাছ পাওয়া যেতো। আর সবুজ কচুরিপানায় ছেয়ে থাকতো পানি। সেই পানিতে যখন কচুরিপানা ফুল ফুটতো তখন মনে হতো পৃথিবীর সব রূপবতী পরী এসে ভর করেছে এখানে। মাঝে মাঝে দু-একটা শাপলা ফুটতো। সাদা আর গোলাপি। বাতাসের কারুকাজে কাঁপতো তির তির করে। এত ভালো লাগতো।

রাবিতা উসখুস করছে। মনে হচ্ছে রেবেকা চলে গেলে তার আনন্দ লাগবে। দাদার সঙ্গে গল্প করতে পারবে। এমন নিশ্চুপ সময় তার ভালো লাগছে না। রেবেকা কী বলবে ভেবে পায় না। চুপ করে থাকে। মনে মনে ভাবে আজ রাতে কেন আম্মার বার বার ঘুম ভাঙছে না?
—আমি আর আধ ঘণ্টা পর চলে যাবো আপা। অন্ধকার থেকে হুট করে কিছু শব্দ ছড়িয়ে দেয় রক্তিম। ভেতরে ভেতরে চমকে যায় রেবেকা—রাতটুকুও থাকবে না ও?
—না দাদা, আজকে রাতে থাকতেই হবে। আমরা সারা রাত গল্প করবো। রাবিতা একগুঁয়ে স্বরে বলে ওঠে।

—আজ নয় রে। সামনে বেশ কিছু জরুরি কাজ আছে। মাত্র মাস দুয়েক ব্যস্ত থাকবো। এরপর আমি বেশ সময় পাবো বাড়িতে থাকার। তখন দেখবি প্রতিরাতেই গল্পের আসর বসাবো। লুডু খেলবো, সিনেমা দেখবো। খুব আড্ডা দেবো।
রাবিতা ঠিকমতো কথা শেষ করতে দিলো না। আধ ঘণ্টা পর চলে যাবে শুনেই নানা কিছু নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো। রক্তিমও আগ্রহ ভরে উত্তর দিতে থাকে। রেবেকা ঘর থেকে বের হয়ে আসে। বাকিটুকু সময় রাবিতা নিক। গল্প করুক প্রাণভরে। আবদার করুক। আব্বার পরে রক্তিম বাদে আর কাউকে সে সহ্য করতে পারে না, কারও সঙ্গে নিজের মনের কথা বলে না। রক্তিমের মাঝেই সে আব্বাকে খুঁজে নিয়েছে। নিক। যে যেভাবে ভালো থাকে থাকুক। বাড়ির দরজা খুলে সে বাইরে মোড়া পেতে বসে। বাতি নিভে এসেছে আশেপাশের সব বাড়িগুলোর। অন্ধকারে কিছুটা নিমগ্ন হতে চায়। আবার কবে আসবে রক্তিম। আবার কতরাত পর মধ্যরাতে দরজায় খুট খুট শব্দ হবে? বুদ বুদ করে বাতাসে আবেগ ভাসবে? বিন্দু বিন্দু সুখ এসে ক্ষণিকের জন্য ভর করবে মনে? আবার কবে?
—আপা, একা বসে আছিস কেন? সিগারেট আর চা পাতার মৃদু ঘ্রাণ মাখা রক্তিম এসে কখন দাঁড়িয়েছে টের পায় না সে।
—একাই তো… কথা শেষ না করে চুপ করে যায় রেবেকা।
—এই খামে হাজার পনের টাকা আছে। হাজার দুয়েক রাবিতার। বাদ বাকি সব তুই বুঝে খরচ করিস। আপাতত এই দিতে পারলাম। নির্বাচন শেষ হোক। সময় বদলাবে।
—তুই… তুই অন্যায় কিছু করছিস না তো? অস্বস্তি নিয়ে বলে রেবেকা।
—কী বলিস আপা। আমাকে এমন মনে হয় তোর? ভুল কিছু করলে তোদের মুখোমুখি এভাবে বসে থাকতে কিংবা তাকাতে পারতাম? আজ যাচ্ছি। খুব জলদি আবার আসবো।
—আম্মার সাথে দেখা করে গেলি না? উনাকে জাগাবো?
—না, আজ নয়। আমাকে দেখলেই কাঁদবেন খুব। তখন চলে যাওয়াটা আরও কঠিন হবে। তারপর কিছুটা থেমে বলে, শোন, আসলে হাজার তিনেক টাকা আম্মার হাতেও তুলে দিস আমার নামে। বাদ বাকি তুই রাখিস সংসারের জন্য।
—সবটাই দেব উনাকে। খুশি হবেন উনি। হালকা ভাঙা ভাঙা স্বরে বলে রেবেকা। রক্তিম চলে যাবে এখন ভেবেই তার মনে হচ্ছে সে পাতালে চলে যাচ্ছে। আকাশ গলে যাচ্ছে বেদনায়। দরজায় রাবিতা এসে দাঁড়িয়েছে। রক্তিম চুপ করে আছে যেন অনুমতি পেলে বিদায় নেবে। পাশের বাসা থেকে বহুক্ষণ পর আবার শিশুকান্নার শব্দ তীক্ষ্ণভাবে ভেসে আসে। শিশুটা কাঁদছে অবিরত। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। একটা পুরুষ কণ্ঠ তাকে শান্ত করতে চাইছে। না পেরে বাধ্য হয়ে শিশুটিকে কোলে নিয়ে বাড়ির বারান্দায় চলে আসে। কান্নার সঙ্গে সঙ্গে মৃদু ছড়ার বলার ছন্দ শুনতে পাওয়া যায়। ওরা তিনজন একইসঙ্গে সেই বারান্দার দিকে তাকিয়ে থাকে।

মধ্যরাতে খোলা উঠানে উত্তরের বাতাসে অচেনা এক তৃষ্ণার ঘ্রাণ। ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।
পরদিন সকাল পেরিয়ে নিত্যদিনের মতো খবরের কাগজ আসে। খবরের কাগকে বড় বড় বর্ণে সংবাদ শিরোনাম।

রাজধানীতে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার যুবক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত
রাজধানীর বাড্ডায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার দুই যুবক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার ভোরে এই ঘটনা ঘটে বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশের দাবি, একটি অস্ত্র মামলায় এই দুই যুবককে গ্রেফতার করে থানায় নেওয়ার পথে আসামিদের সঙ্গীরা গুলি চালায়। এ সময় পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এসময় এই দুই যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু বরণে করে। এরমধ্যে একজনের নাম-পরিচয় জানা গেছে…

মন্তব্য

এই লেখকের আরও লেখা-

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


Comments are closed.