কয়েদি নম্বর-৩৩২ ॥ শারমিন রহমান | চিন্তাসূত্র
২৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮ | দুপুর ১২:৫৫

কয়েদি নম্বর-৩৩২ ॥ শারমিন রহমান

—কেমন আছিস মা? কতদিন পর! আসতে ইচ্ছে হলো তাহলে বাবাকে দেখতে?
বাজারের ব্যাগ আর ছাতা হাতে নিয়ে বের হতে হতে বাবা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলছিল কথাগুলো। সে চোখে কী গভীর মমতা! আমাকে কাছে পাওয়ার কী আকুতি! ডুবে গেলাম সে চোখের মমতায়। অভিযোগ আর অভিমানের ঝড়ের সঙ্গে উঠে আসা কান্না গিলে খেয়ে ফেললাম। বলতে পারলাম না, বাবা, তুমিও তো একবার আমায় দেখতে যেতে পারতে,আমি ফোন না করলে মাসের পর মাস চলে গেলেও একটা  ফোন করোনি তো বাবা! পারুলকে পাঠিয়ে দিয়েছিলে কিছুদিনের জন্য, ওকে দেখার ছলে না হয় যেতে আমার কাছে? জানি, মা খুব একটা পছন্দ করে না আমাকে। আর মায়ের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে আমার খোঁজ নেওয়ার সাহস তোমার নেই বাবা। সবটা জেনে কী করে অভিযোগ করি বলো তো!

—কী রে মা, কাঁদছিস?
—না, বাবা কাঁদব কেন! কতদিন পর তোমাদের কাছে এলাম! আমি কাঁদছি না।

বাবা নিশ্চিন্ত মনে সেই চিরচেনা হাসিটি সারাগায়ে মেখে বাজারের দিকে হাঁটতে লাগলো। বাবার হাঁটা দেখতে লাগলাম। কতক্ষণ যে বাবার পথের দিকে তাকিয়ে আছি, তার হিসাব নেই। পারুলের চিৎকারে সম্বিৎ ফিরে পেলাম।

—পিয়াস কাঁদছে।  কেউ ওকে নিয়ে যাও।

পিয়াস আমার চার বছরের একমাত্র ছেলে। পিয়াসের বয়স যখন ৬ মাস, তখন আতিক আমাদের নিয়ে গিয়েছিল। আর আসা হয়নি। আজ কতদিন পর!

মায়ের কবরের কাছের আমগাছটা কেটে ফেলা হয়েছে, আমার নিজের হাতের লাগানো আমলকী গাছে ফুল এসেছে। মায়ের কবরের বাঁশের বেড়াটার কোনো চিহ্নও অবশিষ্ট নেই। নতুন কারও বোঝার উপায় নেই যে, এখানে একটা কবর রয়েছে। সেদিন একদম নতুন ছিল মায়ের এই কবরটা, যেদিন নতুন মা’কে আনা হয়েছিল আমাকে দেখাশোনার জন্য। সবাই সৎমা বললেও, আমার বয়স  তখন  মা’কে মা হিসেবেই চেনার। সৎমা বোঝার ক্ষমতা হয়েছিল আমার আরও অনেক পরে। ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে বেরিয়ে আসলাম ঘর থেকে। বাড়িটা ঘুরে দেখতে, স্মৃতিগুলো ছুঁয়ে দেখতে বড্ড ইচ্ছে করছিল। ছোটবেলার স্মৃতিগুলো বর্তমানকে উপেক্ষা করে চারপাশে ভিড় করে জমতে থাকে। পুরনো বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে খুনসুটি করে বেড়ে ওঠা,  কোথায় আজ সবাই? কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। সময়ের গর্ভে  সময় এভাবেই বিলিন হয়ে যায়। শীত এসে গেছে আমাদের গায়ে, চারপাশে জানান দিচ্ছে তার আগমনীবার্তা। এমন সময় ঘরে ঘরে পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যেতো। চারপাশের বাড়িগুলো থেকে ধুপধাপ ঢেঁকির আওয়াজ আসতো।

 মা রাতে পিঠা করতো, আর আমি অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতাম।  যেদিন মা আমাকে একা করে চলে গেলো মাত্র দুদিনের জ্বরে, সেদিনও অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলাম। নদীর পাড়ের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। মায়ের হাতের ছোঁয়ায় এ সময় পুঁইশাক, লাউ গাছে ছেয়ে থাকতো মাটির রাস্তার চারপাশ। একটা কুকুর তার সদ্য প্রসব করা বাচ্চাগুলোকে আগলে গুঁটিশুটি মেরে শুয়ে আছে রাস্তার ওপাশে। হঠাৎ করে নদীর পাড়ের রাস্তাটাকে অচেনা লাগছে। মনে হলো, আমি হারিয়ে গেছি, অনন্তকাল ধরে পথ খুঁজে ফিরছি পথে-পথে। কোনো মানুষ নেই সেই পথে, কেউ ছিল না কোনোদিন। কাউকে চিনি না আমি। কোনো জীবন্ত মানুষের সন্ধান পাইনি কোনোকালে। এমন কোনো সঙ্গী পাইনি খুঁজে, যাকে মনের কথা বলে ফেলা যায় অনায়াসে।

দুই.
বাবা বাজার থেকে ফিরেছে। আমার সব প্রিয় মাছ-সবজি এনেছে।
—বড় বাইম মাছ এনেছি, আলু আর মাছ কসা কসা রান্না করবা ঝাল দিয়ে। ছোট বেলে মাছ পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ঝুরি করো, জলপাই দিয়ে ডাল আর খেঁজুর গুড়ের পায়েস। তরকারি আর ডালে ধনে পাতা দিতে ভোলো না।

বাবা  মাকে  বুঝিয়ে দিচ্ছে কী রান্না হবে, তা। আমি ভয়ে ভয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, থমথমে চেহারা। ঝড় শুরু হয়ে যাবে যেকোনো মুহূর্তে।  কিন্তু মা আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবাকে কিছু না বলেই বাজারের ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো।  অন্যরকম ভালো লাগায় ভরে গেলো মন। আমার সঙ্গে কথা না বললেও আমার জন্য রান্না করতে তার আপত্তি নেই আগের মতো,  এ আমার বড় পাওয়া। কথাগুলো এতদিন পরও মনে পড়লো। আর মনে পড়তেই আমি গিয়ে মায়ের কবরের ওপরে জমে থাকা পাতার স্তূপ পরিষ্কার করে পাতাবাহারের ডাল লাগিয়ে দিলাম চারপাশে। একটা ব্যাপার মনের মধ্যে আটকে আছে, মা’কে খুব চিন্তিত লাগছে। মুখে কোনো কথা নেই, গম্ভীর হয়ে আছে। পারুলটাও ঘর থেকে বের হচ্ছে না, বলছে শরীর ভালো না। শুয়েই আছে। একবারের জন্যও বিছানা ছেড়ে উঠলো না পারুল। শুধু বাবার চোখে-মুখে খুশির রোদ ঝলমল করছে। বাবা কি মায়ের চিন্তার কারণ জানে না?

এত ভালোবাসা, বিশ্বাস এত গল্পের মধ্যেও একবারের জন্যও বলেনি, ও এখানে এসেছিল! চেনা পৃথিবীর রঙ বদলে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি আমি

দুপুরে খেতে বসেও পারুলকে ডেকে পেলাম না। রান্না খুব ভালো হয়েছে, খেয়ে নিলাম অনেকটা। উঠে পারুলের সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে দেখি ঘুমে বিভোর। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। খুব মায়া হলো ওর জন্য। আমার ছোট বোন পারুল, যদিও বড় বোন হিসেবে কোনোদিন মানেনি আমাকে। মা ওকে মানতে শেখায়নি। সে যাই হোক, আমিই ওর বড় বোন। একটা কাঁথা ওর গায়ে টেনে দিয়ে বের হতে যাবো,  বাবা তার ঘর থেকে ইশারা করলো। ঘরে ঢুকে  মায়ের ছবিটা খুঁজলাম,নেই কোথাও। সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বাবার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। কিছুই বলছে না, চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে বাবা। আমিও চুপ করে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি বাবার কথা শোনার। জানি, বাবা কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে বলেই আমায় ডেকেছে। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলার আগে বাবা এভাবেই দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকে। মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত হতাম, ঘর থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতাম। সারাদিনে আর বাবার সামনে আসতাম না। আজ অপেক্ষা করতে বড় ভালো লাগছে। বাবা চোখ বন্ধ করে গভীর চিন্তায় মগ্ন। জানালার পর্দা গলে শেষ বিকেলের স্নিগ্ধ আলোর রেখা ছড়িয়ে পড়েছে বাবার মুখে। সোনার বরণ সে আলো। সোনামুখে মায়ার জাল তৈরি করে রেখেছে। বাবার মুখের ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছি না কিছুতেই। চোখ নয়, আটকে আছে মন। বাবা বরাবরই কম কথা বলে, শান্ত স্বভাবের শান্তিপ্রিয় মানুষ। অথচ!

—জামাইয়ের সাথে তোমার কোনো সমস্যা হয়নি তো মা?

দীর্ঘ নীরবতা শেষে বাবার প্রশ্নটা ভাবিয়ে তুললো আমায়। সমস্যা? সংসার জীবনে সে তো থাকবেই। কিন্তু তবু খুব ভালো আছি আমি। বাবাকে খুব জোরের সঙ্গে বললাম, না, বাবা। কোনো সমস্যা নেই তো আমাদের। আমরা তো খুব ভালো আছি বাবা।

তখনো জানতাম না, বাবা এরপরের কথায় আমার বিশ্বাসের পৃথিবী নাড়িয়ে দিতে পারে। একটু আঁচ পেলেও বাবার সামনে এত জোর দিয়ে বলতাম না, ভালো আছি।  বাবা  ধীর-স্থির-শান্ত স্বরে বলে চলল, কয়েকদিন আগে জামাই একা এসে প্রায় একসপ্তাহ থেকে গেলো। এবার তুমি একা আসলে।  জামাইকে অনেকবার বলার পরও তোমার সাথে কথা বলিয়ে দেওয়ার সময় পায়নি,  সে হাজারটা কাজ নিয়ে এসেছিল, সে ঠিক আছে। কিন্তু তোমরা একসাথেই আসতে পারতে না মা? বাবার কথায় আমার পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল যেন, আমি টলে উঠলাম।  খাটের কোণায় বসে পড়লাম ধপ করে। কিছুই বলতে পারলাম না বাবাকে। কী বলব?  অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকলাম বাবার দিকে। বাবা যেন আমার ভেতরটা পড়ে নিলো,  দরজা ভেজিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। আমি  বিছানার ফুল-লতাপাতা আঁকা চাদর আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামাল দিতে চাইলাম। আমার মায়ের চুলের ঘ্রাণে হঠাৎ ঘরটা ভরে গেলো। হারিয়ে গেলাম আমি।

তিন.
আতিকুর রহমান, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার, কৃষি ব্যাংক, যশোর শাখা। পাশাপাশি সফলতার সঙ্গে  চালিয়ে যাচ্ছে পৈত্রিক ব্যবসা।  দেখতে সুদর্শন  আতিকের সঙ্গে যখন আমার বিয়ে হয়েছিল, আমি তখন একাদশের  ছাত্রী। দেখতে এসেই আতিকের ভালো লেগেছিল আমাকে। এরপর ফোনে কথা হতো প্রায়ই। চমৎকার গুছিয়ে কথা বলার ক্ষমতা আছে মানুষটার। মুগ্ধতা ঘিরে থাকে আমাকে। এরপর বিয়ে। বিয়ের পর আতিকের একটাই আপত্তি ছিল বাবার বাড়িতে আসা নিয়ে, তাছাড়া আতিক খারাপ রাখেনি আমাকে। বাড়িতে আসতে না পারার কষ্ট আতিকের ভালোবাসায় ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি দিনের পর দিন। তবু বাবার জন্য খুব কষ্ট হতো, কষ্ট হতো বাড়ির পাশের মেঠোপথটার জন্য।  নদী, গ্রামের মানুষ—সবার কথা মনে হতো খুব।  কখনো জানতে চাইনি, আামাকে বাড়িতে আসতে  না দেওয়ার কারণ। সেদিন বাবাকে স্বপ্নে দেখে কাঁদছিলাম খুব।

—বাবাকে দেখতে যাবে বকুল?

আতিকের এমন প্রস্তাবে বুকে জড়িয়ে বসেছিলাম ওকে।  আতিকও আমাকে বুকে আগলে বসেছিল ভোর না হওয়া পর্যন্ত। কী মধুময় সে ভোর! সকালে নিজেই ব্যাগ গুছিয়ে ঝিনাইদহের বাসে তুলে দিয়েছিল আমাদের। আতিক একদিন পরেই নিতে আসবে আমাদের, এমন কথার পরেই আমি একা আসতে রাজি হয়েছিলাম। এত ভালোবাসা, বিশ্বাস এত গল্পের মধ্যেও একবারের জন্যও বলেনি, ও এখানে এসেছিল! চেনা পৃথিবীর রঙ বদলে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি আমি। ফোন হাতে নিয়েও ফোন করতে পারলাম না আতিককে। ফোনের স্ক্রিনে আমাদের তিনজনের ছবি। আতিকের কোলে পিয়াস। তাকিয়ে আছি ওর দিকে আমি। হাসিখুশি মুখটায় অবিশ্বাসের একটা রেখাও দেখতে পেলাম না। তাহলে কি মানুষের যতটা দেখা যায়, সেটাই সবটা  নয়? দেখার বাইরেও রয়ে যায় আরও অচেনা জগৎ?

পড়ে আছি বাবার বিছানায়। বাইরের ঘর থেকে চাপা কথা কানে আসছে। ক্ষোভ মেশানো সে কথা। আলো জ্বালিনি ঘরের। অন্ধকারে থাকতেই ভালো লাগছে। এই মুহূর্তে আলো সহ্য হচ্ছে না আমার। তাই বাইরের আলোতে  যেতে ইচ্ছে করছে না। চাপা কথা এখন ঝগড়ায় পরিণত হলো, কার কণ্ঠ বুঝতে পারছি না।   চাপা স্বরগুলো থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছে। বুঝতে পারছি না কিছু, স্বপ্ন দেখছি, না সত্যি ঘটছে এটা? মনের বিরুদ্ধে শরীরটাকে টেনে তুললাম। শিউলি গাছটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

—তুই এত বড় সর্বনাশের কথা আমারে গোপন করলি? কী হবে এখন? গ্রামের মানুষরে কেমনে মুখ দেখাবো? এখন তো আর কিছু করারও নাই।  বিষ নিয়ে আয়, বিষ খেয়ে মরি আমি!

আজীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রাপ্ত হয়ে আমি নতুন পরিচয় পেয়েছিলাম কয়েদি নম্বর ৩২২। আমার ব্যবহারে খুশি হয়ে জেলার মুক্তি দিচ্ছে।

পারুল কাঁদছে মায়ের পায়ের কাছে। খাটের এক কোণায় বসা আতিক। আমি পা নাড়াতে পারছি না একটুও। শিউলি ফুলের সুবাসে দম বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে বিষাক্ত কোনো  ধোঁয়ায় ভরে গেছে চারপাশ। বুকের মধ্যে ভয়ের হীমশীতল হাওয়া ছুরির মতো আঘাত হানছে। কিসের ভয় জানি না আমি! দৌড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে অনেক দূরে, যেখানে বকুল নামের কেউ নেই, আতিক নেই। বাবা এসে আমার কাঁধ ছুঁয়ে দাঁড়ালো। তারপরের ঘটনাগুলো ঘটে গেলো সিনেমা বা মঞ্চে ঘটে যাওয়া একেকটা ঘটনার মতো। বাবা আর আমি ঘরে ঢুকতেই পারুল দৌড়ে এসে পাগলের মতো আমাকে মারতে শুরু করলো। হঠাৎ এমন  অপ্রত্যাশিত ঘটনায় আমি দিশেহারা, যদিও আজ সবই অপ্রত্যাশিত!

আতিক, বাবা—দুজনে মিলেও পারুলকে ছাড়াতে পারছে না। আতিক বারবার পারুলকে সব ঠিক করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তবু পারুল ছাড়ছিল না আমাকে। এত দুর্বল শরীরে এত শক্তি কোথা থেকে পেলো কে জানে! আমাকে বাঁচাতে বাবা জোরে ধাক্কা দিল পারুলকে। পারুল ছিটকে পড়ে গেলো কাঠের আলমারির ওপরে। আতিকের যে সন্তান বয়ে বেড়াচ্ছে পারুল, তার স্বীকৃতিতে একমাত্র বাধা আমাকে মনে করেই আঁচড়ে, কামড়ে  রক্তাক্ত করলো সে। আমার কোনো বোধ কাজ করছে না। পারুলকে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে আতিক এগিয়ে  গেলো, আর চিৎকার দিয়ে পারুলের চলে যাওয়ার খবরটা দিলো আমাদের। বাবা একদম নিশ্চুপ হয়ে মেঝের দিকে তাকিয়েই রইলো, অস্বাভাবিক চাহনি তার। মা আঁচল চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো। আর আমি বসে আছি সকাল হওয়ার অপেক্ষায়। সকাল হলেই এই দুঃস্বপ্নটা কেটে যাবে এই বিশ্বাসে।  আতিক আর আমার মধুময় সকাল হবে প্রতিদিন! মা এসে আমার ওপর সন্তান হারানোর জ্বালা মেটানোর চেষ্টা করলো। আতিক ঠাণ্ডা মাথায় মা’কে কী যেন বোঝালো, শুনতে পেলাম না তার কিছুই। মা শান্ত হয়ে বসে পড়লো। আমার চোখের সামনে আাতিক মায়ের সাহায্য নিয়ে পারুলকে ঝুলিয়ে দিল ফ্যানের সঙ্গে। আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া, পোস্টমর্টেম যেন না হয়, তার জন্য চেয়ারম্যান, থানা, পুলিশ ম্যানেজ করার চেষ্টা—সবই করছে আতিক। আমাদের পরিবারের, আমার বোনের সম্মান বাঁচানের কী চেষ্টা আতিকের! অচেনা মনে হলো ওকে, সম্পূর্ণ অচেনা। কোনোদিন ওকে দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না। আতিকের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে পুলিশ বের করে ফেললো পারুলের মৃত্যুর কারণ। সবাই বলাবলি করলো—নিজের স্বামীর সঙ্গে বোনের এমন সম্পর্ক কোনো মেয়েই মেনে নিতে পারে বলো? তাই বলে বড় বোন হয়ে ছোট বোনকে একেবারে মেরেই ফেললো?

চার.
কাল আমার মুক্তি। আমি কয়েদি নম্বর ৩৩২। এটাই আমার পরিচয়। আর কোনো পরিচয় নেই দেওয়ার। মুক্তিতে মানুষের কত আনন্দ হয়, জেলখানা থেকে মুক্তি পেতে মানুষের কত চেষ্টা থাকে! কত আকুতি! আমি চাইছি কাল যেন আমার মুক্তি না হয়। মুক্তি আমার কাছে ভীতির, আশ্রয়হীনতার। এই ১৫ বছরের কয়েদি জীবনে আমি অভ্যস্ত। প্রথম প্রথম মুক্তির জন্য প্রত্যাশা  ছিল তা তো নয়, বরং সকাল বিকাল ভাবতাম এই বুঝি আমার মুক্তির খবর এলো। মাত্র কয়েকটা দিনের ব্যাপার। কয়েকটা দিন ভাবতে ভাবতে ১৫ টা বছর কেটে গেলো! এই সেলটাতে কতজন এলো, চলেও গেলো মুক্তি পেয়ে। আমিই রয়ে গেলাম সেলের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে। মায়া পড়ে গেছে এ জীবনটাতে আমার। বাবার সংসারে বা স্বামীর সংসারেও এতটা দিন থাকা হয়নি আমার।

মা আর আতিকের সাহায্যে সেদিন পারুলের হত্যাকারী হিসেবে আমাকে শনাক্ত করতে বেগ পেতে হয়নি পুলিশের। আজীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রাপ্ত হয়ে আমি নতুন পরিচয় পেয়েছিলাম কয়েদি নম্বর ৩৩২। আমার ব্যবহারে খুশি হয়ে জেলার মুক্তি দিচ্ছে। এ মুক্তি আমার কাছে আরও ভয়ঙ্কর! কোথায় যাবো আমি?  কী নাম আমার?

এই পর্যন্ত পড়ে খয়েরি রঙের ডায়েরিটা বন্ধ করে জেলার নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না। চোখ বেয়ে নামা নোনা জলের ধারা বয়ে চললো। টেবিলে রাখা সাদাকালো ডোরাকাটা পোষাকটা ভিজতে লাগলো,  ঝাপসা চোখে জেলার তাকিয়ে আছে,  জ্বলজ্বল করছে সেলাই করা ৩৩২।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


২ Responses to “কয়েদি নম্বর-৩৩২ ॥ শারমিন রহমান”

  1. শহীদুল ইসলাম খোকন
    ডিসেম্বর ২, ২০১৮ at ১০:৪৯ অপরাহ্ণ #

    গ্রামবাংলার ভাগ্যবিড়ম্বিত নারীদের জীবনচিত্র আঁকা হয়েছে এই গল্পে। এই চিত্র আঁকতে গিয়ে লেখক যে কটি চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, সেগুলোর মধ্যে আতিক চরিত্রটির ক্ষমতার কারণ এখানে বোঝা যায়নি। অর্থাৎ পারুলের হত্যার জন্য প্রকৃত দায়ী আতিককে দোষারোপ না করে কথককে গ্রেফতার করার ঘটনায় পারুলের মায়ের ভূমিকাও রহস্যজনক। তারা কেন আতিককে দোষারোপ না করে কথককে দোষারোপ করলো, সেটি এখানে অস্পষ্ট রয়ে গেছে। তাহলে কি ঘটনা এমন যে, আতিক তার সমাজে এতটাই ক্ষমতাবান যে, তার বিরুদ্ধে আঙুল তোলার সাহস কেউ রাখে না? সব মিলিয়ে গল্পটি এই দেশ এই সমাজ ব্যবস্থার একটি নির্মম চিত্রের কথা বলে। এমন নির্মম-নিষ্ঠুর চিত্র তুলে ধরার জন্য লেখককে ধন্যবাদ।

    • sharmin rahman
      ডিসেম্বর ৩, ২০১৮ at ৫:০৯ অপরাহ্ণ #

      প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আমার গল্পটি পড়ার জন্য। গল্প নিয়ে এমন আলোচনা পেলে যে কোন গল্পকারের উৎসাহ বহুগুণ বেড়ে যায়। আর আমার মত একেবারেই নতুন লেখকের জন্য এটা আশির্বাদ। সৎ মেয়েকে সহ্য করতে না পারা, মেয়েকে হারিয়ে চোখের সামনে বকুল কে ভালো থাকতে দেখাটা মেনে নিতে না পারার মানসিকতাও কাজ করেছে অন্য সব কিছুর পাশাপাশি।
      অনেক অনেক ধন্যবাদ। পাশেই থাকবেন। তাহলে আমরা নতুনরা এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাবো।

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন