সিঙ্গেল মাদার ॥ শারমিন রহমান | চিন্তাসূত্র
২৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮ | রাত ৯:৫৮

সিঙ্গেল মাদার ॥ শারমিন রহমান

অ্যালার্মটা বেজেই চলেছে। নীলুফা জাহান এপাশ-ওপাশ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। ডিসেম্বরের সকাল, প্রচণ্ড শীতে বড় ভালো লাগছে শুয়ে থাকতে। ভারহীন মনটা শান্ত খুব। ৫২ বছরে আজ নীলুফা জাহানের মনে হচ্ছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের আরাম খোঁজার ব্যাপারটার কেমন একটা যোগসূত্র রয়েছে। আজ তার অফিস নেই। একটি প্রাইভেট কোম্পানির চেয়ারম্যান হওয়ার পরও নীলুফা জাহান কখনো ইচ্ছে খুশি মতো ছুটি কাটাননি। বরং দিন-রাত কাজের মধ্যে ডুবে থেকে বন্য আনন্দ পেয়েছেন সারাটা জীবন।

কিন্তু আজকের বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ একমাত্র সন্তান পাভেল দেশে ফিরছে কানাডা থেকে, ১০ বছর পর! নীলুফা জাহান আজ থেকে পাঁচদিন অফিসে যাবেন না বলে সমস্ত কাজ গুছিয়ে রাখছেন গত দুইমাস থেকে। প্রত্যেককে বুঝিয়ে দিয়েছেন কাজ। গুরুত্বপূর্ণ মিটিংগুলো সেরে নিয়েছেন আগেভাগেই। এই পাঁচদিন কোনো কাজের চিন্তা মাথায় আনতে চান না তিনি। বাজার থেকে ছেলের পছন্দের মাছ, মাংস এনে রেখে দিয়েছেন ফ্রিজে। কত বছর দূরে সরিয়ে রেখেছেন ছেলেকে নিজের থেকে, এই রাঙামাটির পাহাড়ঘেঁষা সবুজঘেরা ডুপ্লেক্স বাড়িটা শূন্য করে। না না, আজ কোরো শূরন্যতার স্থান নেই মনে, আজ শুধু ভালোবাসা, পূর্ণতা। বিছানা ছেড়ে উঠে সুরেশ কাকার রেখে যাওয়া ফ্লাক্স থেকে একমগ গরম কফি ঢেলে নিয়ে চলে যান পশ্চিমের বেলকনিতে। কফির মগে চুমুক দিতেই অদ্ভুত আরামবোধ করেন নীলুফা জাহান। কাল থেকেই এই বেলকনিতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকবে তার সন্তান। এই বেলকনিতে এলেই মনটা ভালোলাগায় ছেয়ে যায়। যদিও কাজের চাপে খুব বেশি আসা হয় না এখানে। এখান থেকে দূর পাহাড়ের গায়ে মেঘেদের লুকোচুরি, পাখিদের কিচিরমিচির খুব ভালো লাগে তার। সবুজ দেখে যেন তৃষ্ণা মেটে না, যেমন মেটে না পাভেলকে দেখে! বেলকনি থেকে নিচে তাকালে স্বচ্ছ জলের ধারাটি চোখে পড়ে, এত ওপর থেকেও ওর বয়ে চলার শব্দ শোনা যায়, কী মিষ্টি! পাভেল কি প্লেনে উঠে পড়েছে? ডায়েরির কথাটা কি ওর মনে আছে? ওর চোখে কি আজ অনেক প্রশ্ন থাকবে? এসব ভাবতে ভাবতে অস্থির মনটা কখন যে তাকে পাভেলের ঘরটায় নিয়ে এসেছে, বুঝতেই পারেননি তিনি। এ বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর ঘরটা পাভেলের জন্য। নীলুফা জাহান দেয়ালের ছবিগুলো দেখছেন, যেন ছুঁয়ে দেখছেন সময়, অতীত। দেয়ালজুড়ে পাভেল। ৬ মাসের পাভেল হাসছে, নাকটা কুঁচকে আছে। প্রথম যেদিন হাঁটতে শুরু করে পাভেল, পাভেলের একমাত্র দাঁত বের করা হাসির ছবিটাও আছে, আছে প্রথম স্কুলে যাওয়ার ছবি। আজ দেশে ফিরছে তার সন্তান, আর্কিটেকচার পাভেল আহমেদ।

_____________________________________________
কিছুদিন যাওয়ার পর নীলুফা জাহান লক্ষ করলেন, পাভেল একটু বেশিই গম্ভীর হয়ে পড়ছে। বই, ল্যাপটপ, ফোনই তার বন্ধু হয়ে উঠছে। তৈরি হচ্ছে তার সঙ্গে দূরুত্ব। স্কুলে বা এলাকায় কারও সঙ্গেই পাভেল মিশতে পারছে না। নীলুফা জাহান সেদিন খুব চিন্তায় পড়ে গেছিলেন একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে।
_____________________________________________

প্রথম স্কুলে যাওয়ার ছবিটায় খয়েরি রঙের কোর্ট-প্যান্ট পরা পাভেল, ছুঁয়ে দেখেন নীলুফা জাহান নিবিড়ভাবে। অসংখ্য কণ্ঠ একসঙ্গে হেসে ওঠে, সিঙ্গেল মাদার, হা হা হা! এটাও হয় নাকি! বাপ ছাড়া কোনোদিন সন্তান হয়? তাহলে সিঙ্গেল মাদার আবার কি জিনিস? চিৎকার করে ওঠেন নীলুফা জাহান, দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে বসে পড়েন মেঝেতে। স্মৃতিরা ডানা ঝাপটায়। বুকের ভেতর অস্থিরতা। ঠাণ্ডা ঘরে বসেও ঘামতে থাকেন তিনি। আজ তার স্মৃতির হাত থেকে রক্ষা নেই, মুক্তি নেই। বাঁধ ভেঙে সব বেরিয়ে আসতে চাইছে। নীলুফা মুক্তি চান স্মৃতির হাত থেকে। কারণ স্মৃতিরা কষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজেই আসে না।

পাভেলের স্কুল থেকে ডাক পড়েছিল দ্বিতীয় দিন। প্রিন্সিপাল চশমার ওপর দিয়ে নীলুফা জাহানের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে বিকৃত হাসি দিয়ে বলেছিল, ফর্মে পাভেলের বাবার নামের জায়গায় আপনার নাম কেন? বাবার নাম লিখুন।

নীলুফা জাহানের দৃঢ় উত্তর, আমিই ওর বাবা, আমিই ওর মা। এমন উত্তরে খুব মজা পেয়েছিলেন প্রিন্সিপালসহ বাকিরা। ছাড়াছাড়ি হলেও পাভেল তো আর বাবা ছাড়া হয়নি বা আকাশ থেকেও টুক করে মাটিতে পড়েনি তাই না? একজনের এমন কথার শেষ রেশটুকুন ধরেই অন্য একজন বলেছিলেন, কেউ না কেউ তো ওর বাবা নিশ্চয়ই, নামটা বলুন। না কি আপনি নিজেও জানেন না কে ওর বাবা? তারপরই হাসির ফোয়ারা ছুটেছিল। এত অপমানের মাঝেও নীলুফা জাহান সেদিন অনঢ় ছিলেন। ভেঙে পড়েননি এতটুকুই। যার খেয়ালে জন্ম নিয়েছে পাভেল, এছাড়া আর কোথাও কোনোকিছুতেই যায় কোনো অস্তিত্ব নেই, তার নাম, পরিচয় বয়ে বেড়ানোর কোনো মানে নেই। কোনো মা যদি একাই সন্তানকে ভূমিষ্ঠ করে, বড় করে কারও সাহায্য ছাড়া, তাহলে জীবনের সব জায়গায় কেন বাবার নাম নিয়ে এত মাতামাতি? বুঝতে পারেন না নীলুফা জাহান। প্রতিবাদ করে একাই লড়েছিলেন সবার বিরুদ্ধে সেদিন। ঢাকা ছেড়ে চাকরি নিয়ে চলে আসেন তিনি রাঙামাটিতে প্রকৃতির মাঝে। পাভেলকে বাদ দিয়ে নীলুফা জাহানের অভিভাবক হতে চেয়েছে অনেকে, হতে চেয়েছে নীলুফার সৌন্দর্যের একচ্ছত্র অধিপতি। নীলুফা জাহান পাভেলকে বুকে নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন এক শহর থেকে অন্য শহরে, নিজেকে নেকড়েদের হাত থেকে রক্ষা করতে! এক স্কুলে একবছরের বেশি পড়াননি পাভেলকে তিনি। কিছুদিন গেলেই বন্ধুবান্ধব এমনকি অভিভাবক, শিক্ষকদের প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে বাসায় এসে কেঁদেছে পাভেল। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতো মাকে। নীলুফা একই উত্তর বারবার দিতেন, আমিই তোর মা, আমিই তোর বাবা। একথা মায়ের মুখে শুনতে শুনতে একটু বড় হয়ে যাওয়ার পর অভিমানে আর একবারের জন্য প্রশ্ন করেনি পাভেল। কিছুদিন যাওয়ার পর নীলুফা জাহান লক্ষ করলেন, পাভেল একটু বেশিই গম্ভীর হয়ে পড়ছে। বই, ল্যাপটপ, ফোনই তার বন্ধু হয়ে উঠছে। তৈরি হচ্ছে তার সঙ্গে দূরুত্ব। স্কুলে বা এলাকায় কারও সঙ্গেই পাভেল মিশতে পারছে না। নীলুফা জাহান সেদিন খুব চিন্তায় পড়ে গেছিলেন একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। না, হেরে যাওয়ায় অভ্যস্ত নন তিনি। এবারও হবেন না। মাধ্যমিকের রেজাল্টের পরেই ছেলেকে পাঠিয়ে দেন কানাডা। যাওয়ার সময় একটা কথাও বলেনি পাভেল, বলতে পারেননি নীলুফা জাহানও। শুধু ট্রলির মধ্যে নীল রঙের একটা ডায়েরি দিয়ে বলেছিলেন, যেদিন তোর পড়াশোনা শেষ করে দেশে আসার সময় হবে, সেদিন পড়বি এ ডায়েরিটা। এর আগে নয়। এটা সন্তানের কাছে এক মায়ের দাবি।

সুরেশ চাচা এসে তাগাদা দিয়ে গেলে পাভেলের ঘর ছেড়ে নিজের ঘরে এসে গরম পানির শাওয়ার সেরে নেন তিনি। নীল রঙের হাফ শিল্ক শাড়িটার সঙ্গে ছোট নীল টিপ আর কাশ্মীরি শালটা কাঁধে ফেলে নিচে নেমে আসেন। ড্রাইভারকে পেছনের সিটে বসতে বলে নিজেই বসে পড়েন ড্রাইভিং সিটে। রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে সময়টা আরেকবার দেখে নেন, বেলা ১১টা। সন্ধ্যার আগেই নীলুফা জাহান পৌঁছে যাবেন ঢাকা এয়ারপোর্ট। আর পাভেলের কথা অনুযায়ী, ওর পৌঁছতে রাত ৯ টা। সেঁজুতির বাবা-মাও থাকবেন এয়ারপোর্ট। পরিচয় পর্বটা ওখানেই সেরে নেওয়া যাবে। সেঁজুতি মেয়েটার সঙ্গে ভিডিও কলে অনেকবার কথা হয়েছে নীলুফা জাহানের। মেয়েটি দেখতে সুন্দরী আর মার্জিত। আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলে। খুব অল্প সময়ে মানুষকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা আছে তার। সেঁজুতিও আজ দেশে ফিরছে পাভেলের সঙ্গেই। ওরা একই ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছে। ছেলের ভালোবাসার গুরুত্ব ছেলের মতোই তার কাছে। রাঙামাটির আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি চালাতে চালাতে মুখে চিন্তার ভাঁজ পড়তে থাকে নীলুফা জাহানের। ছেলে কি তাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে? প্রশ্ন করবে ছোটবেলা থেকেও অনেক বেশি? দূরে সরে যাবে আরও? না কি বুঝবে মায়ের কষ্ট!

টরেন্টোর পিয়ারসন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের কাস্টমস ইমিগ্রেশন পার হয়েই সেঁজুতিকে দেখতে পেলো পাভেল। জিন্স ওভারকোটের সঙ্গে মাথায় বেগুনি রঙের টুপি। কানাডার প্রচণ্ড ঠাণ্ডায়ও সেঁজুতিকে দেখলে মনের আকাশে মিষ্টি রোদ ঝলমলিয়ে ওঠে। সেঁজুতিকে এত ভালোলাগার প্রধান কারণ পাভেলকে ও খুব বোঝে। জানালার পাশের সিটটাতে বসেই সিটবেল্ট বেঁধে নিলো পাভেল, পাশে সেঁজুতিও। পাভেলের সবটাই সেঁজুতির জানা, তাই ওর সামনেই পাভেল সাইড ব্যাগ থেকে নীল রঙের পুরনো ডায়েরিটা বের করে আনে। খুলতেই পুরনো কাগজের গন্ধে হারিয়ে গেলো কিছুক্ষণ ওরা।

পাভেল ডায়েরি পড়া শুরু করলো—তখন আমি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। থাকি আজিমপুরের একটা কলোনিতে সাবলেট। চারতলা বাসাটার মালিক সরকারি কোনো অফিসের গাড়ি চালায়। এক রুমে ছয়টা মেয়ে। সবাই অবিবাহিত। কলেজে পড়ছে। আমি তখন বিজনেস ম্যানেজমেন্ট শেষ করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করি, মিরপুরে। পাঁচমাস আগেই এসে উঠেছি এ বাসায়। বাড়িঅলা একদিন ডেকে বললো, নীলু তুমি যে মা হতে যাচ্ছ, এ কথা তো আগে বলোনি। এছাড়া তোমায় দেখতেও তো কেউ আসে না, বাবার বাড়ি বা শ্বশুর বাড়ির কোনো লোককে এ পাঁচমাসে দেখিনি, তুমিও একদিনের জন্যও কোথাও যাওনি। বিষয়টা খুলে বলবে?

_____________________________________________
আমি তোকে নিয়ে আবার রাতের আঁধারে পালিয়ে ঢাকা এসে বান্ধবীর বাসায় উঠি। মিরপুরে একটা চাকরি পেয়ে যাই। পরের সবটাই এই ডায়েরিতে পাবি।
_____________________________________________

শুধু বলেছিলাম, আমার কেউ নেই কোথাও। আমি আর আমার সন্তান ছাড়া কেউ নেই। বাড়িঅলার হয়তো ময়া হয়েছিল সেদিন, তাড়িয়ে দেননি। কিন্তু আমার কারণে রুমের মেয়েগুলোর খুব অসুবিধা হতে লাগলো বুঝতে পারতাম। ওরা কেউ কথা বলতো না আমার সঙ্গে, আমিও প্রয়োজন না হলে কাউকে ডাকতাম না। খুব কষ্ট হতো মিরপুরে যখন লোকাল বাসে করে যেতাম অফিস করতে, ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হতো, এসে রান্না করতাম শুধু তোর কষ্ট হবে, ক্ষতি হবে ভেবে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকলো তোর ভার। নড়তেও কষ্ট হতো আমার। নিজেই নিজের অভিভাবক তখন আমি। দুধ, ডিম, হরলিকস খেতে শুরু করলাম তোর পুষ্টির জন্য। মাঝে মাঝে পেটের মধ্য এমন লাথি মারতি তুই, আমি পেট ধরে বসে পড়তাম। খুব আনন্দ হতো, কাউকে সে আনন্দ ভাগ করার সুযোগ ছিল না। আমি তোর সঙ্গেই কথা বলতে শুরু করলাম। দিনে-রাতের বেশিরভাগ সময়ই তোর সঙ্গেই কথা বলতাম। ডাক্তার যেদিন বলেছিল, আপনার ছেলে হবে, সেদিন থেকেই তোর নাম ঠিক করে রেখেছিলাম। তোর একটা চেহারা ভেবে নিয়ে তোর সঙ্গেই গল্প করতাম। একদিন খুব সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছিলাম না। পেটে এত ব্যথা। আমি মেঝেতে ঘুমাতাম। আমার অনেক জায়গা লাগতো তখন, ছোট বিছানায় শুতে পারতাম না। দরজার সামনেই বাথরুম ছিল, দরজা ধরে উঠে যেতে চাইলাম, পারলাম না। পড়ে গেলাম বাথরুমের সামনে। পেটে তখন খুব ব্যথা শুরু হয়েছে। চোখে অন্ধকার দেখছি। ডাক্তারের কাছে যেতে হবে ভেবে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই পড়ে গেলাম আবার। বাড়িঅলা দেখতে পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। তার আধঘণ্টা পরেই তোকে আমার বুকে পেলাম।

প্রথম পৃষ্ঠা শেষ করলো পাভেল। হাত কাঁপছে। পাভেল কাঁপা হাতে পরের পৃষ্ঠায় যায়।
আমি তখন বিজনেস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়ছি। বাবা-মার একমাত্র মেয়ে। তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন। সাভারের ইপিজেডের পাশ দিয়ে একটু আগালেই আমাদের বাড়ি। বাড়ির সামনে একটা বড় পুকুর, তার ওপাশে সেই মানুষটার বাড়ি। থাকে ঢাকায়। হোস্টেলে। তার ভালোবাসার নাটকে ভুলে যাই আমি আমার বাবা মায়ের ভালোবাসা। ভুলে যাই ভাইদের আদর। তাকেই একমাত্র সত্য মনে হয়। আমি বাড়ি থেকে টাকা-গয়না নিয়ে আমার বিয়ের আগের রাতে পালিয়ে যাই সেই মানুষটার সঙ্গে। এলাকায় জানাজনি হয়ে যায়, মানুষটার বাবার ক্ষমতা অনেক থাকায় প্রায় একঘরে করে রাখে আমাদের পরিবারকে। আমার বাবা অপমানে স্ট্রোক করেন। আমি তার কিছুই জানতে পারি না। তখন বিয়ে করে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি সিলেট, কক্সবাজার। আমার আনা টাকা আর গয়না শেষ হওয়ার পরে আমার প্রতি সেই মানুষটার আগ্রহও কমতে থাকে। খাবো কী? বাসা ভাড়া দেবো কোথা থেকে? এসব নিয়ে আমাকে গালি দিতে থাকে, তারপর গায়ে হাত দিতেও বেশি সময় নেয় না। একপর্যায়ে তার মনে হয় তার বাবার এত প্রতিপত্তি রেখে আমার জন্য এত কষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তার বাবা আমাকে মেনে নেয় না। আমাকে ফেলেই সে তার বাবার কাছে ফিরে যায়। আমিও উপায় না দেখে বাবা-মার কাছে ফিরে যাই। অনেক থানা-পুলিশ হওয়ার পরে আমরা আলাদা হয়ে যাই। তখনই তোর অস্তিত্ব টের পাই। ভাইয়েরা বলে তোকে মেরে ফেলতে, তুই থাকলে আমার বিয়ে দিতে তাদের কষ্ট হবে। আমি তোকে নিয়ে আবার রাতের আঁধারে পালিয়ে ঢাকা এসে বান্ধবীর বাসায় উঠি। মিরপুরে একটা চাকরি পেয়ে যাই। পরের সবটাই এই ডায়েরিতে পাবি। যখন এটা পড়বি তখন আমি এ পৃথিবীতে থাকব কি না, জানি না। জানি না, তুই আমাকে ক্ষমা করতে পারবি কি না। আর যদি বাবার কথা জানতে ইচ্ছে হয়, ইচ্ছে হয় নাম জানতে। শেষ পৃষ্ঠায় লেখা রইলো তার নাম, পরিচয়। খুঁজে নিতে কষ্ট হবে না তোর। যেতে পারিস তার কাছে।

এ পর্যন্ত পড়েই ডায়েরিটা বন্ধ করে দেয় পাভেল। চোখ বেয়ে নোনা পানির ধারা বয়ে চলে।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন