নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান ও মোহাম্মদ হাশেম ॥ মোহাম্মদ নূরুল হক | চিন্তাসূত্র
৫ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৯ মার্চ, ২০১৯ | বিকাল ৩:২০

নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান ও মোহাম্মদ হাশেম ॥ মোহাম্মদ নূরুল হক

সঙ্গীতভুবনে আঞ্চলিক গানের একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। একটি বিশেষ অঞ্চলের কৃষ্টি-কালচারকে অবলম্বন করে আঞ্চলিক গান রচিত হলেও এতে বিশেষ বিশেষ গীতিকবি ও কণ্ঠশিল্পীই অনেক সময় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। লোকগীতি ও পল্লীগীতির ক্ষেত্রে যেমন গীতিকবিকে কেন্দ্র করে বিশেষ ঘরানার সঙ্গীতের প্রচলন শুরু হয়ে থাকে, আঞ্চলিক গানের ক্ষেত্রে সে রকম হয় না। লালনগীতি, হাছান রাজার গান ও শাহ আব্দুল করিম-এর ক্ষেত্রে যেমন গীতিকবির নাম উচ্চারণ করা হয়, রমেশ শীল, কুটি মনসুর কিংবা মোহাম্মদ হাশেম-এর ক্ষেত্রে তেমন উচ্চারণ করা হয় না।

ভৌগলিক দিক বিবেচনায় এবং জলবায়ু ও মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নোয়াখালীর তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিচিত্র পেশার মানুষের বসবাস নোয়াখালী। সমাজে নিচু তলার মানুষ থেকে শুরু করে উঁচু তলার বাসিন্দাও রয়েছে। জীবিকার তাড়নায় এ-অঞ্চলের মানুষ মৌসুমি পেশাকে যেমন গ্রহণ করেছে, তেমনি চিৎপ্রকর্ষের প্রণোদনায়ও প্রণোদিত হয়েছে। ফলে মানুষের আচরণ ও চরিত্রও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নোয়াখালীবাসীর এই বৈচিত্র্যপূর্ণ আচরণ ও  স্বভাব মোহাম্মদ হাশেম আত্মস্থ করেছেন পরম মমতায়। কাছ থেকে দেখেছেন এ-অঞ্চলের মানুষের যাপিতজীবন। নিজেও যাপন করছেন সে জীবন। উপলব্ধি করেছেন সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনা। গীতিকবি হিসেবে লিখেছেন গান, স্বরলিপি; দিয়েছেন সুর, কণ্ঠও। এতে তার লেখা গানগুলো কেবল বাণীপ্রধান কিংবা সুরের ইন্দ্রজাল হয়ে ওঠেনি,  বাণী-সুর-তাল-লয়ের মিথস্ক্রিয়ায় হয়ে উঠেছে মানুষের প্রাণের আকুতিও। সুরের ঝর্ণাধারায় জটিল বিষয়ও শ্রুতিমধুর হয়ে উঠেছে।

জীবনানন্দ দাশ যেমন, বলেছিলেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর মুখ আমি দেখিতে যাই না আর’, তেমনি মোহাম্মদ হাশেম-এরও সগর্ব-উচ্চারণ, ‘আঁই যাইতান্নো ডুবাই, দেশের বদিল্লা খুবাই।’ মাতৃভূমির প্রতি অপার টান থাকার কারণেই অধিক উপার্জনের মোহ তাকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি। আপন মৃত্তিকার আঁচলে স্বল্প আয়ের দিনমজুরিও তার কাছে শ্রেয় মনে হয়েছে সুদূর মধ্যপ্রাচ্য গিয়ে প্রচুর অর্থোপার্জনের চেয়ে।

মোহাম্মদ হাশেম সমাজসেবক নন, রাজনীতিবিদও নন। নন প্রচলিত অর্থে সমাজ-চিন্তকও। তবু অবাক হওয়ার বিষয় নিজের অঞ্চলের মানুষের সুনাম ও গর্বকে অক্ষুণ্ন রাখার সংগ্রাম করেছেন। দীপ্ত কণ্ঠে, তীব্র অহঙ্কারে উচ্চারণ করেছেন, ‘আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী রয়েল ডিস্ট্রিক ভাই/ হেনী মাইজদী চৌমমুনির নাম কে হুনে নাই।’  গানটি বক্রোক্তি ও অনুপ্রাসের সম্মিলনে শ্রোতার মনে গভীর রেখাপাত করে। এখানে মানবসভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নোয়াখালীবাসীর চিৎপ্রকর্ষের প্রসঙ্গও সমান্তরাল বলে দাবি করা হয়েছে।  মানবচরিত্রের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যই নোয়াখালীবাসীর চরিত্রে বিদ্যমান। ভালো ও মন্দ, উত্তম ও অধমের সমন্বয়ে মানবসমাজ গঠিত। সে সমাজে একরোখা জেদি মানুষের অস্তিত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আপসকামী মানুষও।  আবার একই ব্যক্তির ভেতরও আপসকামী ও জেদি পরস্পর বিরোধী সত্তার সহাবস্থান রয়েছে। এ গানের ভেতর সম্পন্ন মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। বিভিন্ন নাটক ও টেলিফিল্মে ভাঁড় ও খলনায়কের চরিত্রের মুখে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা উচ্চারণ করিয়ে নাট্যকাররা আত্মরতিতে ভোগেন। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা কি শ্রুতিকটূ? জটিল? অশ্লীল? অসভ্য? চট্টগাম কিংবা সিলেটের ভাষার চেয়েও দুর্বোধ্য? নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা কি গুরুগম্ভীর ও অভিজাত আলোচনার অনুপযুক্ত? তাহলে নাটক-টেলিফিল্মে খলনায়ক-কূচক্রী, স্বার্থপর ও ভাঁড়দের মুখের ভাষা নোয়াখালীর হয় কী করে? অসৎ ও ভয়ানক লোকগুলো নোয়াখালীর?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে নোয়খালীর যে মুখগুলো মানসপটে ভেসে ওঠে, সে মুখগুলোর চেয়ে উজ্জ্বল মুখ সারা বাংলায় ক’টি আছে? মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিম, ভাষা আন্দোলনের শহীদ আব্দুস সালাম, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বীর শ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন, মোজাফফর চৌধুরী, ভিসি এ কে আজাদ চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, হাবিব উল্লা বাহার চৌধুরী, ইকবাল বাহার চৌধুরী, সার্জেন্ট জহুরুল হক কিংবা আব্দুল মালেক উকিল-এর মতো ক’জন  দেশপ্রেমিক বাঙালি সারা বাংলায় আছেন? নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষাকে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করার ভেতর দিয়ে কি আব্দুস সালাম, রুহুল আমিন, শহীদুল্লাহ কায়সার, আব্দুল মালেক উকিল কিংবা জহির রায়হানের আত্মত্যাগকে অসম্মান দেখানো হয় না? নোয়াখালীবিদ্বেষীদের নোয়াখালী বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কোথাও কাউকে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে দেখা যায় না। কেবল চরম অপমানে জ্বলে ওঠেন একজন মোহাম্মদ হাশেম। তার প্রতিাবাদী কণ্ঠে ধ্বনিত হয়—

হোনা কিয়া রূপা কিয়া হোনাত্তোনো খাডি
আল্লায় দিছে বল্লার বাসা নোয়খাইল্লা মাডি
এই মাডিতে বাঁচি যেনো এই মাডিতে চোক খাডি।

দেক্ষিণে বঙ্গোপসাগর উত্তুরে কুমিল্লা
মইধ্যআনদি এই কদ্দুরা নোয়াখালী জিলা
লাগে এক সোন্দর হাডি।

নোয়াখালী গর্ব আঙ্গো নোয়াখালী সুক
নোয়াখাইল্লা কইতে আঙ্গো হুলি উডে বুক
দ্যাশে আর বিদেশে আমরা সিনাকান হুলাই আঁডি।

অসম সম্পর্কের ফলে মানবজীবনে যে শেকড় বিচ্ছিন্নতার শুরু হয় সেটি মোহাম্মদ হাশেম উপলব্ধি করেছেন যথার্থ অর্থে। অর্থনৈতিক অসাম্যের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে মানবিক সম্পর্ক মর্যাদাপূর্ণ হয় না। মানবতা লাঞ্ছিত হয় মাত্র। শেকড়ের কথা ভুলে যে মানুষ ভিন্ন সংস্কৃতিকে কেবল মেকি আভিজাত্যের প্রলোভনে আঁকড়ে ধরতে চায়, সে কেবল আপন সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গেই সম্পর্ক ছিন্ন করে না; নিজের আত্মার সঙ্গেও তার একটি নেতিবাচক ও ভয়ানক সম্পর্ক তৈরি করে। অন্তর্দ্বন্দ্ব তাঁকে তিলে তিলে অপমান করে। ঠেলে দেয় চরম অধঃপতনের দিকেও। সে সত্যই ফুটিয়ে তুলেছেন মোহাম্মদ হাশেম ‘মাতাত লইন উনের ডরে/ মাডিত থুইন হিমড়ায় ধরে/ হড়াই লেয়াই জমি বেচি বিলাত হাডাইলাম/ বিলাতি মেম হুতের বো’র লাই হোলা আরাইলাম’ গানে। নিম্নবর্গের শিতি যুবক যখন কেবল নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে মনুষ্যত্বের মাপকাঠি জ্ঞান করে সংসার যাপন শুরু করে, বাবা-মা’র কথা তার মনে পড়ে কি না, সে বলতে পারে না। সে সন্তানকে দেখতে গেলে সন্তান বিব্রত হয়। সে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে কেবল পিতা-পুত্রই যে অপমানিত হন না, সঙ্গে মনুষ্যত্বেরও অপমান হয়।

নোয়াখালীবাসী জীবিকার টানে বহির্বিশ্বের অন্যান্য দেশে পাড়ি জমায়। ফলে বাড়িতে থাকে তাদের বিয়ে করা বউ, মা, ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে। প্রবাসীর অনুপস্থিতিতে সন্তান যেমন পিতার স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত হয়, স্ত্রী হয় স্বামী বিরহে বিরহিনী। মাও হন সন্তান অদর্শনে ব্যাকুল। এসব কথা মমতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন ‘ডুবাই গেছে আঙ্গো বাড়ির মহাম্মদ আলী’, ‘এরিও ব্যাক যদি ডুবাই যাইব দেশে থাইকবো কে’, ‘কত মানুষ ডুবাই গেছে আঁই কিন্তু যাইন’, ‘জাল ভিসাদি ডুবাই গেলে হিরি আইয়ন লাগে’ শীর্ষক গানে। এসব গানে যেমন মানুষের অসহায়ত্ব, প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-বেদনা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি প্রকাশ পেয়েছে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমও। সঙ্গে প্রতারণার পাতানো ফাঁদ থেকে রা পাওয়ার সতর্ক বাণীও রয়েছে।

মোহাম্মদ হাশেম অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী শিল্পী। লালন-নজরুল যেমন জাতপাতের ধার ধারেননি, তেমনি জাতপাতের ঠুনকো অহমিকাকে তিরস্কার করেছেন এ গীতিকবিও। ‘ধর্মের লাই কি মানষ নাকি মানষের লাই ধর্ম/ আইজো মানষ বুঝে না এই সোজা কতার মর্ম।’,  ‘জাইত গেলে কার কি ওইবো আর জাইতের খেঁতা হুড়ি/ টুন্নুর করি ভাঙি যাইব জাইত কি কাঁচের চুঁড়ি?’ গানের বাণী অনেকটা লালন-নজরুলেরই বাণীর প্রতিধ্বনি। জগতের সঙ্গীতসভায় সৎমানবতাবাদী শিল্পীর উপলব্ধির ঐকতানে সঙ্গীতও এক মহান ঐশ্বরিক প্রপঞ্চে উন্নীত হতে পারে এই-ই কি তার প্রমাণ? নয়তো কালে-কালে শিল্পীতে-শিল্পীতে চিন্তা ও চেতনার অভিন্ন সুর কেন?

মোহাম্মদ হাশেম কেবল প্রেমের গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন এবং গেয়েছেন তা নয়; দেশপ্রেমের গানেও তিনি আন্তরিক সততার স্বার রেখেছেন। দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের অশুভ উত্থানে এ শিল্পী ক্রদ্ধ, তীব্র ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সময়ও শিল্পী প্রতিবাদে দীপ্তকণ্ঠ। স্বাধীনতাবিরোধীদের সতর্কবার্তা শোনান:

আবার ওদিন আইবো বাঙালি গান গাইবো
ইক্কাইন ভাঙ্গি হড়ছকা চাহ্নি হ’র কিয়ের ডর
চোকগা খুলিচা।

এই বাঙালি হেই বাঙালি দেশ কইচ্ছে স্বাধীন
হাইঞ্জাবিরে এমন হিডা দিছিলো একদিন
হাইঞ্জাবিগো জুব্বার তলে এবো আছে ঘা।

৭১রে বাঙালি যে মু্ক্তিযুদ্ধ করে
কতবোড়া-কতবোড়া ছাগী বাঁড়বালে ভাই মারে
ইয়াহিয়া-নিয়াজী আর জেনারেল টিক্কা।
বাঙালিয়ে জান দিছিলো বাঙলা ভাষার লাই
দুনিয়াইতে এমন নজীর ওজ্ঞা দেবান ভাই
হেই সালাম আর হেই বরকতের আমরা ভাতিজা।

শিল্পী বাঙালি জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেন—বাঙালি ভীতু জাতি নয়। তার অতীত গৌরবের। হীনমন্যতা বাঙালির নয়। বাঙালির বীরত্ব বিশ্ববিশ্রুত।

মোহাম্ম হাশেমের গানগুলো অলঙ্কারসম্পন্ন হলেও অলঙ্কারের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে না। কোথাও কোথাও অন্ত্যমিলে সামান্য পতনের রেশ থাকলেও তা তাল-লয়-সুরের সংরাগে শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে। কে না জানে—সঙ্গীত শ্রুতিনির্ভর শিল্প? শ্রুতিনির্ভর শিল্পে উচ্চারণের কৌশলই মূল। গায়কের গায়কী ঢং শ্রোতার কানে যে অমৃতসমান সুরের আশ্রয়ে বাণী পৌঁছাতে পারেন, তাতেই শ্রোতা মোহিত হন। অন্যান্য সাধারণ ত্রুটি তার কানে ধরা পড়ে না, তাৎক্ষণিক। সমঝদার সঙ্গীতশ্রোতা রসের পূজারী। রসহীন অমৃতও তার কাছে নুনহীন ডালের মতো পানসে। সুতরাং মোহাম্মদ হাশেমের আঞ্চলিক গানগুলোতে অন্ত্যমিলের সামান্য ত্রুটি নিয়ে কেউ আপত্তি তুললেও তা তার সঙ্গীতের প্রাচূর্য ও গভীরতর বোধের সামনে গৌণ। মোহাম্মদ হাশেম ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান সমার্থক। রমেশশীল, কে এম চাঁদ মিয়া, শাহ আব্দুল করিম বাংলা আঞ্চলিক ও লোকসঙ্গীত সভায় যে আসন পাবার যোগ্য, মোহাম্মদ হাশেমও তাদের সঙ্গে একই আসনে সুরসাধনায় ধ্যাননিবিষ্ট হওয়ার সমান যোগ্য। মোহাম্মদ হাশেমকে উপেক্ষা করা আর নোয়াখালীকে তিরস্কার করা একই কথা। আঞ্চলিকতার প্রশ্নে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষাকে অবজ্ঞা করার অর্থই হলো পুরো বাংলাভাষাকে অবমূল্যায়ন ও অপমান করা।

দুই.
নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের একচ্ছত্র অধিপতি মোহাম্মদ হাশেম অর্ধশতাব্দীরও বেশিকাল ধরে গান লিখে, সুর করে, কণ্ঠ দিয়ে নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন বিভিন্নভাবে। যেমন আঞ্চলিক গান তেমনি পল্লীগীতিতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। আঞ্চলিক গানের মতো পল্লীগীতি রচনায়, সুর ও কণ্ঠদানে তিনি অনন্য। তার গানের ভাষা সহজ সরল। কোনও জটিল ঘূর্ণাবর্ত তার গানে নেই। কিন্তু অধিকাংশ গানে জীবনজিজ্ঞাসা রয়েছে, রয়েছে যাপিতজীবনের বিভিন্ন তুচ্ছাতিতুচ্ছ অনুষঙ্গেরও শৈল্পিক রূপায়ণ। ২০০৫ সালে বের হয় তার একমাত্র গীতিসংকলন নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান ।

মানবজীবনে সাধ ও সাধ্যের সম্বয় প্রায় দুরূহ বিষয়। বিষয়টি মোহাম্মদ হাশেম উপলব্ধি করেছেন মর্মে মর্মে। অর্থনৈতিক অসাম্য ও সঙ্গতির অভাবে মানুষ সাধের সঙ্গে সাধ্যের সমন্বয় ঘটাতে পারে না। তাই অনেক সময় কেবল অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার অভাবে জীবনভর অচরিতার্থতার দহনে পুড়তে থাকে। সময়ে স্মৃতিচারণ করে অতীতকে জাগিয়ে রাখে। সে রকম একটি ‘আহারে ও কুলসুম/ কতুন আইল ডুবাইঅলা কইলো এ জুলুম/ এত্তো আশা ভালোবাসা কেন্নেগো ভুলুম।’ এগানের মূল বিষয় হলো—দরিদ্র কথক ভালোবাসে তার খালাতো বোনকে। কিন্তু আর্থিক সঙ্গতির অভাবে তাকে সময়মতো জীবনসঙ্গিনী করে ঘরে তুলতে পারেনি। তার আগেই প্রবাসী কোনও এক পুরুষ এসে তার সে খালাতো বোন প্রেয়সী কুলসুমকে বিয়ে করে ঘরণী করে নিয়ে যায়। ফলে দু’টি জীবনেই নেমে আসে দীর্ঘতম দুঃখের অমানিশা।

জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ চিরন্তন সত্য ট্র্যাজেডি, দুঃখ। সে দুঃখের সঙ্গেই পনের আনা মানুষের সহবাস। মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে তোলে একথা সত্য; কিন্তু সে জীবনও আপনস্বভাবের অনুকূলে গড়ে তুলতে পারে কতটুকু? তার পেছনে কি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও পুঁজিবাদী সমাজপতিদের চক্রান্তের অদৃশ্য হাত থাবা মেলে থাকে না? সে অদৃশ্য থাবায় পরিশ্রমী মানুষের ভাগ্যকেও অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে দেবদেবীর অদৃশ্য চক্রান্তের মতো। ফলে মানুষ ইচ্ছে করলেই আপন ভাগ্য নিজের হাতে গড়ে তুলতে পারে না। পুঁজির কাছে শেষ পর্যন্ত কেউ করেন আত্মসমর্পণ, কেউ হন নতজানু। মাতৃহারা কন্যাসন্তানের ভালোমন্দের বিবেচনা জনকের পে করা সব সময় সম্ভব হয় না। একথা চরমনারীবাদীরাও অস্বীকার করা সুযোগ  নেই যে, নারী হয়েও সৎ মায়েরা সাধারণত সতীনের মেয়ের অমঙ্গল কামনা করেন, এবং নিজের কোনও স্বার্থ চরিতার্থ করার হীনমানসে সৎ মেয়েকে পিতার বয়সী পুরুষের লালসার কাছে জলাঞ্জলি দিতে প্ররোচিত করেন।  সে সত্যই ফুটে উঠেছে ‘দুঃখে যাগো জীবন গড়া তাগো আবার দুঃখ কি/ আঁরে বানাইছে খোদায় গরীপ বাপের ঝি/ দুঃখ কমু আবার কার কাছেগো/ আলা ছাড়া গরীবের আর বন্ধু কে আছে?’ এগানে সহজ সরল ভাষায় যেমন নারীজনমের অচরিতার্থতার দুঃখ বর্ণিত হয়েছে, তেমনি মানব জীবনের লোভলালসা আর হতাশার দিকও ফুটে উঠেছে। একনারী শেষ পর্যন্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ‘কেন্নে গাইতাম বারমাসী/ জীবন গেল বুড়ইয়ার হাকনা চুল বাছি/ দুঃখ লাগে মরার আগে মা-ডাক হুনুম কার কাছে?’ নারী জীবনের চরম সার্থকতা সন্তান জন্মদান ও লালন-পালন। সে সঙ্গে সন্তানের মুখে মা ডাক শোনাও। সন্তানের মুখে মা ডাক শোনার কাক্সা কেবল মাতৃত্ববোধের পবিত্র প্রকাশমাত্র নয়; নিরালম্ব জীবনের জন্য একটি পরম আশ্রয়েরও নিশ্চয়তা। সন্তান জন্মদানের কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজতে গেলে জৈবিকতাড়নার প্রসঙ্গও নেহায়েত তুচ্ছ হয়ে যায় না। জৈবিক ক্ষুধাকে অবজ্ঞা করার মধ্যে কোনও মাহাত্ম্য নেই; আছে কেবল সুযোগের অভাবে চরিত্রবান হওয়ার ভণ্ডামির মতো লৌকিকতা। যে লৌকিকতা মানবজীবনকে উপহাস করে মাত্র; কোনও মহৎজীবনের সন্ধান এনে দিতে পারে না।

মোহাম্মদ হাশেম মানবতাবাদী শিল্পী বলেই মানবতার অপমান যেখানে দেখেছেন, সেখানেই প্রতিবাদ করেছেন। আবহমান গ্রামবাংলার একটি চিরায়ত স্বভাব, পলীর ঘরে ঘরে মা’য়েরা ঘরের বউকে কাজের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজের মেয়েকে বিশ্রামের দিকে প্ররোচিত করেছেন। নিজের নারীমাত্রই দ্বৈতচরিত্রে অভিনয়ে পারদর্শী। নারী যখন বউয়ের শাশুড়ি, সমাজের মূল্যবোধের দোহায় দিয়ে পুরুষশাসিত জীবন-যাপনকে মহিমান্বিত বলে প্রচার করেছে, নারী যখন জামাইয়ের শাশুড়ি তখন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্রদ্ধকণ্ঠে কথা বলেছে। ঘরের বউকে স্বামীপূজার দিকে প্রণোদিত করে, মেয়েকে প্ররোচনা দিয়েছে স্বামীর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে। নারীচরিত্রের এ এক ভয়াবহ ও চিরন্তনরূপ। সে অভিনয় জীবনের প্রতিচিত্র এঁকেছেন ‘ঝি হোত বউ উঠ হইকে ডাক দেয়/ ঝিরে কয় হুইত্তো/ ঝি হোত বউ উঠ হইকে বোলে/ বোরে কয় উইঠতো/ আঁট্টোন আইনছে ইলিশমাছ আর/ বাঁডা মাছগুন কুইটতো।’ আবহমান গ্রামবাংলার বাড়িতে বাড়িতে গভীর রাতে শ্যামা পাখি ডাক দিয়ে যায় ‘কূউ-ঊ, কূউ-ঊ’ সুরে। লোককথা আছে এ পাখি কর্মচাঞ্চল্যের বারতা নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে ঘুমিয়ে পড়া ঘরের বউদের জাগিয়ে দেয়, আপন আপন কর্মে যোগ দেয়ার জন্য। ভাবতে অবাক লাগে এসব লোককথার প্রচার করেন সে সব নারী, যারা বিগত যৌবনা এবং বউয়ের শাশুড়ি হয়েছেন। দারিদ্র্যের কষাঘাতে দিন যাপনকারীর কোনও সাধ আহ্লাদই যে পূর্ণ হওয়ার নয়, তা গভীরভাবে উপলব্ধি না করে প্রকাশ করা যায় না। তারও চেয়ে জরুরি সে দুঃস্থ জীবনকে কাছ থেকে দেখা ও সে জীবনের সঙ্গে নিজের একটি আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন করে, সে  নিম্নবর্গের মানুষের জন্য সহানুভূতিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা। তা হলেই শিল্পীর মানবজীবন ষোলকলাই পূর্ণ হয়। চেশোয়াভ মিউশ যেমন বলেছিলেন ‘কিসের কবিতা যদি তা দেশ ও জাতিকে না বাঁচায়?’ মোহাম্মদ হাশেমের গানগুলো শুনলে চেশোয়াভ মিউশের সে মানবতার বাণীই বারবার মনে পড়ে। স্বল্প আয়ের মানুষ বদু মিয়া স্থানীয় ওদার হাটে লাউ বিক্রি করে সওদাপাতি কেনা শেষে যদি দু’পয়সা বাঁচে তাহলে সে চা-নাস্তা করার বাসনা করে মনে মনে। নিজের সামান্য এ চাওয়া পুরণের কথা যখন তার মনে হয়, তখনই মনে পড়ে বোনের আব্দার, ছেলের বায়না, মেয়ের আহাদ, স্ত্রীর দায়। সামান্য পয়সাই যে গরীব মানুষ দিনানুদিনের চাহিদা মেটাতে চায় সে আর যাই করুক সংসারের সবার মুখে একসঙ্গে হাসি ফোটাতে পারে না। তাই এ গানের তৃতীয় স্তবক ( আভোগ) অংশে সে বেদনাই মূর্ত হয়ে ওঠে ‘বদুর হোলা বানা ধইচ্ছে লইতো নাডাই ঘুড়ি/ মাইয়াগাও কইছে বাবা আইনও কাঁচের চুড়ি/ মাতা খাইজ্জায় বদু এত হইসা কোনাই হাইব।’ সামান্য সব্জি লাউ বিক্রিলব্ধ অর্থ দিয়ে জীবন বাঁচানোর খাদ্য-সামগ্রী কেনাই যেখানে কষ্টকর, সেখানে সংসারের বিভিন্ন বয়সী মানুষের জীবন সাজানোর উপকরণ কেনা তার কাছে মনোযাতনার সামিলই। যারা নিত্য জীবনের সঙ্গে মরণপণ সংগ্রাম করে টিকে থাকে, তাদের সখ-আহাদ প্রায় বিলাসিতায় পর্যবসিত হয়।

এ-ই মানবজীবনের চরম ও পরম ট্র্যাজিডি। মোহাম্মদ হাশেম এগানের ভেতর দিয়ে সে অমোঘ সত্যকেই চিত্রায়িত করেছেন একজন চিত্রশিল্পীর মতোই। মা’য়ের অভাব যে কোনও কিছুতে পুরণ হবার নয় সে বিষয়টি ফুটে উঠেছে ‘আহারে মা কোনাই গেলা আঙ্গোরে হালাই’ গানে। মানুষের অপোর প্রহর যাতনাময় তার স্বার ‘বেড়ার হাকদি দেবা যায় চাহ্নি ডুবে-ডুবে/ হুতি-হুতি ভাবেরে বউ হেতেন আইবো কবে/ ছ’মাসের লাই গেছে হেতেন দুই মাস ওইছে হবে’ গানে রয়েছে। অচরিতার্থ জীবনের হাহাকার আর গানির বর্ণনা রয়েছে ‘ বুইজার আছে দুলাভাই ভাবীর আছে বড্ডা ভাই/ আর কতকাল কাডামু এই রঙ-তামাশা চাই?’ গানে রয়েছে তেমনি ‘জাইত গেলে কার কি ওইবো আর জাইতের খেঁতা হুডি/ টুন্নুর করি ভাঙ্গি যাইব জাইত কি কাঁচের চুড়ি? বলে যে গানের শুরু সে গান শেষ পর্যন্ত লালন-নজরুলের ভাবাদর্শের সুর হয়েও মোহাম্মদ হাশেমের মনস্তত্ত্বকে মহিমান্বিত করে তোলে।

মোহাম্মদ হাশেম জীবনশিল্পী, জীবনের উজ্জ্বলতর দিকগুলো যেমন তিনি প্রত্য করেছেন, তেমনি কদর্যরূপকেও চিনেছেন তৃতীয় নয়নে। তাই জীবনের মাঠে-মাঠে কেবল সুখ-সাচ্ছন্দ্যের অন্বেষণ করেন নি, দুঃখ- বেদনাকেও শৈল্পিকরূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তাই মোহাম্মদ হাশেম জীবন জিজ্ঞাসার প্রশ্নে লালন-রবীন্দ্র-নজরুলের মতই একজন জীবনশিল্পী। গানকে বিলাসিতার ফ্যাশন হিসেবে দেখেননি, গানকে করে তুলেছেন জীবনের সামগ্রিকরূপের স্টাইল হিসেবে। মোহাম্মদ হাশেম কেবল নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের শিল্পী  বলেই নয়, পল্লীগানেরও এবং সমস্ত জীবনব্যাপী সঙ্গীত সাধনার প্রেক্ষাপটে সমগ্র বাংলাগানের স্বতন্ত্র এক অহঙ্কারের নাম। এখানেই মোহাম্মদ হাশেমের সঙ্গীত রচনা ও কণ্ঠসাধনের সার্থকতা।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন