নির্বাণ গল্প-সাত ॥ আজহার ফরহাদ | চিন্তাসূত্র
৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২১ নভেম্বর, ২০১৮ | দুপুর ১:৫৭

নির্বাণ গল্প-সাত ॥ আজহার ফরহাদ

হওয়া না হওয়ার অস্তিত্ববোধ
আমি তো হয়েই আছি, আমাকে নতুন করে কী হতে হবে! কিংবা বলতে পারো, আমার ফেলে আসা ‘আমি’কে আমার চাই। কিন্তু সে ‘আমি’র পরিচয় তুমি জানো না, বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে বসে আছ নিজের মর্মবীজকে। একটুক্ষণের জন্যও মনে করতে পারছ না, প্রকৃতই যা তুমি। কথা হলো, সে কি কেবলই অজানা অতীত?

তা নয়। আমরা যা আগে ছিলাম, তা আমাদের নিতান্তই অতীত হবে কেন? বরং আমরা ঘুমন্ত, চেতনহীন, বিস্মৃত। বলতে পারো, আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি আমাদেরই অজানা ‘আমি’! তাকে আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই সত্তার মুক্তি, তার আগে নয়। বিজ্ঞানের নানান আবিষ্কারের আগে এমন কথা বলা যায় না যে, তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না; ঈশ্বরের আবিষ্কারের আগেও তেমন। মানুষের কাজ হলো আবিষ্কার করা, সদাপরিবর্তনশীল বিবর্তিত জীবনের সত্যকে আবিষ্কার করা। এটা তোমাকে করতেই হবে, নইলে তুমি কিছুই না, অস্তিত্ববোধের অনুভবহীন জড়বস্তু মাত্র।

সৃষ্টিতে জীব ও জড় বলতে যা বোঝায়, তা এখানেই। অস্তিত্বের অনুভব যার আছে, সে জীব, যার নেই সে জড়; আর যে সে অনুভবকে দিব্যদৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেছে, সেই হলো শিব। আমরা জীব হয়ে উঠতে পারি না বলে শিবত্ব অর্জন তাই সাধ্যাতীত। এতটাই বিস্মৃত যে, বিস্মরণের চারপাশে জমাট বেঁধে আছে মোহপাশ, তাকে ছিঁড়ে ফেলার সুযোগ কোথায়?

শীতের সকালে আবছা কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সাধু জানালার কাচ মুছতে গিয়ে দেখতে পেলেন কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে। ভেতরে আসার জন্য ইশারা দিতেই ওরা দ্রুত চলে এলো। তাদের ভেতর একজন হলো বহরম, কাশ্মির বাড়ি। অনেক বছর আগে সাধু তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আজ এতদিন পর তাকে আশ্রমের বাইরে ঠকঠক করে কাঁপতে দেখে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন। বহরম তার সঙ্গে দুজন অতিথি নিয়ে এসেছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে গিয়ে ঠাণ্ডায় প্রায় জমে যাওয়ার উপক্রম। তাদের আগুন পোহাতে রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন তিনি।

বহরমের উপস্থিতিতে এতক্ষণের আলোচনায় একটু ছেদ পড়লো। তিনি কথা বলছিলেন কয়েকজন ভক্তের সঙ্গে, যারা খুব ভোরবেলা উঠেই এখানে বসেছিল, কখন তিনি আসবেন আর দু’একটা কথা বলে তাদের তৃপ্ত করবেন। সাধু কথা বলেন সামান্য, সকালবেলা তার সঙ্গে দেখা হলে কিছু কথা দিনের শুরুতে এমনিতেই হয়ে থাকে। কথার মাঝে ছেদ পড়ে আলাপটি আর জমে উঠছে না দেখে সবাই কেমন ছড়িয়ে গেলো নানান ভাবনায়।

একসময় বহরম ও তার দুই সঙ্গী এসে দাঁড়ালো। সাধু দীর্ঘ এক চাহনিতে বহরমের দিকে তাকিয়ে রইলেন, বসতে বললেন শেষে। বহরম ওদের নিয়ে বসার পর তিনি বললেন, এতদিন পর তোমাকে দেখে অবাক হলাম, আরও বেশি অবাক হলাম তোমার বাইরে অপেক্ষা করার নমুনা দেখে, তুমি না হয় কষ্ট করলে কিন্তু তোমার সঙ্গে আসা দু’জন অতিথিকে শীতে কষ্ট দেওয়ার কোনো অধিকার তোমার ছিল না।

বহরম লজ্জ্বিত হয়ে বললো, আমায় ক্ষমা করবেন সাধুজি, আসল কথা বলছি, এতদিন পর আপনার সামনে এসে দাঁড়ানোর ভয়ে আমি ভুলেই গেছি ওদের কথা। সত্যি আমি লজ্জিত!

অনেকক্ষণ পর তিনি আগের আলোচনায় ফিরে এলেন। সবার গুনগুন কথা থামিয়ে বলে উঠলেন, আমি যত পৃথিবীকে জানতে চাইবো, ততখানি নিজেকে জানার সুযোগ না ঘটলে এ দিয়ে আখেরে আমার পারমার্থিক কল্যাণ অসম্ভব। আমরা জন্ম হতেই অর্থের দিকে ছুটি, আর সে অর্থই সকল অনর্থের মূল হয়ে ওঠে; এ কেবল টাকা-পয়সার ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রে অর্থবহতা খুঁজতে চাওয়া। এটা হয়, যদি আমরা পরমার্থের দিকে যেতে না পারি, ক্ষুদ্রার্থে, বৃহদার্থে, স্বার্থে-সংঘাতে বিপর্যস্ত হই কিন্তু নিজের ভেতর যে পরম অর্থবহতা লুকানো, তা টের পাই না।

আজ অনেক বছর পর বহরম উপস্থিত। একদিন তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম আশ্রম হতে। বলেছিলাম সাধনা অর্থবহতার নাম নয়, অর্থ বুঝে বুঝে বা টাকা গুনে গুনে তুমি হিসাব করতে পারবে না জীবনের। জীবন যে বহতা নদী, তাকে কে কবে অর্থবহরূপে বুঝে উঠতে পেরেছে? কিন্তু সকল অর্থকরি চিন্তা-ভাবনাকে পরমার্থের দিকে সমর্পিত না করতে পারলে সাধনা হয় না। হয়ে ওঠে সাধ-বাসনা।

বহরম তেমনি আমার কাছে এসেছিল কিছু একটা হয়ে ওঠার জন্য। এমন একটা কিছু আশা করছিল সে, যা অর্জন করতে পারলে তার লোকসমাজে সুনাম হয়। আমি ব্যাপারটা ধরতে পেরে ওকে চলে যেতে বলি। আজ এতদিন পর তার আসা আমাকে কিছুটা অবাক করেছে, আবার আশ্বস্তও করেছে যে, সে আগের মতো এমন হয়ে ওঠার সাধ-বাসনা নিয়ে হয়তো আসেনি আজ।

বহরম মাথা নিচু করে এতক্ষণ কথাগুলি শুনছিল। এবার কেঁদে ফেললো সবার সামনে, আমি সত্যিই লজ্জিত সেদিনের সে ঘটনার জন্য। আজ এতবছর পর আমি এটুকু অনুধাবন করেছি যে, সাধ করে সাধনা হয় না, এর জন্য চাই সাধ্যাতীত প্রেরণা। যে প্রেরণা আমার ভেতর ছিল না, কিন্তু আজ তা এসেছে, তাই আমি একজন ‘না’ হয়ে ওঠার মানুষ হিসেবে আপনার কাছে ফিরে এসেছি। আমি আজ কিছু হতে চাই না, কেবল নিজেকে অনুভব করতে চাই।

কুয়াশা কেটে গেছে ততক্ষণে। বাইরে রোদ উঁকি দিচ্ছে। আশ্রমে প্রভাতসঙ্গীতের আয়োজন শুরু হচ্ছে। সবাই গোল হয়ে বসলো। মাঝখানে শিল্পী ও বাদ্যকর। সাধুও বসলেন। একসময় তিনি বলে উঠলেন, বহরম তোমার মুখে সে গানটা অনেক দিন শুনি না।
-কোনটা দয়াল!

ওই যে,
দাপেওমাস বালিয়ারাস য়ার লাগভ
তয়াম দোপনাম বোযওয়ূন চূস কোন লাগভ।

ভালোবাসি যারে সুধাই তারে, বান্ধব গো
শুনছি আমি চালাও তুমি, সে কয় গো।
চলবে

নির্বাণ গল্প-ছয় ॥ আজহার ফরহাদ

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।