আগুনপোকা ॥ সুমন মজুমদার | চিন্তাসূত্র
১ কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৬ অক্টোবর, ২০১৮ | সকাল ৮:১৬

আগুনপোকা ॥ সুমন মজুমদার

ছোট ঘরের উঠানে জ্বলছে তাদের আগুনের কুণ্ড। এই পৌষভাঙা শীতে জারেজার হয়ে স্বামী-স্ত্রী বসে আছে এই কুণ্ড ঘিরে। স্বামীটির মুখে আগুনের কমলা আঁচ, তবু শীতে তার মধ্য বয়সী হাতদুটো যেন অসাড় হয়ে আসে। একই অবস্থা চিন্তাশক্তিরও। কেবল রাত যত বাড়ছিল বিষণ্ন বাতাসের বল্লমে বিদ্ধ হয়ে তার ঠোঁট দুটো তত কাঁপছিল হু হু করে। স্ত্রীটিরও এখন বলার কিছু নেই। পুরনো স্মৃতির মতো পাতলা হয়ে আসা শাড়ির ওপর দেড়হাতি গামছাটা টেনেটুনে কাঁপছিল সেও। অন্যদিকে দাওয়ায় এক অন্ধকার কোণে মুখ লুকিয়ে বসেছিল তাদের মেয়েটি। তার শীত আরও বেশি। হীম কুয়াশার রাতে ফোঁটা ফোঁটা শিশিরের ভারে যেমন বেড়ে ওঠা ঘাসলতা কাঁপতে থাকে, মেয়েটিও ধুঁকছিল তেমন করে। তাই সেও করুণ চোখে তাকিয়ে আছে অগ্নিকুণ্ডের দিকে। ইচ্ছে, একটা ছোট্ট শিশুর মতো আগুনটাকে বুকের উমে চেপে ধরে। হঠাৎ বাবাটি মুখ খোলে; স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তার চোখে কিসের যেন ফুলকি দেখতে পায়। সে বলে—এত ছোট আগুনে পোষায় না রে, শীত যে মেটে না। আরও বড় আগুন দরকার, এক্কেবারে দোজখের মতো। য্যান সব শীতরে ভয় দেখান যায় দৈত্য হয়া। স্ত্রীটি তবু নিস্পৃহ। পাশে থাকা শেষ ডালটি সে গুঁজে দেয় কুণ্ডে। শুকনো ডাল আগুনের সঙ্গ পেয়ে শীতের সঙ্গে দুর্বোধ্য ভাষায় কথা জুড়ে দেয়। স্ত্রীটির তাতে কী আসে যায়, শীত আর মরা ডালের এই খেজুরে আলাপে তো তার কাঁপুনি কমছে না। একসময় সে স্বামীকে বলেই বসে—ঘর থাইকা নিয়া আসি? কিন্তু স্বামী সে কথার জবাব দেয় না। অবশ্য স্ত্রীটিও জবাবের অপেক্ষা না করেই কুঁকড়ে যাওয়া পাতার মতো কাঁপতে কাঁপতে ঘরের দিকে চলে যায়। মেয়েটি এবার দাওয়া থেকে মৃদু শব্দে ডাকে—বাবা আমিও আগুনের কাছে আসি? বাবা মেয়েকে এবার সাবধান করে—না গো মা, শইল পুইড়া যাবে। কিন্তু মেয়ে ততক্ষণে আঁধার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে ধীরে ধীরে কুণ্ডের দিকে এগিয়ে আসে আর বলে—পুইড়া যাওয়ার তো আর বাকি নাই, অখন খালি ভস্ম হওয়ার দেরি। গাঢ় কুয়াশা সত্ত্বেও আগুনের মরচে আলো খানিকটা দৃষ্টিসীমা অবশিষ্ট রেখেছে। মেয়ের দিকে বাবা মুখ তুলে তাকাতে পারে না। লজ্জায় না কি শীতের শাঁপে তার গায়ে কাঁটা দেয়। ষোড়শী মেয়েটা তার উন্মুক্ত বুকটা যে চেপে ধরে আছে কেবল দুই হাতে। সারা শরীরে আর একটি সুতোও যে নেই। শুধু আবছা কুয়াশা যেন তার আব্রু হওয়ার ইচ্ছায় আশপাশে ঘুরঘুর করছে, অথচ মেয়েটি তা পাত্তাও দিচ্ছে না। পুরুষটি খেয়াল করে, মেয়েটির উরুতে রক্ত আর বীর্যের দাগ এখনো মিলায়নি। চোখের এককোণ ছিঁড়ে গেছে। বুকে পেটে নখের আচড়গুলো একইরকম তাজা। মেয়েটি এসে পাশে বসে, কাঁপা কাঁপা হাতে স্পর্শ করে বাবাকে। পরক্ষণেই কিসের যেন ঘৃণায় হাতটা সরিয়ে নেয়, স্পর্শটুকু প্রাণপণে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। শীতে যে আর পারি না বাবা। এই আগুনে পোষাবে না, পোষাবে না। আরও বড় আগুন লাগবো। শয়তানের চোখের মতো, দৃষ্টি দিয়া যে পোড়ায়া খায় মানইষেরে। মেয়েটি একটি কাঠি দিয়ে আগুনের কুণ্ডু নাড়া দেয়। লাকড়ির অভাবে ঈষৎ কমতে থাকা ফুলকি মুহূর্তের জন্য ফণা তুলে আবার নিস্তেজ হয়ে যায়। ততক্ষণে মা হাঁক দিয়েছে—এই যে এসব নিয়া আসছি। এই আগুনে পোষাইবো না, আরও বড় আগুন লাগবো। মায়ের হাতে তোড়া বাঁধা কাপড়-চোপড়। ট্রাঙ্কের ভেতর ন্যাপথলিন দিয়ে রাখা নিজের বিয়ের শাড়ি, মেয়ের ছোটবেলার ফুলওয়ালা জামা, ষোড়শকালের কামিজ, সালোয়ার থেকে শুরু করে, স্বামীর রঙজ্বলা শার্টটিও। পুরো স্তূপটি এনে সে ফেললো আগুনের পাশে—চলেন পোড়াই। স্ত্রীটির কথায় বাবা-মেয়ে উৎসাহ পায়। তারা অগ্নিকুণ্ডের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে।

স্ত্রীটির হাতে একটা নীলধোয়া শাড়ি। সে ওটা ছুঁড়ে ফেলে আগুনে। পুরনো সেই ধোঁয়া নীলের সঙ্গে আগুনের কমলা মিশে একটা স্মৃতির গন্ধ তৈরি করে। ধীরে ধীরে নীলকে গ্রাস করতে থাকে কমলা। সেই জ্বলন্ত কমলাকে দেখে স্ত্রীটি দীঘশ্বাস ছাড়ে। তবু সেটি থেকে উদগীরিত ওম তাকে আরাম দেয়। প্রতিটি রোমকুপের ভেতর দিয়ে স্মৃতির ছদ্মবেশে সেই ওম যেন বাতা পৌঁছে দেয় রক্তে। স্ত্রীটি তার ভেতরগত সেই রক্তের ডাক শোনে। বিয়ের পর স্বামী প্রথমে তাকে যে শাড়িটা দিয়েছিল, এটা ছিল সেটাই। যৌবনে এক কাক নিখোঁজ দুপুরে স্বামী শাড়িটা নিয়ে এসেছিল তার জন্য। সে তখন পাকঘরে কালিঝুলি মেখে ভাত চড়াতে ব্যস্ত। স্বামী এসে বলে—অনেক তো ভাত ফুটাইতেছস বউ, তোর ঘাম আর অন্নের গন্ধে তো শইল চিলিক দিয়া ওঠে। নতুন বউ তখন লজ্জায় লাল। একেবারে সে ছিল বেহায়া মরদ। তখনই একটা কাগজে মোড়া শাড়িটা তাকে দিয়ে বলেছিল—এইটা তোর জন্য। আর আমারটা কিন্তু রাইতে ঠিকই বুইঝা নিমু। সেই কালি-ঝুলি মাখা হাতে সে কাগজটা খুলে শাড়ির নীল দেখে কী যে খুশি হয়েছিল। তারপর জীবনের ওপর দিয়ে কত অভাব, ঝড়-ঝাপটা চলে গেল, তবু স্ত্রীটি শাড়িটা যত্ন করে রেখেছিল ট্রাংকে। অথচ এখন ২৫ বছরের সংসার জীবনের বিশেষ এই স্মৃতিটি কী নির্দয়ের মতোই না পুড়িয়ে তার ওম নিচ্ছে সে। ধরা গলায় এবার স্বামীটি বলে—নীল শাড়িটা না দিলেও পারতি। এবার চট করে স্ত্রীটি মুখ ফেরায় তার দিকে—তাইলে আগে কোনটা দিলে ভালা হইতো, বিয়ার শাড়িটা? ওইটা তো রাখছিলাম এই হারামজাদির জন্য। কে জানতো এইটা আজই কাজে লাইগা যাইবো। বাতাসে তখন নীল পোড়া গন্ধ। এরমধ্যে হঠাৎ স্বামীটি যেন কোথায় ডুব দেয়—কত কষ্টে গড়া সংসার রে, কত কষ্টে গড়া। দিনরাইত কষ্ট কইরা একটু একটু উপায়ে জমাইছিলাম এই সংসারের মধু। ক্ষ্যাতে কাম করছি, কখনো কামলা দিসি, কখনো রিকশা চালাইছি। তবু মধুর একটু কমতি আছিল না জীবনে। তারপরও ক্যান আম গো লগে এগুলা হইলো।

স্ত্রীটি উত্তর দেয় না—তবে সূত্র ধরে মেয়েটি। জানি না আব্বা, আমি কিচ্ছু জানি না। শুধু জানি আমার অনেক শীত লাগতাছে। শরীরের কোনায় কোনায় যে পাপ, সেগুলা সাপ হয়ে ছোবল দিতাছে। এই শীত আর সহ্য হয় না আব্বা। দিয়া দাও, সব আগুনে ফালায়া দাও। মেয়েটির কথায় মায়ের মাঝেও চাঞ্চল্য দেখা দেয়। সেও বলে—হ আমারও আর শীত সহ্য হইতাছে না। পোড়াও সব পোড়ায়া ফেল। বিয়ের লাল শাড়িটা থেকে শুরু করে তোড়াবাঁধা সব কাপড়-চোপড় তারা ছুড়ে ফেলতে শুরু কওে আগুনে। নীল খেকো আগুনটা আরও রঙ পেয়ে তরবড়িয়ে ওঠে। ওটার শিকঅয় নাচন শুরু হয়। সঙ্গে নাচে কুয়াশাও। এভাবে কতক্ষণ কতক্ষণ আগুনটা স্মৃতিগুলো পুড়িয়ে চলে সেদিকে ওদের খেয়াল ছিল না। শুধু আবার যখন ক্ষুধার যন্ত্রণায় যখন কুণ্ডুটা নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে, তখনই ওরা টের পায়। এখন কী করি, আর কী আছে? জার তো হাড্ডি মাংস খায়া খাক করে ফেলতেছে। এই আগুনে তো পোষায় না। স্ত্রীটিও জবাব দেয়—হ এই আগুনে তো পোষায় না। আরও বড় আগুন চাই, আরও বড় ওম। এবার মেয়েটি উঠে দাঁড়ায়—আমার আর সহ্য হয় না। আমি আরও আগুন নিয়া আসি। আধো অন্ধকার ঠেলে ঘোরগ্রস্ত বিবস্ত্র মেয়েটি টলতে টলতে ঘরের ভেতর ঢোকে। ঘরে কোনো আলো নেই। তবু তার দেখতে ভুল হয় না। একপাশে ছোট্ট টেবিলে তার বই-পত্র রাখা। কয়েকটা খাতা পড়ে আছে এলামেলো। মেয়েটি একেএকে সেগুলো বুকে জড়িয়ে নেয়। বই আর খাতার কথাগুলো তার নতুন আব্রুর জমিন হয়ে ভেসে ওঠে। স্কুল পাস করে যখন সে কলেজে ভর্তি হয়েছিল, তখন বাবা বলেছিল—আর যাই করো মা পড়াশোনাটা ছাইরো না। বিপদের দিনে এই পড়ালেখাই তোমার শক্তি হবে। আরও কষ্ট করতে হয় করুম, তবু তোমাকে লেখাপড়া শিখামুই। বাবার সেই কথা মনে করে এখন মেয়েটির হাসি পায়। লেখাপড়া তাকে বিপদের দিনে বাঁচাতে পারলো কই? কলেজে আসা-যাওয়ার পথে ওই ছেলেগুলো যখন তাকে কুৎসিত ভাষায় টিটকিরি ইঙ্গিত করতো, তখন তো সে সব সহ্য করে নিয়েছিল। কিন্তু দিনে দিনে যখন সেটা অসহ্যের পর্যায়ে গেল, তখনই কেবল এর প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু লাভ কী হলো?

বাবা যখন সমাজপতিদের সামনে দাঁড়ালেন বরং তখন তাকে শুনতে হয়েছে উলটো কথা। মেয়ে মানুষের এত পড়াশোনা করে লাভ কী? স্কুল পাস করেছে সেটাইতো যথেষ্ট। তারপরও আবার কিসের পড়ালেখা। ফকিন্নির শখ হইছে মিয়া খাঁ হওয়ার; তাও যদি আব্রু রক্ষা কইরা চলতো। কলেজে যাওয়ার নামে এমন রঙ-ঢঙ আর গতর দেখাইলেতো ছোট ছোট পোলাপাইনের মাথা খারাপ হইবোই। আর এই বিচার দেওয়ার অপরাধেই তো গতরাতে, মেয়েটি অন্ধকারের মধ্যেও সেই কথা ভেবে শিউরে ওঠে। কী ভয়ঙ্কর সেই রাত। বাবাকে ছেলেগুলো বেঁধে রেখেছিল উঠানে আর মা চিৎকার করে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছিল। বারবার পাষাণগুলোর পায়ে ধরছিলেন আর বলছিলেন—বাবারে বাবারে আমার মেয়েটা…

কিন্তু কে শুনেছে কার কথা। ঘরের ভেতরে ছিন্নভিন্ন হতে হতে সে আর অন্ধকার কেবল সাক্ষী থেকেছে সবকিছুর। এসব ভেবে মনের অজান্তেই বুকে জড়িয়ে ধরা বইগুলোকে সে আরও চেপে ধরে। হাতের একটা দগদগে ক্ষত থেকে খানিকটা রক্ত লেগে যায় সাদা খাতায়। তবু সে প্রাণপণে চেপে ধরা ছাড়ে না। বিপদে তো এগুলো কাজে এলো না; বরং এই শীতে কিছুটা কাজে আসুক। বই-খাতাগুলো নিয়ে টলতে টলতে মেয়েটি ফিরে আসে উঠানে। ততক্ষণে আগুনের কুণ্ডুটার প্রাণ নিভু নিভু। শীতে স্বামী আর স্ত্রী জুবুথুবু হয়ে তারপরও কোন আশায় যে ঘিরে আছে সেটিকে। মেয়েটিকে দেখতে পেয়ে ওরা নতুনভাবে আশান্বিত হয়। কিন্তু তার হাতে বই-খাতা দেখে তারা চমকে ওঠে। না, আর যাই হোক বই-খাতাগুলো দেওয়া যাবে না আগুনে। কিন্তু মেয়েটি তাদের কথা শুনবে না; কী হবে আর এসব দিয়ে, যত্ন করে যদি রেখেও দেই তবু কি আর এগুলো নিয়ে ফেরা যাবে? তাহলে এই রক্ত চুষে নেওয়া শীতে এগুলো ব্যবহার করতে দোষ কী? মনে নাই সকালে থানায় পুলিশের বড়কতা দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে কী বলেছিল? ছোট পোলাপান ভুল করে ফেলছে, এখন মামলা হামলায় না গিয়া একটা মিটমাটে আসলে তোমাদেরও ভালো, ওদেরও। টাকাপয়সার ব্যবস্থা করে দিতেছি, কোনও সমস্যা হবে না। সেটা নিয়া মেয়েসহ অন্য জায়গায় চলে যাও।

যাবা না মানে! হারামজাদারা তোদের বাপ যাবে। কত্তবড় সাহস, আমারে আইন শিখাও। পুলিশের ডাণ্ডার বারিতো খাও নাই, একবারে গোয়া দিয়া ভইরা দিমু। মাইয়ারে সামলায়া রাখতে পারো না, আবার আসছো বিচার নিয়া। ওই মাইয়া যে কলেজে যাওয়ার নামে রাস্তাঘাটে ছিনালি করে বেড়াতো, সে খবর আমাদের কাছে আছে।

সকালের সেসব কথা মনে করে ওরা চমকে ওঠে। হঠাৎ শীতের তীব্রতা যেন আরও বেড়ে যায়। অগ্নিকুণ্ডের প্রাণবায়ুটুকু রক্ষার কথা মনে হয়। বাবা বলে—সত্যিই তো কী হবে আর এত বিদ্যা শিক্ষা দিয়া? কেউ তো তার দাম দিলো না। তারচেয়ে বরং এই ভালো আগুনটার জীবন বাঁচাক। তার কথা শুনে মা আর মেয়ের চোখেও আগুন ঝিলিক দিয়ে ওঠে। যেকোনো মূল্যে আগুনটাকে বাঁচানো চাই। ওরা বই-খাতাগুলো ছিঁড়ে গুঁজে দেয় কুণ্ডে। কালির হরফের সেই জ্বালানি পেয়ে আগুনটা আবার প্রাণ ফিরে পায়। ওরা তিনজন তার পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে। আহ, কষ্টে অর্জিত শিক্ষাটা এই রাতেতো কাজে লাগছে। কিন্তু এরপরও রাতের অন্ধকার শেষ হয় না। শীতের কামড়ও বাড়তে থাকে পাল্লা দিয়ে। ওরা নিজেরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে, এরপর কী। এই আগুনে যে শীত মেটে না; আরও বড় আগুন চাই। স্বামী তাকায় স্ত্রীর দিকে, স্ত্রীও কিছু বলতে যায়। তবু মুখে আসে না। শুধু মেয়েটি তার বেআব্রু শরীর জমিনকে কোনোমতে আঁকড়ে বলে ওঠে—এরপর কি পোড়ানোর কিছু নাই? মায়ের সম্বিত ফেরে, সে স্বামীর দিকে তাকায়। স্বামীটির মুখ যদিও অভিব্যক্তিহীন। তবু সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে—আছে। যে কলঙ্ক হইলো সেইটা আছে। কলঙ্করে যদি পোড়ায়া খাক বানানো যাইতো, তাইলে আজ আমি তাই করতাম। এবার মেয়েটি কেবল অস্ফুট স্বরে বলে—বাবা। এই একটি শব্দ যেন লোকটির শীতক্লিষ্ট শরীরে আবার শক্তি জোগায়। সে বলে—চিন্তা করিস না, আমি আরও বড় আগুন আনুম। এই আগুনে পোষায় না। এবার লোকটি দৌড়ে ঘরে চলে যায়। তারপর একে একে বাইরে টেনে আনে পুরো সংসার। ধীরে ধীরে উঠানে জমা হয়, একদা ঘুম পাড়ানি অথচ এখন দশপুরুষের ঘিনঘিনে বীর্যলেপা চৌকি, বিবস্ত্র আলনা, স্মৃতির ট্রাঙ্ক, রক্তের ছাপওয়ালা ভুলোনা আমায় বালিশ, হাড়িকুড়িসহ আরও টুকিটাকি। হঠাৎ শীত যেন আড়ালের ভূত হয়ে খিকখিক করে হাসে। মা আর মেয়ে তাতে কাঁপে ঠকঠক করে। লোকটি এবার জ্বলন্ত কুণ্ডু থেকে টুকরো লাকড়ি নিয়ে ফেলে সেই সাঁজানো সংসারের স্তূপে। ক্রমেই জ্বলে ওঠে সেই পুরাতন, ধোঁয়া ছড়ায় সাত আসমান ছোঁবে বলে। ওরা তিনজন সেই উজ্জ্বল আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে কিভাবে পুড়ে যাচ্ছে চেনা দিনগুলো। ওদের কষ্ট হয়, তবু শীতের এই দুঃসময়ে ওই আগুন তাদের দয়া করে। কেবল একসময় মেয়েটি কাকে যেন প্রশ্ন করে—সব তো গেলো। শরীর, সংসার, সমাজ, সম্মান; আর কী বাকি? আর আমরা কী পোড়াব? অবশেষে এক মা তার বেআব্রু বুকের ধনের গায়ে হাত রাখে। শরীরটা যে হীম হয়ে আসছে তার। আছে, পোড়ানোর আরও কিছু নিশ্চয় আছে। নাইলে সবকিছু জাইনা শুইনাও ক্যান পতঙ্গরা ছুইট্টা আসে আগুনের কল্যাণে। সবকিছু শেষ হয়া গেলে ওরা যে নিজেরে পোড়ায়। অস্থিমজ্জা কয়লা কইরা আগুন নেয় আত্মায়। হঠাৎ এক বাবা তার সংসার পোড়া আগুনের পাশে বসে পড়েন কাঁদতে কাঁদতে। আগুনের ধোঁয়া তখন ধ্বংসের পতাকা হয়ে গেছে আকাশে। বাতাস আর গন্ধ সে পতাকা নাড়িয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ চায় মানুষের। একটু একটু করে গ্রামে কোলাহল বাড়ে, কৌতূহল বাড়ে। সঙ্গে বাড়ে ভোর এগিয়ে আনা শীত। কিন্তু তার আগেই যে ওদের তিনজনকে পালিয়ে যেতে হবে। সংসার থেকে আগুন ছড়ায় ঘরে, ঘর থেকে শরীরে আর তা থেকে মগজে। মেয়েটির শরীরের একেকটা ক্ষতচিহ্ন চিড়চিড় করে। কাঁদতে কাঁদতে সে তার মাকে বলে—বড় কষ্ট মাগো, এই আগুনে পোষায় না।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন