অপ্রমেয় ॥ মাহরীন ফেরদৌস | চিন্তাসূত্র
৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২১ নভেম্বর, ২০১৮ | দুপুর ১:৫৯

অপ্রমেয় ॥ মাহরীন ফেরদৌস

জানুয়ারির এক ঝকঝকে শীতের সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলাম, আমার স্ত্রী সামরিন আগের রাতে ওর বান্ধবী দিশার বাসায় ছিল। দিশার সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব প্রায় দুই যুগের। এখনো সময় পেলে দু’জনে একসঙ্গে কেনা-কাটা করতে যায়। অফিসের পর কফিশপে বসে আড্ডা দেয়। এহেন পুরনো বান্ধবীর বাসায় রাত কাটানো এমন কোনো বড় বিষয় না। আমি তথাকথিত সংকীর্ণমনা স্বামী নই যে, বিয়ের পর স্ত্রীকে বান্ধবীর বাসায় থাকতে দেব না। বরং আমার কখনোই এতে কোনো আপত্তি ছিল না। প্রতিটি মানুষের কিছু ব্যক্তিগত স্থানের প্রয়োজন, যেখানে সে তাই করবে, যা তাকে মানসিকভাবে ভালো রাখবে। সেখানেই যাবে, যেখানে তার মন চায়। এই স্থানে কারও হস্তক্ষেপ করার প্রশ্নই ওঠে না। তবে মূল সমস্যা অন্যখানে। গত তিন-চার রাত কাজের চাপের জন্য ভালো ঘুম হয়নি। গতকাল অফিস থেকে প্রচণ্ড ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। তাই এসেই গোসল করে, ফ্রিজে রাখা খাবার গরম করে খেয়ে নিয়েছিলাম। সামরিন বলেছিল, ও অফিসের পর দিশার বাসায় যাবে, ফিরতে রাত হবে। সে কারণে ওর জন্য অপেক্ষা করিনি। রাত নয়টার দিকে সামরিনকে ফোন করে জানলাম একঘণ্টার মধ্যে ও বাসায় ফিরে আসবে। এঁটো গ্লাস-প্লেট সিংকে দিয়ে, অবশিষ্ট খাবার ফ্রিজে তুলে, বেডরুমে গিয়ে খবর দেখতে শুরু করলাম। মিনিট কয়েক পর টেলিভিশন চালু রেখেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। ঘুমটা ছিল গাঢ়। বেশ গাঢ়। তিন দিনের ক্লান্তি, ধকল, নিদ্রাহীনতা সব একসঙ্গে জমে ইন্দ্রিয়ের ওপর রীতিমতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অন্য কোনো জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। মাঝরাতে জলবিয়োগের প্রবল চাপে ঘুম ছুটে গেল। ঢুলু ঢুলু চোখে উঠে টয়লেটে গেলাম। সামরিন তখন বিছানায় ঘুমাচ্ছিল অঘোরে। আমার বেশ স্পষ্ট মনে আছে। আমি টয়লেট থেকে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। ও হালকা একটু নড়ল। তারপর গভীর নিঃশ্বাস ফেলে আবার ঘুমে তলিয়ে গেলো।

আমার ঘুম ভাঙলো পরদিন সকাল সাতটায়, অ্যালার্মের শব্দে। জানুয়ারি মাসের নাতিশীতোষ্ণ সকাল। বাইরে হালকা কুয়াশা তারপরেও রোদের আলো ঝলমল করছে। আমি ঘুম থেকে উঠে অ্যালার্ম বন্ধ করলাম। মোবাইলফোন হাতে নিয়ে অফিসের মেইল দেখতে গিয়ে চোখে পড়লো পাঁচটা মিসডকল আর একটা মেসেজ। সবগুলোই সামরিনের। মেসেজে লেখা, ‘মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছ। তাই ফোন ধরছ না। দিশা আর সাগরের মাঝে খুব ঝগড়া চলছে।  ঝগড়ার এক পর্যায়ে দিশা গ্লাস ভেঙে হাত কেটে ফেলেছে। পরিস্থিতি ভালো না। আজ রাতটা এখানেই থাকছি। সকালে কথা হবে।’

মেসেজ পড়েই আমি বিছানার দিকে তাকালাম। সামরিন নেই, কিন্তু ওর দিকের বালিশ, বিছানা কুঁচকে আছে। শূন্য বিছানায় ওর উপস্থিতির ছাপ আছে, কিন্তু ও নেই। ও কি ফ্রেশ হতে গিয়েছে কিংবা নাস্তা বানাতে? আমি গলা ছেড়ে ডাকলাম, ‘সামরিন, সামরিন।’ পাশের ঘর থেকে কেউ উত্তর দিলো না। কান পাতলাম, নাহ, বাথরুমে পানির কোনো শব্দ নেই। সম্পূর্ণ বাসা নীরব। এক পলকের জন্য আমার মনে হলো সামরিন কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছে? বোকা বানাচ্ছে? তবে দিশার ঘটনা নিয়ে বানিয়ে তার কিছু অন্তত বলার কথা না। আর আমার তো স্পষ্ট মনে আছে মাঝরাতে আমি যখন উঠেছিলাম তখন পাশে সামরিন ছিল। আমি কি তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম? ঘুমের ঘোরে অবচেতন মন ভেবে নিয়েছিল? নাহ, আমার মস্তিষ্ক আমার মনকে বোঝাতে পারলো না। সত্যতা যাচাই করতে আমি একটা সূক্ষ্ন অস্বস্তি  নিয়ে সামরিনের নাম্বারে কল করতে শুরু করলাম।

‘এই মুহূর্তে আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটিতে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।’—যান্ত্রিক ও একঘেয়ে কণ্ঠ শুনতে পেলাম। এরপর দ্রুত দিশার নাম্বারে কল করলাম। ফোন ধরে আমি কিছু বলার আগেই দিশা অসম্ভব বিব্রত এবং বিষণ্ণ স্বরে বললো,

—‘হ্যালো অনিক ভাই, আমি কিন্তু খুবই লজ্জিত। আপনি প্লিজ সামরিনের ওপর রাগ করবেন না। গতকাল আমার এমন অবস্থা হয়েছিল, ও না থাকলে হয়তো বাসায় খুনাখুনি হয়ে যেতো।’

দিশার কথায় আমার মাথা কিছুটা ঝিম ঝিম করে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘সামরিনের নাম্বার বন্ধ পাচ্ছি কেন জানো? তুমি নাকি হাত কেটেছিলে এখন কী অবস্থা?’

—‘এখন হাতের অবস্থা ভালো। আজকে ডাক্তার দেখাব। সামরিনের ফোনে চার্জ নেই অনিক ভাই। শিহাবকে তো বেডরুম ছেড়ে দিয়ে আমি রাগ করে লিভিং এ ছিলাম। সামরিনও ছিল আমার সাথেই। চার্জ দিতে ভুলে গিয়েছিল। ও আধঘণ্টার মতো হয়েছে বাসার দিকে রওনা হয়েছে। জ্যামে না পড়লে পৌঁছে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। গতকাল আপনাকে কয়েকবার কল করেও পায়নি। পরে মেসেজ দিয়েছে। আমার দোষেই হয়েছে এসব। আপনি ওকে কিছু বলবেন না।’

—‘না না। ঠিক আছে। এমন পরিস্থিতে ওর চলে আসাটাই বরং খারাপ হতো। থেকেই ভালো করেছে। তবে তুমি একটু মাথা ঠাণ্ডা রেখো। এ ধরনের দুর্ঘটনা তো খুবই বিপজ্জনক।’

—‘হ্যাঁ। চেষ্টা করব।’

কল কেটে বিছানায় বসে থাকি বিহ্বলের মতো। সম্ভবত মন থেকে মেনে নিতে কষ্ট হয় দিশার কথাগুলো। ভাবতে থাকি, আজ অফিসে দুইটা মিটিং আছে। নতুন  আসা কিছু কাজের ফোরকাস্টিং করতে হবে। সহকর্মীরা সবাই যতটা সম্ভব আগে অফিসে আসবে বলেছে, অথচ আমার কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না। গতকাল রাতে আসলে কী হয়েছিল? আমি টেলিভিশনের দিকে তাকাই। ওটা বন্ধ। যতদূর মনে পড়ে গতকাল খবর দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। বন্ধ করলো কে? আমি নিজেই? তাহলে কেন কিছুই মনে করতে পারছি না? আমি আর কিছু না করে বিছানায় বসে থেকে মোবাইলফোন হাতে সামরিনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।

ও বাসায় আসে আরও মিনিট বিশেক পর। পরনে গতকালের পোশাক। মুখ কিছুটা লম্বাটে হয়ে আছে। চোখের কোলে ক্লান্তির ছাপ। ঘরে ঢুকেই হাতব্যাগটা ছুড়ে ফেলে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ও বলে, ‘গতকাল এত মরার মতো ঘুমাচ্ছিলে কেন?’

—‘কিভাবে জানলে?’ আমি কিছুটা উৎকর্ণ হয়ে প্রশ্ন করি। যেন মনে মনে আশ করছি ও উত্তরে বলবে, আমি তো তোমার পাশেই ছিলাম। দেখেছি তোমাকে।

অথচ আমাকে আশাহত করে ও বলে, ‘কতগুলো কল দিয়েছিলাম দেখেছিলে? পরে বুঝলাম ঘুমিয়ে গেছ। সে জন্য মেসেজ দিয়ে রেখেছি। ভেবেছিলাম রাতে ঘুম ভাঙলে নিশ্চয়ই কল দেবে। তাও দাওনি। দিশা আর শিহাব ভাইয়ের ঝগড়া খুব কুৎসিত ছিল। সেখানে থেকে রক্তারক্তি হয়ে গেলো। খুব অস্বস্তি লাগছিল আমার। যাই হোক, এখন বলো আমি ছিলাম না বলে খারাপ লেগেছে তোমার?’

আমি ওর কথার উত্তর দিলাম না। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হালকা পায়ে জানালার সামনে গেলাম। অদূরে তাকিয়ে বাইরে কিছুটা অন্যমনস্কভাবে বললাম—‘দ্যাখো। আজকের সকালটা কী ঝকঝকে।’

সে বছর আমার কোম্পানি নতুন আরেকটি শাখা খুলবে বলে তুমুল তোড়জোড় শুরু করে দিলো। আমার জীবনে বিশ্রাম কিংবা বিনোদন বলতে কিছুই থাকল না। অফিসের কাজ শেষে কিংবা দিনের শুরুতে নতুন অফিসে গিয়ে নানা তদারকি করতে হতো। দেখতে দেখতে বছরের শেষ চলে এলো। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি জানলাম আমাকে দিন তিনেকের জন্য খুলনা যেতে হবে। সামরিন ও আমি ঢাকার একঘেয়ে জীবন থেকে বিরতি নেওয়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলাম না। ও অফিস থেকে ছুটি নিলো। দুজনেই পাড়ি জমালাম খুলনার দিকে। সেখানে পৌঁছে তিন দিনের কাজ দু’দিনে শেষ করার প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকলাম। যেন শেষের দিন দু’জন মিলে উপভোগ করতে পারি। হয়তো ড্রাইভ করে চলে যাব রূপসা নদীর পাড়ে। কিংবা চলে যাব খান জাহানের শাসনামলের কুঁড়ে মসজিদে। নয়টি গম্বুজের যেই মসজিদ প্রত্নতত্ত্ববিদদের রীতিমতো বিস্মিত করে ছেড়েছে।

দ্বিতীয় দিন সাইটে সব কাজ গুছিয়ে যখন হোটেলে ফিরে আসছি, তখনই ঢাকা থেকে কল করলো আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু তামিম। হাস্যরস মিশিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,—‘আরে! তোর বাসায় আসছি সারপ্রাইজ দিতে। এখন দেখি তুই নাই! তিন দিনের জন্য বউ ফেলে কেউ অফিস ট্যুরে যায়? ভাবিকে সাথে নিতে পারছ নাই?’ আমার বুকের ভেতরে একটা ছোটখাটো বিস্ফোরণ ঘটে যায়। হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে যায়। কী বলছে এসব তামিম? কম্পিত কণ্ঠে বলি, ‘তুই কই এখন? আমার বাসায়?’

—‘আর কই? আমি আর নিতু আসছিলাম আড্ডা দিতে। এখন দেখি তুই নাই। কী আর করা!’
—‘আর সামরিন কোথায়?’
—‘সামনেই আছে, নে কথা বল। সে কিন্তু তোকে খুবই মিস করতেছে।’

আমার বুকের ভেতর একটা শীতল রেখা নদীর মতো এঁকেবেঁকে চলে যায়। মাথার ভেতরটা খুব দ্রুত দপ দপ করতে থাকে, যেন কোথাও যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আর গোলাগুলিতে ছেয়ে গিয়েছে চারপাশ। লাশের পর লাশ পড়ে যাচ্ছে। আর আমি ছুটছি, ছুটছি। সামরিন ঢাকায় কিভাবে থাকবে? সে তো আমার সাথেই খুলনা এসেছে। হোটেল রেড লেভেল-এর ৩০৪ নাম্বার ঘরে অপেক্ষা করছে। আগামীকাল আমরা ঘুরতে যাব। বাইরে খাব। এরপর পরশু বাড়ি ফিরব। তামিম তাহলে বাসায় গিয়ে কাকে দেখেছে? কে সে? আমি কম্পিত মনে ফোনের অন্যপ্রান্তের কণ্ঠের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। আমাকে বিদ্যুৎ চমকের মতো চমকে দিয়ে কথা ভেসে আসে,

—‘হ্যালো! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহধর্মিনীর এলাকায় গিয়ে নিজের সহধর্মিনীকেই ভুলে গিয়েছ নাকি?’ সামরিনের কণ্ঠের কৌতুক আর ভালোবাসায় স্তব্ধ হয়ে যাই কয়েক মুহূর্তের জন্য। চুপ করে থাকি। তারপর ঢোঁক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করতে করতে বলি,—‘তুমি কি বাসায়?’

—‘এ সময় বাসায় না থেকে কোথায় থাকব? তামিম ভাই আর ভাবির সঙ্গে গল্প করছি। তুমি সাবধানে থেকো। দুপুরে তো বিরিয়ানি খেয়েছ। রাতে আর ভারী কিছু খেও না। কেমন?’ আমি কোনো রকমে কথা শেষ না করেই লাইন কেটে দেই। বিন্দু বিন্দু ঘামে নেয়ে উঠি যেন। দুপুরের খাবার নিয়ে সামরিনের সঙ্গে ফোনে গল্প করেছিলাম আজ। কিন্তু ও তো তখন হোটেলে ছিল। তাহলে ঢাকার আমার বাড়িতে কে আছে? আর সে তাহলে কিভাবে জানে আমার সব তথ্য? কী হচ্ছে এসব! আমি রীতিমতো টলতে টলতে হোটেলে ফিরে আসি। প্যাসেজে হেঁটে আসার সময় পেছনের দেয়ালে কোথাও টিকটিকি ডেকে ওঠে।
টিক টিক টিক।
ঠিক ঠিক ঠিক

কী ঠিক? কী বেঠিক? আমি কিছুই বুঝতে পারি না। ৩০৪ নাম্বার ঘরে গিয়ে দরজার লক খুলি। সারা ঘর অন্ধকার। ভেতরে রজনীগন্ধা ফুলের মৃদু ঘ্রাণ। প্যাসেজ থেকে ঠিকরে আসা আবছা আলোতে দেখি সামরিন জানালার পাশের রকিং চেয়ারে বসে আছে। আর তালে তালে দুলছে হালকাভাবে। আমার সবকিছু ঘোরের মতো লাগে। বাতি জ্বালাব না কি জ্বালাব না বুঝতে পারি না। নিঃসাড়ে বাথরুমে চলে যাই। ঘন ঘন পানির ঝাপটা দেই চোখে মুখে। আমি ঠিক আছি তো? নিজের বাম হাতে শক্ত করে ডান হাতের বৃদ্ধা আঙুলের নখ চেপে ধরি। বাঁকা চাঁদের মতো দাগ পড়ে যায় সঙ্গে সঙ্গেই। ব্যথাও পাই। নাহ এসব কিছুই কল্পনা না। আরও কয়েকবার পানির ঝাপটা মেরে আমি অন্ধকার ঘরে ফিরে আসি। উপস্থিতি টের পেয়ে সামরিন রকিং চেয়ার থেকে পায়ে পায়ে উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। ওর গায়ের উষ্ণতায় আমি ক্ষণিকের জন্য ভুলে যাই বাকি সব অনিশ্চিত আর রহস্যময় দ্বিধার কথা। দু’হাতে ওকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরি। আমাকে কানে ফিসফিস করে সে বলে, ‘কী? কাজের ব্যস্ততায় আমাকেই ভুলে যাচ্ছ?’ ঝট করে আমার আবার সব মনে পড়ে যায়। এমন কিছুই ফোনে বলেছিল ঢাকায় থাকা সামরিন। ছিটকে সরে আসি। ‘কী হলো?’ হতভম্ব স্বরে বলে ওঠে ও। একটা অর্থহীন আর্তনাদ করে হোটেল রুম থেকে ছুটে বের হয়ে আসি আমি।

এরপর থেকে খুব দ্রুত বদলে যেতে থাকি। খুব দ্রুত। অনেক নিঃশব্দে একটা বাতাসের ঘ্রাণ আমাকে ধাওয়া করতে থাকে। সেই ঘ্রাণে কেউ ফিসফিস করে বলতে শুরু করে, সামরিন এক, সামরিন দুই। সামরিন এক, সামরিন দুই।

কর্মস্থলে এমন অবস্থা হয় যে আমার কর্মদক্ষতা কমে যাওয়াতে তারা আমাকে মূল অফিস থেকে বদলি করে বেশ ছোট একটা শাখায় পাঠিয়ে দেয়। অল্প অল্প করে হতাশাগ্রস্ত হতে থাকি আমি। সামরিনের সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা কমিয়ে দেই। ক’দিন আগেও যেখানে দিন ফুরালেও আমাদের কথা ফুরাত না সেখানেই আজকাল বিশাল ধরনের নীরবতা চেয়ার পেতে বসে থাকে। সামরিন আমাকে সহজ করতে চেষ্টা করে। আমি তাতে আরও গুটিয়ে যাই। আরও।

বর্ষার বিষণ্ণ এক দুপুরে অফিসে থেকে মিটিংয়ে যাওয়ার পথে দেখতে পাই বাংলা মোটরে রাস্তা পার হচ্ছে সামরিন। সঙ্গে সঙ্গেই কী মনে করে ওর ফোনে কল করি। সে ব্যস্ত ভঙ্গিতে জানায় অফিসে জরুরি কাজ করছে। খুব দরকারি কোনো কথা আছে নাকি আমার? এর কিছুদিন পর একবার ওকে বলার চেষ্টা করি, ‘কোনো মানুষ একই সঙ্গে দুই স্থানে বাস করতে পারে কি?’ প্রশ্ন শুনে ও এমনভাবে আমার দিকে তাকায় যেন আমি একজন বদ্ধ উন্মাদ। আমি চুপ করে যাই। সেদিন থেকে ওর সঙ্গে কথাবার্তা আরও সংক্ষিপ্ত আকার ধারণ করে।

পরের বসন্তে আরও অনেক কিছু ঘটে যায়। আমাদের বিচ্ছেদ ঘটে। ও নিজেই রাগ করে ওর বোনের বাসায় গিয়ে থাকা শুরু করে। এ বিচ্ছেদ অন্তরের নাকি শুধুই বাহ্যিক তা নিয়ে আকুল হয়ে ভাবতে থাকি। বেশিদূর ভাবতে হয় না। ঈষৎ শীতরাতের উড়োবৃষ্টির মতো ও দু’দিন পর নিজ থেকেই ফিরে আসে। আমি কিছুই বলি না। কথা বা তর্ক বাড়াই না। ও ফিরে এসেছে, এটুকুতেই আমার তীব্র মনে আনন্দ জাগে। আমি তাতেই সুখী। এদিকে সবার মতে আমার স্বাস্থ্যের বেশ অবনতি হয়েছে। ওজন কমেছে প্রায় তের কেজি। মাঝে মাঝেই প্রচুর ব্যাক পেইন হয়। অফিসের কাজের দক্ষতা আরও কমে গিয়েছে। ইতোমধ্যেই আকারে ইঙ্গিতে আমাকে বোঝানো হয়েছে দিন দিন কর্মচারীদের বেতন কমানোর কোনো পন্থা সিস্টেমে নেই বলে আমি আগের বেতন পাচ্ছি। কিন্তু আর বেশি দিন আমার চাকরির আয়ু নেই। আত্মীয় স্বজন আমার এমনিতেও খুব বেশি ছিল না। তাদের মধ্যেই টুকটাক যারা ছিল এক মাসেই মারা গেলো দু’জন। একজন দূর সম্পর্কের চাচা। একষট্টি বছর বয়সে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। আরেকজন আমার এক খালাতো ভাই, মাত্র ষোল বছর বয়সে সে হৃদয়ভাঙার দুঃখ নিয়ে আত্মহত্যা করল। হৃদয়ঘটিত জটিলতা দুজনেরই। সামরিন জানাল ও মৃতদেহ সহ্য করতে পারবে না। মৃত মানুষের বাড়িতে ওকে যেন আমি না নেই। আমিও জোর করলাম না। অথচ চাচার বাসায় গিয়ে দেখলাম সামরিন আমার আগেই পৌঁছে গেছে। সাদা-কালো রঙের শাড়ি পরে আছে। এমন শাড়িতে আমি ওকে আগে কোনোদিন দেখিনি। সোফায় বসে চাচিকে ও বেশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল। চাচি ডাক ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে চাচার উদ্দেশে বলছিলেন, ‘আমাকে একলা রেখে তুমি কই চলে গেলে?’

আমি সামরিনকে দেখে সত্যি হতচকিত হয়ে গেলাম। পায়ের নিচের মাটি আটকে গেলো। বিস্মিত হয়ে কয়েক মিনিট তাকিয়ে থাকলাম ওর দিকে। কেমন যেন অন্যরকম লাগছে ওকে। হালকা স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। উজ্জ্বল হয়েছে ত্বক। যেন কেউ মোমের আলোর আভা মেখে দিয়েছে মুখে। বাসায় যখন ছিল তখন তো এমন লাগেনি। আমার কী দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছে নাকি বদলে যাচ্ছে? আমি কিছুটা থেমে থেমে এগিয়ে এসে কোনো রকমে ওর পাশে দাঁড়ালাম। তারপর একটু ঝুঁকে বললাম, ‘তুমি না বলেছিলে এখানে আসবে না? মৃহদেহ সহ্য করতে পারবে না?’

সামরিনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো আমার কথা শুনে। সে নিচু স্বরে অসম্ভব শীতলভাবে বললো, ‘অনিক। আমি তোমাকে কিছুই বলিনি। আর তুমিও আমাকে চাচার মৃত্যুর খবর দাওনি। তোমার চাচাতো বোন দিয়েছে। আল্লাহরওয়াস্তে মিথ্যে বলা বন্ধ কলো।’

আমি মাথা নিচু করে সরে এলাম। সামরিন চাচির চোখের অশ্রু মুছে দিচ্ছে। তা দেখে আশেপাশের অনেক মহিলার চোখ ভিজে আসছে। খুবই মর্মস্পর্শী দৃশ্য। এখানে কেন যেন আমার নিজেকেই বেমানান লাগছে। মনে হচ্ছে আমার অনুপস্থিতিই যেন বড় প্রাসঙ্গিক। এই মিলিয়ে আসতে থাকা ফ্যাকাসে দুপুরে, মৃত মানুষের জন্য হাহাকারে আমি যেন এক উদ্বাস্তু। কী মনে করে আমি পাশের ঘরে উঁকি দিলাম। সেখানে পশ্চিম দিকে মুখ করে কেউ সুরে সুরে কোরআন তিলাওয়াত করছে। বাতাসে আগরবাতির কড়া ঘ্রাণ। চারপাশে অনেকে ফিসফাস করছে, ‘মানুষটা বড় ভালো ছিল।’ চাচি এখন কান্নার দমকে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছেন। সামরিন নিচু স্বরে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে কিছু বলছে। কী বলছে, ঠিক বুঝতে পারলাম না। আরও বেশি অবাঞ্ছিত অনুভব করার আগে, দ্বিধায় ভেঙে পড়ার আগেই আমি সবকিছু পেছনে ফেলে চাচার বাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম।

খালার বাসায় গিয়ে জানতে পেরেছিলাম সেখানেও আমার আগে সামরিন এসেছিল। বাসার সবার সঙ্গে দেখা করে চলে গেছে। খালা একবুক বেদনা নিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছেন। জ্ঞান নেই। তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা শোচনীয়। খালু আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে দিলেন না। আমি সেই বাড়ি থেকে বের হয়ে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে যখন সিএনজি খুঁজছি তখনই দেখলাম দিশা আর সামরিন রিকশায় করে খুব গল্প করতে করতে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। অথচ সামরিনের এখন এই এলাকায় থাকার কথা না। তার তো কাজে থাকার কথা। এত আগে অফিস ছুটিও হবে না। তাহলে ও কেন এখানে?  হঠাৎ কী যেন হয় আমার। মনে হয় এভাবেই কি মানুষ একে অন্যের থেকে দূরে দূরে চলে যায়? গন্তব্য বদলে অন্য কোথাও আশ্রয় নেয়? অন্য কারও সঙ্গে সঙ্গে, ঘুরে বেড়ায়? আর আগের মানুষটা বৃষ্টিতে ভেজা মলিন গাছের মতো একাকী থেকে যায়? আমি কি তবে একটা ভেজা গাছ? মলিন? পুরানো? আমার কি বিস্মৃত হওয়ার সময় চলে এলো? আমি সামরিনের নাম আউড়াতে থেকে ওদের রিকশার পেছনে ছুটতে শুরু করি। যেন পৃথিবীর শেষ স্টেশনের শেষ রেলগাড়িটি চলে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে দিয়ে। আর সেটা ধরতে না পারলে আমার জীবনই বৃথা। আমি ছুটতে থাকি, প্রাণপণে। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ ঢাকা শহরে এত জ্যাম থাকে অথচ সে সময়ই কেন যেন রাস্তাটা বেশ ফাঁকা হয়ে যায়। দুই পাশের সারি সারি বহুতল ভবনের দেয়ালগুলো কেমন সরে সরে যায়। আকাশ বিস্তীর্ণ হয়ে পড়ে। আর সামরিনদের মোটর চালিত রিকশা বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়োজাহাজের মতো এগিয়ে যায়। পেছন পেছন উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকি আমি। চিৎকার করে ডাকি, ‘সামরিন, আমার সামরিন। একটু থামো।’

কিন্তু কেউ ফিরে তাকায় না। অচেনা পথচারীর কিংবা কোনো আবর্জনার মতো আমাকে পেছনে ফেলে চলে যায় ওরা। একবুক অভিমান নিয়ে আমি রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার মনে হয়, আমাকে ছিটকে ফেলে দিয়ে সামরিন উড়ে গেল রঙিন প্রজাপতির মতো।

আমার যেন জিদ চেপে যায়। ভেতরে ভেতরে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার ভান করি। অধিকারবোধ চাপাতে ইচ্ছে করে ওর ওপর। মনে হয় শরীরের সঙ্গে শরীর চেপে ওকে পরাস্ত করি। ইচ্ছে হয় ওকে আঘাত করি নির্মমভাবে। কেন আমার ডাকে ও থামবে না? কেন ফেলে যাবে আমাকে? মর্মবিদ্ধ হয়ে দ্রুত ওর মোবাইলফোনে কল করি, ও ধরে না। কী মনে করে এবার ওর অফিসের ল্যান্ডলাইনে কল দেই। কেজো গলায় সে বলে, ‘হ্যালো সামরিন বলছি।’ ধড়াস করে ওঠে আমার বুক। চট করে লাইন কেটে দেই। ও অফিসে থাকলে রিকশায় কে ছিল?  আবারও কি আমি বিভ্রমে পড়লাম? সামরিন আসলে কোথায়? অফিসে, রিকশায় না কি আমাদের বাসায়? আগে তো শুধুই দু’জন সামরিন ছিল। এবার কি তবে তৃতীয় কেউ এলো? কিভাবে? সত্যটুকু জানাবে আমাকে কে? এই দৃশ্যান্তরের ভেতরে লুকানো প্রকৃত সত্য কি অজানাই থেকে যাবে আমার? আমি নিঃসঙ্গ আর অবসাদগ্রস্ত পথচারীর মতো হাঁটতে থাকি। দু চোখের গভীরে একটা দুঃখী শালিক পাখি ডেকে ডেকে আমাকে বিষণ্ণ করে তোলে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা হেঁটে বাসায় পৌঁছাতে পারি। দরজা খুলে দেয় আমার চিরচেনা স্ত্রী, সামরিন। আমি তাকে এক অপরিচিতার মতো দেখতে থাকি। আমার বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে অসম্ভব উদ্বিগ্ন হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই বুকে জড়িয়ে ধরে সে। ওর বাহুতে নিজেকে ছেড়ে দেই উড়ন্ত পাখির পালকের মতো। ঘরের ভেতরের কোনো দেয়াল থেকে একটা টিকটিকি ডেকে ওঠে। টিক টিক টিক। সঙ্গে সঙ্গেই আমার মাথার ভেতর কেউ কোরাসে গেয়ে ওঠে, একটা সামরিন। দুইটা সামরিন। তিনটা সামরিন। আমি দু’হাতে নিজের কান চেপে ধরি। পৃথিবী দুলে ওঠে। আমি জ্ঞান হারাই।

এর কিছুদিন পর।
শহরের নামকরা হাসপাতালের চিকিৎসক বলেন, ‘অনিক, আমাদের কথামতো না চললে আপনি খুব বেশিদিন সুস্থ থাকতে পারবেন না। আপনার খুব বড় কোনো শারীরিক সমস্যা নেই। কিন্তু, কোনো কারণে আপনার মানসিক সমস্যা শারীরিক সমস্যার চেয়ে বৃহৎ। মানসিক অস্থিতিশীলতাও তাই বেশি। এটা আপনাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আপনিই নিজের প্রকৃত চিকিৎসক।’

আমি তার কথা চুপচাপ শুনে যাই। আমার শ্রান্ত শরীরের পাশে সামরিন এসে বসে। তারপর আমার হাত ধরে বলে, ‘আমি আছি তোমার পাশে। তোমার কিছুই হবে না। চিন্তা করো না।’ আমি ভালোমানুষের মতো মাথা নাড়ি। যেন আমি জগতের সবকিছুই মেনে নিতে পারি। আমি সবই পারি। সেদিন বিকেলেই আমার মোবাইলফোনে আরেক সামরিনের কল আসে। সে কঠিন স্বরে বলে, ‘আজই তোমাকে ডিভোর্সের কাগজ পাঠাব ভেবেছিলাম। পরে জানতে পারলাম হাসপাতালে আছ। কাল দেখতে আসব। সুস্থ হয়েই কাগজে সই করে দিও।’

এরপর সন্ধ্যাবেলা মোবাইলফোনে তৃতীয় সামরিনের মেসেজ আসে, ‘বড় আপার কাছ থেকে তোমার অসুস্থতার খবর পেলাম। অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে আছি। ফিরে এসে দেখা করব। গেট ওয়েল সুন।’

এই মেসেজটা পড়ে আমি মোবাইলফোনটা একেবারেই বন্ধ করে দেই। চোখ বন্ধ করে বহুক্ষণ পড়ে থাকি। হাসপাতালের ফিনাইল আর ওষুধের ঘ্রাণে আমার কেমন ঝিম ঝিম করতে থাকে। মস্তিষ্কে স্মৃতির রেলগাড়ি চলতে থাকে অনবরত। যেন ওস্তাদ জাকির হোসেন বিশাল বড় মঞ্চে বসে লক্ষ শ্রোতার সামনে বসে তবলা বাজাচ্ছেন। আর সবার সঙ্গে আমিও তন্ময় হয়ে শুনছি। হাসপাতালের লম্বা করিডোরে মাঝে মাঝে হালকা পায়ে মানুষের হেঁটে যাওয়ার শব্দ ভেসে আসে। আমি কান পেতে শুনি। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই আমার কাছে অবাস্তব মনে হয়। সব স্মৃতি কে মনে হয় দুঃস্বপ্ন কিংবা কল্পনা। আকাশের আলো নিভু নিভু হতে হতে রাত নেমে আসলে আমার বড় অস্থির লাগতে থাকে। মনে হয় দূরে কোথাও পাতাঝরা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেখানে আমার ডাক পড়েছে। আমি দুর্বল কণ্ঠে আমার পাশে থাকা সামরিনকে ডাকি- ‘সামরিন, এই সামরিন।’ ও আমার সামনের চেয়ারে বসে বসে ঢুলছিল। ডাক শুনে সচকিত হয়ে উঠে এসে আমার বুকে পরম মমতায় হাত রাখে। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে? খুব খারাপ লাগছে?’

আমি মাথা নাড়ি। তারপর ক্ষীণভাবে বলি, ‘একটু বারান্দায় নিয়ে যাবে?’

বহুতল ভবনের হাসপাতাল। বারান্দার স্লাইডিং করা দরজাটা বন্ধই থাকে। সেখানে যাওয়া নিষেধ। তবু সামরিন আমাকে নিয়ে ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। কাচ সরিয়ে দুজনে মিলে বারান্দায় দাঁড়াই। মাথাটা একটু ঘুরে ওঠে আমার। নিজেকে সামলে নিতে চেষ্টা করি। মরিচাবাতির মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোয় জ্বলজ্বল করছে শহরটা। আর অন্যদিকে অল্প অল্প করে দীপ্তিময় হচ্ছে আকাশ। আমার প্রিয়মানুষ সামরিন, তার গা থেকে কেমন যেন চাঁপাফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসে। আমি নিজের দুর্বল ও শীর্ণ হাতে ওর হাতটা চেপে ধরি। কোথাও কিছু একটা যেন ঘটে যায়। আমার ভেতর কোনো ভয় থাকে না। উৎকণ্ঠা থাকে না। বরং শীতের সকালে রোদ ছোঁয়ার মতো আনন্দ জেগে ওঠে।

আমার মনে হয় যে পৃথিবীতে সামরিন আছে, সে পৃথিবী সুন্দর। যেখানে একাধিক সামরিন আছে সেই পৃথিবী আরও বেশি সুন্দর। অসহ্য সুন্দর। সেই অসহ্য সুন্দর পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আমি ভাবতে থাকি এরপর কি এমন কোনোদিন আসবে, যেদিন থেকে আমি শত শত সামরিনকে দেখতে পাব? দেখব রাজপথে হেঁটে যাচ্ছে অজস্র সামরিন। আকাশে মেঘ হয়ে উড়ে যাচ্ছে সে, কিংবা শহরের সব পাখির মুখ হয়ে গেছে ওর মতো। গাছদের ডাল হয়ে উঠেছে ওর হাত, কিংবা সব জানালার কাচে ওর মুখশ্রীর গ্রাফিতি! এত সামরিনের মাঝে অন্তত কেউ একজন একান্ত আমার হয়ে থাকবে তো? যদি না থাকে? আমি আর ভাবতে চাই না। অজানা আশঙ্কা আর হিম হিম বাতাসে আমার গা কেমন যেন কেঁপে ওঠে। পাশ থেকে সামরিন কিছু একটা বলে, কিন্তু আমি কিছু শুনতে পারি না। ভাবতে পারি না। শুধু রাতের আকাশের পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি একটা হলুদ পাতার জীবন মিলিয়ে যাচ্ছে সুদূর আকাশে।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।