অন্যচোখে: যে পথে হাঁটেনি কেউ ॥ হুসাইন হানিফ | চিন্তাসূত্র
৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ | সকাল ৯:৩৮

অন্যচোখে: যে পথে হাঁটেনি কেউ ॥ হুসাইন হানিফ

প্রবেশপথ
অপারেশন সার্চলাইটের রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে যে লাশটা পড়ে থাকবে, সে হয়তো আমি, কিংবা আমার জননী; অথবা প্রিয়তম পিতা; অথবা স্নেহের ছোট ভাই, অথবা একমাত্র আদরের ছোট বোন, কিংবা ঠোঁটে তিল চিহ্ন আর হাতে নীলখামে গোপন চিঠি নিয়ে অপেক্ষারত ভালোবাসার মানুষটি: যেকেউ হতে পারে যুদ্ধের বলি, মূলত একটি লাশ; কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আর লাশের সামনে দাঁড়িয়ে আছে যে, কিংবা যে খুনি, সে আমি কিংবা তুমি অথবা সে; ঊনিশশ একাত্তর সালের পঁচিশে মার্চ রাতে আমরা সবাই, অথবা সে সময়ে বেঁচে থাকা যে কেউ পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে একটা ভয়ঙ্কর সময়ের চিহ্ন বয়ে নিয়ে হলেও হতে পারতাম চোখ ঠিকরে বেরিয়ে যাওয়া বা মগজ গলে চুইয়ে পড়া একেকটা বীভৎস লাশ। হতে পারতো জিঘাংসায় মানুষের রক্তপানে উল্লাসরত একেকটা খুনি, মানুষরূপী রাক্ষস, ভয়ঙ্কর দানব।

সেই সময়টাতে আমরা যদি বাঙালি হই অবধারিত রূপে আমাদের অবস্থান বিভক্ত হয়ে পড়বে একজন প্রতিবাদী অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে; সাধারণ জনগণের চেহারা নিয়ে, যারা মার খেয়ে যাবে দিনের পর দিন; অথবা এর সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থাৎ রাজাকার পরিচয়ে, যারা ধর্মান্ধতার আড়ালে কিংবা বিগত দিনে দেশের অর্থাৎ পাকিস্তানের জন্য নিজেদের আন্দোলন আর ভালোবাসার মোড়কে অথবা পরিস্থিতির শিকার হয়ে, অবশ্য এর সম্ভাবনা কম থাকলেও আছে যেহেতু বিরোধিতা করে যাবে একটা দেশের বিরুদ্ধে, যেটা স্বাধীন হতে চলেছ। একটা নতুন দিনের জন্য, যেটা ফলত অবশ্যম্ভাবী; আর শাসক শ্রেণী, শোষণ করে চলেছে যারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি, এভাবে এসব বিবিধ বিভক্তিতে দেশের মানুষ অবস্থানগত জটিলতায় পড়ে ভাগ হয়ে যায় যার যার পরিচয় নিয়ে। এই পরিচয়ের জটিলতাকে ভিন্নভাবে দেখার প্রয়াস অন্যচোখে।

অর্ভ্যথনাকক্ষ
মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে উপন্যাস লেখার শুরু বাংলায়, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে থেকেই; সেই ১৯৭১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কত শত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই বেরিয়েছে তার হিসাব করা শুধু কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভব। এতসব বই লেখা হয়ে গেলেও, যেটা বাদ ছিল, যে পথে হাঁটেনি কেউ। একজন আশান উজ জামানের জন্য অপেক্ষা করে ছিল যে পথ। পাকিস্তানিদের অর্থাৎ বিরুদ্ধশক্তির সচেতন মানুষদের দৃষ্টিতেও পাকিস্তানিদের নৃশংসতার বিরুদ্ধে বাঙালিদের যুদ্ধটাকে বৈধ শুধু নয় দায়িত্ব বলে দেখানো। আরও বিশদ করে বলতে গেলে সবাই প্রত্যাশা ছিল, কী করে ভিন্ন একটা পথ আবিষ্কার করা যায়, মুক্তিযুদ্ধটাকে, দেশের একজন হয়ে, আরও গুছিয়ে পরিপাটি করে কোনো কমতি না রেখে কিভাবে উপস্থাপন করা যায়, গতানুগতিক ধারায় না গিয়ে নতুন একটা ফর্ম আবিষ্কার করে উপন্যাস লেখা, এসবই ছিল দুঃসাধ্য; হয়তো ভেবে ছিল অনেকেই, কিন্তু সেই ভাবনা আকার পায়নি কারও হাতে। অপেক্ষায় ছিল কোনো এক দৈবের, যদিও দৈবে লেখা হয় না; তবু একটা সময়ের আগেই কেউ লিখতে চায়নি হয়তো; কিন্তু, আশান উজ জামান; না, দেরি করেননি কোনো দৈবের জন্য, ধার ধারেনি কোনো নিয়ম আর নিয়তিনির্ধারকের গৎবাঁধা নীতিকে; সব প্রচলনকে গুঁড়িয়ে দিয়ে সেই ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে ‘অন্যচোখে’ নিয়ে নিজের উপস্থিতির ঘোষণা করেন একজন আশান উজ জামান; তার ক্ষেত্রে এ বাক্য ভালোভাবে প্রযোজ্য- তিনি এলেন এবং মঞ্চ দখল করলেন।

এখানে বলে রাখা ভালো অন্যচোখে ‘শব্দঘর-অন্যপ্রকাশ-এর কথাশিল্পী-অন্বেষণ কার্যক্রম:১’ এর সেরা উপন্যাস হিসেবে মনোনীত হয়েছিল।

বিশেষ অতিথিদের ভাষণ
হাসান আজিজুল হক: আমি খুব আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি পড়লাম, তরুণদের লেখা সম্বন্ধে আশান্বিত হয়ে উঠলাম। এই উপন্যাসের বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু এ উপন্যাসে দেখা যাচ্ছে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল এবং পাক-হানাদারের সহযোগিতা করে আলবদর, আলশামস এবং রাজারকার ইত্যাদি আখ্যায় আখ্যায়িত হয়েছিল, মানুষ হিসেবে বিচার করতে গেলে তাদেরও সংসার-পরিবার-আত্মীয়স্বজন তার লেখায় উঠে এসেছে। তখন মনে হয় আমরা নকশিকাঁথার দিকটা এতদিন দেখে এসেছি, তার উল্টো দিকটা আমাদের চোখে পড়ে নেই। প্রকৃতপক্ষে শিল্পের জন্য যে-পরিপ্রেক্ষিত উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হবে তার একপেশে বিবরণে কোনো মহৎ শিল্পসৃষ্টি হতে পারে না। এই প্রথম আমরা লক্ষ করলাম, একজন তরুণ কথাশিল্পী মুক্তিযুদ্ধের এপিঠ-ওপিঠে আলো ফেলে প্রণিধানযোগ্য এক অগ্রসর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

জাকির তালুকদার: আপনার ছোট আয়তনের উপন্যাস অন্যচোখে আমি পাঠ করেছি। বোঝা যাচ্ছে যে, আপনি এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চিহ্নিত হলেও, আপনার এক ধরনের প্রস্তুতি আছে কথাসাহিত্যে কাজ করার। আপনি প্রস্তুত হয়ে এসেছেন। আপনার আখ্যান-বয়ন, শব্দ নিয়ে কারুকৃতি, চরিত্রগুলোকে স্বল্প আয়তনের মধ্যেই চরিত্র করে তোলার শক্তি দেখে বোঝা যায় লেখালেখি নিয়ে আপনি অনেকদিন ধরেই ভাবছেন এবং অনুশীলন করছেন।

আমরা সমকালের প্রচলিত চিন্তার পরিধির বাইরে যেতে ভয় পাই। কেননা মধ্যবিত্ত-মানস আর যাই হোক, চিন্তার বিপ্লবকে খুবই ভয় পায়। আমাদের ভাষার লেখকদের এক জায়গাতে আটকে থাকার পেছনের কারণও প্রধানত এটাই। যারা আমাদের সাহিত্যের মোগল, তারা নিজেরা যেহেতু এর বাইরের কোনোকিছু ধারণ করতে অক্ষম, তাই অন্য সবার ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে তারা চেষ্টা করেন সবাইকে বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়ার জন্য বাধ্য করতে।

কথাসাহিত্যের শক্তির গোড়ায় ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছে বিনোদন-চিন্তা। অনেক বড় বড় চেয়ারে বসে থাকা কথাসাহিত্যিক সাহিত্যকে বিনোদন বলেও মনে করেন। সভা-সমিতি-বেতার-টিভিতে বলেও থাকেন এই ধরনের কথা। আমি সবিনয়ে, কখনো দুর্বিনীতভাবে, তাদের প্রতিবাদ করি। বিনোদন নয়, শব্দটি হতে পারে আনন্দ। ব্রহ্মস্বাদ সহোদরম। আপনার উপন্যাসটি পড়ে মনে হয়েছে আপনি আনন্দ আর বিনোদন এর পার্থক্য বোঝেন। এটাই আপনার প্রধান শক্তি।

মোহিত কামাল: উপন্যাসের উপজীব্য বিষয় বাঙালির গাঢ় রক্তে রাঙানো মুক্তিযুদ্ধ। আখ্যানটি মাথা তুলেছে লাশের স্তূপ থেকে। সেই স্তূপ, যার ওপর ভর দিয়ে পর-সকালেই উদিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার সূর্য। সেই সূর্যের সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে গেছে কাহিনী। ষোলোই ডিসেম্বরের উদ্দেশ্যে। এর চরিত্র হয়েছে মরণপণ স্বাধীনতাকামী বাঙালির দুর্দশা, লোমহর্ষক নারীধর্ষণ, মৃত্যু, সাহস, ঘুরে দাঁড়ানো, কারও কারও কাপুরুষতা আর পাকিজন্তুদের তাণ্ডবসহ মুক্তিযুদ্ধ স্বয়ং। বাতাসে বাতাসে অত্যাচারের আগুন। আগুনের মুখে আর্তনাদের ধোঁয়া। ধোঁয়ার গায়ে মৃত্যুর ঘ্রাণ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সব অস্থিরতা নিয়ে সে-সময়ের উদ্বাস্তু বাংলাদেশ যেন রূপ পেয়েছে উপন্যাসটির অবয়বে।

হামীম কামরুল হক: আশান মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস লিখেছেন এটা বলার চেয়ে বলা দরকার তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিষয় নিয়ে ঔপন্যাসিক হিসেবে তার যাত্রা শুরু করেছেন। অন্য আরও বিষয় দিয়েও সেটি হতে পারত। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের কোনো রকম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকার পরও তার এই উপন্যাস পড়লেই মুক্তিযুদ্ধের সময়কার প্রাকৃতিক, সামাজিক ও মনোজাগতিক জগৎ জেগে ওঠে না কি? বলা যেতে পারে, উপন্যাসের গদ্য বা ভাষায় তার ততটা দক্ষতা এখনো আসেনি, যখন বলা যেতে পারে, সেই ভাষাকে তিনি উদাত্ত, উন্মুক্ত ও উন্মাদ করে দিলেও উপন্যাসের কোথাও কোনো ভারসাম্য হারাবেন না, সেই পর্যায়ে তিনি উঠে আসেননি। অর্থাৎ তার ভাষাগত দক্ষতা এখানে সর্বত্র তাল সামলাতে পারেনি।

ধন্যবাদান্তে
এখানে সবাই উপন্যাসটির ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। শুধু একজন বিশেষ অতিথির ব্যাপারে আমরা সেটা বলতে পারব না, ব্যাপারটা সেরকম না; তবে তিনি ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছেন, সঙ্গে তার যে নেতিবাচক দিক, সেটাও তুলে ধরতে ভুলে যাননি। এদিক থেকে হামীম কামরুল হক প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। কেননা, সাহিত্যের পর্যালোচনা সব দিক থেকেই তার ওপর আলো ফেলার কথা বলে। তবে তিনি যে নেতিবাচক দিক বা গদ্য নিয়ে বা ভাষাগত অদক্ষতার কথা বলেছেন, সে বিষয়টা আমাদের ভেবে দেখতে হবে। ব্যাপারটাকে যদিও আমি একটু আগে ব্যাখ্যা করেছি, ভাষাগত উন্মুক্ততা বা উদাত্ততা, সেটা আরেকটু ভালো করে বলতে হবে। আমরা যারা সচেতন পাঠক তাদের এ কথা অজানা নয় যে রাবীন্দ্রিক গদ্য, ট্রাডিশনাল গদ্য, হুমায়ূনীয় গদ্য, জহিরীয় গদ্য, ইলিয়াসীয় গদ্য আরও বিবিধ সব গদ্য-ধারা বিদ্যমান। এইসব গদ্য ধারার কোনোটার সঙ্গে আশান উজ জামানের গদ্য মিলছে কি না? যদি না মিলে থাকে তবে তো আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতেই হয় যে সে আসলে এই সমস্ত ধারার বিপরীতে গিয়ে স্বতন্ত্র একটা ধারা গড়তে চেয়েছে। এই ধারা গড়তে গিয়ে সে সফল না ব্যর্থ, সফল যে তা বলার অপেক্ষা রাখে না, সেই প্রশ্নে না গিয়ে আমাদের ভাবা উচিত হামীম কামরুল হকের তোলা প্রশ্নটি নিয়ে। ভাষাটাকে যদি উদার উন্মুক্ত করা হত তবু তার ‘ভারসাম্য’ হারাবে না; তার মানে কি এই নয় যে, ভারসাম্য এখনো ঠিক আছে; তবে যদি তিনি অন্যভাবেও লিখতেন তবে সেটাও সম্ভব হতো বলে মনে হয়। আমাদের জানা কথা, যেকোনো সফল শিল্পকর্ম তখনই সফলতার দাবি করে, যখন সে আরও দশটা ভাবের জন্ম দেয়; তার আরও সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়। এখন আমরা হামীম কামরুল হকের প্রশ্নের আলোকে এ কথা বলতেই পারি, সে দিক থেকেও ‘অন্যচোখে’ সফল একটি শিল্পকর্ম।

ভাষাগত যোগ্যতায় উঠে এসেছেন কি না, সেই ব্যাপারটাও ভেবে দেখা দরকার। একটা কাজ যদি কেউ দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে, আরেকটা যে সে পারবে না সেটা কিন্তু না। অর্থাৎ দাঁড়িয়ে যে আছে সে বসতে পারবে ঠিক; তবে বসে যে আছে, সে যে দাঁড়াতে পারবে না, এমন বলা যাবে না। যার যার অবস্থান নিয়ে সে থাকবে। কেউ জোরে চললে তাকে তার মতো চলতে দাও; কেউ আস্তে চলে আনন্দ পেলে, তাকে আস্তে চলতে দাও। যে যেতে রাজি নয়, তাকে থাকতে দাও। মোট কথা ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’। সে কেমন হবে না হবে সেটা তার ব্যাপার। সে যে অমন হতে পারবে না, তা না; হতে পারবে বলেই যে তাকে অমনটাই হতে হবে, এমন তো না।

আর ‘অন্যচোখে’ উপন্যাসটির যেকোনো জায়গা থেকে এক স্তবক টেনে নিয়ে যদি শুধু দাঁড়িগুলো তুলে দেওয়া যায় তাতেই বোঝা যাবে বাক্যের গতি বা ভাষাগত উদারতা আছে কি না: ‘আমাদের বাঁওড়ের তলায় নাকি একটা দেশ ছিল, সোনার দেশ: ঘরবাড়ি দালানকোঠা সবই সোনার; সেদেশের লোকজন খুবই ভালো আর দয়ালু আর উপকারী: চাইলেই তারা মানুষকে সাহায্য করত; তবে চাইতে হতো কায়দা করে: যেমন কেউ হয়তো খুব গরিব, মেয়ের বিয়ে দিতে পারছে না বা চিকিৎসা করাতে পারছে না বা ঘরবাড়ি নেই কোথায় কোথায় থাকে; সে যদি সাহায্য নিতে চায়, তাহলে তাকে বাঁওড় কান্দায় গাব গাছটার নিচে যেতে হবে সন্ধ্যার সময়, পুবদিকে মুখ করে চোখ বুজে দাঁড়াতে হবে; তারপর প্রয়োজনটা বলতে হবে, মুখ ফুটে না মনে মনে; অনুরোধ করতে হবে সোনার দেশের রাজার কাছে; লোকটা যদি লোভে পড়ে মিথ্যেমিথ্যি ওসব চায়, তাহলে পাবে না; কিন্তু সত্যিই যদি তার দরকার হয়, তা হলে যখন সে গোসল করতে যাবে, বা মাছ ধরতে বা কাপড় কাচতে, দেখা যাবে তার পায়ে একটা আংটি এসে ঠেকল বা বালা বা নোলক- এগুলো হলো দান- ফেরত দিতে হবে না; শুধু ধন্যবাদ দিলেই হবে।’

খাদ্য-তালিকা
১. সংক্রান্তি
২. জন্মদিন
৩. দাবানল
৪. শরণ
৫. মুক্তি
৬. বৈঠা
৭. গুলতি
৮. ঘুম
৯. যুদ্ধ
১০. ঘৃণা
১১. বিজয়
১২. পতাকা

রেসিপি
উপন্যাসটি যে ধারায় তৈরি হয়েছে, তা আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে। এই ধারাটি বাংলা ভাষায় প্রথম। প্রথম বলেই অনেকেই অস্বীকার করার মওকা পেয়ে গেছেন একে উপন্যাস না বলার। আমাদের চোখে পড়েছে একে গল্পের বই বলে দাবি করার চেষ্টা।

আমরা একে উপন্যাস হিসেবেই মেনে নেব। উপন্যাসের গল্পগুলো একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করে এগিয়ে গেছে নিজেদের লক্ষ্যে। মাঝে মধ্যে একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হলেও, শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন। তবে তাদের সবার ভেতর যে মিলটা পাওয়া যায় তা যুদ্ধ। অর্থাৎ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এদের সবার আনাগোনা। ব্যাপারটা যেন সৌরজগতের মতো। সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে অন্য সব গ্রহ নক্ষত্র। অবশ্য সূর্যও ঘুরছে। অর্থাৎ যার যার কক্ষপথ ঠিক রেখে তারা নিজেদের মতো করে ঘুরছে। সব মিলিয়ে যেন একটা সংসার। পরিবারের প্রধান কর্তাকে মান্য করে চলে অন্য সব সদস্য। অন্য সদস্যদের উপেক্ষা করে প্রধান তার কার্য পরিচালনা করতে পারবেন না।

এখানে সময়টা বুঝে নেওয়া গেলেও স্থানের ব্যাপারে মাথা খাটানো ছাড়া উপায় নেই। গল্পগুলোর ব্যবহারিক আঞ্চলিক ভাষার সাহায্যে অনুমান করে নেওয়া যেতে পারে কে কোথায় আছে, বা গল্পটি মূলত কোথায় ঘটিত।

২২ মে ‘ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার ২০১৮’ পুরস্কার পেয়েছেন পোলিশ কথাসাহিত্যক ওগলা তোকারচুক। তিনি নিজের উপন্যাসের ব্যাপারে বলতে গিয়ে এই কথাগুলো যখন বলেন তখন কি আমাদের অন্যচোখের কথা মনে পড়ে না?- ‘উপন্যাসটির ফর্ম বা ধারার কারণেই বিচারকেরা একে বেশি পছন্দ করেছেন। পুরো উপন্যাস খণ্ড খণ্ড অংশ, গল্প বলায় কোনো ধারাবাহিকতা নেই, চরিত্রগুলোর সবারই একটা তাড়া নিজ নিজ অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার বিষয়ে। উপন্যাসের গল্পগুলো গতি ভালোবাসে, স্থিতি নয়। তাই আমি ফ্লাইটসকে বলি ‘নক্ষত্রমণ্ডল উপন্যাস’। এতে আমি বিভিন্ন জনের ভিন্ন ভিন্ন গল্প একটি কক্ষপথে ছুড়ে দিয়েছি। এবং সেগুলো কুণ্ডলী পেকে একটা উপন্যাসে রূপ নিয়েছে। গল্পগুলো আলাদা আলাদা; কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না চরিত্রদের সবাই অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে বদ্ধপরিকর। এই একমাত্র মিল গল্পগুলোকে উপন্যাসে পরিণত করেছে।’

আর মনে পড়ে বলেই যে তিনি ওটার প্রভাবেই এমনটা লিখেছেন, যেহেতু আমাদের অনেকের ভেতর প্রভাব খোঁজার একটা বাতিক আছে, পুরস্কার পাওয়ার ১০ বছর আগেই যেহেতু উপন্যাসটি রচিত, সেহেতু কেউ ভাবতেই পারেন- ব্যাপারটা এমন ভাবা যাচ্ছে না; কেননা, পুরস্কার পাওয়ার আগে সেটা বাংলাদেশে কারও কাছে এসেছে এটা প্রায় অবিশ্বাস্য না হলেও, ইন্টারনেটের যুগ যেহেতু, এসেছিলই যে তা হলফ করে বলা যাচ্ছে না; আর তাছাড়া ওটা তখন মূল ভাষা পোলিশেই ছিল, অনুবাদ হয়নি; অনুবাদ হলো এই সেদিন; আশান উজ জামান সেই ভাষা জানেন কি না, সেটাও আমাদের জানা নেই; আর যদি জেনেই থাকেন, সেটাও আমাদের জন্য মঙ্গল বৈ নয়; কেননা, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ লেখাগুলোর সঙ্গে পরিচিত এত জানাশোনা, এবং বিশ্বমানের লেখা উপহার দেওয়া একজন লেখকও আমাদের বাংলাভাষায় আছে এটাও একটা বিস্ময়েরই ব্যাপার।

ভোজনপর্ব
এযাবৎ, খেয়াল করে দেখলে, সচেতন দুয়েকজন লেখক: মাহমুদুল হক ও রশীদ করিমসহ আরও কয়েকজনের নাম নেওয়া যেতে পারে। তারা বাদে, প্রায় সবাই যুদ্ধের সংখ্যার হিসাব নিয়ে ব্যস্ত হয়েছেন, যুদ্ধের ছবি আঁকতে গিয়ে সেখানে ধরা পড়েছে অনুদান পাওয়ার কাঙালিপনা; কিন্তু ‘অন্যচোখে’ সংখ্যার হিসাব নয়, আশান দেখাতে চেয়েছেন জীবনের যন্ত্রণা। একটা জীবন কী ভীষণরকম যন্ত্রণাকাতর হয়ে পড়ে যুদ্ধের বলি হলে; তখন সেই একটা জীবননাশও সমর্থন করা অসম্ভব, আর তো এক দুই নয় ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণের কথা।

প্রত্যেকটা চরিত্রের বর্ণনা আর কাহিনী খুবই স্পর্শকাতর, ভয় ধরানো, মায়াজাগানো, ঘুম কাড়িয়ে নেওয়ার মতো ভয়ঙ্কর। উপন্যাসটাকে ব্যাখ্যা করতে গেলে এর প্রতিটা চরিত্র নিয়েই আলোচনা করতে হবে। কারণ, এখানে কোনো চরিত্রই মুখ্য নয়; আবার কোনো চরিত্রই নয় গৌণ। নায়ক বা ভিলেন বলে আলাদা কারও কোনো জায়গা এখানে নেই। জীবনের প্রয়োজনে মানুষ কত কীই না করে; চুরি করে হলেও পরিবারের দায়িত্ব পালন করে চোর; এখানে একদিকে তার অপরাধ অপর দিকে তার ভালোবাসা। এটা বলা মূখ্য নয় যে অপরাধ কোনো ব্যাপার না; মূলত এইসব জীবনেরই অংশ। নিষ্ঠুরতা, যৌনতা, অপরাধপ্রবণতা; এগুলো মানুষের স্বভাবজাত; কিন্তু এগুলো যখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তখন অন্যসব মানুষ, যারা নিজেরাও এইগুলো দ্বারা চালিত। তারাও প্রতিবাদ না করে পারে না। সবকিছুর একটা সীমা আছে। সেই সীমাটা হচ্ছে বিবেক। সেই বিবেক ধরে টান মারার দক্ষতা আশান উজ জামানের আছে। এখানে প্রত্যেকটা গল্প বিবেককে দংশন করে ছাড়ে। গল্প বলার দক্ষতা, চরিত্রচিত্রণের পারঙ্গমতা, শব্দ-প্রয়োগের সিদ্ধহস্ততা আর ভাষার কারুকার্য নিয়ে যে কুশলতা তিনি দেখিয়েছেন সেটা বলে আর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না; বড়রা আগেই বলেছেন এসব।

বিদায়ের আগে
তবে একটা ব্যাপারে কথা না বললেই নয়: আশান উজ জামান তার ‘অন্যচোখে’ মনের ভাব প্রকাশের জন্য মাঝেমধ্যে গালি ব্যবহার করেছেন। এটা যদিও বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঠিক ধরে নেওয়া যায়, তবু আমাদের বলতে ইচ্ছে করে, তিনি এই ব্যাপারটা না করলেও করতে পারতেন। পাকিজন্তু, হায়েনার দল, এইসব শব্দ ব্যবহার পুরোপুরি ঠিক; তবে এগুলো এড়িয়ে যদি তিনি চলতে পারতেন, তবে যে সোনায় সোহাগা হতো সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, তিনি লেখক; তার কাজ বর্ণনা করা, যেই সময়ের জঘন্যরকম ঘটনাবলি এসে গেছে, সেগুলো পাঠক পড়ে আপনাতেই গালি দিয়ে উঠবে, লেখকের আলাদা গালি দেওয়ার দরকার নেই।

বাহিরপথ
সচেতন লেখকরা সবাই যখন একটা বৃত্তের ভেতর ঢোকার চেষ্টা করছে, যদিও তারা মনে করছে ভিন্ন কিছুই তারা করছে, কিন্তু ফল যা আসছে, তা থেকে এটাই প্রমাণিত, তাদের প্রত্যেকের চেষ্টাই একটা বৃত্ত তৈরি করছে, সেই বৃত্তে সবাই ঘুরে চলেছে সমান তালে; কিন্তু আশান উজ জামান বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন সেই বৃত্ত থেকে। নিজের জন্য আলাদা বসত তৈরি করে নিয়েছেন, স্বতন্ত্র ভাষা, আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি; যেটা মূলত সিরিয়াস লেখকদের বৈশিষ্ট্য, সেটা আশান উজ জামানের আছে। এই আলাদা জিনিস বা নতুন ব্যাপারটাকে মেনে নেওয়ার মতো মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

আর উপন্যাসের শেষ বাক্য দু‘টি আমাদের লক্ষ করতে হবে। ‘যুদ্ধ শেষ হয়নি। হয় না।’ যুদ্ধ শেষ হয়েও কেন শেষ হয়নি; বা হয় না; তা কি এ জন্য যে, সমস্ত বিপ্লবই এক সময় গার্হস্থ্যের দিকে মোড় নেয়? তার ব্যাখ্যা আমরা আশান উজ জামানের কাছেই জানতে চাইব। আরেকটি অভিনব রচনা দিয়েই যেন তিনি এই প্রশ্নের বা তার নিজের বলা কথার ব্যাখ্যা দেন।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


২ Responses to “অন্যচোখে: যে পথে হাঁটেনি কেউ ॥ হুসাইন হানিফ”

  1. কামাল আহসান
    জুলাই ২১, ২০১৮ at ৯:২৭ অপরাহ্ণ #

    শুভেচ্ছা

    • হুসাইন হানিফ
      অক্টোবর ১, ২০১৮ at ১২:২৭ অপরাহ্ণ #

      ধন্যবাদ।

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন


webcams Etudiantes Live Jasmin Forester Theme