বিশল্যকরণী-৮॥ রঞ্জনা বিশ্বাস | চিন্তাসূত্র
১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৮ মে, ২০১৮ | সকাল ১১:০৮

বিশল্যকরণী-৮॥ রঞ্জনা বিশ্বাস

॥পর্ব-আট॥
আবেগ মরে এলে ঝণ্টু মাল বলে, তোর মায় বাঁইচ্যা থাকলি সইতে পাতো ক? ঝণ্টু মালের নাতির কাম মানতে পারবো কোন সোমাজ। আর কেউভি করলে মানতাম। সইতো। আজ সই কেমনে? তোর মামুর মুহের দিক চাওন যায় না। খলিল জানে কত্ত বড় ভুলডা সে করছে। সমস্ত বাইদ্যা কুলের কলঙ্ক হইয়া গেছে।  তুই জানস না বাইদ্যার একটা নেয়ম আছে? জানস নাতি? নূহ-নবীর আমল থিকা এইডা মাইনা আইছে বাইদ্যারা। তামাম দুনিয়াডায় যখন আল্লার গজব নামলো, তখন নূহ নবীর নৌকায় ঠাঁই নিয়েছিল দুনিয়ার তামাম জেব-জানোয়ারের জোড়া। নৌকার খোলের জলে ছিল জোড়া গোখরা, জোড়া দাঁড়াশ, জোড়া লাউলতা। গড়ুর পাখিও ছিলো নৌকায়। কেউ কাউরে আঁচড়া পর্যন্ত কাটে নাই। একটানা চল্লিশ দিন চল্লিশ রইত শত্তুর মিত্তর ভুইলা সব তারা এক হইয়া ছিল। আর তুই কী করলি? জামা ঘইষা দিলি? তেঁতে ওঠে ঝণ্টু মাল। খলিল জানে বাইদ্যার কড়ির চায়া নেয়মের দাম বেশি। খলিল বলে, জানি নানা। অপরাধ করছি মাপ চাই না। তাইলে সাজা দিস নানা। সোমাজ থেইকা খেদাইস না। এর চায়া তু বিষ দিস্ নান। খাই মরবু। শেষের দিকে খলিলের গলা কেমন ধরে আসে। ঝণ্টু মাল খলিলের কাঁধে হাত রাখে।

ঝণ্টু মাল বোঝে সাজার চায়া অনেক বেশি সাজা সে পাচ্ছে। কিন্তু পঞ্চায়েতের দাম খি? সে খলিলকে পালিয়ে যেতেও বলতে পারছে না। লাভ কী? কোনো বাইদ্যা দলে ঠাঁই নাই যে ঠাঁই দেবেতার সর্দারী যাবে। আইন অমান্য করার জন্য তারও সাজা হবে। ঝণ্টু মাল ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে কেবল। মালতী নানা শ্বশুরের কাছ থেকে কোনো আশার বাণী না পেয়ে ফিরে আসে নৌকায়। মেয়েটা ঘুমোচ্ছে। নৌকার গলুইয়ে বসে সে পা ডুবিয়ে দেয় চন্দনার জলে। চন্দনার পাক খাওয়া জলের মতো বুকের মধ্যে কী যেন পাঁক খায় মালতীর। কত  বছরের সংসার তার। কোনোদিন চড়া গলায় কথা কয় নাই। সে দিন যে তার কী যে হলো বুঝতে পারে না মালতী। যা হওয়ার হয়েছে তাই বলে কি এত বড় শাস্তি হবে তার? এই প্রথম মালতীর মনে হয় সমাজ বড় নিষ্ঠুর । নিষ্ঠুর তার নিয়ম। কই সে তো খলিলের বিরুদ্ধে কোনো নালিশ করে নাই সমাজের কাছে। একবারও তো সে কাউকে বলে নাই খলিল যা করছে তা অন্যায়। এর বিচার চাই। তাহলে সমাজের অত দায় কেন? নানার কাছে এই কথা বলতে চেয়েছিল মালতী। কিন্তু সাহসে কুলায় নাই। মালতী জানে, নানা যদিও বা নরম হয়, মামা হবে না। সোমাজ, নিয়ম এসব করেই সে দলের সর্দার। জান দেবেনিয়ম ভাঙবে না। চন্দনার জলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মালতী। মনে মনে বিপত্তারিণীর নাম নেয়। মা বিষহরির নাম নেয়। কপালে হাত ঠেকায়, মা মনসা রক্ষা করো মা, রক্ষা করো সব। মালতী আশ্বস্ত হতে চায় কিন্তু পারে না। সত্যি সাত্য কি মা মনসা পারবে খলিলকে বাঁচাতে? অবিশ্বাস এসে হাজির হয় মালতীর মনে। বাইদ্যারা চিরকালই অসিহিষ্ণু জাত।  ধৈর্য নেই।  প্যাটে পাথর বেঁধে রাখার বেলায় ধৈর্য আর কোনো সোময় তার ধৈর্য নাই।

মনে মনে হাসে মালতী চোখ মোছে—মারে অবিশ্বাস লয়। তোরও কি ধৈর্য ছিলো মা! আমারও নাই তোর লাহান। আঙর ক্ষেমতা থাকলে, আঙ কি হাঁসফাঁস করতাম। আঙও নেয়মের ঘরে ছেদা বানাইতাম, ছেদা বানাইতাম মা।  হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে মালতী।  চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা লোনা জল পড়তে থাকে চন্দনার জলে। কান্নার বেগ কমে এলে এক আজলা জল তুলে সে মুখ ধোয়। দ্বিতীয় আজলা জল তুলতে গিয়েই তার মনে হয়, জলের অতল থেকে একটা শিশুমুখ হাসছে। সবুজ তার গায়ের বরণ। সে হাসতে হাসতে উঠে আসছে খলিলকে কোলে নিয়ে। স্যাৎ করে সে দু’পা নৌকায় তোলে। বাবা গো, রক্ষা কর তোর ছোয়াল ডারে রক্ষা কর। অমন কইরে তোর কোলে ঠাঁই দিস্ বাবা। মালতী খোয়াজ খিজিরের নাম নেয়। তবু মালতীর স্বস্তি আসে না। শ্মশান খোলায় শিয়াল ডেকে উঠলে মালতী তাতে অশুভ কিছুর ইঙ্গিত পায় খলিল এখনো কোঠিতে আসল না।  অন্যদিন সন্ধ্যা না হতেই কোঠিতে এসে পড়ে আর ঘুমের মেয়েটাকে খুচিয়ে খুচিয়ে জাগিয়ে তোলে।  মেয়ে ঘুম ভাঙানোর অপরাধে বাপকে কোনো শাস্তি দেয় না। সে বরং বাপের সঙ্গে হাসে। হাত পা ছুড়ে কথা কয়, আ-অ। খলিল কোলে তুলে নিয়ে টোপা গালে আদর করে, ও আমার নাগ কইন্যারে ও আমার হাপের ছাও। তুমি কী হইবা চাও? ভানুমতি রানি হবা বুঝবার পারছাও? শিশুটির নগ্ন পেটে মাথা দিয়ে সুরসুরি দিলে খিলখিল করে হেসে ওঠে সে।

খলিলের কাব্য করার গুণ অমরপুরের তামাম বাইদ্যারা জানে। কাব্য করার গুণে হোক আর ঝণ্টু মালের নাতি বা বিষু মান্তার ভাগ্নে বলেই হোক, খলিলের প্রতি বাইদ্যাদের আলাদা দরদ আছে। কিন্তু সোমাজের নেয়মের বেলায় সে কথা খাটে না। এজন্যই মালতী ভরসা পায় না। শেষমেশ সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবে, যা হওয়ার হউক, খলিল দলত্যাগী হলে সেও না হয় যাবে খলিলের লগে। গলুই ছেড়ে এবার সে ভেতরে যায়। মেয়েটা ঘুমে কাদা। কাত হয়ে একটা পা সে তুলে দিয়েছে মইয়ালের ঝাঁপিতে আর একটা হাত বীণাবাঁশির ওপর। মালতী মেয়ের কোঁকড়া কোঁকড়া ছোট চুলের মধ্যে হাত বোলায়।  শাড়ির অঁচলটা দিয়ে ঘামেভেজা গলার পাশটা মুছে দেয়। তারপর শুয়ে পড়ে মেয়েটার পাশে। একটু দূরে, মাঠের ওপাশ থেকে খাটাশের ডাক ভেসে আসে। একটা নয় জোড়া খাটাশ ডাকছে। মালতীর কোনো ভাবান্তর হয় না। ঠিক এ সময় নৌকাটা একটু দুলে ওঠে। খলিল এসে কোঠিতে ওঠে।

চলবে…

বিশল্যকরণী-৭॥ রঞ্জনা বিশ্বাস

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন