বিশল্যকরণী-৫॥ রঞ্জনা বিশ্বাস | চিন্তাসূত্র
২ ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৭ আগস্ট, ২০১৮ | রাত ১১:৩৯

বিশল্যকরণী-৫॥ রঞ্জনা বিশ্বাস

॥পাঁচ॥
কুশনির জন্য হৃদয় পেতেছে বিষু মন্তার বড় ভাই পো। সে ডুকনিমাকে বিষয়টা জানিয়েছেও। ডুকনি যতবার কথাটা তুলতে গেছে ততবার কুশনি ফণা তোলা সাপের মতো ফোঁস করে উটেছে। নাকের নথ নেড়ে সে পাঁচ কথা শুনিয়ে দেয়েছে। কিন্তু তাতে কি, নলুয়াকে দেখলে কুশনির যে ভালো লাগে না তা নয়।  দেখতে শুনতে খারাপ নয় কিন্তু রহমালীর মতো অত কী? তার ওপর ছোক্ ছোক্ করা পুরুষ মানুষ কুশনির পছন্দ নয়। অকারণে গড়া ঘেঁসে দাঁড়ানো ভাকুজল কেয়ে আর কারো নয় ঠিক কুশনির কোঠির সামনে এসে মাতালামো করা, এসব পছন্দ নয় কুশনির। সে সাফ জানিয়ে দেয় ডুকনি বুড়িকে। সাত জন্মের পুণ্যি যে নলুয়া তোরে পছন্দ করে। দ্বিগুণ ঝাঁঝের সঙ্গে কুশনি বলে, দ্যাখ বুড়িমা, এক খন্দর দিলে তু ক্যা তামাম বাদ্যারা আমার পুণ্যির হিসেব করবে বুঝলি। নে নে আর কানি বিয়াইস না। পথ ছাড়। ডুকনি মুখে মেঘ ঘানায়। সে কি সোমাজ খোয়াবার শঙ্কায় না কি নলুয়ার একশ টাকা ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কায়, ঠিক বোঝা যায় না। নদীর প্রথম বাঁকটা যেখানে মনা মাঝির আউশ খেতের পাশে লম্বা লম্বা ধইঞ্চাগুলো আকাশ ছোঁয়ার সাধে বেড়ে উঠেছে, তার কাছে প্রকাণ্ড একটা বটগাছ।  সেই বটগাছে বড় বড় শেকড় ছুঁয়ে চলে যায় চন্দনা। কুশনি এসে রহমালীকে সেখানে নিঃসঙ্গ বসে থাকতে দেখে। শতবর্ষী বটগাছের শরীরে চোখ বুলিয়ে নিয়ে ব্যস্ততার সুরে কুশনি ডাকে, ই বাবু, ঝলদি খেউল ঝলদি খেউল। রহমালী মুখ তুলে ডান দিকে তাকায়। চকচক করে ওঠে রহমালীর চোখ। রহমালী কুশনির কথা বুঝতে পারে না। সে হাতের ইশারায় কাছে ডাকে। বলে, এইখানে আয় কুশনি। কুশনির গলায় পরিষ্কার আতঙ্ক—না বাবু তুই ধার আও। মইয়াল জম্বাইবে। রহমালী এবার সত্যি সত্যি উঠে আসে। সাপে কামড়াবে এই ভয় কুশনিকে যেন ব্যাকুল করে তোলে। রহমালী হাসে, কুশনির থুতনি দুহাতে নিজের দিকে তুলে চোখে চোখে রাখে, বাইদ্যানীর সাপের ভয়? কুশনি লজ্জা পায়।  সাপের ভয় পায় বলে নয়। রহমালীকে নিয়ে একটু বেশি উদ্বেগ দেখিয়ে ফেলছে সে। দুজন পাশাপাশি হাঁটে একটুখানি সামনে এসে ঘাসের ওপর বসে। গতবারও সে এখানেই বসে ছিলো রহমালীর সাথে। বিশল্যাকরণী গাছগুলোর পশে। কুশনির নিংশ্বাস ঘন হয়ে আসে। রহমালীর দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারে না সে। কতু বাউদ্যার মেয়ে সে। লাজ-শরম খামুর বহ্নির মতো তার অত নয়। বুকের পাড় ভাঙতে শুরু করলে সে জানতে চায়, সে তাকে শাদী করতে রাজি কিনা?

রহমালী আগপাছ ভাবে না। সালমা ভাবীর মুখখানাও তার মনে আসে না। কুশনির গলায় কম দামি পুঁতিরমালা, কোমরের বিছা হাতভরা রঙবেরঙের কাঁচের চুড়ি। বাহুর বাজুবন্দ আর নাকের নোলক এই মুহূর্তে তাকে সিনেমায় দেখা রানির চেয়েও বেশি কিছু করে তুলেছে রহমালীর কাছে। ব্লাউজবিহীন নারীর শরীর রহমালীর পরিচিত। গায়ের বৃদ্ধা মহিলারা ব্লাউজ পরে না। কুশনিকে সে কিসের সঙ্গে তুলনা করবে ভেবে পায় না। শেষে মায়ের হাতে লাগানো লাউয়ের বীজ থেকে সদ্য বের হওয়া দুটি সবুজ পাতার লাউগাছের মতো মনে হয় কুশনিকে। কৃষকের ছেলে সে। লউ, কুমড়ো, তরমুজের বীজ থেকে বের হওয়া দ্বিপত্র দেখে রহমালীর এমনই উত্তেজনা হয়। সে আড় চোখে একবার কুশনির বাহুদুটোর দিকে তাকায়। দু’জনে যখন পরস্পরের উষ্ণতা অনুভবের চেষ্টা করছে ঠিক তখন পেছনে তিন চার জনের উপস্থিতি টের পায় ওরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কুশনির খোঁপায় হাত রাখে নলুয়া। হাসতে হাসতে খুলে দেয় খোঁপা। নলুয়ার সঙ্গীরাও হাসে। কুশনির মুখ নিমিষেই মলিন হয়ে যায়। পিঠময় কালো চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ে মেঘের অন্ধকার নিয়ে। সে দিকে তাকিয়ে রহমালী মুগ্ধ হয়ে যায়। দেবী প্রতিমার মতো মনে হতে থাকে কুশনিকে। নলুয়া সঙ্গীদের নিয়ে চলে যায়। ফুসতে থাকে কুশনি। রহমালী ফের কুশনির হাতে হাত রাখে। কুশনি হাত ছাড়িয়ে নেয়। আচমকা এই ব্যবহারের মানে বোঝে না রহমালী। শুধায়, ওরা তো চলে গেছে তাইলে মুখ ব্যাজার ক্যা কয়স? কুশনি স্বাভাবিক হতে পারে না। রহমালী আর একটু সাহসী হয়। কুশনির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। রহমালী শুনেছে বাইদ্যানীরা বেশ সস্তা হয়। কুশনির কাছে রহমালী ঠিক সাহস পায় না। তবু সে চেষ্টা করে আর একটু ঘনিষ্ঠ হতে। একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা রহমালীকে বিচলিত করে না। সে কুশনির নগ্ন বাহুতে হাত রাখে। কেঁপে ওঠে কুশনি। ঝাঁ করে উঠে দাঁড়ায়। বুকের ওঠা-নামা স্পষ্ট হয় রহমালীর চোখে। কিন্তু সে বোঝে না সে কি রাগে-ক্ষোভে না কি? কুশনি ঘুরে দাঁড়ায়। হাজার বছরের সংস্কার তাকে আটকে দেয়। রহমালী আর কুশনির মাঝখানে দেয়াল তুলে দেয়। রহমালী গুটিয়ে যায়। সেও উঠে দাঁড়ায়—কি হইলো বাদ্যানী?

নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখ তুলে তাকায় কুশনি। তা দেখে রোমাঞ্চিত হয় রহমালী। একটা উষ্ণ স্রোতধারা রক্তের মধ্য দিয়ে চন্দনার মতো নিম্নগামী হয়। ইচ্ছে হয় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কুশনিকে নিয়ে ডুব দেবে চন্দনায়। সাহসে কুলোয় না। বলে, শাদী করতে চাইছিলি তুই করবি আমারে শাদী? কথাটা শুনে টগবগ করে ফুটে ওঠে কুশনি। কিন্তু সে নিরুত্তাপ। চোখ বন্ধ করে সে নলুয়ার কথা ভাবে। নলুয়া…নলুয়া.. দুই কানে হাত দিয়ে সে রহমালীর সামনে থেকে দৌড়ে পালায়। তবে সালমা ভাবী বলেছিল, বাইদ্যাদের মন পাওয়া যায় না। তাই কি তবে ঠিক? বাইদ্যার হৃদয় থাকে হাতে! কুশনির এই পালিয়ে যাওয়াতে রহমালীর পৌরুষে ঘ লাগে। এ উপেক্ষা সে সহ্য করবে না কিছুতেই। কুশনিকে তার চাই-ই। সে সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিদিন কুশনির জন্য অপেক্ষা করবে এখানে। একদিন না একদিন আসবেই।  আর যদি সে আসে—ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ায় রহমালী। কুচফলের মতো লাল সূর্যটা বোঁটা খসা ফলের মতো সেই সময় টুক করে পড়ে যায় চন্দনার জলে। কুশনি নৌকায় এসে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে নলুয়ার মুখটা মনে আনার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয় সে। তার বদলে রহমালীর মুখটাই ভেসে ওঠে। কী করবে কুশনি এখন? একেই বাইদ্যা সোমাজে খামুরের সঙ্গে সম্পর্ক নিষিদ্ধ তার ওপর নলুয়া তার চুলের খোঁপা আলগা করে দিয়েছে। সাক্ষীও আছে তার।  তাহলে? কুশনির রাগ হয় নলুয়ার ওপর।  আমার ওপর অধিকার ফলাতে খেসপিয়েছে? শালা গোধরের ল্যালো, ছেছড়াকে পোদলী। গোখরা সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে থাকে কুশনির মায়ের সম্পর্ক ছিল মল্লরী মামার সাথে। কাউকে খারিজ করতে হলে প্রথম প্রস্তাবককে তার সাক্ষীসহ প্রেমিকের সামনে প্রেমিকার মাথার চুলের খোঁপা আলগা করে দিতে হয়। অর্থাৎ তাকে জানিয়ে দেওয়া যে, এই মেয়েটির ওপর আর কারও অধিকার টিকবে না। এর ওপর কেবল তার অধিকার। কুশনি হাতের কাঁচের চুড়ি এক এক করে খুলে ছুড়ে মেরেছিল নদীর জলে।

এতক্ষণে বেদে বহরের সবকটা নৌকায় কুশনিকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। কুশনি হাতের কাছে রাখা একটা সাপের ঝাঁপি নামায়। ঢাকনা তুলতে মাথা তুলে দাঁড়ায় গুমো। বাম হাতের তালুতে দুটুকরো করা কাগজ তুলে ধরে সাপের সামনে। দুলতে দুলতে সাপটা মাথা নিচু করে দ্বিখণ্ড জিভ ছঁয়ে যায় কাগজটি। তা তুলে নেয় কুশনি। বাঁজ খুলে সে খুশিতে ডগমগ হয়ে ওঠার পরিবর্তে বিরক্ত হয়। ধাম করে সাপের ঝাঁপটা বদ্ধ করে কোঠি ছেড়ে সে বের হয়ে আসে। ক্রুদ্ধ চোখে সে তাকায় নলুয়ার নৌকার দিকে। তারপর সে ধীর পায়ে এসে দাঁড়ায় নলুয়ার নৌকার সামনে। নৌকার ঝাঁপ নামানো। অর্থাৎ কেউ নেই সেখানে সে নৌকায় উঠে চারীদিকে তাকায়। তারপর ভেতরে ঢুকে পুরো নৌকাটা দেখে নেয়। আর পাঁচটা বেদে নৌকার মতোই এটা। সব নৌকার ছই গোলাকার আর সামনে ও পেছনের দিকে সরু। মাল বেদেদের নৌকার সামনে ও পেছনের গলুই কিছুটা উঠানো আর ছই নৌকার ওপরের ভাগে কিনারার দিকে বাঁধা থাকে। নলুয়ার নৌকাও তাই। নৌকার পাটাতনে শুয়ে পড়ে কুশনি। উবু হয়ে দু’পা ওপরে তুলে চন্দনার দিকে তাকায়।  এই সময় নৌকাটা একটু পেছনের দিকে নিচু হয়। টের পায় না কুশনি, সে অন্যচিন্তায় বিভোর। নৌকার ঝাপটা সরে গেলে বিস্মিত হয় নলুয়া। তার বুকের ভেতর মাদল বাজে—দাত্রা হিতা! দাং হিত্বা ঘেট্রিক।

চলবে…

বিশল্যকরণী-৪॥ রঞ্জনা বিশ্বাস

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন