চিঠি ॥ আহমাদ মুজাহিদ | চিন্তাসূত্র
২ ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৭ আগস্ট, ২০১৮ | রাত ১১:৩২

চিঠি ॥ আহমাদ মুজাহিদ

অনেকদিন হলো চিকেন বিরিয়ানি খাচ্ছেন, সাথে কোমল পানীয়ও দেওয়া হয়েছে।  তাই, এ মাসেই যদি মূল্যটা পরিশোধ করতেন, বড় উপকৃত হতাম। —কণ্ঠস্বরে বিনয় ও আভিজাত্যের একটা মোহনীয় ঝাঁজ টের পাওয়া গেলো। বিশেষ করে নব উদ্দীপনায় নির্মীয়মাণ শহরটির কেন্দ্রে অবস্থিত, প্রয়োজনীয় আলোহীন অবস্থায় পড়ে থাকা, ক্ষুদ্র বর্গাকার এই অঞ্চলটিতে, বর্তমানে এটিই চা ও অন্যান্য তরল পানীয়ের একমাত্র দোকান; অর্থাৎ যেখানটায় বসে আমি একটানা কয়েক কাপ চা নিয়মিতই পান করে থাকি; এবং অপরাহ্নের শেষভাগে যখন সূর্য কিছুটা নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে, এমন একটি সময় বেছে নেই প্রাত্যহিক বিরতি গ্রহণ করার সুযোগ হিসেবে।  সেখানে দিনের এই ক্ষুদ্র পরিসরে এরূপ কণ্ঠস্বরের অধিকারী মানুষের দেখা কখনো পাইনি—এটা স্পষ্ট করেই বলে দেওয়া যায়।

সেই সঙ্গে লক্ষ করলাম, গোলাকার একটি ঘড়ি; সময়ের সংখ্যাগুলো দামি লাল পাথরে বিন্যস্ত, বেশ বড় আকারের, তিনি ডান হাতে পরে আছেন।  বলা চলে দারুনভাবে সুকণ্ঠের অধিকারী এই ভদ্রলোক বেশ দৃঢ়ভাবেই সেই একই হাত ব্যবহার করে তার স্নিগ্ধ ও পাতলা চামড়া বিশিষ্ট গালের পুরো ক্ষেত্রজুড়ে মাঝারি আকারের একটা সেলফোনের দ্বারা প্রয়োজনীয় কথোপকথনটি চালিয়ে নিচ্ছিলেন। সঙ্গত কারণেই সে বস্তুটিও আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। বিদেশি কোনো মার্জিত ব্র্যান্ডের ফোন হবে হয়তো, অসাধারণভাবে মসৃণ ও চকচকে গায়ের রঙ, বেশ কিছুক্ষণ পরপর একটু নড়া-চড়াতেই শরীরের বিভিন্ন অংশ আলোর জেললা ছড়িয়ে দিচ্ছিল চারপাশে।

তারপর একটু নৈঃশব্দ্য; কোথাও কেউ অপ্রাপ্তির চিৎকার করে উঠলো; কথা শেষ হতেই আমার বিপরীতে উপবিষ্ট লোকটি কোনো এক মহান ভূমিকার সূত্রপাত করেছেন এ রকম শারীরিক ভঙ্গিসহ ফোনখানা টেবিলের ওপর আমার দিকেই ঠেলে দিলেন।  মনে হলো, তিনি ইচ্ছা করেই আমার মুখমণ্ডলের কাছাকাছি স্থানে পতনের ঘটনাটি ঘটালেন। যেনবা আমার দৃষ্টিশক্তির একটি অপূর্ব ব্যবহার করা গেলে তার কার্য সমাধা হবে। তিনিও হয়তো কোনো দুশ্চিন্তা থেকে সাময়িক মুক্তি পাবেন; অথবা ভুলে যেতে সক্ষম হবেন, গতবছর ঠিক এ সময়টাতেই তার বড় এবং মেঝো পুত্র আনন্দকর একটি নৌভ্রমণে অংশগ্রহণ করার সময় দুঃখজনক সমস্যাটি ঘটে যায়। এই ফোনই সেই অহিতকর মুহূর্তের সংবাদটি গ্রহণ করে।  ভীষণ ঝড় ও বজ্রপাতে মাঝনদীতে ডুবে যায় তাদের পুরো নৌবহর; দু’টি বিদ্যায়তনের ছেলে-মেয়েরা।

এভাবেই আমি আরও পরিষ্কার চিন্তা লাভের উদ্দেশ্যে যথেষ্ট সুখী মানুষটির হৃদয় ও তার নজরকাড়া ফোনের সঙ্গে মনসংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করছিলাম; তিনি কি নির্দিষ্টভাবে টের পেয়েছেন, আমি তার স্মৃতির পুরো কাঠামোয় খুব সহজেই আমার কতৃত্ব স্থাপন করেছি? না কি ইতোমধ্যে এই বস্তুটির প্রতি মানুষের কৌতূহলের বিশেষ অভ্যাসের গুণাবলি তার মধ্যে কিছুটা সচেতনতার সৃষ্টি করেছে যে, যারা তার সংস্পর্ষে আসবে, কণ্ঠস্বর শুনতে পাবে, কিংবা শারীরিক অবয়বটি দেখতে স্বক্ষম হবে প্রত্যেকেই একটি রহস্যময় খেলায় পরিণত হয়ে যায়।  এমনকি তার অতি প্রিয় ও সাময়িকভাবে অবহেলিত প্রয়োজনের অংশটিকেও লোকেরা কিছুটা উৎকর্ষ দেবে। সেইসঙ্গে আজীবন স্মরণে রাখবে—এমনতর ইচ্ছাই লালন করে থাকেন, সাধারণত।

তবে, কারও এমনতর ইচ্ছার মধ্যে প্রবেশ করার জন্যে কোনো সুনির্দিষ্ট সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়ার প্রয়োজন নেই বোধ হয়; একই কারণে আমিও তার অস্তিত্বের ক্ষুদ্রতম অংশ হিসেবে খুঁজে পেয়েছিলাম, ফোনটির মনোমুগ্ধকর পেছনের এলায়িত উপরিভাগে এমনসব রঙিন ছবি, যেগুলো যে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। বাচ্চা হাতি ও ঘোড়ার অবিন্যস্ত একটা পাল পরিকল্পনাহীন নিশ্চল হয়ে বেশ নৈরাজ্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। কয়েকটার শুঁড় ছিঁড়ে গেছে এবং অত্যন্ত আশাপ্রদ বিষয়, বেশ ক’টা তাদের লেজ হারিয়ে ফেলেছে কয়েকসপ্তাহ হলো। বাস্তবে হলুদ ও গাঢ় বেগুনি রঙের এ প্রজাতির পশু দেখা যায় না; তাই একজন ব্যক্তির স্বাভাবিক চিন্তার বৈশিষ্ট্য ধাক্কা খাওয়ার ফলে তিনি এদের যথেষ্টসংখ্যক দিন স্মরণে রেখে দিতে পারেন, এই সম্ভাবনাটিও ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে,পৃথিবীর ধীরতম অপরাহ্নের এই নিয়মের মধ্যে সভ্যতাগুলোর নিয়মিত কর্মকাণ্ড অনেকটাই হ্রাস পেয়ে যায়; মানুষেরা ঘুমিয়ে পড়তে থাকে; নড়ে যায় অধিকাংশ ছায়ার অবস্থান। ফলে আমার চারপাশে রাখা কাঠের আয়তনগুলোর মতো আমার চিন্তার ছায়াটি হারিয়ে যেতে লাগলো; শক্তিশালী স্বচ্ছতাগুলো হয়ে পড়লো নড়বড়ে; কয়েক শতাব্দী ধরে অপেক্ষমাণ আমার বর্তমান মনযোগটিও অপ্রয়োজনীয়—এরূপ সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলাম। যদিও কোনো তাড়া ছিলো না, তবু গভীর তৃষ্ণায় অপেক্ষমাণ আমার জিভ আমাকে কঠিন একটি দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে দিলো। নিবিড়ভাবে আরও তৃপ্তিকর অভিজ্ঞতায় নিজেকে নিমজ্জিত করার সংকল্পে অটল হওয়াই উচিত; দুই ঠোঁটের সিক্ততায় টেনে নেওয়া যাক এক পেয়ালা উষ্ণ চায়ের তারল্য।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন