সোনালি রঙিন পৃথিবী: শিশুমনের কথা ॥ পলিয়ার ওয়াহিদ | চিন্তাসূত্র
১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৮ মে, ২০১৮ | সকাল ১০:৫৭

সোনালি রঙিন পৃথিবী: শিশুমনের কথা ॥ পলিয়ার ওয়াহিদ

শিশু-কিশোর সাহিত্যে মনসুর আজিজের বিচরণ নিবিড়। শিশু-কিশোরের ভাবনা-চিন্তার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেন প্রতিনিয়ত। শিশুদের ভাবনার জগৎ বিশাল। সাহিত্যপাঠ এই জগৎকে বিস্তৃত করে প্রতিনিয়ত। দেশভাবনা  ও প্রকৃতিপাঠ তাদের অনুপ্রাণিত করে দায়িত্বশীল হয়ে গড়ে উঠতে।

মনসুর আজিজ দেশ-ভাবনা ও প্রকৃতি-চিন্তা তার শিশুসাহিত্যে তুলে এনেছেন নিবিড়ভাবে—দক্ষ কুশীলবের মতো। আমাদের পরিবারের সঙ্গে সমাজের। গ্রামের সঙ্গে শহরের। দেশ ভাবনার সঙ্গে বিশ্বভাবনার আত্মীয়তা। এসব বন্ধনকে মনসুর আজিজ ‘সোনালি রঙিন পৃথিবী’তে তুলে এনেছেন পরম মমতায়। আশ্চর্য দক্ষতায়। ভাষার বৈচিত্র্য ও নিপুণতায়। শব্দের শৈলী ও কুশলতা তার শিশুতোষ গদ্যকে নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়। তাই আলাদা সত্তায় মনসুর আজিজ এর শব্দশৈলীকে চেনা যায়।

আকারে ছোট হলেও বইটি পাঠের পর মনে হয় যেন কতকিছু পেলাম। কত স্মৃতির মাঠ। কত বকুনির তট। কত কত খানাখন্দ। যেন ঢুকে পড়ে সোনালি পৃথিবীর ভেতর। আমরা যদি বইটির অধ্যায়গুলোর দিকে একবার নজর বোলায়, কিছুটা হলেও টের পাওয়া যাবে তার বইয়ের ঘ্রাণ।

‘যে পড়ে সে বড়’। বুঝতে পারা যায় শিশুকে পড়ার দিকে বইয়ের দিকে লেখক আনন্দদানার মতো টেনে নিচ্ছেন। ‘আমিও পারবো’ নিশ্চয় শিশুর মনে আমিও পারবো বলে ওঠে। ছোট বেলায় সাধারণত আমরা শুনেছি। তোকে দিয়ে কিছু হবে না! এই নেতিবাচক প্রভাব যে কত খারাপ, তা টের পাওয়া যাবে এই বই পড়লে।

‘বোশেখ নাচে আমের থোকায়’—এই নাম শুনলে কার না মন আনন্দে নেচে ওঠে! বইটি আমি পড়তে পড়তে নিজের ভেতরে শিশু হয়ে গেছি। প্রত্যেক শিশুকে এ রকম বই পড়ানো অবশ্য প্রয়োজন। বইটি পড়তে পড়তে  হুমায়ুন আজাদের ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ বইটির কথা মনে পড়ে যায় আমার।  আসলে শিশুর বই লিখতে হলে তো একটা ‍শিশু মনের বড় দরকার। সেটা মনসুর আজিজের মধ্যে না থাকলে তিনি এ বই লিখতে পারতেন না।

‘ঐ নতুনের কেতন ওড়ে’—আমাদের শাশ্বত এক বাণী। কাজী নজরুল ইসলোমের এই শিরোনাম আমাদের মন ও মগজে প্রথিত হয়ে আছে। এখানেও তেমন কিছু কথা গল্পের ভঙ্গিমায় লেখক লিখেছেন। ‘বৃষ্টির ছন্দে ভিজে যায় মন’ সেই রকম। বর্ষাকালের যত সব স্মৃতির মাঠে পাঠকে ঢুকিয়ে দেন তিনি। তখন না ভিজে উপায় কী? ‘শরতের গান’ একটু কি খেয়াল করেছেন? ঋতুময়গুচ্ছকে স্মরণ করেই এমনটা করেছেন লেখক। এখনকার শিশুরা যখন বাংলা তারিখ মাস ভুলে যায়। মনসুর আজিজ তখন সেটা আবার নতুন করে শিশুর মননে প্রবেশ করিয়ে দেন আনন্দদানের মতো করে।

‘বিজয়ের কথা এগিয়ে যাবার কথা’ শুধু ঋতু মাস বছর নয়। স্বাধীনতা ও বিজয় নিয়েও তিনি শিশুদের মন ভরিয়ে তোলেন। ‘রমজান মাস আনন্দের, পূণ্যের’ এই শিরোনামে ধর্ম পালনের একটা তাগেদা তিনি শিশুর কানে কানে বলে দেন। যার যার ধর্মের আচারগুলোও সংস্কৃতির প্রধান হাতিয়ার। দিন দিন সেগুলো আমাদের আচরণে প্রভাব ফেলছে। বড়কে সম্মান করা ও ছোটকে স্নেহ করা কিন্তু ধর্মই আমাদের শেখায়।

‘শিশুতোষ ছড়াসাহিত্যে স্বাধীনতা প্রসঙ্গ’ দারুণ একটা প্রবন্ধ। কার কার ছড়ায় কেমনভাবে স্বাধীনতা ধরা দিয়েছে সেটা নিয়ে মূল্যবান প্রবন্ধ। না পড়লে সত্যিই মিস হয়ে যায় যেন। ‘শৈশব, আনন্দভরা স্মৃতির বাগানবাড়ি’। শিরোনামেই বোঝা যায় কেমন হবে এই বাগানবাড়ি। পড়তে চাইলে আজই সংগ্রহ করতে পারেন। ‘সোনালি রঙিন পৃথিবী’ শিশুকিশোরদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ভাবনা জগতের দুয়ার খুলে দেবে বলে মনে করি। বড়রাও পাবেন স্বপ্নময় শৈশব ও কৈশোরে ফিরে যেতে।

সোনালি রঙিন পৃথিবী
লেখক: মনসুর আজিজ
প্রকাশক: শিশুকানন
প্রচ্ছদ: আল নোমান
মূল্য: ১২০ টাকা
পাওয়া যাচ্ছে রকমা‌রি ডট কম-এ

 

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন