শিশিরে পা রাখো অসুখীরা: আরশিতে কবির মুখ ॥ পলিয়ার ওয়াহিদ | চিন্তাসূত্র
১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৮ মে, ২০১৮ | সকাল ১১:০৩

শিশিরে পা রাখো অসুখীরা: আরশিতে কবির মুখ ॥ পলিয়ার ওয়াহিদ

মানুষ হারিয়ে ফেলছে স্মৃতি! স্মৃতির মৃত্যু মানেই কি মানুষের খণ্ডমৃত্যুর বাজনা! বায়োস্কোপে চোখ রাখলেই যেন তাই মিলে যায়। কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের ‘শিশিরে পা রাখো অসুখীরা’পাঠ করতে করতে পাঠকের এমনটাই মনে হবে। গ্রামগুলো হজম করছে শহর। আর নগরের পিঠে হাত বুলিয়ে কয়েকজন পাগল। মাতালের স্বরে মিনতি করছে। আয় আয় ফিরে আয় আদর করবো তোকে। কিন্তু স্মৃতি সে তো মলিন। তবু কত অমিলন হয়ে টিকে থাকে গচ্ছিত রুমালের মতো। কবিতাও ঠিক তেমন। অনেক কথার ফুলকে তাই অল্প কথার ডালিতে ভরাতে হয়।

এই বইয়ের প্রথম কবিতা ‘বায়োস্কোপ’। কী নেই এই কবিতায়? অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের বয়ানে ঋদ্ধ এই কবিতা। রয়েছে স্মৃতির শরাব, যা পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণে সহায়ক। দ্বিতীয় কবিতার নাম ‘তারপরও’। কয়েক লাইন পাঠ করি:

কমলালেবুটা পৃথিবীর মতো গোল
পৃথিবীটা ঘোরে লাটিমের মতো, আর
লাটাইটা ছাড়ে মাকড়ের মতো সুতো
আকাশের গালে জড়ুলের মতো ঘুড়ি

আমরা চিরকাল পৃথিবীটা কমলালেবুর মতো গোল শুনেছি। কিন্তু কবির বর্ণনায় বিপরীতভাবে তথ্য উপস্থিত হলো। দৃষ্টিকে আমূল বদলে দিয়েছেন তিনি। যা পাঠকের মগজকে আলোড়িত ও মনকে আন্দোলিত করে। আমাদের চিরকালের দেখাকে তিনি অন্য রকম করে দেখান। এই যে দেখানোর মুন্সিয়ানা, সেটাই মূলত কবির মৌলিক ও প্রধান কাজ।

‘নগ্নতা’কবিতায় তিনি পুরো পোশাকি একটি জাতির ভেতরের নগ্নতা প্রকাশ করেন। জাতি, জ্ঞাতি, দেশ, ধর্ম; সবার রগরগে চরিত্র এখানে ধরা পড়ে। কবির আকুতি তাই পাখিতে কেন গুঁজে দেওয়া হলো না তার প্রাণ? এমনকী পশুতে বা বৃক্ষেও গুঁজে দিলে তার কোনো ক্ষোভ নেই। কিংবা মাছ ও তৃণলতায় মোড়ানো প্রাণে তার আপত্তি নেই। তবু যেন শরীর ঢেকে রাখতে চান তিনি।

হতাশ কেন চাবির গোছা?
শেষ চাবিতেও দরজা খোলে
(পাগল লোকটা)

প্রশ্ন তো অনেক রকমের হয়। কাকে প্রশ্ন করা হয়? কী ধরনের প্রশ্ন করতে হয়? আর হতাশ কেন চাবির গোছা? আমিও ভেবেছি। পাঠকও ভাববেন। কিন্তু উত্তরটা কেমন? কত স্বপ্নময়! কত চমকপ্রদ! এজন্য কবিতা না পড়লে মন ভালোর কোনো ওষুধ নেই কবিতাপ্রেমীর। এই যে হতাশা আর তার বিপরীতে সমাধানের আঙুল তুলে দেন কবি, বারবার তাই কবিতার পানে মেলে পাঠকের মুক্তি। যেন আবু হাসান শাহরিয়ার মানেই স্বপ্ন: যে জানে সে মহাকাল, হাহাকার তার দিনলিপি (দিনলিপি)।

এত স্বল্পবাকে দীর্ঘালাপ করাই কবিতার কাজ। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শৈশবে পাঠ করা ভাবসম্প্রসারণের কথা মনে পড়ে যায়। সফল কবিতা পাঠ করতে করতে চুপ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো সদুত্তর আছে প্রিয় পাঠক?

সময়ের ঢেউয়ে ভেসে ভেসে যাও; কাউকেই
অতিবিশেষণে ভূষিত কোরো না; কেউ
কিছু নয়
(মোক্ষ)

এক-একটা কবিতার পর আরেকটি কবিতা পাঠের আগে পাঠকও যেন দার্শনিক একটা চিন্তার ভেতর গোল খেতে থাকে। ধ্যানী-ঋষীর মতো বেদবাক্য লিখে দিলেন কবি। কত সহজে কত বড় কথার সারমর্ম। পাঠক কবিতার শরীরে জড়ানো চিন্তার কাপড় মুক্ত করলেও তার কবিতাকে খোলামেলা মনে হয় না। কোথায় যেন একটা কোমল ছায়া অপরূপ মায়ার ভেতরে লুকিয়ে থাকে। আদ্রতামাখা সেই সব কবিতা বারবার পাঠ করতে তাই আবু হাসান শাহরিয়ারের কাছে ফিরে আসতেই হয়। কেন মানুষ অুসখী, তা যেন তিনি মুখস্থ বলে দিচ্ছেন।

‘নবীনতমকে’ কবিতাটি পড়ে আমি বিমুগ্ধ হয়েছি। তরুণকে কত ভালোবাসেন তিনি! অগ্রজের মাদুর সরিয়ে নিলেও তিনি তাকে কবিতার খাতা এগিয়ে দেন। তিনি যেন বুঝিয়ে দিচ্ছেন আবহমান সঙ্গীত। যে সামান্য দাগ তিনি কাটতে পেরেছেন, তাও মুছে ফেলতে নবীনকে এগিয়ে দেন রাবার। আর পছন্দ না হলে ফেলে দিতে বলেন চোখবুজে। আর যদি কেউ কেড়ে নিতে চায়, তাহলে অগ্রন্থিত পৃথিবী তাকে দিয়ে বিদায় নেবেন তিনি। এই যে নিজের সত্তাকে তিনি তরুণের ভেতর আবিষ্কার করেন, তরুণদের স্থান ছেড়ে দেওয়ার মনোবাসনা পোষণ করেন, তিনিই তো মহান। তিনি নতুনকে ছেড়ে দিতে চান তার সর্বত্র। সবকিছু অধিকারও তিনি অনায়াসে তুলে দিতে চান অনুজের হাতে। এই যে নবীনদের সাগ্রহে আহ্বান জানানো, সে যেন তার মহৎ কবিতারই অংশ বিশেষ।

আমার ঈশ্বর—নদী
হিজড়া সে
একই দেহে শিশ্ন-যোনিময়

ঠিক যে সময়টাতে আমরা ঈশ্বরকে নিয়ে দ্বন্দ্ব নিয়ে বেড়ে উঠছি। ঠিক তখন একজন কবি আমাদের সব বস্তুগত-অবস্তুগত বিষয় থেকে সরিয়ে এনে ধরিয়ে দিলেন নদী। কত কঠিন একটি বিষয়কে সহজ করে ভাবেন তিনি। কবি তো তিনিই, যিনি সবার মতো করে ভাবেন না, কিন্তু তা যে সবার হয়ে যায়। এই যে চিন্তার সর্বত্র বিচরণ করতে পারেন, তিনিই তো কবি।

সমকালীন রাজনীতি, আন্তর্জাতিকতা ও প্রযুক্তি। এসব বিষয় নিয়েই তিনি কথা বলেন। এখন পোশাকি যুগ, প্রচ্ছদেই অস্ত যায় কবিতার বই। এভাবেই বাস্তবতার নিরিখে চরম সত্যকে উন্মোচণ করেন তিনি। তার একটি কবিতা পড়লে আরেকটি কবিতা পড়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে।

‘শূন্যের ঠিকুজি’ কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন, নারীকে প্রথমে পুরুষ একটুকরো কাগজের মাধ্যমে বউ হিসেবে খরচ করে। এরপর তাকে মাতৃত্ব দিয়ে মহৎ করে তোলে। এভাবেই জটিল ও সাধারণ ব্যাপারগুলোকে অসাধারণ করে তোলেন। ‘নাম’ শীর্ষক কবিতা পড়লে মনে হয় দীর্ঘ মেডিটেশন শেষে একটা শান্ত নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছেন কেউ। তার পিছু নিয়ে দেখলেন তিনি আর কেউ নয় তার প্রিয়জন।

বর্ণমালা শেখাই হলো না
আজও আমি ‘অ’য়ে পড়ে আছি
‘অ’য়ে দেখি কত কী অহম’

এই কবিতা পড়ার পর কীই বা আর বলার থাকে! নিজের ব্যবচ্ছেদ কেন পাঠকের ঘাড়ে তিনি ছড়িয়ে দেন, কেন নিজের ক্ষুদ্রতা চেনাতে তিনি সবাইকে অবলীলায় করে ফেলেন ‘অ’, কিভাবে ‘অ’ আমাদের কাছে ‘অহম’ হয়ে ধরা দেয়, আমাদের বোধের দোরগোড়ায় একে একে সবই পরিষ্কার হতে থাকে।
‘শোনো কন্যা, এ পৃথিবী ধর্ষকামী পুরুষের বীর্যধর গ্রাম। আমার মানবজন্ম বৃথা, আমি পুরুষ ছিলাম।’ নিজেকে পুরুষ ভেবে কতই না যাতনার কাছে মাথা ঠুকেছেন তিনি। নিজের ব্যর্থতার দায় নিয়ে নিজের দিকে ছুড়ে দিয়েছেন থু থু। আমরা তাই এক-এক করে এগিয়ে যাই আরেকটি কবিতার দিকে। শরীরহীন আত্মার দিকে। সুরুতরূপী শরীরের দিকে।

মাটির কসম কেটে প্রেমও বলে, এই ভিটে আমার ঠিকুজি
তাকে ছেড়ে তুচ্ছ জানি ভিনদেশি রাজার প্রাসাদও
বারবার চন্দ্রধর ফিরে এসেছিল
চিরস্থায়ী বসতি গড়েনি ভিনদেশে

এ কবিতা পড়ার পর একজন কবির দেশপ্রেমের অমর গাথা আমরা টের পাই হাড়েহাড়ে। ইতিহাস থেকে তিনি নিচের চরিত্র বের করে আনেন ছেনে ছেনে। যেন নরম মাটির ভেতর তার পোড়া হাতখানি বারবার তছনছ করে ফিরে পেতে চাচ্ছেন সব সম্পদ। কবিতার মুখের দিকে না তাকিয়ে আর কী উপায় থাকে তখন পাঠকের?

কবিতারা স্বভাবে কোকিল
রূপনারাণের কূলে ব্যঞ্জনার বাড়ি

সত্যই যে সুন্দর, এই সত্য বুঝতে হয়তো কারও পুরো জীবনটা ব্যয় করতে হয়। তবু কবি তো খানিকটা ভবিষ্যদ্বক্তা। তার চোখ ঈশ্বরের দিকে। ভবিষ্যতের দিকে। তাই তিনি বলতে পারেন ভবিতব্য।
তিনি বলেন,

এগুলো তো পদবি ও পদ। ঘরভরা এত কেন ক্রেস্ট? ছবিটা দারুণ, পাশে লোকটা কি চোর? মন্ত্রী ছিল, তাতে কিছু যায় বা আসে না। তুমিও তো কবি ছিলে, এখন মঞ্চের ঠিকাদার। মহাকাল ‘ধুলো’ জানে, নদী জানে ‘সার্কাসের ভাঁড়’।

জানাজানি পাঠ করার পর আর কী বা বলার থাকে? কাউকে তুলোধুনো করতে কার্পণ্য করেননি তিনি। সেটা নিজের বিরুদ্ধে গেলেও তিনি বলে দিতে পারেন। এই শক্তি যার কব্জিতে তিনি আবু হাসান শাহরিয়ার।

কবিতারই মতো, শুধু নতুনত্ব নেই
নতুনত্ব আছে, তবে কবিতা নিখোঁজ
দুজনই অপ্রিয় ওরা পাঠকের কাছে
শিল্পের নিয়তি বলে কথা—
শিশুমৃত্যুহারে বিপুলতা

নিজের সমালোচনা, কবিতা ও শিল্পের সমালোচনা—এ সবই করেছেন কাব্যের চাবি হাতে নিয়ে। পাঠককে টেনে নিয়ে গেছেন তরতর করে। কখনো পাথরের টমটম রঙে, কখনো ঘাসের শব্দে, কখনো বাতাসের সুরে। কখনো মেঘের আকুলতায়। সবকিছুকেই তিনি যেন কবিতার খাতায় নামিয়ে আনেন অনায়াসে।  ‘শিল্পের কদর আরও বেশি হোক, বেশি লোকে নন্দন বুঝুক। কবিতা নিমিত্ত মাত্র, আমি বুঝি ক্ষুধার্তের মুখ’-শিরোনামহীন শীর্ষক এই কবিতার আর কী বিশদ আলোচনার দাবি রাখে?

পুরো কাব্যেই তিন যেন খুঁজেছেন শিল্পের আড়ালে শিল্পীর নিয়তি। আত্মসমালোচনা ও নিজের কাঁধে তুলে নিতে দেখা যায় সাহসের সঙ্গে। কোনো লুকোচুরি যেন তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না।

সর্বশেষ ‘সূর্যাস্তের ছবি’ এঁকে পাঠকও সূর্যের পটে মিলে যাবে কবির সঙ্গে। ‘নদীরা সব সেলাইপটু, ছন্দে বোনা নকশিকাঁথা।’ কবির সেই নকশীকাঁথা আরও বিস্তৃত হোক। আর অসুখী তার কবিতা পড়ে সুখী হয়ে উঠুক।

শিশিরে পা রাখো অসুখীরা
আবু হাসান শাহরিয়ার
প্রকাশক: নাগরী
মূল্য: ১৬০ টাকা
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন