বচনে খনার বচন ॥ কাজী মহম্মদ আশরাফ | চিন্তাসূত্র
৫ আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ | সকাল ১১:৩৫

বচনে খনার বচন ॥ কাজী মহম্মদ আশরাফ

খনার কথা শুনেছি ছোটবেলা থেকেই। ঠিক কখন থেকে তা মনে নেই। আমাদের দেশের প্রকাশনা শিল্প তখন আজকের মতো উন্নত ছিল না। এত বই ছাপা হতো না। কাগজ-কালি-বাঁধাই উন্নত ছিল না। অনুন্নত কাগজে বই ছাপা হতো। খুব দামি কিছু বই ছাপা হতো। সেগুলো মূলত নামি লেখকের দামি উপন্যাস বা কবিতার বই। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বইগুলো সর্ববস্তরের পাঠকের কাছে যেত সস্তা কাগজে ছাপার কারণে।

নামাজশিক্ষার মতো ধর্মীয় বই, সোলেমানি খোয়াবনামা, ফালনামা, কিরোর অনুবাদ হস্তরেখা, গাছ-গাছড়ার ওষধি ব্যবহার থেকে শুরু করে মিসরের রাজা ফারুকের প্রেম, সোফিয়া লোরেনের সাত বার অস্কারবিজয়, ইরানের রেজা শাহের পলায়ন, ভুট্টোর ফাঁসি ইত্যাদি সমকালীন বিশ্বরাজনীতির ঘটনা নিয়েও পাতলা চটি বই প্রকাশিত হয়েছে। সেসব বই শুধু নিউ মার্কেট আর স্টেডিয়াম মার্কেটেই বিক্রি হতো না। রেলস্টেশন, বাস স্টপেজ, লঞ্চ টার্মিনাল এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও বিক্রি হতো। আর দামি বই ছিল রাজকীয় ব্যাপার।

সেই সস্তা কাগজের বইয়ের পাঠক ছিলেন আমার বাবা, এবং বড় ভাইয়েরা। তখনই কোনো এক বইয়ে খনার কথা পড়েছিলাম। এর পরে তার বচন পেয়েছি লোকনাথ ডাইরেক্টরি পঞ্জিকায়। মুসলমানদের মোহাম্মদী পঞ্জিকায় থাকত মুসলমানদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কিছু টিপস। আর হিন্দুদের লোকনাথ পঞ্জিকা। লোকনাথ পঞ্জিকার অবশ্য দুটি সংস্করণ ছিল। একটি পকেট পঞ্জিকা অন্যটি ডাইরেক্টরি পঞ্জিকা। এটি আকারে অনেক বড়। সাত-আটশ পৃষ্ঠার। এই বিশাল পঞ্জিকায় অনেক কিছুই থাকত। হিন্দুধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের নিয়ম-কানুন, কৃষিবিদ্যা, লোকচিকিৎসা এমনকি ঢাকা শহরের রোড, লেন এবং এভিনিউ পরিচয় পর্যন্ত।

নিউজপ্রিন্টে ছাপা এই পঞ্জিকায় খনার বচন পেয়েছিলাম। খনা সম্পর্কে আর কোথাও কিছু পাই নেই। ‘প্রবর্তনা’ থেকে বোধ হয় একটি পকেট সাইজের বই প্রকাশিত হয়েছিল খনার বচনের সংকলন হিসাবে। খনাকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো বই পাই নেই। জানার আকাক্সক্ষা সর্বদাই ছিল। খনা নারী নাকি পুরুষ ছিলেন তাও জানতাম না তখন। হিন্দু নাকি বৌদ্ধ? বোঝা যায় না। নামটি হিন্দুধর্মীয় না, বৌদ্ধধর্মীও মনে হয় না। মুসলমান তো হতেই পারে না। নামটির উৎসমূলও ধরতে পারি না। আজ থেকে ছাব্বিশ-সাতাশ বছর আগে এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘খনা কে রে? নারী না পুরুষ? হিন্দু না বৌদ্ধ? পূর্ণ নাম কী? ক্ষণেশচন্দ্র চক্রবর্তী না কি?’

অনেক পরে জেনেছি খনা একজন নারী। কিন্তু কে এই নারী? যিনি সেই কোন প্রাচীন বা মধ্যযুগে কৃষিবিদ্যা এবং আবহাওয়াবিদ্যায় এত বিদ্বান ছিলেন? যার জিভ কেটে নিয়েছিলেন তার শ্বশুর? কী ছিল তার অপরাধ অথবা অজুহাত? তিনি কিভাবে এত কিছু জানলেন? তার শিক্ষক বা গুরু কে ছিলেন? তার সামাজিক, ভৌগোলিক এবং শ্রেণিগত পরিচয় কেমন ছিল? খনাকে নিয়ে টেলিভিমনের ভারতীয় কোন চ্যানেলে যেন ধারাবাহিক দেখানো হয়। টিভি দেখি না, তাই দেখা হয় নেই। আর ভারতীয় এইসব ধারাবাহিকে আলঙ্কারিক জৌলুস বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে যায় বলে দেখার আগ্রহও ছিল না। ঢাকায় খনাকে নিয়ে মঞ্চনাটক হয়েছে শুনেছি। দেখার সুযোগ হয় নেই। সম্প্রতি পেয়ে গেলাম একটি পুরনো পত্রিকা। ‘থিয়েটার’ ডিসেম্বর-২০০৯ সংখ্যা। এখানে ছাপা হয়েছে ‘খনা’নাটকটি। পড়ে ফেললাম।

সামিনা লুৎফা নিত্রা ‘খনা’ নাটকের নাট্যকার। থিয়েটারবিষয়ক পত্রিকায় তাঁর নাম আগেও শুনেছি। তিনি কয়েক বছর আগে সোহরাব-রুস্তমের কাহিনি নিয়ে ‘তীর্থঙ্কর’ নাটক লিখেছেন। পাঠ্যনাটক নিয়েই এই রচনা। যেহেতু মঞ্চে দেখি নেই তাই ‘খনা’ এখন পর্যন্ত আমার কাছে মঞ্চনাটক না। মঞ্চনাটক নিয়ে লিখতে গেলে অনেক রকমের দ্বিধা কাজ করে। পবিত্র সরকারের এক লেখায় পড়েছিলাম, ‘মঞ্চস্থ নাটক, তার অনেক পাঠ বা টেক্সট থাকে। নাটকের মুদ্রিত পাঠ তার মধ্যে একটি।’ পবিত্র সরকারের মতে নির্দেশকের মঞ্চায়নে থাকে আরো কয়েকটি পাঠ। অভিয়পাঠ, দৃশ্যপাঠ, মঞ্চদৃশ্যের ও পশ্চাৎপটের পাঠ, সঙ্গীত ও নেপথ্যধ্বনির পাঠ ইত্যাদি।

॥দুই॥
পবিত্র সরকারের কথা থেকেই প্রশ্ন ওঠে নাটকের অনেকগুলো পাঠ থাকলে নাট্যসমালোচনা কোন পাঠের ভিত্তিতে রচিত হবে? উল্টা করে বললে, সমালোচনার ভিত্তি হবে নাটকের কোন পাঠ? আমরা মাইকেল মধুসূদন দত্তের, রবীন্দ্রনাথের, দ্বিজেন্দ্রলালের, অমৃতলালের, গিরীশচন্দ্রের বা ক্লাসিক গ্রিক এবং সংস্কৃত নাটক অথবা শেক্সপিয়র, বেন জনসন, মার্লো, গ্যাটে, জর্জ বার্নাড শ, ইবসেন প্রমুখ পাশ্চাত্যের যেসব নাট্যকারের নাটক নিয়ে সমালোচনা লেখা হয় তার ভিত্তি হবে কোন পাঠ? মুদ্রিত পাঠ নাকি মঞ্চায়িত কোনো পাঠ? মঞ্চায়িত নাটকের নির্দেশক অনুসারে ভিন্নতা থাকে। তাই লিখিত এবং মুদ্রিত টেক্সট অনুসারেই আলোচনা বা সমালোচনা হওয়া উচিত। কারণ এটিই নাটকের চিরন্তন রূপ।

যদিও জানি নাটক দেখার বিষয়, পড়ার না। নাটক ভালোভাবে বুঝতে হলে পড়া এবং দেখা দুটিই উচিত। তবু দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর মতো নাটক পড়া। সেখান থেকেই এই লেখায় ভালোমন্দ পাঠ-প্রতিক্রিয়া জানানো মাত্র।

‘থিয়েটারে’ প্রকাশিত নাটকটি পড়েই লেখার আগ্রহ জন্মাল। নানা কারণেই তা হতে পারে।

প্রথমত, বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে গিয়ে বাংলাদেশের যত নাট্যকারের নাম পেয়েছি সেখানে কোনো নারীর নাম ছিল না। সামিনা লুৎফা নিত্রা নামটি নতুন। পাশ্চাত্যের নাট্যকারদের নামের তালিকায়ও কি কোনো নারীর নাম পেয়েছি? মনে পড়ে না। ধ্রুপদী গ্রিক বা সংস্কৃত নাট্যকারের তালিকায়ও না।

দ্বিতীয়ত, ‘বাংলাসাহিত্যে নারী’ নামে একটি বড় প্রবন্ধ লিখেছিলাম কয়েক বছর আগে। সেটি আসলে অসমাপ্ত রচনা। চিরকাল অসমাপ্তই থেকে যাবে। কারণ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত টার্গেট করে লেখি নেই। সে রচনায় আধুনিক বাংলাদেশের সাহিত্যের মধ্যে উপন্যাস আর ছোটগল্পকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নাটকের অংশটি অলিখিত রয়ে গেছে। এখন সেই অংশটি পূর্ণ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হাতের কাছে পেয়ে গেলাম।

তৃতীয়ত, দশ-বিশটি প্রবন্ধ পড়ে যা জানা যায় না, কল্পনা করা যায় না, তা কথাসাহিত্যের মাধ্যমে সম্ভব। চলমান চরিত্রকে পাওয়া যায় এখানে। আর কথাসাহিত্যের মধ্যে নাটকের একটি ভিন্ন রকম গুরুত্ব আছে। লিখিত এবং সুপ্ত চরিত্রদের বাস্তবায়িত করা হয় এখানে।

চতুর্থত, সম্প্রতি নাট্যসাহিত্যে আমার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। দুই-তিনটি নাটিকা লিখে এই জগতের ব্যাপারে কৌতূহলী হয়ে উঠেছি। পড়ার এবং দেখার চেষ্টাও করছি। আধুনিক নাট্যধারার মধ্যে জীবনীভিত্তিক নাটক কেমন হয় বা হতে পারে বিষয়টি জানা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, খনা একজন নারী। নারীচরিত্র নির্মাণ নারীর হাতেই ভালো হয়। পুরুষের সৃষ্টি করা নারী আসলে পুরুষদের আদর্শ হয়। নিত্রা এই নাটকেই এত জায়গায় লিখেছেন, ‘কেউ কি আসলে কারো কথা বোঝে?’

এসব বিষয় মাথায় নিয়ে নাটকটি পড়েছি ও পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখছি।

॥তিন॥
এখানে প্রকাশিত নাটকটি গতের অনুগত নয়। নতুন আঙ্গিকে লেখা। চরিত্রলিপি বা পরিচয় নেই। অঙ্ক বা দৃশ্যবিভাজন নেই। একটানা। মঞ্চায়িত হয়েছে কিভাবে জানি না। এখানে প্রকাশিত নাটকটি আধুনিক ধারার বলে নাটকের এরিস্টটলীয় তিন ঐক্যের নিয়ম ভেঙে নতুন কিছু করার চেষ্টা করা হয়েছে। নাটকের সময়ের ধারাবাহিকতা ভেঙে ফেলা হয়েছে কোথাও কোথাও। আধুনিক কথাসাহিত্যে প্রচলিত এটি একটি রীতি। আগের যুগে বা একালেও প্রথাগতভাবে লেখা হলে নাটকটি করুণ রসের এবং ট্রাজেডি হিসাবে সেই নিয়মেই লেখা হতো। এখনো খনাকে ট্রাজেডি বলে চিহ্নিত করা যায়। আধুনিক ট্রাজেডি এমনই হতে পারে।

নাটকটি শুরু হয়েছে মানবের গান দিয়ে। গল্পের মতো করে বর্ণনাধর্মী লেখা। দেউলনগরের রাজা ধর্মকেতুর রাজজ্যোতিষী বরাহ মিহিরের দৃশ্য দিয়ে শুরু। তিনি গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান থেকে গণনা করছেন। তিনি রাজপুত্র বিচিত্রকেতুর জন্ম নক্ষত্রবিচারে মগ্ন। এ সময় লীলাবতীর প্রবেশ। লীলাবতীর স্মৃতির ভেতর দিয়ে ঘটনা চলে যায় বরাহ মিহিরের স্ত্রী কঙ্কনার সংলাপে। কয়েক যুগ আগের দৃশ্যে। রাজপুত্রের ভবিষ্যৎ গণনা করতে গিয়ে বরাহ যা দেখেন নাট্যকার আমাদের নিয়ে যান সমান্তরাল আরেকটি রাতে। দেখান এমনই একটি রাতে বরাহের পুত্র মিহিরের জন্মের পরে বরাহ স্ত্রী কঙ্কনাকে বলেছিলেন, ‘কঙ্কনা তুমি যেও না। যেও না তুমি। চাই না এ ভয়াল বীজ—তোমার সন্তান। তোমাকে চাই আমি শুধু তোমাকে।’

বরাহের এই সংলাপে কি লুকিয়ে আছে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার একাধিপত্য? নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চাই বরাহের? এর পরে বরাহের নির্দেশে নিজ পুত্রকে তাম্রপাত্রে ভরে বিদ্যাধরী নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এইসব ঘটনা কিন্তু অনেক আগের। কিন্তু নাট্যকার নাটকের শুরুতেই অনেক বছর পরের মিহিরের বেঁচে ওঠা এবং লীলাবতীকে বিয়ে করার পরের দৃশ্য সামনে এনে বরাহের সাথে লীলাবতী নামধারী খনাকে মুখোমুখি করান মঞ্চে—একই সময়ে।

রাজপুত্র বিচিত্রকেতুর জন্মবিষয়ে নক্ষত্রবিচার করতে গিয়ে বরাহ ভুল করছিলেন। তিনি বলেন, ‘রাহু, কেতু দ্বাদশীর মিলনে আনে ধ্বংস।’ রাজপুত্রের জন্মবিচার এমন বলে তিনি প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছেন না। রানী সুমিত্রার ভয়ে। যদিও রাজা বুঝতে পারেন। তিনি রাজজ্যোতিষের বাণী মেনেও নিতে চান। কিন্তু ঠিক এই সময়ে প্রাসাদের বাইরে এসে ঝামলো সৃষ্টি করেন তাম্র্রপাত্রে ভাসিয়ে দেওয়া পুত্র মিহির আর মিহিরের সহধর্মিণী লীলাবতী। যাকে লঙ্কার মানুষেরা খনা বলে চেনে। প্রাসাদের বাইরে থেকে  ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি প্রার্থনা করেন প্রহরীর মাধ্যমে। বরাহ অনুমতি দেন না। পরে পত্র পাঠান লীলাবতী। পত্রে লেখা ‘জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, তিন জানে না বরাহ।’ পত্রপাঠে বরাহ রাগে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। লীলাবতীর পরিচয় জানতে চান। বরাহের সেই তাম্রপাত্রে বিদ্যাধরীজলে ভাসিয়ে দেওয়া পুত্রই মিহির। লীলাবতী তার জীবনসঙ্গিনী। বরাহ প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেন না। বিশ্বাস করলেও স্পর্ধা মেনে নিতে পারেন না। সেদিনই বরাহকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় তার গণনা নির্ভুল না। কারণ আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে নিজের সন্তান সম্পর্কেও ভুল গণনা করে অশুভ আশঙ্কায় জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ সেই সন্তান আজ বেঁচে আছে সগৌরবে। মিহিরের মা কঙ্কনা কিন্তু নিজের ছেলে সম্পর্কে আশাবাদীই ছিলেন। বরং ভুল ছিল বরাহের গণনা।

পুত্রবধূর গণনা মানতে রাজি হন না বরাহ। তিনি বলেন, ‘নির্ভুল আমার গণনা, ধ্বংস, মৃত্যু, নষ্ট গর্ভফুল। জন্ম মুহূর্তে জননী আর দ্বাদশ ঘণ্টায় স্বীয় মৃত্যুর চিহ্ন সে শিশু। তার বেঁচে থাকা অবাস্তব কল্পনা নতুবা অপলাপ সত্যের। মিথ্যাবাদী নারী, কী উদ্দেশ্য তোমার? এক্ষুণি প্রকাশ করো। পরবর্তী আদেশমাত্র বিচ্ছিন্ন শির লুটাবে ধুলায়।’

এর পরে লীলাবতী ভুর্জপত্রে রাশি এঁকে, গণনা করে দেখিয়ে দেন বরাহের গণনা ভুল। বরাহ তো অসম্ভব অসম্ভব বলে চেঁচিয়েই ওঠেন। শান্ত কণ্ঠে লীলাবতী বলে, ‘নতুনের আবাহন বড় সহজতো নয়। আপনি জানেনি এখনো পৃথিবী এগিয়ে কত?’

নাটকের এই সংলাপ শুধু সেই খনার যুগের কথা নয়, এ কথা যুগান্তরেরও। পৃথিবী এগিয়ে চলে। সব কিছু বদলায়। কিন্তু কিছু মানুষ পুরনো জ্ঞান, পুরনো ধ্যান এবং ধারণা নিয়ে পড়ে থাকেন। এখানে বরাহের পুরনো জ্ঞানের দর্প চূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে নতুন যুগের দম্পতি মিহির আর লীলাবতীর সত্যবিদ্যার জোরে।

রাজপুত্রের ভাগ্যগণনা করতে গিয়ে কালক্ষেপণ করেও বরাহ যখন বলতে সাহস পান না তখন লীলাবতী শ্বশুরকে বলেন, ‘বলতে আদেশ করুন পিতা।’

বরাহ নতি স্বীকার করে বলেন, ‘আমিই বলছি। ভয় নেই। রাজপুত্রের ভাগ্য গণনায় ভুল ছিলো আমার। নতুন বিশ্ব নব আবিষ্কারে এগিয়েছে কতটা তা ছিল না জানা। পুরোনো নিয়ম ধ্বংস এঁকে গেলো রাজপুত্রের ভাগ্যে। আমার, আমাদের আর দেউলনগরের সৌভাগ্য যে, কন্যা আমার বড় ঠিক সময় উপস্থিত হন—মূঢ় পিতার সামনে। চোখে আঙুল দিয়ে পথ দেখান আমায়। নতুন সূর্য তার নতুন আলোয়। বিচিত্রকেতুর ভাগ্য পত্র-পুষ্পে সুশোভিত। তার সৌভাগ্য দেউলনগরের সৌভাগ্য।’

নাটকের শুরুতে বরাহের এই আত্মসমর্পণই শেষ কথা হতে পারে না। এর পরে রয়েছে নাট্যদ্বন্দ্ব। লীলাবতীর সাথে শুধু এক ভাগ্যগণনার ভুল-নির্ভুলের পার্থক্যেই নয় নানা দিক দিয়ে রয়েছে নবীন-প্রবীণের প্রজন্ম ব্যবধান এবং স্বার্থদ্বন্দ্ব।

বরাহ কিন্তু মিহির এবং লীলাবতীর গুণে মুগ্ধ হন। স্রষ্টার কাছে প্রশংসাবাক্যও উচ্চারণ করেন। রাজপুত্রের ভাগ্যগণনার ঘোষণা হয়। রাজ্যজুড়ে আনন্দও হয়। এর পরে সূর্যপ্রণাম নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।  লেখকের ভাষায়, ‘এমনি আরো কত শত আচার আর নতুনত্বের দীক্ষায় জীবনটা আঁটো হয়ে ওঠে লীলার’। দাম্পত্যের এই সংকট কিন্তু আধুনিক যগের যৌথ পরিবারের সংকটও। লীলার দম বন্ধ হয়ে আসে প্রাসাদের পরিবেশে। তিনি স্পষ্টই বলেন, ‘এখানে আমার প্রাণ হাঁপিয়ে উঠছে’।

বরাহ জিজ্ঞাসা করেন, ‘বাইরের জগৎটা বুঝি হাতছানি দিয়ে ডাকে?’ লীলাবতী প্রাসাদের বাইরে প্রকৃতির কাছে যেতে চান। যানও। প্রহরী রঘুনাথকে মিহির সাথে যেতে বলেন। দরিদ্র চাষীদের সাথে লীলাবতীর বোধ ও চিন্তা মিলে যায়।

এর মাঝে রাজা ধর্মকেতু জরুরি রাজসভা ডাকেন। সেখানে লীলাবতীকেও প্রয়োজন রাজার। জানা যায় তিনি প্রাসাদে নেই। জীবনপুরে গেছেন। কোনো প্রয়োজনেই গেছেন। রাজা জানতে চাইলে বরাহ ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘প্রয়োজন তাকে টানে কম, অপ্রয়োজনই তার পাথেয়।’

রাজা বুঝতে পারেন, তিনি বরাহের কণ্ঠে পুত্রবধূর প্রতি যেন সন্তুষ্টির অভাব বোধ করেন। রাজসভায় রাজার পক্ষ থেকে ঘোষণা হয়, ‘দেউলনগর রাজ্যের মহারাজ ধর্মকেতুর রাজসভায় সভাসদ পদ অলঙ্কৃত করবেন মহান জ্যোতিষী বরাহের একমাত্র পুত্র মিহির এবং জ্যোতিষকুল শিরোমণি দ্বীপবাসিনী রাজকুমারী লীলাবতী।’

রাজার এ ঘোষণায় সন্তুষ্ট হতে পারেন না বরাহ। তিনি মনে করেন নারী শুধু রন্ধন বা গৃহকর্ম করবে। রাজার এই সিদ্ধান্ত তার কাছে কৌতুক বলে মনে হয়। তিনি তাচ্ছিল্য করে মন্তব্য করেন, ‘মিহির যর্থার্থই সভাসদপদ লাভের যোগ্য। আমি ধন্য রাজার বদান্যতায়। কিন্তু লীলাবতী? এ কোন কৌতুক রাজার, নারী হয়ে রাজসভায় কোন কর্ম করবে সম্পাদন? রন্ধন বা গৃহকর্ম বিষয় রাজসভার আলোচ্যসূচিতে স্থান পাবে কি?’

এর পরে নাট্যকারের উক্তিটি যথার্থ, ‘ঘরের বাইরে পা ফেলা নারীর প্রথম বাধা যে ঘরের ভেতর থেকেই আসে।’

বরাহের স্বার্থে আঘাত না হানলেও লীলাবতীর প্রতি বরাহের ঈর্ষা, অসহিষ্ণুতা তীব্র দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। লীলাবতী কৃষকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তারা তাঁকে রানীমা বলে ডাকেন।

বরাহ নিজ পুত্র মিহিরকে ডেকে সাবধান করে দেন, ‘লীলাবতীর চাষাদের সাথে ওঠাবসা রাজা ধর্মকেতুর বিরাগের কারণ হতে পারে, যে কোনো সময়। স্ত্রীর কারণে তোমার জীবনে কেনো ক্ষতি হোক চাই না আমি তা।’।

নাট্যকারের ভাষায়, ‘মিহিরের মনে অসন্তোষের লৌহখ-টিকে মোটামুটি আকার দিতে পারার তৃপ্তি নিয়ে প্রস্থান করেন বরাহ।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পিতার উক্তিতে মিহিরের মানসে পরিবর্তন আসে। মিহির কিন্তু দু’হাতে মুখ ঢেকে সবসে থেকে ভাবে নারীর পায়ে শেকল পরানোর কথা। ‘নারী যেন টপকে না যায় লক্ষণরেখা।’

লীলাবতী প্রাসাদের আগল পেরিয়ে জীবনপুরের কৃষকদের কাছে পৌঁছে যান। সেখানে তার এক জ্যোঠামনি আছেন। তার কাছে গিয়ে আলাপ করেন।

রানী সুমিত্রার কঠিন ব্যাধির চিকিৎসা করতে গিয়ে লীলাবতী দেখেন, অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রানীর বাস। বেলা দ্বিপ্রহরেও প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে হয়। আলো-বাতাসের সহজ চলাচল আছে এমন কক্ষে নিয়ে রানীকে রাখার অনুরোধ করেন লীলা। এসব কিন্তু ভালো লাগে না বরাহ আর তার সমমনা মন্ত্রী বীরেন্দ্রের। মন্ত্রী বীরেন্দ্র আগেই গণনা করে রেখেছেন খুব শিগ্রই রানীমা মারা যাবেন। কিন্তু রানী খনার সহজ চিকিৎসায় ভালো হয়ে ফিরে আসেন।

সে বছর দেশে বর্ষায় অনাবৃষ্টি ছিল। অগ্রহায়ণে অতিবৃষ্টি দেখা দেয়। খনাতো জানেন, যদি বর্ষে আঘনে/ রাজা যায় মাগনে। দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে। রাজ্য শেষ হয়ে যাবে। খনার পরামর্শে সেনাদলের সাহায্যে বীজ সরবরাহ করে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করে নতুন করে চাষাবাদে নিয়োজিত করে দুর্ভিক্ষ ঠেকানোর ব্যবস্থা করা হয়। দেশে ফিরে আনে শান্তি।

কিন্তু খনার জীবনে অশান্তির কারণ শুধু বরাহ নামের ঐ ‘পাজি বুড়োই’ না। স্বামী দিয়ে তিনি সুখী হতে পারেন নেই। রাখাল বালকের সংলাপে এই বিষয়টি তীব্র ক্ষোভ হয়ে প্রকাশিত হয়। ‘এত কাপুরুষ জীবনে দেখিনি— দিদিটারে ছেড়ে এলো ঐ শয়তান বুড়োটার কাছে। কেন তুমি বলতে পারলে না তার মুখের পরে—পারবোনি আমি আমার বউরে মারতি’।

এ নাটকে একটি সংলাপ একাধিকবার একাধিক চরিত্রের মুখ দিয়ে উচ্চারণ করার ব্যবস্থা করেছেন নাট্যকার। ‘কেউ কি বোঝে আসলে কাউকে?’ একবার সংলাপটি উচ্চারণ করেন বরাহ। অন্যবার রাজা স্বয়ং। এটি আধুনিক যুগের শুধু নয়, প্রাচীন এবং মধ্যযুগ ধরে মানুষে-মানুষের মধ্যেকার সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েনটি স্পষ্ট করার সংলাপ।

খনা মানমন্দির গড়ে তোলেন। জ্যোতিষী চর্চা করেন। কৃষক সম্প্রদায়ে তার বিপুল জনপ্রিয়তা। খনার কাছে কৃষকদের ভিড় হয়। এসবে বরাহ ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরেন। কথায় কথায় খনার বেয়াদবি-ঔদ্ধত্য তার চোখে পড়ে। তিনি ক্রুদ্ধ হন। মন্ত্রী বীরেন্দ্র বরাহের হরিহর আত্মা। খনার জনপ্রিয়তাকে তিনিও ঈর্ষার চোখে দেখেন। দেখেন সন্দেহের চোখে ষড়যন্ত্র হিসাবেও। তিনি বলেন, ‘প্রজাদের এহেন সমাবেশ উৎসাহিত করেন তিনি। এ একেবারে অনুচিত।’

বরাহ তিনটি অভিযোগ আনেন খনার বিরুদ্ধে। উদ্ধত, অহংকারী আর দেশদ্রোহী। তিনিও বলেন, ‘প্রাকৃত বর্বরদের এক করে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করেছেন।’

খনার পক্ষ হয়ে স্বামী মিহির, রানী এমনকি রাজাও বরাহের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু ঔদ্ধত্যের অভিযোগকারীর নিজের ঔদ্ধত্য সীমাহীন। তিনি নিজেই রাজার কথার অমান্যকারী। বরাহের প্রয়াত স্ত্রী কঙ্কনা এসেও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু বরাহ স্বীয় সিদ্ধান্তে থাকেন অটল। খনাকে অনেকে ক্ষমা চাইতে বললেন। স্বামী মিহিরও ক্ষমা চাইতে বলেন। লীলাবতী বলেন, ‘আমার অপরাধটা কী? অপরাধ করলে ক্ষমা চাওয়া যায়। না করলে কেন ক্ষমা চাইবেন? তিনিও স্বধর্মে নিধয়ং শ্রেয়োঃজ্ঞানে স্বপথেই স্থির থাকেন। রাজাকে তিনি বলেন,

‘এই আমার সাধনা। আমার বিদ্যা, আমার সত্য। পিতা, স্বামী বা সকল সম্পর্কের ঊর্ধ্বে জ্ঞান সত্য। মিহিরের জন্ম অথবা মৃত্যু কি ঠেকাবে সূর্যের উদয়াস্ত? অসম্ভব। কেননা সে সত্য মানুষের ঊর্ধ্বে। পিতার আদেশ মানতে জীবন দিতে রাজি আছি। রাজা, সত্য নয়। কেননা সত্য জীবনের ঊর্ধ্বে, এ সত্য মানুষের, প্রকৃতির। দেউলনগরের জল-কাদার। ক্ষমা আমি চাইতে পারবো না। তাতে অপমান সকলের।’

ক্ষমা চাওয়া না চাওয়া নিয়ে লীলাবতীর কঠিন দুঃসময়ে একমাত্র রাখাল বালক খনার পাশে থাকে। নিঃসন্তান নারী খনার জীবনে কি রাখাল বালকটি ফ্রয়েডীয় সূত্রে পুত্রসন্তানের প্রতীক? রাখালকে বাইরে থেকে মনে হচ্ছে কৃষিবাংলার জনতার প্রতীক। সে বলে,

‘ক্ষমা চাইবে না তুমি দিদি। কেনই বা চাইবে? তুমি খনা, তুমি পবিত্র, শুদ্ধ, তুমি দেবী। ক্ষমা যদি চাইতে হয় চাইবে সেই ব্যাটা।’

রাজা এবং রানীকে রাখাল বলে,

‘শোনো রাজামশায়, আর রানিমা, বলে দিও সে ব্যাটাকে আমার দিদি তাকে ক্ষমা চাইতে সাত দিন সময় দিলো। আমরা ডরাই না তারে। শেষ রক্তের ফোঁটা দেহে থাকতি দিরি অপমান হতে দিবো না।’

বরাহ ক্ষমা চাওয়ার জন্য খনাকে সাতদিন সময় দিয়েছিলেন। পাল্টা রাখাল বালকও বরাহকে সমপরিমাণ সময় দিয়েছে।

এরপরে নাটকের কাহিনি আর বেশি নেই। পরের ঘটনা কিংবদন্তি হয়ে আছে। সেই জানা ঘটনা নাট্যকার হাতে রেখে দিয়েছেন। হয়তো সাতদিন পরেই বরাহ খনার জিভ কেটে নেন শাস্তি হিসাবে। কিন্তু মধ্যবর্তী এই সাত দিনের পরিকল্পনা ছিল রাখাল বালকের।

‘শোনো সবাই, এই সাতদিন পাহারা এই প্রাসাদে আমাদের সকলে। যা যা জানেন দিদি লীলাবতী বলবেন। তুলে নেবো কণ্ঠে মোরা। ভুলবো না। দিদি গো, আমাদের মাটি আর ফসলের শেকড়ের বিদ্যে পেটে ধরে তোমাকে পালাতে দেবো না। আর ছোটও করবো না তোমাকে ক্ষমা চাইতে কয়ে। আমাদের যে জ্ঞানটুকু রেখেছো তোমার মাথায় তা দিয়ে যাবে আমাদের এই সাত দিনে দেউলনগরের চাষারে। পারবা না দিদি?’

এর পরে খনার একটি বচন আবৃত্তির মধ্য দিয়ে নাটকের সমাপ্তি। নাট্যকার শেষের দিকে সাহস আর স্থৈর্য নিয়ে ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করেছেন। সাতদিনের ঘটনা আড়ালে রেখে দিয়ে সে যোগ্যতারই পরিচয় দিয়েছেন। রাখাল তথা বাংলার কৃষকসম্প্রদায় খনাকে হয়তো প্রাণে বাঁচিয়ে রাখতে পারে নেই। কিন্তু তার প্রতিভা এবং কীর্তি অমর করে রেখেছে। আর এভাবেই রাখালেরা, কৃষকেরা বাংলার মাটি ও মানুষের মাঝে সম্পর্ক গাঢ় করে রাখায় খনাকে মাঝখানে রাখেন। খনা মিশে আছেন এই বাংলায়। মাটি ও মানুষের সাথে।

নাট্যকার এ নাটকের মাধ্যমে নারীমুক্তির বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে সামনে এনেছেন। রাজা ধর্মকেতুকে যদি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রতীক বিবেচনা করি তাহলে রাষ্ট্রের ক্ষতি না হলে নারীমুক্তি রাষ্ট্রের বা রাজ্যের বা কোনো রাজার জন্য প্রতিবন্ধক হয় না। কিন্তু নারীর উত্থানে যাদের স্বার্থে ও সম্মানে আঘাত লাগে তাদের দিক থেকেই বাধা আসে। আর এ ব্যাপারে নিজের ঘরে থেকে প্রবল বাধা এলে তার এগিয়ে যাওয়া কঠিন। অনেকের ক্ষেত্রে অসম্ভবও হয়ে যায়। খনা নিজেই প্রতিকূল পরিবেশ অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে পারেন নেই। নাটকটিতে একজন খনেই দেখতে পাই না। সমকালীন বিশ্বের প্রায় সকল প্রতিভাবান নারীকেই খনা হিসাবে তুলে ধরেছেন নাট্যকার।

শুধুই প্রতিভার কথা বলি কেন, নারীমুক্তির প্রসঙ্গটি তো আসলে সকল নারীরই বিষয়, পুরুষেরও। পুরুষ যদি স্ত্রী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন তাহলে ভবিষ্যতে তার কন্যাসন্তানও নিজের জীবনের বিকাশ ঘটাতে পারবে। এ নাটকে খনাকে নিঃসন্তান দেখানোতে সচেতন পাঠক বা মঞ্চনাটকের দর্শকের মনে একটি অনিবার্য প্রশ্নের উত্তর জন্ম দেয়, খনা উপযুক্ত পরিবেশ পাননি বলেই সন্তান রেখে যাননি। যদি কন্যাসন্তানের জননী হতেন তাহলে তিনি হয়তো দৃঢ়ভাবে মাথা তুলে শাস্তি মেনে নিতে পারতেন না। কারণ সময় ও পরিবেশ তার পক্ষে ছিল না। কন্যাসন্তানের জন্য পরিবেশ উপযুক্ত করে তোলা রাখাল বালকের মতো সচেতন কৃষিসমাজের পুরুষদেরই দায়িত্ব।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন