দার্শনিক দৃষ্টিতে মাতুব্বরের সত্যের সন্ধান ॥ রাশিদা আখতার খানম | চিন্তাসূত্র
৬ কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২১ অক্টোবর, ২০১৮ | রাত ৩:২৩

দার্শনিক দৃষ্টিতে মাতুব্বরের সত্যের সন্ধান ॥ রাশিদা আখতার খানম

বিশ শতকে পারিপার্শিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে  বাংলাদেশে আবির্ভাব ঘটে দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের (১৯০০-১৯৮৫)। বরিশালের প্রত্যন্ত এক গ্রামে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত ছিলেন। তবে এটা সত্য যে, তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত দার্শনিক।

মানুষের জীবনকে বুঝতে গিয়ে আরজ আলী মাতুব্বর যুক্তিকে ব্যবহার করেছেন। জীবনে চলার পথে ধর্ম দিয়ে মানুষ নানাভাবে আকৃষ্ট হয়। মাতুব্বর অনুধাবন করেন যে ধর্মের অপব্যাখ্যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বচ্ছ না করে কুসংস্কারপূর্ণ করে তোলে যে কারণে জীবনে নানা ব্যাঘাতের সৃষ্টি হয়। এ কারণে তিনি সচেষ্ট হন, সত্য কি তা আবিষ্কারের পথে। জীবন ও বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের অন্তর্নিহিত সত্যকে তিনি খুঁজেছেন যুক্তি দিয়ে। ‘সত্য’ সম্পর্কিত দার্শনিক আলোচনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল না, তিনি ধর্মীয় সত্যের দিকে ঝুঁকে ছিলেন। ‘সত্য’ প্রত্যয়টি সম্বন্ধে দর্শনে নানাবিধ ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব রয়েছে। আরজ আলী মাতুব্বর সত্য প্রসঙ্গে দার্শনিক তত্ত্বের অনুসন্ধানী ছিলেন না, ধর্মীয় সত্যকে জানাই ছিল ‘সত্যের সন্ধান’ গ্রন্থের একমাত্র আলোচ্য বিষয়বস্তু। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, ‘আমরা ঐ সকল দুরূহ দার্শনিক তত্ত্বের অনুসন্ধানে প্রবিষ্ট হইব না, শুধু ধর্মজগতের মতানৈক্যের বিষয় সামান্য কিছু আলোচনা করিব’ (মাতুব্বর, আরজ আলী, আরজ আলী মাতুব্বরের রচনা সমগ্র-১, আইয়ুব হোসেন সম্পাদিত, ঢাকা : পাঠক সমাবেশ, ১৯৯৪, পৃ. ৫১)। তিনি অনেকগুলো গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মাঝে অন্যতম ‘সত্যের সন্ধান’। আমার আলোচনায় এ গ্রন্থটিকে আমি গুরুত্ব দিয়েছি।

‘সত্যের সন্ধান’ প্রকৃতপক্ষে আরজ আলী মাতুব্বরকে জ্ঞানুরাগী করে তোলে। প্রকৃত অর্থে ধর্ম যা বোঝায় এবং কুসংস্কারপূর্ণ ধর্মীয় ব্যাখ্যা যা—এ দুয়ের পার্থক্যকে তিনি নির্দেশ করেছেন। এ পার্থক্য বুঝতে হলে ব্যক্তিকে যৌক্তিক মনের অধিকারী হতে হবে এবং সংস্কারমুক্ত থাকতে হবে।

ধর্ম ও যুক্তি
মাতুব্বরের কাছে  ধর্মের চেয়ে দর্শন নিম্ন স্তরের নয়। আর তাই দর্শনের অনুরাগী হয়ে ধর্মকে বোঝার চেষ্টা করেন তিনি। ধর্মের ব্যাখ্যার জন্যে আমাদের প্রয়োজন যৌক্তিক চিন্তনশক্তি। যুক্তি দিয়ে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিলে তা কি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না? এমন প্রশ্নের উত্তরে মাতুব্বর মনে করেন, ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে মানুষের মন উন্মুক্ত থাকে কিন্তু আমাদের দেশে এ অবস্থাটা তখন ছিল না। বাংলাদেশে মানুষ আবেগের বশে কল্পনাশ্রয়ী হয়ে পড়ে। গ্রামে-গঞ্জে মানুষের মনে ঐশ্বরিক বিষয় ও নানা দিক নিয়ে নানা কল্পনাশ্রয়ী অন্ধ কুসংস্কারপূর্ণ ব্যাখ্যা আতঙ্ক তৈরি করে ব্যক্তি মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা আমাদের চোখে পড়ে। শিক্ষার সুফলবঞ্চিত মানুষের সামাজিক জীবন থাকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন। এমন অবস্থায় অন্ধ বিশ্বাসে মানুষ ধর্মের ব্যাখ্যা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে। আরজ আলী মাতুব্বর তার গ্রন্থে এসব ব্যাখ্যা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন।

তার সমাজের মানুষের মাঝে ধর্ম সম্পর্কিত মনোভাব তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি দেখেছেন ঐশ্বরিক বিষয়ে মানুষের মাঝে অন্ধ বিশ্বাস কাজ করেছে। বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তির মাঝে জগৎ ও জীবন নিয়ে অন্ধ বিশ্বাস নেই; একজন বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি প্রকৃত সত্যকে জানতে চেষ্টা করেন। মাতুব্বর ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক, তার এ জানার চেষ্টা যৌক্তিক, কেবল বিশ্বাসভিত্তিক নয়।  তিনি মনে করেন, বিজ্ঞানের জ্ঞান প্রত্যক্ষণনির্ভর, তাই এ জ্ঞান প্রমাণনির্ভর। প্রত্যক্ষণ দিয়ে কোনো উক্তির সত্যতা ও মিথ্যা প্রমাণ করা সম্ভব। যে উক্তির প্রমাণ-অপ্রমাণ কোনো কিছু করা সম্ভব নয়, তা সত্য কী মিথ্যা, কোনটাই দাবি করা যায় না বলে তিনি মনে করেন। একজন পদার্থবিদ যেমন মনে করেন, অভিজ্ঞতামূলক পরীক্ষণ হচ্ছে জ্ঞানের ভিত্তি, তেমনি আরজ আলী মাতুব্বরও মনে করেন, যা কিছু অভিজ্ঞতালব্ধ, তা-ই জ্ঞানের বিষয়।

জ্ঞানের ক্ষেত্রে যুক্তি ও অভিজ্ঞতা এ দুটিকে তিনি মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেন। সত্যের সন্ধান গ্রন্থে তিনি জ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা করেন। ধর্মীয় জ্ঞান যেটাকে ধর্মতত্ত্ব (theology) বলা হয়, তা নিয়ে তিনি কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেন তার গ্রন্থে। এ প্রশ্নগুলোকে তিনি ছয়টি শ্রেণীভুক্ত করেন, আত্মা বিষয়ক, ঈশ্বর বিষয়ক, পরকাল বিষয়ক, প্রকৃতি বিষয়ক ও বিবিধ বিষয়ক। এসব প্রশ্নের সবই অর্থপূর্ণ, তা নয়। উল্লেখ্য, কোরানে যেসব বিষয় স্থান পেয়েছে, সেসব বিষয়কে ছয়টি ভাগে ভাগ করেছেন গবেষকরা। এ সম্বন্ধে মুসলিম দর্শনের আলোচনায় পাওয়া যায়, এগুলো হলো, ১) আধিবিদ্যক এবং বিমূর্ত; ২) ধর্মতাত্ত্বিক; ৩) নৈতিকতা; ৪) অতীন্দ্রিয়; ৫) আচার-অনুষ্ঠান; ৬) ঐতিহাসিক। এ বিষয়গুলো জানা থাকলে ধর্ম সম্পর্কিত মাতুব্বরের কিছু প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে।  আমি মনে করি, তিনি কাণ্ডজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জানার চেষ্টা করেছেন ধর্ম সম্পর্কিত বিভিন্ন বক্তব্যকে। ধর্ম গ্রন্থের সবকিছু আক্ষরিক অর্থে নেওয়া সঠিক নয়, অনেককিছুই রূপক অর্থে বলা হয়েছে, এমন ধারণা দিয়েছেন মধ্যযুগের মুসলিম দার্শনিকগণ। ধর্ম সম্পর্কে তার সময়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে যারা বক্তব্য রেখেছেন, সেগুলোর কোনো যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না, কেবলই অন্ধবিশ্বাস-ভিত্তিক ছিল। এদেশে ধর্ম প্রচার করেন যারা, তাদের ধর্মতত্ত্ব, আধ্যাত্ত্বিক জ্ঞানবিষয়ক যৌক্তিকতা অথবা সৃষ্টির মাঝে অকল্যাণকর মন্দের (evil) উপস্থিতি ঈশ্বরের গুণ থেকে অনুসৃত হতে পারে কিনা—এমন প্রশ্নের কোনো যুক্তিনির্ভর উত্তর ছিল না। আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন যুক্তিবাদী, নিছক আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু গ্রহণ করতে তিনি অস্বীকার করেন। এ কারণে ধর্ম সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নের সঠিক ব্যাখ্যার অনুসন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি।

ধর্মের যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা বিভিন্ন সময়ে ধর্মতত্ত্ব ও থিওডেসি দিয়ে থাকে। এসব ব্যাখ্যা কোনো না কোনো অথরিটির কাছ থেকে দেওয়া হয়। ইসলামে শুরুতে মসজিদ ও মাদ্রাসা ছিল অথরিটি, ধর্মীয় নিয়মের উৎস যদিও কোরান ও হাদিস, তবু কোরানের ব্যাখ্যা মসজিদ ও মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ছিল, পরবর্তীকালে  তা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে—প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ছিল না বলে ইসলামি আইন-কানুনের অপব্যাখ্যা ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে জটিলতার সৃষ্টি করে। যে জটিলতা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এমন একটা ঘটনা তার জীবনেও ঘটেছিল। সে সময়ে মাতুব্বর ইসলামের অপব্যাখ্যায় বিচলিত হয়েছিলেন।

আরজ আলী মাতুব্বর জ্ঞানের ক্ষেত্রে যুক্তি ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেছেন, কোনো স্বজ্ঞাভিত্তিক ব্যাখ্যাকে তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। তিনি ধর্মের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান নির্ভর জ্ঞান অর্থাৎ যুক্তিভিত্তিক ও অভিজ্ঞতা নির্ভর জ্ঞানের দাবি করেন। তার আলোচনা থেকে এটাই স্পষ্ট—তিনি অন্ধবিশ্বাস দিয়ে ধর্মের প্রতি অনুরক্ত যারা, তাদের যুক্তিনির্ভর বিশ্বাসের প্রতি আহ্বান করেছিলেন তার সত্যের সন্ধান গ্রন্থে। ধর্মতত্ত্ব ও থিওডেসি ধর্মের যে দিকগুলো আলোচনায় নিয়ে আসে, সেগুলো সম্বন্ধে মাতুব্বর জানতে উদগ্রীব ছিলেন।

মাতুব্বর মানবতাবাদী ধ্যান-ধারণার অধিকারী ছিলেন, এ মানবতাবাদী ধ্যান-ধারণা ধর্মীয় ভাবধারা থেকে মুক্ত ছিল। এ জন্যেই তিনি ধর্মের প্রচলিত ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট ছিলেন না। সাধারণ মানুষের জন্যে এসব ধর্ম যে ব্যাখ্যা দিয়েছে সেসব  ব্যাখ্যা সম্বন্ধে তিনি সংশয়ী ছিলেন। যুক্তি প্রয়োগে সেসব ব্যাখ্যা বোঝার চেষ্টা করেছেন। ধর্মের প্রচলিত ব্যাখ্যাকে অনুধাবন করতে গিয়ে তাই তিনি ধর্মের বিপক্ষে বিজ্ঞানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন।  তিনি বাস্তববাদী দার্শনিক মত প্রকাশ করেছেন বস্তু জগতকে জানার বিষয়ে। তাত্ত্বিক দিক থেকে পারিপার্শ্বিক জগত সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানের একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় বাস্তববাদ থেকে। বাস্তববাদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা আমরা পেয়েছি দর্শনের জ্ঞানবিদ্যক শাখায়। তার ব্যাখ্যাকে আমি কাণ্ডজ্ঞান বাস্তববাদ বলব। বাহ্য জগত সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণনির্ভর বলে কাণ্ডজ্ঞান বাস্তববাদ ব্যাখ্যা করে। আরজ আলী মাতুব্বর বাহ্য জগত সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় নির্ভর বলে দাবি করেন।  তিনি দাবি করেন যে, ‘যাহা প্রত্যক্ষ তাহা সর্বদাই বিশ্বাস্য। মানুষ যাহা কিছু প্রত্যক্ষ করে, তাহা তাদের চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা, ত্বক ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যেই করে এবং যাহা কিছু প্রত্যক্ষ করে, তাহাই বিশ্বাস করে। আমি স্বচক্ষে যাহা দেখিয়াছি, স্বকর্ণে যাহা শুনিয়াছি, স্বহস্তে যাহা স্পর্শ করিয়াছি তাহাতে আমার সন্দেহের অবকাশ কোথায়? যাহা আমাদের প্রত্যক্ষীভূত, তাহাতেই আমাদের অটল বিশ্বাস’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৪)।

জ্ঞানবিদ্যক দিক থেকে তার এ মতকে কাণ্ডজ্ঞান বাস্তববাদ বলা যায়। ইন্দ্রিয়নির্ভর জ্ঞানের ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কিন্তু, ইন্দ্রিয় থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের দুর্বলতা হলো, এখানে যে ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণ সবসময় আমাদের জগৎ সম্বন্ধে যথার্থ খাঁটি সত্যটা না জানিয়ে প্রবঞ্চিত করতে পারে, মনোবিজ্ঞানে যেটাকে অধ্যাস বা ভ্রান্ত প্রত্যক্ষণ এবং  অলীক প্রত্যক্ষণ বলা হয়।

আরোহ পদ্ধতি
দর্শনে সত্যকে জানার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। দার্শনিকরা অন্যান্য পদ্ধতির মাঝে সাধারণত আরোহ ও অবরোহ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। অভিজ্ঞতার জগৎ থেকে বিভিন্ন উপাত্ত নিয়ে আরোহ পদ্ধতিতে সত্যকে তুলে ধরা হয়। অভিজ্ঞতার জগতে আমরা যা দেখি, তা যদি বারংবার একই বিষয়কে তুলে ধরে, তবে তাকে সত্য বলে বিচার করা যায়। মাতুব্বর সত্যের অনুসন্ধান করেছেন প্রত্যক্ষণকে মানদণ্ড ধরে। তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞান প্রত্যক্ষ ও অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে আমাদের সন্দেহ নেই। বিজ্ঞান যাহা বলে, তাহা আমরা অকুণ্ঠচিত্তে বিশ্বাস করি। কিন্তু অধিকাংশ ধর্ম এবং ধর্মের অধিকাংশ তথ্য অন্ধবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অধিকাংশ ধর্মের বিধি-বিধান প্রত্যক্ষ বা অনুমানসিদ্ধ নহে।’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৪-৫৫)।  প্রত্যক্ষণমূলক বিজ্ঞানের জ্ঞানের সঙ্গে তিনি ধর্মীয় জ্ঞানের একটা তুলনা করেন এখানে। আমি মনে করি, ধর্ম সম্পর্কিত এ তুলনাটা যথার্থ নয়। প্রথমত, বিজ্ঞানের জ্ঞান সব সময় অকাট্য হয় না;  এমন নজির রয়েছে, কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব একসময় যা সত্য বলে গণ্য ছিল, পরবর্তীকালে তা-ই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি এটা স্বীকারও করেছেন এই বলে যে, ‘এক যুগের বৈজ্ঞানিক সত্য আরেক যুগে মিথ্যা প্রমাণিত হইয়া যায় এবং যখনই উহা প্রমাণিত হয়, তখনই বৈজ্ঞানিক সমাজ উহাকে জীর্ণবস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করেন ও প্রমাণিত নূতন সত্যকে সাদরে গ্রহণ করেন।’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫২-৫৩)। দ্বিতীয়ত, আরোহ পদ্ধতিতে আমরা যে সত্য পাই, তা সম্ভাব্য সত্য, শাশ্বত সত্য নয়। মাতুব্বর ধর্মীয় জ্ঞানের ক্ষেত্রে আরোহ পদ্ধতিতে যে অকাট্য সত্যকে অন্বেষণ করেছেন, তা আরোহের সমস্যার কারণে যথার্থ প্রমাণযোগ্যতা দাবি করতে পারে না। সত্যকে প্রমাণযোগ্য হতে হবে এমন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিজ্ঞানের সত্যের মতো ধর্মীয় সত্যকেও একই মানদণ্ডে বিচার করেছিলেন বলে এই ত্রুটি তার আলোচনায় ঘটেছে বলে মনে করা যায়।

মাতুব্বর এমন একটা পূর্বানুমান দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন—প্রত্যক্ষণ ও অনুমান হলো জ্ঞানের আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত কিন্তু ধর্মীয় চিন্তা এমন ধরনের যা প্রত্যক্ষণ ও অনুমান দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। যেহেতু ধর্মীয় বিষয়কে প্রত্যক্ষণ ও অনুমান দিয়ে বৈধতা দেওয়া যায় না, তাই ধর্মীয় চিন্তা কুসংস্কারের উদ্ভব ঘটায় বলে তিনি মনে করেন। আরজ আলী মাতুব্বরের এ পর্যায়ের আলোচনায় একটা ভ্রান্তি ঘটেছে বলা যায়। এই ভ্রান্তিটা হলো শ্রেণী বিভ্রান্তি; যেখানে বলা হয়, ভিন্ন থাকা সত্ত্বেও দুটি বক্তব্য বা ধারণাকে যখন একই মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তখন একটা যৌক্তিক ভ্রান্তি ঘটে। এক শ্রেণীর যে বৈশিষ্ট্য, তা যদি ভিন্ন শ্রেণীর ওপর আরোপ করা হয় তবে তা একটা ভ্রান্তি ঘটায় অথবা যখন কোনো বস্তু যে শ্রেণীর নয়, সে শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখনো একটা ভ্রান্তি ঘটে, যেমন, রঙের সঙ্গে শব্দের বা সত্যের সঙ্গে প্রশ্নের। (Honderich, T., ed., The Oxford Companion to Philosophy, Oxford: Oxford University Press, 1995, p. 126)। আমরা যখন বিজ্ঞানের কথা বলি, তখন  জ্ঞানের এমন একটা দিককে নির্বাচন করি, যা ইন্দ্রিয় সংবেদনের মাধ্যমে জানাকে বোঝায় অথবা পরীক্ষণের মাধ্যমে জানাকে বোঝায়। কিন্তু ধর্মের বিষয়টা আলাদা। এটা বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বাস হলো ধর্মীয় জ্ঞানের ভিত্তি। সে জন্যই ধর্মীয় জ্ঞানকে বিজ্ঞানের জ্ঞানের আওতায় এনে যাচাই করা যুক্তিযুক্ত হয় না। একটা সাদৃশ্যমূলক যুক্তি এখানে দেওয়া যায়। ডেভিড হিউম বলেছিলেন, নীতিবিদ্যা ‘উচিত’ জাতীয় বাক্য ব্যবহার করে। ‘উচিত’ জাতীয় বাক্যগুলো ‘হয়’ জাতীয় বাক্য থেকে ভিন্ন ধরনের, এ দুটোকে এক করা যাবে না, করলে এখানে একটা ভ্রান্তি ঘটবে। জি. ই. ম্যুর এ ভ্রান্তিকে প্রাকৃতিকীয় অনুপপত্তি বলেছেন। মাতুব্বরের আলোচনায় প্রাকৃতিকীয় অনুপপত্তি ঘটেনি কিন্তু শ্রেণী বিভ্রান্তি ঘটেছে বলে আমি মনে করি।

আরজ আলী মাতুব্বর যে দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন, তা হলো ধর্মীয় জ্ঞানের একটা সর্বজনীন দিক থাকতে হবে, ধর্মীয় জ্ঞান যেন সর্বজন গ্রাহ্য হয় এবং শুধু বিশ্বাস নয় বিশ্বাসের যৌক্তিক ভিত্তি দিয়ে জ্ঞানসর্বস্ব করতে হবে। সত্যের সন্ধান পড়তে গিয়ে কখনো মনে হবে যে তার অভিমত নিতান্তই সাদাসিধা গভীরতাশূন্য; কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তা নয়। তার উপস্থাপনের ভঙ্গিমা সাদাসিধা কিন্তু চিন্তার গভীরতা আমাদের আকৃষ্ট না করে পারে না। তিনি বলেন, কৃষিকাজে জাপানিদের যন্ত্রের ব্যবহার জাপানকে একটা প্রগতিশীল দেশে উন্নীত করেছে কিন্তু জাপানিরা অধার্মিক; অন্যদিকে, বাংলাদেশের কৃষক সমাজ ধার্মিক অথচ দরিদ্র। তাহলে কি আমরা আমাদের প্রগতির জন্যে আল্লাহর দয়ার ওপর নির্ভর করব? মাতুব্বরের দেওয়া এ উদাহরণটা খুবই তুচ্ছ মনে হতে পারে কিন্তু এর গভীরে রয়েছে তার ঐকান্তিক চেষ্টা। সাধারণ মানুষকে ধর্মের অপব্যাখ্যা থেকে ফিরিয়ে এনে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা আর বিজ্ঞানমনস্ক বলতে আমরা বুঝি স্বচ্ছ চিন্তা ও কুসংস্কারমুক্ত চিন্তা। বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে ধর্মকে যেভাবে প্রচার করা হয়েছে, যেভাবে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে, আরজ আলী মাতুব্বর সে উপস্থাপনা/ব্যাখ্যা সম্বন্ধে প্রশ্ন রেখেছেন। কিন্তু প্রশ্ন রাখার ভঙ্গিমাটা তাকে ধর্ম সম্বন্ধে সংশয়বাদী করেছে।

বাংলাদেশ এক দশক আগে আর্থ-সামাজিক যে অবস্থানে ছিল, বর্তমানে সে অবস্থানে নেই। আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে এখন মানুষের চিন্তা-ভাবনায় যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা আগে ছিল না। বাংলাদেশের অপ্রগতিশীল অবস্থার নানা কারণ রয়েছে। প্রধানত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অসুবিধাজনক অবস্থা মানুষকে ধর্ম বিশ্বাসের দিকে টেনে নিয়ে যায়। শিক্ষাবঞ্চিত মানুষ সহজে ধর্মীয় আবেগ দিয়ে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের সময় থেকে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার জন্যেও মানুষ ধর্মীয় ভাবধারাকে মেনে নেয়। শাসন ও শোষণের এ অবস্থা সহজেই কাটেনি স্বাধীনতার পরেও। অপ্রগতিশীল বা প্রযুক্তিহীন সমাজের জন্যে তাই ধর্মকেই কেবল দায়ী করা যায় না, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থাও দায়ী।

আরজ আলী মাতুব্বরের আলোচনায় অন্যান্য দিক ছাপিয়ে কেবল ধর্মের দিকই গুরুত্ব পেয়েছে সত্যের সন্ধান গ্রন্থে। কিন্তু কেন? এ আলোচনা তার দার্শনিক মতের সদর্থক মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত। তিনি চেয়েছেন ধর্মীয় শিক্ষা ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি মানুষ নিষ্ঠাবান হোক, একইসঙ্গে মানুষের কাছে এ বাণী পৌঁছাতে চেয়েছেন,  কেন আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে তারা দরিদ্র জনগোষ্ঠী হয়ে পড়েছে।

জ্ঞানবিদ্যা ও ধর্ম
আরজ আলী মাতুব্বরের অনুসন্ধান ছিল—সত্য কী? তার মতে, একই বস্তু বা ঘটনা দুভাবে সত্য হতে পারে না। তিনি বলেন যে, ‘কোনো বিষয় বা কোনো ঘটনা একাধিকরূপে সত্য হইতে পারে না। একটি ঘটনা যখন দুই রকম বর্ণিত হয়, তখন হয়ত উহার কোন একটি সত্য, অপরটি মিথ্যা অথবা উভয়ই সমরূপ মিথ্যা; উভয়ই যুগপৎ সত্য হইতে পারে না—হয়ত সত্য অজ্ঞাতই থাকিয়া যায়।’ (মাতুব্বর, আরজ আলী, পৃ. ৫০)। সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্বন্ধে অথবা আদর্শ নিয়ে মত পার্থক্য (অভিমত) থাকতে পারে কিন্তু সত্য নিয়ে মত পার্থক্য থাকতে পারে না। সত্য ও অভিমত যে এক নয়, পৃথক এ বিষয়টি আমাদের কাছে তুলে ধরেন তিনি। প্লেটোর সময় থেকে আমরা জানি, অভিমত যৌক্তিক ভিত্তিহীন এবং আবেগ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এ কারণে অভিমত ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভিন্ন হয়ে থাকে কিন্তু সত্য সবার জন্যে এক ও অভিন্ন হয়। আরজ আলী মাতুব্বর জ্ঞান, সত্য ও বিশ্বাস নিয়ে বিচলিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন,

‘‘জ্ঞানের সহিত বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক। বরং বলা হইয়া থাকে যে, জ্ঞানমাত্রেই বিশ্বাস। তবে যে কোন বিশ্বাস জ্ঞান নহে। প্রত্যক্ষ ও অনুমানের ওপর যে বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত, তাহাকেই জ্ঞান বলা হয়। প্রকৃত প্রস্তাবে ইহাই খাঁটি বিশ্বাস। পক্ষান্তরে, যে বিশ্বাস কল্পনা, অনুভূতি, ভাবানুসঙ্গ বা কামনার উপর প্রতিষ্ঠিত তাহা জ্ঞান নহে। তাহাকে অভিমত বলা হইয়া থাকে। চলতি কথায় ইহার নাম ‘অন্ধ-বিশ্বাস’। সচরাচর লোকে এই অন্ধ-বিশ্বাসকেই ‘বিশ্বাস’ আখ্যা দিয়া থাকে। কিন্তু যাহা খাঁটি বিশ্বাস, তাহা সকল সময়ই বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা প্রসূত, প্রত্যক্ষ ও অনুমানের উপর প্রতিষ্ঠিত।’’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৪)।

এই উদ্ধৃতি আমাদের কাছে এটাই প্রমাণ করে যে সত্য বিশ্বাস হলো জ্ঞানের অংশ। এমন নয় যে বিশ্বাস মাত্রই জ্ঞান রূপে গ্রহণযোগ্য, জ্ঞান হতে হলে তা সত্য হতে হবে— প্রমাণযোগ্য হতে হবে। অভিমতকে তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। তিনি দাবি করেন, অভিমতের উৎস হলো কল্পনা অথবা আবেগ। কল্পনা কী? কল্পনা হলো, এমন যা বাস্তবের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয় নতুবা এমন কিছু নির্দেশ করে, যা বাস্তবে অস্তিত্বশীল নয়। অনুভূতি বা আবেগ ব্যক্তি ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তনশীল, বৈচিত্র্যময়; সত্য এমনটা নয়, সত্য কখনোই কল্পনা বা পরিবর্তনশীল হয় না। সত্য সম্পর্কিত তার এ আলোচনা খুবই যুক্তিযুক্ত।

আরজ আলী মাতুব্বরের এ আলোচনা দর্শনের জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ; এখানে বলা হচ্ছে জ্ঞান হলো প্রমাণযোগ্য সত্য বিশ্বাস। থিটেটাস গ্রন্থে প্লেটো এমনটা বলেছেন, জ্ঞান হলো সত্য বিশ্বাস। বিশ শতকে সত্য বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসের প্রমাণযোগ্যতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তবে এ প্রসঙ্গে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বিতর্ক রয়েছে। রডরিক চিজম একভাবে জ্ঞানের আলোচনা করেছেন, আবার, গ্যাটিয়ার প্রমাণযোগ্য সত্য বিশ্বাসের বিপক্ষে কালজয়ী আলোচনা করেছেন। মাতুব্বর মনে করেন, বিশ্বাস যদি সত্য না হয়, তবে তা শুদ্ধ জ্ঞান হতে পারে না, এমন বিশ্বাস অন্ধ বিশ্বাসে পরিণত হয়; অন্ধ বিশ্বাস অযৌক্তিক। দর্শনের ছাত্র হিসেবে আমরা জানি যে জ্ঞানের পূর্ব শর্ত হচ্ছে সত্য বিশ্বাস।  তিনি মনে করেন, বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের আকর্ষণ এ কারণে ঘটে, ‘বিজ্ঞান প্রত্যক্ষণনির্ভর অথবা বাস্তব এবং ন্যায়সম্মত অনুমান আশ্রিত’ এবং এ কারণে বৈজ্ঞানিক সত্য সংশয়ের ঊর্ধ্বে। বিজ্ঞানের সঙ্গে তুলনা করলে বলতে হয়, ধর্মের ভিত্তি হলো অন্ধ বিশ্বাস। এভাবে তিনি বিজ্ঞান ও ধর্মের মাঝে পার্থক্য করে বলেন, বিজ্ঞান হলো অভিজ্ঞতামূলক এবং ধর্ম হলো অন্ধ বিশ্বাসমূলক।

মাতুব্বরের বক্তব্যকে ধর্মতত্ত্বের পরিপ্রক্ষিতে বিবেচনা করলে একটা ত্রুটি এখানে দেখা যায়। তাহলো ধর্মতত্ত্ব অনুসারে ধর্মের মূল নীতিগুলোর প্রতি বিশ্বাস ধর্মকে জানার জন্যে একটা মানদণ্ড কিন্তু তা অন্ধ বিশ্বাস নয় তা নির্বিচারবাদী। ধর্মতত্ত্ব ধর্মের নীতিগুলোকে ব্যাখ্যা দেয়; ধর্মীয় ইনস্টিটিউটগুলো যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ধর্মীয় আইন-কানুনগুলোর ব্যাখ্যা দেয়। ধর্মীয় গ্রন্থগুলো থেকে সামাজিক চলাচলের বিধিনিষেধ নিয়ে ধর্মীয় আইনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ধর্ম ভিত্তিক ইনস্টিটিউট থেকে। যুগে যুগে বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিকরা এসব ব্যাখ্যার মাধ্যমে ধর্মীয় আইনকে যুক্তি দিয়ে সর্বজনীন আইন হিসেবে বৈধতা দিয়েছেন। ইসলাম ধর্মের আইন হিসেবে প্রথম দিকে কোরআন ও সুন্নাহকে আইনের উৎস হিসেবে স্বীকার করা হতো, পরবর্তীকালে এগুলোর সঙ্গে ইল্ম (শিক্ষা) এবং ফিকাহ্ (বোধ) দুটি নতুন নীতি সমন্বিত করা হয় (ইসলাম, ড. আমিনুল, মুসলিম ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন, ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৩, পৃ. ৪৫)। ইসলামি আইনের ক্রমবিকাশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে কোরআন ও সুন্নাহর পাশাপাশি ইজমা এবং ইজতিহাদের প্রচলন থেকে এক সময় সুসংবদ্ধ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন সম্ভব করে তোলে। ইসলাম ধর্মীয় জ্ঞান একটা পর্যায়ে ব্যক্তিনিষ্ঠতার গণ্ডি পেরিয়ে সর্বজনীন জ্ঞানে পরিণত হয় এবং ফিকাহ্ যা ছিল প্রাথমিক অবস্থায় ব্যক্তিনির্ভর উপলব্ধি, পরবর্তীকালে তা সর্বজনীন বস্তুনিষ্ঠ আইনবিজ্ঞানে পরিণতি লাভ করে। (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬)।

মহানবীর পরবর্তী সময়ে আইনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ক্বারি (শিক্ষক) বা ওলামা এবং মুফতি হিসেবে নিয়োজিত হতেন যারা। ইসলামি আইন প্রণেতারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন; তারা অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন না। ইসলামি ধর্মতত্ত্ব যুক্তি ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা দিয়েছে, আইন প্রণয়ন করেছে। অসুবিধাটা হলো বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ধর্মতত্ত্ব বহির্ভূত ইসলামি ব্যাখ্যা দিচ্ছেন এমন কিছু ব্যক্তিবর্গ যারা কোরআন ও সুন্নাহ্র জ্ঞান সম্পর্কে সঠিকভাবে জানেন না। সুশৃঙ্খল যুক্তি প্রয়োগ না করেই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এমন ব্যক্তিবর্গ ইসলামি আইনের অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের সামাজিক জীবনে নানা সমস্যার সৃষ্টি করেছেন। আরজ আলী মাতুব্বর এ দিকটিকে নির্দেশ করেছেন।

আরজ আলী মাতুব্বর বাংলাদেশে ইসলামি আইনের প্রাতিষ্ঠানিক সর্বজনীন ব্যাখ্যা খুঁজেছেন। তার আলোচনা থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, দেশের সর্বত্র ধর্মীয় অপব্যাখ্যাকারীদের পরিহার করে কিভাবে সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃত ইসলামি আইনপন্থী ব্যাখ্যা জানানো যায় তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন এ কাজটি করতে পারে। ইসলামি আইন শিক্ষায় পারদর্শী ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন নিয়োগ দিতে পারে। মাতুব্বর যে দিকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন তা হলো ইসলামি আইনের সঠিক ব্যাখ্যা ও সর্বজনীনতা। সর্বজনীনতা কোনো ব্যাখ্যাকে যুক্তিবিচারে সিদ্ধ করে মানুষের কাছে তুলে ধরে যা সংশয় দূর করতে সাহায্য করে।

মাতুব্বর আরেকটি দিকের প্রতিও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি ধর্মের নৈতিক শিক্ষা ও শৃঙ্খলার দিকটিও তার আলোচনায় নিয়ে আসেন। যদিও বিভিন্ন ধর্ম মূল নীতি নিয়ে আলাদা হয়েছে কিন্তু নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার বিষয়ে সব ধর্মের মাঝেই ঐক্য আছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ‘ধর্মজগতে এমন কতগুলি বিধি-নিষেধ, আচার-অনুষ্ঠান ও ঘটনাবলীর বিবরণ পাওয়া যায়, যাহার যুক্তিযুক্ত কোন ব্যাখ্যা সাধারণের বোধগম্য নহে। তাই সততই মনে কতগুলি প্রশ্ন উদয় হয় এবং সেই প্রশ্নগুলির সমাধানের অভাবে ধর্মের বিধি-বিধানের উপর লোকের সন্দেহ ও অবিশ্বাস জন্মে। ফলে ধর্মের বিধি-বিধানের উপর লোকের শৈথিল্য ঘটে’ (মাতুব্বর, ড়ঢ়. পরঃ., পৃ. ৫৮)। সব ধর্মেই কিছু নিয়ম-কানুন, বিধি-নিষেধ, আনুষ্ঠানিকতা, পালা-পার্বন থাকে। মাতুব্বর মনে করেন যে, কিছু উৎসব পালা-পার্বন আছে যেগুলোর কোন যৌক্তিকতা নেই। সাধারণ মানুষ ধর্মীয় আচার এবং বিধি-নিষেধ, পালা-পার্বন মেনে চলে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে আচার-আচরণের বিধি-নিষেধের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয় না বলে বিশ্বাস থাকলেও মানুষ নীতিগুলো পালন করে না বা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়।

মাতুব্বর ধর্মকে পরিষ্কার ও স্পষ্ট করে জানার জন্যে অনুসন্ধানী মন নিয়ে ধর্মগ্রন্থগুলো পড়েছেন। ধর্ম নিয়ে যে জ্ঞান তিনি অর্জন করেন তা থেকে তিনি উপলব্ধি করেন যে ধর্ম-চর্চায় মানুষের ভুল বুঝাবুঝি ঘটে যেহেতু মানুষের মাঝে ধর্ম নিয়ে জ্ঞানের অভাব রয়েছে; আর এই জ্ঞান বলতে আমরা বুঝি সত্যকে। মাতুব্বর দাবি করেন যে ধর্মের জগতে স্বাধীন চিন্তার সুযোগ অপরিসর। তাঁর মতে ধর্মীয় জ্ঞান অর্থাৎ ধর্মীয় সত্যের ভিত্তিতে থাকবে যুক্তি কারণ যুক্তিই পারে স্ববিরোধিতাকে মোচন করতে, যুক্তির জন্যে কোন অসমন্বিত চিন্তার উদ্ভব ঘটার আশঙ্কা থাকে না।

উপরোক্ত আলোচনার শেষে এটা বলা যায় যে আরজ আলী মাতুব্বর ধর্মকে অস্বীকার করেননি কিন্তু যুক্তি ভিত্তিহীন ধর্মীয় মতাদর্শকে তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেননি। তিনি ধর্ম বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেননি কিন্তু ধর্মীয় অন্ধ বিশ্বাসের বিষয়ে এবং ধর্মীয় আচার-আচরণের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ধর্ম নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে যে জ্ঞান তা-কি যথার্থ অর্থে জ্ঞান সেই প্রশ্ন তিনি উত্থাপন করেছেন। জ্ঞান সম্পর্কিত বিজ্ঞান ও ধর্মীয় অনুসন্ধানের মাঝে যে বিভেদ আছে তা নিয়ে তিনি সংশয়ী ছিলেন। তিনি বলেন,

‘‘আধুনিককালের অধিকাংশ মানুষ চায় কুসংস্কার হইতে মুক্তি, চায় সত্যের সন্ধান। ধর্মরাজ্যের যত্রতত্র অল্পাধিক কুসংস্কার স্বচ্ছন্দে বিহার করিতেছে। আবার সভ্য মানব সমাজে এমন কোন মানুষ নাই, যিনি কোনও না কোন ধর্মের আওতাভুক্ত নহেন। কাজেই এমন মানুষও অল্পই আছেন, যাঁহাদের কোনরূপ কুসংস্কার স্পর্শ করে নাই। … কোন রকম গোঁড়ামীকে প্রশ্রয় না দিয়া প্রত্যেক ধর্মকে যথাসম্ভব কুসংস্কারমুক্ত করা উচিত। কুসংস্কার ত্যাগ করার অর্থ ‘ধর্মকে ত্যাগ করা’ নহে। যদি কেহ কুসংস্কার ত্যাগ করিতে অনিচ্ছুক হন এবং বলিতে চাহেন যে, কুসংস্কার ত্যাগ করিলে ধর্ম থাকিবে না, তাহা হইলে মনে আসিতে পারে যে, ধর্মরাজ্যে কি কুসংস্কার ভিন্ন আর কিছুই নাই? এ প্রসঙ্গে কেহ যেন মনে না করেন যে, আমরা ধর্মের বিরুদ্ধাচারণ করিতেছি। আমাদের অভিযান শুধু অসত্য বা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, কোন ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। প্রত্যেকটি ধর্ম থাকিবে মিথ্যার আবর্জনাবর্জিত ও পবিত্র সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।’’ (মাতুব্বর,  পৃ. ১৩৫-১৩৬)।

 তিনি নাস্তিক ছিলেন এমনটা এ গ্রন্থের কোথাও তিনি দাবি করেননি। তবে তিনি ধর্ম সম্বন্ধে অনেক প্রশ্ন রেখেছেন। কিন্তু ধর্ম বিষয়ে তাঁর অনুসন্ধান ছিল ধর্মীয় সত্যের স্বরূপ উদঘাটন করা—এই সত্য কি অন্ধ বিশ্বাস ভিত্তিক? ধর্মীয় সত্য কি যৌক্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য? ধর্মের ভিত্তি বিশ্বাস হলেও তা কুসংস্কারপূর্ণ বিশ্বাস হতে পারে না, এ বিশ্বাসের যৌক্তিকতা দেওয়ার প্রকৃত প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকা ঠিক নয়। মধ্য যুগে বিভিন্ন দার্শনিকরাও ইসলাম ধর্মের যুক্তিসিদ্ধ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইসলাম ধর্মকে কুসংস্কারমুক্ত করার জন্যে জ্ঞানের বাহন যে যুক্তি তা দিয়ে  ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা তাঁর মধ্যে প্রবল ছিল।

মানবতাবাদ
আরজ আলী মাতুব্বর মানবতাবাদী দার্শনিক ছিলেন। মানবতাবাদ জগতকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মানব সমাজকে গুরুত্ব দিয়েছে। এ জগতে মানুষের মর্যাদা ও অস্তিত্ব কেন্দ্রিক বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করেছে এ মতবাদ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় বিশ্বেই সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের স্থান নির্ধারণ করাটা দার্শনিকদের চিন্তায় প্রাধান্য পেয়েছে। মানুষকে কেন্দ্র করে চিন্তা-চেতনা গুরুত্ব পেয়েছে। মানবতাবাদ প্রত্যয়টি উনিশ শতকে প্রসার লাভ করে। মানবতাবাদ কেবল তত্ত্ব নয় এটা হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি, এ দৃষ্টিভঙ্গি কিছু বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে আর এগুলো হলো স্বাধীনতা, সমতা, সহনশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও বিশ্বজনীনতা। (Audi, R., ed., The Cambridge Dictionary of Philosophy, Cambridge: Cambridge University Press, 1999, p. 397)

মানবতাবাদ মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও অধিকারের ব্যাখ্যা দিয়েছে রেনেসাঁর সময় থেকে। রেনেসাঁর উদ্ভব ঘটেছিল মানুষের কর্তৃত্বকে উচ্চে তুলে রাখার মনোভাব থেকে। বিজ্ঞান ও ধর্মের দ্বন্দ্বের কারণে ঊনবিংশ শতাব্দীতে মানুষের স্বার্থকে কেন্দ্র করে মানবতাবাদ সাড়া জাগিয়েছিল। এ সময়ে ডারউইনের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিজ্ঞান ও ধর্মের দ্বন্দ্ব চরম রূপ নেয়; মানবতাবাদকে অনেক সময় বিজ্ঞানসম্মত মানবতাবাদও বলা হয় যেহেতু মানবতাবাদ প্রত্যাদেশের উপর গুরুত্ব বাতিল করে যুক্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে; প্রাকৃতিক জগত, মানুষের স্বরূপ, মানুষের লক্ষ্য এবং নৈতিকতার ভিত্তি ইত্যাদি সম্বন্ধে মানবতাবাদ প্রত্যাদেশ বা ধর্মের বিপরীতে যুক্তিকে  স্থান দিয়েছে (Honderich, T., ed., op. cit., p. 376)| মানবতাবাদের এমন ব্যাখ্যার সাথে মাতুব্বরের চিন্তা-চেতনার গভীর ছাপ লক্ষ করা যায়। এমন চিন্তা-চেতনা থেকেই মানুষের কল্যাণের জন্যে তিনি তাঁর মরনোত্তর দেহকে দান করে গেছেন।

দর্শনের উদ্ভব ঘটে বিস্ময় এবং কৌতূহল প্রবণতা থেকে; বিস্ময় আর কৌতূহল আমাদেরকে জানার দিকে নিয়ে যায় অর্থাৎ সত্যকে আবিষ্কার করার পথে নিয়ে যায়। এ আলোচনায় আমরা দেখেছি আরজ আলী মাতুব্বরের মাঝে দর্শন চিন্তার উপরোক্ত দিকগুলো ছিল এবং তিনি সত্য উদঘাটনে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। আমরা জানি যে একজন দার্শনিক তাঁর যুগের ফসল। এ সম্পর্কে রাসেল বলেন যে,

কোন একটা যুগ বা কোন একটা জাতিকে বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে এর দর্শনকে আর এর দর্শনকে বুঝতে হলে আমাদেরকেও কিছু মাত্রায় দার্শনিক হতে হবে। এখানে একটা পারস্পরিক কারণিক দিক আছে: যে পারিপার্শ্বিকতায় মানুষ বাস করে তা বহু মাত্রায় তাদের দর্শনকে ধার্য করে, কিন্তু আবার বিপরীতভাবে (এটাও বলা যায় যে) তাদের দর্শনও বহু মাত্রায় তাদের পারিপার্শ্বিকতাকে নির্ধারণ করে i (Russell, B., History of Western Philosophy, London: George Allen & Unwin, 1965, p. 14)।

আরজ আলী মাতুব্বরকে আমরা পেয়েছি তার পারিপার্শ্বিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন অবস্থার বিপক্ষে সংগ্রামরত পরিপক্ক একজন দার্শনিক হিসেবে। আমাদের কোন দ্বিধা নেই এ বিষয়কে স্বীকার করে নিতে যে আরজ আলী মাতুব্বরের সত্যের সন্ধান গ্রন্থটি তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে। কিন্তু ঐ সামাজিক অবস্থাটা এখন নেই তা বলা যাবে না। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের আচার অনুষ্ঠান বিধি-নিষেধের মূলে কুঠারাঘাত করে বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ার দিকেই তার চিন্তা ছিল।

দার্শনিক চিন্তা বলতে আমরা বুঝি পদ্ধতি নির্ভর এবং জ্ঞানবিদ্যক চিন্তা— মাতুব্বরের ব্যাখ্যায় দুটি দিকই স্পষ্টভাবে আছে। আমার আলোচনায় ব্যাখ্যা করেছি যে মাতুব্বর আরোহ পদ্ধতিকে ব্যবহার করেছেন সত্য বিশ্বাসের অনুসন্ধানে এবং একই সাথে আমি এটাও ব্যাখ্যা করেছি যে তিনি সত্যকে তুলে ধরতে যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি জ্ঞানের সংজ্ঞা দিয়েছেন “সত্য বিশ্বাস” রূপে এবং ধর্মীয় জ্ঞান নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ সংজ্ঞার প্রয়োগ আছে কি না—এমন আলোচনার প্রয়োজনীয়তাকে তাৎপর্যময় করে তুলেছেন তার গ্রন্থে। আমি তাই বলতে চাই—আমরা দর্শন ও দার্শনিক বলতে যা বুঝি, সে মানদণ্ডে আরজ আলী মাতুব্বর অন্যতম বাংলাদেশি দার্শনিক।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন