ঈশ্বরের দূত ও অন্যান্য ॥ চাণক্য বাড়ৈ | চিন্তাসূত্র
৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ | বিকাল ৫:০৭

ঈশ্বরের দূত ও অন্যান্য ॥ চাণক্য বাড়ৈ

বাদাবন
মাটির মানুষ আমি, খাটি দিনরাত। কোদাল চালাতে গিয়ে ঘামি। জল আর কাদা মেখে হই একাকার।  ক্লান্তহই।  আমার ক্লান্তিও ধরে মাটি। এই মাটি, ঘাসের মখমল বিছিয়ে রাখে মাঠে। শহরে যে বন্ধুরা থাকে, তাদেরও বলেছি এই কথা, ‘একবার আয় আমাদের গ্রামে, সারারাত ঘাসের বিছানায় শুই, কথা কই তারাদের দিকে চেয়ে…’

আমি যার গেঁয়ো প্রেমিক, তাকে পাঠাই ফুল। নীল নীল ঘাসফুল সব। নাচের স্কুলে পড়ে সে। শহরের রঙিন মঞ্চে তার উত্তরীয় ওড়ে। তার কথা ভেবে সারারাত জাগি—আকাশে অসংখ্য তারা। তাদেরও তো নাম আছে, ধাম আছে, আলো আছে আলাদা আলাদা।

দক্ষিণে বাদাবন। বাঘের ডাকে ঘুম ভাঙে গভীর কোনো রাতে। বাঘটার মুখে ধরা হরিণীকে ভেবে সারারাত কাঁদি, গোধূলির মেঘের মতো লাল হয় চোখ। কোদাল কোপাতে গিয়ে অসাবধানে ভাঙে যদি শামুকের ডিম, তখনো তো কেঁদে কেঁদে এ বুক ভাসাই।

বাদাবন পেরিয়ে গেলে অথৈ সাগর। আমার বাল্য বন্ধু সুধাকর যায়। ইলিশের মরসুম এলে প্রতিবার নৌকা ভাসায়। কূল নেই। জল তার আকাশে মিলেছে, নাকি আকাশ মিশেছে ওই জলে, এত দিন সমুদ্রে গেল, সুধাকর আজও তার পায়নি জবাব। ঘাম আর চোখের জলের মতো তার স্বাদ—ও কেবল এতটুকু জানে।

আমারও ইচ্ছে করে সমুদ্রে যাবার, শুধু প্রেমিকা ছাড়ে না। কেবলই শাসনে রাখে। এখানে-সেখানে যাই, মাঠ-ঘাট চষি, আনমনে ঘুমিয়ে পড়ি ঘাসে—এসব বারণ করে। আর দেয় নিজের দিব্যি, ‘ওখানে সাপের বাস। শঙ্খিনী, চন্দ্রবোড়া, গোখরার হাঁড়ল— সবুজ ঘাগরা আর ঘুঙুরের দিব্যি দিয়ে বলি, ওখানে যাবে না কিন্তু…’

আমি শুধু হাসি। কে তারে বোঝাবে গিয়ে, এমন বেহুলা আছে যার, তার কি সর্পভয় সাজে?

আমাদের ঘুম

কাস্তে আর কোদাল নিয়ে মাঠে যাই। ধানি জমিতে চারাদের বেড়ে ওঠার বীজমন্ত্র পুঁতে দিয়ে আসি নরোম কাদার ভেতর। আমাদের নিত্যকার প্রার্থনা এই। খেতের পবিত্র হাওয়া আর রোদ আমাদের আয়ুবর্ধক ওষুধ।

এক সুন্দর মুখ আর অসুন্দর তিরস্কার নিয়ে এখনো হাজির হন বায়োলজির ম্যাম। পড়া হয়নি বলে একে একে আমরা বেরিয়ে যেতে থাকি ক্লাসরুম থেকে—যেন দাগি আসামি। অথচ, গেঁয়ো ফসলের পাতা আর রোদের সালোক-সংশ্লেষণ দেখে দেখে দিন কাটে আজ। আল টপকে অকস্মাৎ পালিয়ে গেলে কোনো বেজি, বাস্তু-সংস্থান নড়ে চড়ে ওঠে মাথার ভেতরে।

আমাদের মগজে নেই ক্যালকুলাস, কার্তেসীয় গুণজ—তবু, দিন শেষে ফসলের হিস্যা নিয়ে ফিরি ঘরে। তারপর, ঘুমিয়ে পড়ি ক্লান্তির ভেতর।

আমাদের ঘুম ফসলের সমানুপাতিক।

ঈশ্বরের দূত

বাদার মধুই আমাদের মদ—আর অন্ধকার নেমে আসা রাতের জঙ্গলই আমাদের আশ্চর্য অপেরা— আর বিশ্বাস করো, তোমাদের মতো কোনো নাইটক্লাবের আলো নেই আমাদের চোখে। আছে ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতো ঝরেপড়া জোছনা। বিটোফেন শুনি না কখনো—দিনভর মৌমাছিগুলো আমাদের কানের কাছে গুনগুন করে গান গেয়ে যায়।

বৃষ্টি হলে ঘাসেরাই নাকি বেশি নাচে, এই কথা বলেছিল নাচের স্কুলের বান্ধবী— আমরা তাই, বৃষ্টি এলে বেরিয়ে পড়ি গেঁয়ো ঘাসেদের পাড়ায়— বহুদিন পর জঙ্গল থেকে ফিরে এলে কোনো হারানো মানুষ—তাকে নিয়ে দিনভর উল্লাসে মাতি—বনবিবির পূজা করি, আর গাই পচাব্দী গাজীর গীত—

কেননা, একবার ওই জঙ্গল থেকে ফিরে এলে কেউ, আমাদের কাছে ঈশ্বরের প্রেরিত দূত হয়ে যায়—

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন