সম্পাদকের কাজই সম্পাদনা করা ॥ মামুন রশীদ | চিন্তাসূত্র
৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২১ নভেম্বর, ২০১৮ | দুপুর ১:৫৫

সম্পাদকের কাজই সম্পাদনা করা ॥ মামুন রশীদ

সাহিত্য ও সম্পাদনা বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকলেও, আমরা  অনেকেই তা স্বীকার করি না।  ভাবি, সাহিত্য আবার কিভাব সম্পাদনা করে? এও কি সম্ভব? আমি লিখব, আর সেই লেখা অন্যে কেটেকুটে ঠিক করবে, তাই কি হয়? অথচ সম্পাদনা ছাড়া সাহিত্য তার সঠিক আকার পায় না বলেই আমার ধারণা। এই ধারণার সঙ্গে দ্বিমত থাকবে, সেটা স্বাভাবিক, তবে আমি মনে করি যেকোনো পর্যায়ের সাহিত্যই সম্পাদিত হওয়া উচিত। আমরা যখন লিখি, সেই লেখাকেই সম্পাদনা করে পরিপাটি রূপ দিতে হয়। এক্ষেত্রে সাহিত্য সম্পাদক বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন।

লেখক যখন লিখছেন, তখন তিনি যদি লেখার পর নিজের লেখাটি যথাযথ সম্পাদনা করেন, তাহলেও আবারও সম্পাদনা দরকার। আর না করলে তো অবশ্যই লেখাটি একজন সম্পাদকের হাতে যাওয়া প্রয়োজন।  মোটকথা সম্পাদনা টেবিল ঘুরেই লেখাকে প্রকাশের আলোয় আসা প্রয়োজন। সম্পাদনার ক্ষেত্রে কিছু খুঁটিনাটি বিষয় রয়েছে। শুধু বানানই সংশোধনই সম্পাদনা না। সম্পাদনায় একইসঙ্গে বাক্যগঠন ও অর্থের দিকটিও যেমন দেখা হয়, তেমনি তথ্যের অসঙ্গতিকেও সংশোধন করার দায়িত্ব সম্পাদকের।

প্রকৃতপ্রস্তাবে অভিজ্ঞতার বাইরে এসে যে লেখা, তাতে ভুল থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। যিনি কখনোই গ্রামের পরিবেশ দেখেননি, তার লেখায় কি যথাযথভাবে গ্রামের বর্ণনা ফুটে উঠবে? অথবা যে লেখকের কখনোই পাঁচ তারকা কোনো হোটেলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি, তিনি কি সেই হোটেলের বর্ণনায় নিখুঁত থাকতে পারবেন? আমি যদি ভাঁটফুল না-ই দেখি, যদি বেতফল না-ই দেখি, তাহলে শুধু জীবনানন্দ দাশের বর্ণনা শুনেই কি ভাঁটফুল বা বেতফলের উপমা যথাযথভাবে লেখায় ব্যবহার করা সম্ভব? বেতফলের সঙ্গে যদি পরিচয়ই না থাকে, তাহলে বেতফলের মতো ম্লান চোখ দেখেও, তা চেনা যাবে না।

লেখার প্রয়োজনেই লেখককে অনেক উপমা ব্যবহার করতে হয়, অনেক দৃশ্য বর্ণনা করতে হয় পরিবেশ তৈরির প্রয়োজন থেকে—একজন সম্পাদক এইসব বর্ণনার খুঁটিনাটি ভুলগুলো সংশোধন করে দেন। তথ্যের অসঙ্গতি থাকলে, তা ঠিক করে দেন। বাক্যের ভেতরে গুরুচণ্ডালী দোষ থাকলে তা শুধরে দেন। একইভাবে তিনি বাক্যের ভেতর থেকে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে ভাষাকে দৃঢ় করেন, স্মার্ট করে তোলেন।  একজন সম্পাদকের এই দায়িত্বের সঙ্গে সাহিত্য সম্পাদকের আরও কিছু কাজ যোগ হতে পারে। এই কাজের মধ্যে নতুন লেখক তৈরি করা, লেখককে ধারণা দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া, বিষয়ভিক্তিক লেখা তৈরি করানোও পরতে পারে। তবে সাহিত্য সম্পাদক বলতে যদি আমরা বর্তমানের দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতার সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে বুঝি, তাহলে সম্পাদকের দায়িত্বের অতিরিক্ত কিছু করা তো দূরের কথা, সম্পাদকের দায়িত্বও যথাযথভাবে তারপক্ষে পালন করা কঠিন।

অধিকাংশ লেখক যেভাবে লেখা পাঠান, হুবহু সেভাবে প্রকাশ বেশিরভাগ সময়েই সম্ভব নয়। প্রত্যেকটি কাগজেরই রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। রয়েছে তাদের নিজস্ব ভাবনা। যার প্রতিফলন উঠে আসে তাদের প্রকাশিত লেখার মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে যেহেতু আমাদের রয়েছে পৃষ্টাভরানোর বাধ্যবাধকতা, রয়েছে অন্যান্য দায়ভারও। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লেখক যা পাঠান, তাই হুবহু প্রকাশ হয়ে যায়।

লেখা সম্পাদনার ক্ষেত্রে সাহিত্য সম্পাদক দুভাবে তা করতে পারেন। একটি লেখকের সঙ্গে আলোচনা করে আর অন্যটি নিজের বিবেচনায়। তবে আমি মনে করি এর পুরোটাই সম্পাদকের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করবে যে, তিনি আলোচনা করবেন কি না? অনেক সময় লেখক লেখা পাঠানোর সময়েই বলে রাখেন, সম্পাদনার প্রয়োজন হলে যেন তা করা হয়—এটি তিনি করেন সম্পাদকের যোগ্যতার প্রতি আস্থা থাকায়। আবার কোনো কোনো লেখক তার লেখা সম্পাদনার ঘোরবিরোধী, সে সম্পাদকের ওপর আস্থা থাকুক আর নাই থাকুক। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে লেখা সম্পাদনার পক্ষে। আমার লেখাও যথাযথভাবে যোগ্য সম্পাদকের সম্পাদনায় সম্পাদিত হয়ে আলোয় আসুক, এটা আমি মনে করি।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।