সুকুমার বড়ুয়া: ছড়ারাজ্যের বিস্ময় ॥ ইলিয়াস বাবর | চিন্তাসূত্র
১১ বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২৪ এপ্রিল, ২০১৮ | বিকাল ৪:৪০

সুকুমার বড়ুয়া: ছড়ারাজ্যের বিস্ময় ॥ ইলিয়াস বাবর

আমাদের গতিময় জীবনে ছড়া লুকিয়ে থাকে পরতে পরতে। কখনো প্রকাশ্য হয়ে ওঠে খিলখিলিয়ে হেসে, কখনো নিরবব্যাধির মহৌষধ হয়ে নিরাময় করে লুকানো আর্বজনা। আমাদের সাহিত্যের সবচেয়ে পুরনো এ মাধ্যমটির রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। প্রায় দেড় হাজার বছরের এ পথযাত্রায় অনেকেই ছড়াকে করেছেন সমৃদ্ধ। যাত্রাপথের সবাই পথপ্রদর্শকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হতে না পারলেও তাদেরও থাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অবাক বিস্ময়ে আমাদের লক্ষ করতে হয়, কেউ কেউ ছড়ার গৌরবময় পথযাত্রায় হয়ে ওঠেন মহিরূহ। ছড়াবিষয়ক ভিন্নধর্মী চিন্তাপুঞ্জ, শব্দপ্রয়োগের যুগসচেতনতা, অন্ত্যমিলের চমৎকারিত্ব ও একেবারেই নতুন উপাদানে ছড়ার শরীর নির্মাণের কৌশল তাদের নিয়ে যায় আলাদা আসনে। যা ছড়ার পাঠক-শিল্পীকে নাড়া দেয় ব্যাপকভাবে। ছড়া জাদুকর সুকুমার বড়ুয়া বাংলা ছড়াসাহিত্যের অবশ্যম্ভাবী স্তম্ভের একজন, যিনি একাই একটি যুগকে নিরন্তর সাধনা আর শিল্পের কাছে নতজানু তাকে করে তুলেছে অদ্বিতীয় ছড়াশিল্পী হিসেবে।  সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হওয়ার পরেও ছড়াকে যখন অনেক বোদ্ধাই এর ঐতিহাসিক ও লৌকিক ভূমিকা বিস্মৃত হন, তখন আমাদের সামনে উজ্জ্বল আলোয় এগিয়ে আসে সুকুমার বড়ুয়ার কালজয়ী ছড়াসমস্ত। ছড়ার যাবতীয় বৈভব অর্জন করার পরেও সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া হয়ে ওঠে আমাদেরই ঘরগেরস্থের চূড়ান্ত কথামালা, না বলা বেদনার মূল্যবান বাণী, আনন্দের অনুচ্ছারিত হাসিরেখা। পথচলার যাবতীয় রসদ থেকে, মানুষেরই কোলাহল থেকে, পাশের মানুষটির ছায়া থেকে, দূরের আকাশের জোছনা থেকে তিনি নিয়ে আসেন ছড়ার রূপ-রস-অবয়ব। আমাদেরই অলক্ষে বেড়ে ওঠা অভ্যাসটি কিংবা স্বভাবদোষের মুদ্রাটি তুমুলভাবে মূর্ত হয় সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ায়। মোহময় অন্ত্যমিল ও শব্দঝঙ্কারে দৃশ্যমান হয়ে থাকে সমাজের নানাবিধ দূষণ ও সম্ভাবনা। তার ছড়ায় অবগাহন করতে করতে আমাদেরই মরাচোখ আবিষ্কার করে নানা সুরত, নানা আকাঙ্ক্ষা ও আশঙ্কা।

জনজীবনের মূল্যহীন ঘটনা বা কৃষ্টিতে সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া রচনার প্রধান অবলম্বন। দশের চোখের ভেতরে থেকেও তিনি অনন্য হয়ে ছড়ায় আঁকতে থাকেন আমাদের শৈশব-চারপাশ-বিশ্বাস-প্রতারণার বিবিধ বেলুন। আমাদের হাহাকার তার ছড়ায় পায় মূর্ততা, আনন্দের বাড়াবাড়ি তার ছড়ায় আশ্রয় নিয়েই পায় কলহাসির সাহস। এ শিল্পীর বেঁচে থাকার কিংবা শিল্পের উঠোনে বাহাদুরি ফলানোর একমাত্র মাধ্যম ছড়া। ফলে যাবতীয় মনোযোগের তীব্রতা নিয়েই সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে পায় শুধু ছড়া-ই বাংলাসাহিত্য গর্ব করার মতোন সব পঙ্‌ক্তিতে নিজের নাম খোদাই করে নেন নিজেরই অজান্তে। আমাদের অভিভাবক সমাজে সন্তানদের শিক্ষিত করার জন্যে যে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, তারই নজির দেখতে পাই বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়, প্রশ্নপত্র-রেজাল্ট ফাঁসের মাধ্যমে। কমে আসছে বিনোদনের জায়গা, খেলার মাঠ। কেবলই পড়া পড়া আর পড়া। পাঠ্যবইয়েই যত নজর আমাদের। আমরা চাই সন্তান গোল্ডেন এ প্লাস পাক, প্রকৃত শিক্ষিত হওয়ার কথা দূরঅস্ত। কিন্তু এরপরেও আমরা আশা করি, আমাদের শিক্ষার হার বাড়ুক, আমাদের জনবোঝা রূপান্তরিত হোক জনসম্পদে। যার জন্য বিকল্প নেই শিক্ষার। ‘এটুক শুধু চাই’ ছড়ায় দেখা যাক শিক্ষিত হওয়ার প্রবল বাসনা:

এটুক শুধু চাই
একটু আলো ছড়িয়ে পড়ুক
যেথায় আলো নাই।

অবুঝগুলো বুঝতে পারুক
জানতে পারুক তারা,
মূর্খ খেতাব গ্রহণ করে
জীবন কাটায় যারা।

একটু হাসি ছড়িয়ে পড়ুক
কান্নাঝরা মুখে,
এটুক চাওয়া রয় যেন গো
নিত্য আমার বুকে।

মূর্খতা অবশ্যই পাপ। শিক্ষার আলোয় জ্বলে উঠতে না পারলে মানবিক সুকুমার বৃত্তিগুলোর বিকাশ হয় না। অবশ্য ছড়াটি রচনা হয় মে ১৯৬৩ সালে, তার প্রেক্ষাপট থেকে আমরা অনেক দূরে আছি, অনেক এগিয়ে আছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে, দেশের মানুষ মুক্ত হয়েছে, বেড়েই চলছে শিক্ষার হার। তবে আরও অনেক দূর পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের। এত সব প্রয়োজনীয়তার ভেতরেও জেগে ওঠে গোপন অভিলাষ। শিশুদের মানসের সঙ্গে একাকার হয়ে যায় আমাদের মৌল চাওয়া।:

এমন যদি হতো
ইচ্ছে হলেই আমি হতাম
প্রজাপতির মতো।

নানান রঙের ফুলের পরে
বসে যেতাম চুপটি করে
খেয়াল মতো নানান ফুলের
সুবাস নিতাম কত।

এমন হতো যদি
পাখি হয়ে পেরিয়ে যেতাম
কত পাহাড় নদী।

দেশ-বিদেশের অবাক ছবি
এক পলকে দেখে সবি
সাতটি সাগর পাড়ি দিতাম
উড়ে নিরবধি।

এমনই আজগুবি অথচ শিশুবাস্তবতার সুনিপুন ছবি দেখতে পাই ‘এমন যদি হতো’ ছড়ার শরীর জুড়ে। এক্ষণে আমাদের স্মরণে রাখা দরকার, ছড়া শুধু শিশুদের জন্যেই নয়, বড়দের তৃঞ্চা আর জিজ্ঞাসার জবাব দিয়ে যায় একই সঙ্গে। অভিধাননির্ভর শব্দে নয়, চলার পথের টুংটাং, চাওয়া-পাওয়ার খুচরো শব্দবন্দে অলঙ্কৃত সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া।

গ্রাম-শহরের এ বিভেদ অথবা কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েও আমাদের নগরমুখী হতে হয় নানা কারণেই। স্বাভাবিকভাবেই নগরের সঙ্গে গ্রামের ফারাক আকাশ-পাতাল। অবশ্য উপশহর আর প্রযুক্তিগত সুবিধার দরুণ ব্যবধান কমে আসলেও আমরা দেখে ওঠি এরকম বাস্তবতা:

হাঁক দেয় ফেরিঅলা—ডালমুট চানাচুর,
কড়াভাজা খেতে মজা স্বাদে ঘ্রাণে ভরপুর।
বুট ভাজা, ভাজা ডিম
লেমোনেড আইসক্রিম
নিজ নিজ পথে সবে চলে যায় সুড় সুড়
কেউ বলে ‘একি জ্বালা কাঠাফাটা রোদ্দুর।।

‘শহরের রাস্তা’ ছড়ায় এভাবেই নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক বাস্তবতাকে চিত্রিত করে যান সুকুমার বড়ুয়া। তার ছড়ার অনন্য বৈশিষ্ট্য অনুপ্রাসের দুরন্ত খেলা, শব্দ নির্বাচনের মুন্সিয়ানা; তাতে জীবনের বিপুল অভিজ্ঞতা যোগ করে বাড়তি সৌন্দর্য, যা একেবারেই অভূতপূর্ব  ছড়াসাহিত্যের দুর্লভ সংযোজন। এরপরেও সুকুমার বড়ুয়া ভুলে যান না ছড়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শিশুআনন্দের কথা। শিশুরা দেবদূত, তারা প্রকৃতির ছন্দময়তার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে চায় তাদের জীবনের প্রথম পাঠ, প্রথম শোনা ও শেখা। ছড়ার সঙ্গে শ্রুতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে বলেই ছড়াকারকে সচেতন থাকতে হয় ছন্দের ব্যাপারে, বুনন ও অন্যান্য ব্যাকরণের দিকগুলোয়। তাছাড়া ঐতিহ্যগতভাবেই আমরা বেড়ে ওঠি ছড়া শুনে, ছন্দের ঝঙ্কারে। শিল্পের অন্যান্য মহার্ঘ্য মাধ্যম থাকার পরেও ছড়াকেই কেন বেচে নেয় আমাদের মা-দিদিরা? তার প্রধানতম কারণ ছন্দশ্রুতি ও আনন্দ। উদ্ভট আনন্দের ব্যাপারটি ছড়া যেভাবে ধরতে পারে তা অন্য মাধ্যমে অপ্রতুল।

‘ব্যাঙবাবু’ ছড়াটি পড়লেই আমাদের মনে পড়ে যায় দারুন সব লৌকিক ছড়ার কথা, অর্থহীন দ্যোতনার কথা। পড়া যাক ছড়াটি:

আধুনিক ব্যাঙ বাবু
বৈজ্ঞানিক উপায়ে,
লাফ-ঝাঁপ ভুলে গিয়ে
হাঁটে সোজা দু’পায়ে;
বর্ষায় পথ চলে
রাবারের ‘সু’ পায়ে,
মনে বড় ব্যথা পেলে
কেঁদে ওঠে ফুঁপায়ে।

কিছুই না থাক, একটা রস আছে ছড়াটিতে যা আমাদের শৈশবকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, রঙিন করতে শেখায়; এমনটি যারা জীবনযন্ত্রণায় কাহিল তাদের শেখায় নতুন করে হাসতে। সময়ের বির্বতনে হয়তো উপকরণ বদলে যায় ব্যবহারের, পরিবর্তনের সাড়া দিয়ে আমাদের দাদুরাও এমন ছড়া কেটে যান অনায়াসেই:

দাদু যাবেন ভিনিস
আনতে নতুন জিনিস
কী আনবে? কী আনবে?
মশা মারার ‘ফিনিশ’।

‘দাদু-নাতি’র এ মধুর খেলা সুকুমার বড়ুয়া আত্মস্থ করেন মানবিক চোখ দিয়ে। ফলে তাদের বর্ণিল শৈশবের সঙ্গে আমরা ফিরে যাই সুন্দর সময়ের কাছে। ছড়া হয়ে যায় যুগের সেতু, বন্ধনের পবিত্র দৃঢ়তা। কিচ্ছা-গপ্পের সময় খোকার স্বপ্নকে দূর দিগন্ত দিয়ে পর্যটন করাতে আমরা নিশ্চয়ই ‘টুনির ছা’ ছড়াটির পাঠ নিতে পারি:

টুনির ছা লো—টুনির ছা
একটা কথা শুইন্যা যা
বাগুন গাছের তলে রে
চক্ষু দুইটা জ্বলে রে
টুন টুনা টুন পাখির ছা…
ফুরুৎ ফুরুৎ উইড়া যা।

লোকাল টোনে এমন ছড়ার ফোড়ন শুনে খোকারও তখন উড়তে যাবার দশা। ক্রমাগত হারিয়ে যাওয়া সুস্থতার ভেতর এরকম বিনোদন, সুন্দর হাসি, নির্মল বেড়ে ওঠার জন্য দরকার এমনতর ছড়া। দুঃখের বিষয়, আমরা সংস্কৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিকের সাথে ভুলে যাচ্ছি এমন সব লাইন, চমক জাগানো পঙ্‌ক্তিগুচ্ছ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গেহ আমাদের পার্থিবতায় যোগ হতে থাকে করুণ ব্যাধি। এসব প্রতিরোধে প্রশাসনের ভূমিকার কথা অস্বিকার না করেই কবুল করে নিতে হয় ব্যক্তিগত দায়িত্বও কম নয়। যৌতুকের নেতিবাচক বিষ আমাদের সমাজকে করছে কলুষিত। কন্যাকে করতে হয় মুখ কালো, বয়ে বেড়াতে হয় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার অভিশাপ। জানুয়ারি ১৯৬৭ সালে রচিত ‘উপহার’ ছড়ায় সুকুমার বড়ুয়া প্রচলিত এ বিষবৃক্ষকে ইঙ্গিত করেই বলেন:

বরের বাড়ি আগরতলা
কনের বাড়ি কটক,
বিয়ের তারিখ পাকাপাকি
ঠিক করেছেন ঘটক।
শূন্য হাতে আসলে পরে
দেয় তাড়িয়ে হেলায় ভরে
উপহারের বাকস দেখে
তবেই খোলেন ফটক।

 উপহারের আড়ালে জোরজবরদস্তির কথা অনায়াসেই চলে আসে উপর্যুক্ত ছড়ায়। ছড়াটির আয়তন বেশ বড় নয় কিন্তু আবেদনের ব্যাপ্তি বিশাল।  উল্লেখ করার মতো ব্যাপার, সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার অন্ত্যমিল প্রচলিত ঢঙের বাইরে, একেবারেই নতুন। তিনি নিজেই সৃষ্টি করেন অদ্ভূত সব মিল, শব্দের বশীকরণে প্রশ্নাতীত দক্ষতা তাকে করেছে মহান, তার ছড়াকে দিয়েছে বিশিষ্ট স্থান। ছড়া নিয়ে প্রতিনিয়তই তাচ্ছিল্য হয় আড্ডায়, চায়ের টঙ্গে কিন্তু সুকুমার বড়ুয়ার ছড়াকে কুর্ণিশ করে। তিনি এক্ষেত্রে দ্রষ্টা, ত্রাতা।

সম্প্রতি ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুলভাবে লক্ষ করি সম্পর্ক ভাঙা আর গড়ার প্রতিযোগিতা। কারো কাছে কেউ নিরাপদ নয়, কেউ বিশ্বাস করছে না কাউকে। আমাদের প্রতিবাদের ভাষা আর শিল্পীত ও মার্জিত নেই। প্রজন্ম কেমন যেন খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছে। অথচ ১৯৬৬ সালে রচিত ‘অমুক’ ছড়াটি পাঠে আমাদের বোধে আসে প্রতিবাদের ভাষা এমন, বলার ভঙ্গিমা এমন হওয়া উচিত:

 অমুক দেশের অমুক…
পরের মাথায় কাঁঠাল রেখে
কোয়া খাবেন একে একে
মুচকি হেসে বলেন আবার
তোমার বোঝা কমুক
ভাগ্য দোষে আমার পেটেই
জমছে বোঝা জমুক
সে যে অমুক দেশের অমুক।

এভাবেই সুকুমার বড়ুয়া পালন করে যান শিল্পী হিসেবে তার ভূমিকা, মানুষ হিসেবে তার দায়বদ্ধতা। বিজ্ঞানের উৎকর্ষ আমাদের কারোই অলক্ষে নয়। ছড়ার গৌরবজনক ইতিহাসে অনেকেই ছড়ার ভেতর দিয়ে বিজ্ঞানের জয়যাত্রার কথা বলে গেছেন, কেউবা উদ্বুদ্ধ করে গেছেন বিজ্ঞানচর্চায়। সুকুমার বড়ুয়া ‘জ্যাকরা গাড়ি’ ছড়ায় যেমনটি বলেন:

‘ট্যাকরা মামার ছ্যাকরা গাড়ি
ছাড়িয়ে গেলো যাত্রাবাড়ী
সামনে হঠাৎ নদী দেখে
সেই দিয়েছে এক লাফ
অমনি গাড়ি পৌঁছে গেলো
ঢাকা থেকে টেকনাফ।

কুমার বড়ুয়া হয়তো তারই সৃজনশীল চোখে দেখতে পেয়েছিলেন এমন গাড়ির আগনরেখা। আমরা কিছু দিন আগেই জানতে পারি জলে-স্থলে সমান পারদর্শী বাহন আবিষ্কার করেছে বিজ্ঞানীরা। আবিষ্কারকদের সঙ্গে এখানেই সৃজনশীলদের মিল। আর শোনান আশার কথা, যেটা কেবলই মানায় সৃজনশীল মানুষদের মুখে, কবিদের মুখে। যাপনের বিবমিষা, শ্লেষকে এমন অপরূপভাবে ছড়ায় টেনে আনার কৌশল তাকে দিয়েছে বিশিষ্টতা। সঙ্গে প্রচণ্ডরকমের হিউমার, যা আমাদের গোমরামুখে দিয়ে যায় একটুকু শান্তির সুবাতাস।

জাতির পিতাকে নিয়ে আমাদের সৃজনশীল মানুষদের নানা মাধ্যমের কাজ অনেকেই করছে। কেউবা রঙ-রেখায়, কেউবা ভাস্কর্যে, কেউবা নাটক-মঞ্চে। বাদ যায়নি গল্পের দুনিয়া, কবিতার বিকিরণ। কিন্তু অতি মাত্রায় ব্যবহারে, বলা ভালো, অমেধাবীদের চর্বিতচর্বণে তা অনেক সময় হারিয়ে পেলে শিল্পের ন্যূনতম মান। অথচ সুকুমার বড়ুয়া অনেকভাবেই আনেন প্রিয় নেতাকে, পিতাকে, তারই প্রিয় মাধ্যম ছড়ায়। ‘বিশাল মুজিব’ ছড়ায় যেমন দেখা যায়:

সাড়ে সাত কোটি মানুষের নেতা
জনতা দ্বিগুন আজ
স্বদেশে বিদেশে মানবচিত্তে
জীবন্ত মহারাজ।
সোনার বাংলা সোনার মানুষে
একদিন যাবে ভরে
স্বাধীন স্বদেশে পিতার স্বপ্ন
পৌঁছাবে ঘরে ঘরে।

কিংবা ‘মহামানব’ ছড়ায় দেখা যাক:

মানব জীবন ধন্য তোমার
ধন্য মুজিব ধন্য
জীবন মরণ পণ ছিল এই
বাংলাদেশের জন্য।

 যদিওবা ‘মহামানব’র আঙ্গিকে আমাদের শৈশবেই পড়ে উঠি অসাধারণ এক ছড়া সুকুমার বড়ুয়ার—‘ধন্য সবাই ধন্য/ অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে/ মাতৃভূমির জন্য।’ এতসব ঢামাঢোলের ভেতরেও তিনি ভোলেন না নেতা নামের অনেক অমানুষের চরিত্র। নানা সময়ে আমাদেরই স্বাধীন বাংলাদেশে বিচিত্র রকমের নেতাকে দেখি, যারা দেশপ্রেমের ভাঁওতাবাজি করে নিজের আখের গুছিয়েছেন। ‘বন্ধু’ নামের ছড়ায় এটাই যেন মূর্ত হয়ে ওঠে:

দিনের বেলায় দীনের বন্ধু
রাতের বেলায় কার?
কী-যে বলেন কী-যে করেন
বোঝাই হোল ভার।

নিজের সমাজকে, স্বকালকে চেনেন বলেই; সমাজের নানা কিছিমের জিজ্ঞাসা তাকে তাড়িত করে বলেই তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়ে যায় ছড়ার সন্ন্যাসে, ছড়ার সাধনা ও নির্মাণে। বর্তমানে রচিত অনেক ছড়াই তেমন করে পাঠককে আর টানে না অথবা চর্বিত চর্বনের দোষে অনেক ছড়াকারই প্রায় মৃত অথচ  সুকুমার বড়ুয়া বিশ্বসংঘ নিয়ে যখন এভাবে ছড়া লেখেন, তখন শিক্ষিত কী গেঁয়ো, বড় কর্তা কী মুচি—সবারই সমান তৃঞ্চা, সবারই সমান দৃষ্টি কাড়েন।

জগৎ সেরা ভূতের বাসা ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে
কেউটে সাপের বিষ ভরে দেয় খাঁটি মধুর শিশিতে
নাম ফাটাতে জগৎ জোড়া
বানায় বিরাট পাথর গোড়া
ট্রেনিং চালায় সেই নোড়াতে মানবশিশু পিষিতে।

এভাবে অনেক লেখায়, বলতে গেলে সুকুমার বড়ুয়া তার দীর্ঘ ছড়াযাপনে জীবনকে নানা দিক দিয়ে পর্যবেক্ষণের সুযোগ নিয়েছেন। নিজের জিজ্ঞাসাকে দশের জিজ্ঞাসা করেছেন ছড়া দিয়েই। এক জীবনের এ ছড়াযাপনে তার প্রাপ্তির ভাণ্ডার বিশাল, বলতে গেলে শুধু ছড়া দিয়েই এটা অকল্পনীয়। অথচ সুকুমার বড়ুয়া দিব্যি বলে যান:

সবার সাথে পাল্লা দিয়ে
এগিয়ে যাবো বুক ফুলিয়ে
সব খেলাতে জিততে হবে
আর কখনো হারবো না।
শক্তি সাহস বুদ্ধি দিয়ে
ধরবো হাতিয়ার
চিন্তা দিয়ে নিত্য নতুন
করবো আবিষ্কার।

ছড়ার জয় হোক, জয়তু সুকুমার বড়ুয়া।

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন