তিস্তা: পর্ব-৯॥ হারুন পাশা | চিন্তাসূত্র
২ শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৭ জুলাই, ২০১৮ | সন্ধ্যা ৭:১৩

তিস্তা: পর্ব-৯॥ হারুন পাশা

॥ পর্ব-৯ ॥
৩০
পরে মুই সাইতুনক শিখ্যানু ক্যামন করি বাসত জিনিস বেচা নাগবে। কনু, তুই সোজা বাসের সামনত তাকাবু, আর কবু তোর কথা। তুই গলা ফাটায়া বয়ান দিবু, কারো কানত যাইবে, কায়ো হ্যালা করি শুইনবার নয়, কায়ো মজা নিবে, কায়ো আবার কিনবে। তুই ওমার দিকত তাকাবু না। সোজা বাসের শেষ মাথায় চোখ আখপু। তাকায়ে তাকায়ে তোর বিজ্ঞাপনের ভাষা কইতেয়ে থাকপু। আড় চোখে তাকাবু, দেখপু কায়ো নড়ছে-চড়ছে কি-না মানিব্যাগ বাইর করার জন্যে। তুই কয়ায় যাবু ‘বইটাতে জমি-জমার রেকর্ড সম্পর্কে জানতে পাবেন। জমিনের মায়া দলিল, জমিনের নকশা সম্পর্কে জানতে পাবেন, সরকারি খাস জমির দখল সম্পর্কে জানতে পাবেন, জমিনের মামলা সম্পর্কে জানতে পাবেন, কত টাকার জমিনে কত টাকার ফি লাগে জানতে পাবেন, কত টাকার জমিতে কত টাকার স্ট্যাম লাগে জানতে পাবেন। বইটা দেখতে চাইলে দেখতে পারেন, নিতে চাইলে নিতে পারেন। দেখার অধিকার প্রত্যেকেরই আছে। বলতে পারেন ছোট বোন, বইটার দাম কত এবং কোথায় গেলে পাবো? যে কোনো লাইব্রেরিতে গেলে পাবেন, দাম নিবে একশ’ পঞ্চাশ টাকা। আমার কাছে নিলে একশ’ পঞ্চাশ টাকা দিতে হবে না, মাত্র পঞ্চাশ টাকা, পঞ্চাশ টাকা করে পাচ্ছেন। বসে বসে বই পড়ে সময়টাকে মূল্যবান করেন। বই পড়লে হয় জ্ঞানী। এই বইটাতে শেখার আছে, বোঝার আছে। এরকম ভালো কাগজ, ভালো লেখা, ভালো ছাপা, নির্ভুল একটা বই লেমেনেটিং করা কভার, একশ’ ষাট পেজের একটা বই আপনে নেন। দেখতে চাইলে দেখতে পারেন, পছন্দ হইলে নিতে পারেন। এদিকে আর কে নিবেন? আছেন কেউ? দরকার পড়লে নিতে পারেন। এদিকে আর কেউ আছেন? নিবেন? এদিকে কারো দরকার পড়লে চেয়ে নিয়েন।’

এইটা বেচপু প্রথমদিন। কয়েক দিন পর আরেকটা বেচপু আগের বুদ্ধি ব্যবহার করি। এটে কেবল জিনিসখান বদলাবু। কবু, ‘একটা মানিব্যাগ আছে পঞ্চাশ টাকা দাম, একটা মানিব্যাগ আছে একশ’ টাকা দাম। একটা চামড়ার পার্স আছে দুইশ’ টাকা দাম। ভাই আপনাদের একটা কথা জানাতে চাই গাবতলীতে সাতশ’ পঞ্চাশ কইরা কিছু ব্যাগ আছে অটবিতে বিক্রি হইছে একশ’ পঞ্চাশ টাকা, ভাই আপনাদের একটা কথা জানাইলাম। মামা ন্যান, জিনিসটা মোটা ওটার জন্য সমস্যা না, ন্যান মামা। মামা আপনারা কিছু কিনবেন মামা? আপনারা যদি ম্যামো দেখতে চান, ম্যামো আছে। একশ’ টাকার ব্যাগ কোনটা জানেন, যেটা হাতে লইলে আমার হাত-পা জ্বলে। গাড়িটা শাহবাগের উপর দিয়া আইছে, মাইন কইরেন না। শাহবাগে এমন অনেক পাপী আছে যারা ব্যাগ ব্যাচে। ওদের ব্যাগের সাথে আমার ব্যাগ বনবে না। আমার ব্যাগ সব খানদানি ব্যাগ। মামা কিছু লাগবে?’ পরে একদিন ফল আর চকলেট বেচপু, কবু, ‘রাজশাহীর পাকা লিচু, মুখে পুড়ে রস নিবেন, দাম মাত্র আটানা। চকলেট লন দাম মাত্র আটানা। কোম্পানীর প্রচারের জন্য এই দাম করা হইছে। আপনারা বাসা-বাড়ি যাচ্ছেন বিশ টাকা প্যাকেট নিয়ে যাবেন।’ মাথাত আখপু, এই জিনিসগুইলা অনেকেই বেচপে, তাইলে তোরটা ক্যা নিবে? অয় কইল, কেইল্লাইগ্যা নিবে সমীরণ আপা?
কনু, নিবে তুই কতো সুন্দর করি কবার পাবু, আকর্ষণ কইরবার পাবু তোর কথায়, ওইটায় হইল ঔষধ। অভ্যাস বাড়াইতে থাকেক। আরো আছে, পরে কবার নাগছোং।

৩১
সুলতান, মহিউদ্দিন পান্তা-পুন্তা খায়া কামে নাইগ্যা যাও। দুইপরা দেখি কি খাবার দেওয়া যায়। দেরি কইরো না। আজ কিন্তু কামটা শ্যাষ করা নাগবো।
চাচা, আপনাক এইডা লইয়া চিন্তা হরুন লাগতো না। আমরা মন দিয়া কাম হরাম।
মহিউদ্দিন ভাই, শুনলা তো কি কয়া গেলো। খালি আলাপ মাতপার চাও।
ছাড়ো তো। পান্তা খায়া কাম দরতে দরতে মাছ যে মারছো হেই কতা হুনাইবা। গপ্প না হরলে কাম আগায়, কও তো?
আগে খায়া ন্যাও। তারপর দেহা যাইবো নে।
সুলতান ভাই, গপ্প দরো।

তোমারে নিয়া পারা গেলো না মহি বাই। শুনো, অ্যাহন মাছ মারা মানে কুনুরহমে দিন বাঁচা। ওইরহম কুনো ইনকাম নাই যে দশ ট্যাহা থইয়া পরে খায়াম। মনে হরো তিনদিন অ্যাকনাগারে বান গেলো, আজ কাইল পরশু নাই। আবার বান আইলো। এই দুইদিন ২০০-২৫০ হইরা কামাই অইবো। এইতা চা, নাস্তা খাইতেই শ্যাষ। কার্তিক মাস থাইক্যা চৈইত মাস পর্যন্ত পানি আইড্ডা আয়ে। বৈশাখ মাস থাইক্যা অল্প পানি থাহে। আষাঢ়-শাওন দুই মাস পানি বইরা থাহে। বাদ্দর মাসো অদ্দেক অয় অদ্দেক অয় না। আশিন মাসো চান্নির মইধ্যে ওইরহমই। আর বাহি মাসগুলাত কম অয় মাছ। মাছ মারবার যায়া পরতম যে মাছটা উডে ছ্যাব দিয়া থুই। যাতে পরে আরো বেশি মাছ উডে। গরমকালো মাছ মারবার যাইবার আগে তোমার বাবি হুগনা মইচ বাজা আর প্যায়াইচ দিয়া পান্তা দেয়। নাউয়ো যাই, আর কই, শালা, মাইনষে খায় গরম বাত, আর আমি খাই পান্তা বাত। হায় রে কপাল! আপসুস হরি আর মাছ মারি। বর্ষাকালো মাছ মারতে মারতে ম্যাগ আয়া পড়ে। মাছ তো দরুন লাগবো। দোস্ত সগীরও আঙ্গোর লগে যায়। অরে কই, হালার ম্যাগ আর কাম পাইলো না। যহন তহন আয়া পড়ে। এতো ম্যাগ আর বালা লাগে না। কই, আল্লায় গরিব বানাইছে, ম্যাগো বিইজ্জাই মাছ মারুন লাগবো। বাইত বউ-পোলাপাইন আছে। ম্যাগ কমলে মাছ কম পানিত আয়ে। খ্যাও দিতেই জাল বইরা বইরা মাছ উডে। তহন তো খুশির শ্যাষ নাই। এতক্ষণের পেরেসান মন, ইট্টু রস পায়। দোস্ত গান দরে,

ওরে আগ করেন না সোনার কন্যা
মনোত না হন গোসা (ও কন্যা)
ওরে দুই-চাইরখান মাস সবুর করেন
ফিরিয়া হইবে দেখা হে
ওমোর সোনার কন্যা হে, ওমোর গুণের কন্যা হে।।

গান বেশিক্ষণ থাহে না। দেওয়া ডাক ছাড়ে গুড়ুম গুড়ুম। বিদুৎ চমকায়। শব্দ অয়। দুই আত দিয়া দুই কান চিইপ্যা দরি। গাও জাহি মাইরা উডে। এইরহম অইলে নদীত যাইবার মন চায় না। প্যাডের দায়ে যায়ুন লাগে। কালা কম্বল দিয়া পেইচ্যা থাহি। কম্বল দিয়া শরীল ডাইক্যা রাখলে চিলকাডা লাগে না। তহন খালি আওয়াজ পাওয়া যায়। কুনু কুনু সময় আকাশ ম্যাগ অয়া আইলে নাউ চরো লইয়া খুডা গাইরা থাহি। দোস্ত আর আমি মাছ দরি কিস্তি দেওয়ার চিন্তা লইয়া। হিল পড়ার সময় নদীর ফাহা জাগায় থাকলে কাগজের বিতরে থাহি। বইয়্যা থাকলে মাথা ছ্যাও হইরা থাহুন লাগে। মাতাত ম্যাগনেট আছে, এইডা টানে। অ্যার লাইগ্যা মাথা ছ্যাও হইরা থাহি। হিল আইলে মাতার তলো গামছা দিয়া লম্বা অইয়া নাউয়ো হুইত্যা থাহি। মুডা খ্যাতা লগে নেই, মাথাত দেই। আর আল্লারে ডাহি। কই, আল্লা তুমি রক্ষা হরো! আল্লা তুমি বাউর-বাতাস কমাও! বাড়িত বউরে কইয়া আই বড় বড় হিল পড়লে বাড়ির উডানো সইস্যা ছিটাইবা, যাতে আসমান থাইক্যা বড় হিলের বদলে ছুডু হিল পড়ে। ম্যাগ আইলে পানি দিয়া নাউ বইরা যায়। কুনো কুনো সময় নাউ উইল্ডা যায়। সারারাইত ম্যাগ ছাড়ে না। বিইজ্জা যাই। গুম আয়ে না। খালি ম্যাগ বাসা আর উডা, তাতেই অ্যাক বুক পানি। হুড়কা-বাতাস, হিল-বাউর কহন অইবো এইডা কেউই কইবার পাইতো না। এইরহম বিপদ লইয়্যা মাছ মারলেও গড়ানে মাসে তিন আজার, চাইর আজার, পাচ আজার কামাই অয়। গড়ান দিয়া কি কাম অয়? শট পড়ে। ঋণ হইরা জাল কিনুন লাগে। নাউ বান্দান লাগে। শীতের মাছের স্বাদ ম্যালা। এই সময় বড় বড় বৈরাতি মাছ পাওয়া যায়। চাইদ্দর-মাইদ্দর শইল্লো দিয়া বিড়ি লাগাই আর খ্যাও দেই। চুপ হইরা বইয়্যা থাহাম। যেইনো ইট্টু পানি আছে অইনো খ্যাও মারাম। থরথরি কাপাম। বিড়ি মুহো থাকপোই। অ্যাকটা শ্যাষ অইলে আরেকটা লাগায়াম। মাছ উডলে রাইত কুইন্দা চইল্যা গেলো, শীত কুইন্দা গেলো টেরই পাই না। মাছ না উডলে কুড়হা-মুড়হা অইয়া বইয়্যা থাহি। বিড়ি টানি আর পানির মইধ্যে চায়া থাহি। দেহি, পানি লড়ে নাহি। মাছ আইলো নাহি। লগে অ্যাকটা ছিড়া লই। বিড়ির প্যাকেড তো থাহেই। নদীর পাড়ো বইয়্যা অল্প সময় বিড়ি টানি। প্ল্যান হরি। কি হরাম। কই যায়াম। শীতো মাছ কম পাওয়া যায় আবার খরচটাও বাড়ে। কাপড় কিনুন লাগে। যে মাছ পাই সংসারি চলে না, কাপড় কিনি কিইদ্যা? এইরহম শীত আয়ে চোহেই দেহা যায় না। নাউ চরের লগে অ্যাকসিডেন্ড হরি। শীতো নদীত থাহুন যায় না। বরফ অয়া যায় শইল। এমনিতেই ঠা-া, নদীততেও উডে ঠাণ্ডা। অবস্থা খারাপ অয়া যায়। চান্নীরাইত আইলে আর মাছ পাওয়া যায় না। দিনের মতো ফডফডা। আন্দারি অ্যাকবারেই থাহে না। গড়ে মনে হরো যে, বিশ দিন মাছ মারুন যায়। দশ দিন বইয়্যা থাহুন লাগে। এইসময় জাল গড়াই। মাঝে মাঝে মাইনষেরে কামলা দেই। আগে মাছ মারছে হেন্দুরা। মুসলমানরা কইছে, মাছ মারলে আঙ্গোর জাত যাইবো। আর অ্যাহন নদীত মাছুয়া মানে মুসলমান। ট্যাহার অবাবে জাত-টাত গ্যা কই হান্দাইছে। হেন্দুরা যে কয়জন মাছ মারে তারা কুমবালা নদীত আয়ে, কুমবালা যায়, টেরয়ি পাওয়া যায় না।

পানিই তো নাই। পানি থাকলে না জাগাডা বড় থাকতো। তহন অনেক মানুষ মাছ মারবার গেলেও সমস্যা অইতো না।

এইডা দামি কথা কইছো মহিউদ্দিন বাই। আঙ্গোর বাড়ির সামনে যে বানাস বিল আছিন অইনো ছোডুকালে ইচা মাছ মারবার গেছি। কি ইচা উডে! চাইর-পাচটা খ্যাওয়ো অ্যাক পাইল্লা উডছে। পরের বছরো পাইলাম হাফ পাইল্লা। পরের বছরে আরো কমলো। আস্তে আস্তে ইচা খুইজ্যাই পাইলাম না। সংসার বড় অইতাছে আর নদীর মাছ কমতাছে। এইডার বড় কারণ অইলো নদী শাসন। আঙ্গোর তিস্তা শাসন হরতাছে ইন্ডিয়া। হ্যারা পানি ছাড়লে যে কয়টা মাছ আয়ে নদীর মইধ্যে আইতে আইতে শ্যাষ অয়া যায়। মাছুয়া কি কম! দাদা গপ্প ছাড়ে, আগে দশ-পনরো মিনিট মাছ মারলে লইয়্যা আয়ুন গেছে না। অ্যাহন গণ্টার পর গণ্টা মাছ মারছ, অ্যাক কেজি মাছও না পাছ। এইরহমে কি দিন চলবো? আরো যে কি দেহাম। এইকথা হুইন্যা মেজাজ খারাপ অয়া যায়। কই, এতো ম্যাল ম্যাল হইরো না তো। মাছ নাই তো কি হরাম। শ্রম তো কম দেই না। বাপ-দাদাগর লাহানি শ্রম দেই। তহন যে মাছ খাইবার মন চাইছে, হেই মাছ মাইরা লইয়্যা আইছে। নুন-মইচের বাত অইলে স্বামী কইছে মসলা বাডতে থাহো, আমি আইতাছি। আইতাছি মানে ড্যাগ বইরা মাছ লইয়্যা আইছে। অ্যাহন চাইলেও পাওয়া অয় না। আগে নাহি আঙ্গোর হুমান মাছ মারছে। আর অ্যাহন কেনি আঙ্গুলের লাহান মাছয়ি পাওয়া যায় না। আরেকটা জামেলা অইলো, মানুষ মরে মাছ মারবার যায়া। গতবার, তার আগেরবার, তারও আগেরবার মরছে। ইবারো মরলো। মুডা জাল ফিক দিলো, জাল নিচ থাইক্যা জুরে টান দিলো। বুজাইলো বড় মাছ ফানছে। মাছুয়া কয়, যাই নিচে নাইম্যা তুইল্যা আনি। ওই যে নিচে নামছে, আর খবর নাই। মানুষ জানে ওই জাগাত সমস্যা, কিন্তু বুইল্যা যায়। পানি বাড়লে মনে পড়ে। পানি কমলে ওইনো অনেক বেশি মাছ পাওয়া যায়। হের লাইগ্যা সমস্যার কতা কারোরি মনে থাহে না। বুইল্যা গেলেই দইরা হালায়। ওইনো মাছও অয় অনেক। আমার দোস্ত সগীররে নিচ থাইক্যা যহন টাইন্যা দরলো অয় তহন নাউয়ের কানি দইরা আছিন। আর কইছে, কলা গাছের মতো কি জানি আমার পাওঅ টাইন্যা দরছে। আমারে বাঁচাও। মানুষ যাইতে যাইতে অরে লইয়্যা গেলো গ্যা। নাউ ডুইব্যা যাইতাছে তাও অয় কানি ছাড়বার চায় না। শ’ শ’ মানুষ কত কিছু লইয়্যা নামলো কুনু খবরই পাইলো না। দোস্তর লাশ অ্যাকদিন পরে উডছে। লাশ দেইহ্যা মনে অইছে এই মাত্র মরলো। বাসার সময় দেহা গেছে নাক দিয়া রক্ত পড়তাছে। তরতাজা। শইল গরম। সহজে মারে না। কি যে বিষয়টা কেউই বুজবার পায় না। গেরামো যারা মুরুব্বি আছে তারা কয় মাসান আছে। তবে খারাপ কিছু আছে। অ্যার আগে তিনডা কুত্তা অ্যাক লগে পার অইতাছে। মইধ্যে থাইক্যা একটা কুত্তা নাই। দুইডা কুত্তা পাড়ো আইছে। একটা খাইল আছে, ওইনোই এইরহম গটতাছে।

খাইলো পাহো পড়ে না তো সুলতান বাই?

কি যে কও মহি বাই। পাক কই থাইক্যা আইবো?  দূরত্ব নাই। ছুডু একটা জাগা। এইপার থাইক্যা ওইপার পনরো বিশ ফিট। কালা পানি খাড়োয়া আছে। ডুবা মাত্রই সব মানুষ গিইরা দরে। তারপরেও পাওয়া যায় না। যে লাশগুলা পরেরদিন উডে ওইতা যে জাগাত ডুবে, অই জাগাত থাইহ্যাই উডে। যেতা পাচ-ছয় দিন পর উডে, ওইতা লাশ অন্য জাগাত বাসে। এইডা রহস্য। আমরা আতঙ্কে থাহি। আঙ্গোর বাড়ির লগের পুলডাতেও মানুষ মরে। বড় মানুষরে তো দরে না, ছুডু বাচ্চাগুলারে মারে। মাছ মারবার গেলে হাপে কাডে। তহন কতো তন্ত্রমন্ত্র পড়ে।

শুনাও তো।
আমারে য়ুজা পাইছো?
য়ুজা না অও, যা দেখছো, শুনছো তাই কও।
তুমি তো খুবই বালা না। খালি কথা কওয়্যাই নিতাছো।
কয়দিন পর তো আর পাইতাম না তুমারে। কইলাই না হয় কয়দিন।
সব মনে নাই। এইডা ছাড়ো। সগীরের কথা কই। ওর কথা মনে
পড়তাছে।
কও।
মাছ মারবার যায়া মন খারাপ থাকলে দোস্ত কতো মজা দিতো। ছিল্লুক দরতো। কইতো উত্তর দ্যাও,

কৈলাটির নানী
হাত দিয়া ধরলে হয় পানি
এই সব কি মনে থাহে। হ্যায়ই উত্তর দিতো। কইতো ম্যাগের লগে পড়া পাথর।
আবার কইতো,
হাত নাই, পা নাই, পিট দিয়ে চলে
রাত দিন জলে।

কয়, এইডার উত্তর দিবার পাইলে তোমারে শাবনুরের বই দেহায়াম। আর না পাইলে আমারে দেহান লাগবো। উত্তরডা হ্যায়য়ি দেয়। কয়, নাউ। বই দেহাই নাই। চা-বিস্কুট খাওয়াইছি। রাইত জাইগ্যা মাছ মারলে বউ আফসুস হইরা কয়, মানুষ স্বামী লইয়া গুমায়, আর আঙ্গোর স্বামী গেছে নদীত। যহন ইচ্ছা অয় একজন থাহি, আরেকজন থাহি না। বউ আমার লাইগ্যা অনেক কষ্ট পায়। এইডাও বুজে স্বামী নদীত কতো কষ্ট হরতাছে। মাছ দরবো, বাজারো লইয়া যাইবো। খরচপাতি আনবো। অয়ো জানে এইডাই আঙ্গোর বিজনেছ।

ছইল-পইল কান্দা-কাডি হরলে কয়, তর বাপ আইয়ুক, বাপেরটে ট্যাহা লইয়্যা দ্যাম। পরে স্কুলো যাইছ। সদাই খাইছ। বউ রাইতো গুমায়। আমি সারাদিন গুমাই। সারারাইত মাছ মাইরা আমরা দিনো গুমাই বইল্যা আঙ্গোর পাড়ারে মাইনষে কয় আইলসাপাড়া। বাড়িত আইলে তোমার বাবি জিগায়, কয় সের পাইছিলা?
যেদিন মাছ পাই না হেদিন কই, অ্যাক সেরও পাইছি না। সারারাইত ম্যালা কষ্ট হরলাম, মাছ পাইলাম না।
অ্যারা বইয়া রইছে স্কুলো যাইবো, ট্যাহা দ্যাও।
কারো কাছ থাইক্যা লইয়া দে। মাছ মাইরা শুদ হইরা দ্যামনে।

তারো তো মেজাজ আছে। রাইগ্যা-টাইগ্যা কয়, কাম হরা বাদদ্যা কি মাছ মারা শিখছে, রাইতে বাড়ি থাকপার পায় না, আবার মাছও নাই। মাছ মারা বাদদ্যা অন্য কাম হরবার পাও না? চাইল নাই, ডাইল নাই, লইয়্যা আয়ো।
ট্যাহা নাই।
কিইদ্দা লইয়া আইবা, আনো।
বানচোদ মাগি চুপ হইরা থাক। ট্যাহা-পইসা নাই বুজবার পাইতাছস না? জিত হইরা থাক।

বানচোদ মাগি চুপ হইরা থাক।

গালাগালি হইরা চইল্যা আইলাম দুহানপাড়ো। গালাগালি হইরাই কি আর সমাদান আয়ে? আয়ে না। অল্পেট্টু গুরাগুরি হইরা দুহান থাইক্যা জিনিসপাতি বাহি লইয়্যা যাই। পরে মাছ-টাছ মাইরা ট্যাহা অইলে শুদ দেই। আঙ্গোর অবাবের শ্যাষ নাই। একটার পর একটা লাইগ্যাই আছে। মাছ নিজে মারি। আর গুসতু ছয় মাসে অ্যাকদিনও খাইবার পাই না। খাইবার চাইলে সারাদিনের কামাই অ্যাক সইন্দ্যাতেই শ্যাষ। আঙ্গোরও কি দুঃখু কম অয়? দোস্তর লগে কইতাম, রাইতে বাড়ি থাহা বাদদ্যা নদীর মইধ্যে থাহি। যারা ব্যবসা হরে, চারহি হরে তারা রাইতের বেলা বউয়ের লগে থাহে। আর আমরা বউ-ছাওয়া থইয়া সারারাইত নদীত মাছ মারি। সারাবছর যে গাটতি থাহে ওইডা ইদের পনরো দিন মাছ মাইরা পুষাই। আঙ্গোর গুরার সময় অয় না। মাছ যহন না মারি তহন অল্প সময় পাই। ইদো সবাই আমোদ-ফূর্তি হরে। আঙ্গোর আমোদ-ফূর্তি অয় না। ইদ আইলে নাউ চালাই, বাড়া মারি। ইদের পনরোদিন আমরা বাড়া মারাম। অ্যাহন যুদি আমরা গুইরা বেড়াই তাইলে এই কামাইডা হরবার পাইতাম না। একটা দিনে দুই-তিন আজার কামাই হরবার পাই। ইদের পরের দিন আরো বেশি মানুষ আয়ে। নাউ বাই। মানুষ গুরাই। এইতাই আঙ্গোর আনন্দ। ইদ আইলে সহাল দশটার সময় নদীত যাই, আন্ধার যহন অয় তহন চইল্যা আয়ি। মাইনষে মডর সাইকল লইয়্যা আয়ে, গুইরা যায়। আর আমরা নদীর পাড়ো বইয়্যা থাইহা দেহি। কত মানুষ বউ-ছাওয়া লইয়া, বালোবাসার মানুষ লইয়া গুরবার আয়ে। আঙ্গোর বালোবাসা নাই। সব বালোবাসায় বালু জমছে। হ্যারা আয়ে আর আমরা নাউয়ো গুরাই। আঙ্গোর আনন্দ থাহে না। আগের দার হরা ট্যাহা, ইদের সময় বাড়া মাইরা শুদ হরুন লাগে। গার্মেন্সের ওভারটাইমের মতো। সারাবছর মাছ মারি, আবার খুশির দিনেও নাউ চালায়া বাড়া মারুন লাগে। আগে রাইতে মারছি, এই কয়দিন মারি দিনে।

বিলকিসের বাপ, আপনে যে কামলা নিলেন দেখছেন কি কাম করে? কতকুইনা করছে?
যাবার নাগছোং, গেঞ্জিটা দে তো।
বাবারা, তোমাগোর পানি-টানি নাগবো?
না, চাচা, ইট্টু পরে তো খাইবারি যায়াম।

কি কইলা সুলতান? খাবার যাইবা, মানে আর দুইঘণ্টা পর কাম শ্যাষ? তোমরা তো কামের কিছুই করবার পাও নাই। যে ত্যামাল তুলছো এইটা দিয়া তো পুরা বেড়া হইবো না। বেড়া শ্যাষ করবা কবে? অ্যামনে কাম করলে কি চলবো? আমাক তো ফকির হওয়া লাগবো। না, এমন কইরা পারা যাবো না। তোমরা যদি কাম করো তাইলে ভালো কইরা করো। নাইলে কাল থাইক্যা বিদায় কইরা দিবো। হাতের কাম শ্যাষ কইরা খায়া ন্যাও।

মহি ভাই, আমরা কাম তো ঠিকি হরি। মালিক খালি ট্যারা ট্যারা কথা কয়।

সুলতান বাই, আমরা গরিব মানুষ এইতা কতা হুনুনয়ি লাগবো। শত কষ্টের মইধ্যে কাম হরুনয়ি লাগবো। চইলা যাওয়াও তো যায় না।
চলো, খায়া আয়ি।

বুজলা মহিউদ্দিন বাই, নদী-তি শান্তি। কুনু ক্যাডর-ম্যাডর নাই। দুই কতা হুনুনও লাগে না। চাইর কথা কয়ুনও লাগে না। নদীত মাছ দরলাম, মন চাইলে গেলাম, না চাইলে না গেলাম।

এইকথাও ঠিক। হালার পুলিশ আইয়া তো আঙ্গোর কামডায় বাডা ফালাইলো। কও তো পাত্তর তুললে নদীর কি এদুন ক্ষতি অয়?

তোমরা তো ছুডু মিশিন দিয়া কাম হরো। ক্ষতি তো দেহি না।

ওইডাতেই অগোর জ্বলে। এলাকাত কাম হরছিলাম। বাড়িত থাকপার পাইছি। বাইরে খাডুন লাগছিন না। সারাদিন কাম হইরা বাড়িত যায়া গুমাইবার পাইছি। পার দিন যদি এক টলি মাল উডাইবার পাইছি তাইলে আটশ’ ট্যাহা। ত্যাল-মবিল, নাউ-টাউ যা আছিন সবই মালিকের। যা অয় অদ্দেক পাইতো মালিক, অদ্দেক পাইতাম আমরা। মিশিন নষ্ট অইলে ঠিকঠাকও হইরা দিতো মালিক। মন্দ আছিলাম না। এই মেশিন দিয়া পাত্তর তুললে ছুডু খাইল অয়। লগে লগেই খাইলো বালু জমা অয়। কুনু ক্ষতি নাই। যেইহানের বালু ওইহানেই থাহে। পাম্প মিশিন অইলে বিরাট খাইল অইতো। পাড় বাইঙা বাইঙা আইতো। ওইডা না এইডা। নাউগুলা বন্দ অয়া আছে। মানুষগুলা কাম ছাড়া বইয়্যা রইছে। হাজার হাজার মানুষ খাডে এই নদীত। দরো, একটা পরিবারে আমি অ্যালহা কাম হরি। পরিবারে আরো পাচটা মানুষ আছে। আমি অ্যালহা কাম হইরা যে ট্যাহা পাই হেই ট্যাহায় আরো পাচজুন বাঁচে। আমরা তো কারো ক্ষতি হরি না। কষ্ট হইরা পাত্তর উডায়া কয়েক ট্যাহা ইনকাম হরি। পরিবার লইয়া খাই। আগে লেদ কোদাল দিয়া উডাইতাম। কষ্ট আছিলো বেশি। নদীর জন্ম থাইহ্যা আঙ্গোর এই পাথরের ব্যবসা। যহন দশ ট্যাহা বিশ ট্যাহা পাত্তরের সিফটি আছিন তহন থাইক্কা এই পেশা। নদীর পাড়ের মানুষ মাছ মারতাছে আর পাথর তুইল্যা খাইতাছে। বুট্টার আবাদ আয়া এই কাম ইটটু কমলেও এই ব্যবসা থাইম্যা নাই। খালি আঙ্গোর এইনো না, নদী লেহা যেইনো আছে ওইনো পূর্বপুরুষ থাইক্কা এই ব্যবসাই চলতাছে। ক্ষতি যুদি হরতাম তাইলে তো লগে লগেই বন্দ হইরা দিতো পাত্তর তুলা। এই গ-গুল আগে আছিন না। হেরা যে কি মনে হইরা এইরহম হরতাছে? আমরা তো জানি না, বুজি না। ৫-১০ ফিটের বেশি খাইল অয় না এই মেশিন দিয়া পাত্তর তুললে। পুলিশ আইলে আমরা তো নাউ-টাউ থইয়্যা জান লইয়া পলাই। হেরা আয়া নাউয়ো আগুন দেয়।

বাই, কি আর করবা, আঙ্গোর কপালডাই ফাডা। ফাডা কপাল জুড়া নেয় না। আঙ্গোর মালিক নাহি বেইনছাবি কাম হরে।
কারটে হুনলা সুলতান বাই?
কাইল বিড়ি খাইতে দুহানো গেলাম না, ওইনো শুনছি।
কিরহম বেইনছাবি কাম?

হ্যায় নাহি জমিন আবাদ হরবার দ্যা এক ক্ষণ পরেই লইয়া লয়। জমি দেওয়ার সময় কয়, তিনদোন জমি তোক দিনু। তুই আবাদ করেক। তিনভাগের একভাগ মুই নেইম। আবাদিরা জমিন ঠিক হইরা একক্ষণের আবাদ গরো তুললে, পরেরক্ষণ আওয়ার আগে মালিক কইবো, নারে তোক আর ভুই দিবার নং। তোর দ্বারা আবাদ করা সম্ভব নোয়ায়। আর যদি আবাদ কইরবারয়ে চাইস তাইলে অর্ধেক ভাগ দেওয়া নাগবে। হেরা মনে মনে কয়, এতো কষ্ট করি ভুইটা সমান করনু। দুই-তিনটা ফসল তুইলবার সুযোগ না দিয়া ঘুরি দিবার কয়। আচ্ছা হোক, অর্ধেক ভাগ যখন চায়, দেইম। মালিকের খাছিলতও মনে অয় খারাপ আছে। নাইলে বুইড়া ব্যাডা বিয়া হরছে নাতনীর বয়সী মাইয়ারে।

পুরা খাডাইসমার্কা লোক। দ্যাহো না আঙ্গোর লগে কিরহম চামডালি হরে। এতো কাম হরি তাও হ্যার অয়য়ি না।

হ বাই। এইনো কাম হরবার আওয়ার আগে কইছি, কামডা পাইলে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়াম। নামাজ পড়ছিও। আর মালিক এইরহম ঠ্যাডা ক্যাডা জানতো।
সুলতান বাই, চলো আইজ কাম শ্যাষ হইরা নতুন বাজারো যাই।
আচ্ছা। যায়ামনে।
মালিক আইতাছে।
আইয়ুক।
কি বাবারা, দুপুরে খাওন ভালো হইছে তো?
হ, চাচা বালা অইছে। হলুদটা একটু বেশি না অইলে সবই বালাই আছিন।
ক্ষ্যাতের হলুদ তো, তোমার চাচি আন্দাজ ঠিক আইখপার পায় নাই। কাইল তোমরা টিনের চালাটা ঠিক কইরো। সকাল সকাল কাম ধইরো।

মহিউদ্দিন ভাই, রেডি অইছো।
এই তো প্রায় অয়াই গেছি।
আয়ো। আমি বাইরেই আছি।
আচ্ছা! বিড়ি টানবা নাহি?
এই দরাই।
চলো, আটতে আটতে দরাইয়ো।
রেডি অওয়া শ্যাষ?
হ, শ্যাষ।
শশুরবাড়িত যাও না?
যাই মাঝে-সাঝে।
মাঝে-সাঝে ক্যা?
শ্বশুর যহন ডাহে তহন যাই, অ্যাছাড়া যাই না।
দাওয়াতের আশায় থাহুন লাগবো?
শ্বশুর বেশি বালা না। বেশি গেলে বেশি বেশি কতা কয়। তোমার ছইল-পইল আছে?
আছে, একটা বেডি।
ছইল-পইল মানুষ হরা খুবই কঠিন?

কঠিনয়ি তো। স্কুলো যায়। ট্যাহা-পয়সা দিয়ুন লাগে। বেডা-বেডিরে মানুষ হরা অ্যাহন কষ্টই। দুইদিন পর পর কাপড়-চুপড় দিয়ুন লাগে। স্কুলো কারো কাপড় যদি পছন্দ অয়, বাড়িত আয়া জিদ দরে। কাপড় না দেওয়া পর্যন্ত আর স্কুলো যাইতো না। কি আর হরার? কষ্ট হইরা অইলেও দেই কিইন্যা।

হ বাই, বেডিরে মানুষ হরলে তো কাপড়-চুপড় দিয়ুন লাগবোই।
তুমি আমার বাড়িত দাওয়াত ন্যাও। কাম শ্যাষ হইরা যেদিন যায়াম তার দুইদিন পরে আইবা। নুন-মইচ যা অয় খাইবা-দাইবা, আমোদ-টামোদ হইরা চইলা আইবা।
হ, কামডা থাইক্যা ছুডি পাই, যায়াম আলাপ-পরিচয় যহন অইলো। তুমিও এই গরীবের বাড়িডা দেইখ্যা আইবার পারো সময়-সুযুগ হইরা।
গরিব তো আমিও! মহিউদ্দিন বাই এমনে না কইলেই পারতা।
রাগ হরল্যা বাই? আমি ওইরহম কিছু মনে হইরা কই নাই।
আরে না। চলো, বাজারের বিতরে যাই।

চলবে…

তিস্তা: পর্ব-৮ ॥ হারুন পাশা

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন