তিস্তা: পর্ব-১১॥ হারুন পাশা | চিন্তাসূত্র
৫ ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২০ আগস্ট, ২০১৮ | সকাল ১০:৩০

তিস্তা: পর্ব-১১॥ হারুন পাশা

॥পর্ব-১১॥
৩৪
মহিউদ্দিন বাই, টিনের চালো তারকাটা লাগানোর লাইগা বাড়ি দেই, বাড়ি য্যানো আঙ্গোর বুহো লাগে। এতো কষ্ট আর বালা লাগে না। জীবনডা গেলো কষ্টের পিছোনোই। রইদের মইধ্যে টিনের চালার উপর বইয়্যা বইয়্যা প্যারাক মারুন লাগে। আর কতদিন চলবো?

হ, ঠিকি কইছো সুলতান বাই। হেই কবে থাইক্যা শুরু হরছি এহনো শ্যাষ অয় না। কপালো কি এইত্তাই লেহা আছিন? বাড়িত বউ-মাইয়া থইয়া আইছি। কত্তদিন দেহি না। খালি প্যারাক লাগাও ঠাস ঠাস।

হ, বাড়িত গেলে নাউয়ো টিকা ছ্যাচড়াই। আর এইনো টিনের চালো। নাউয়ো রাইতো ছ্যাচড়াই, এইনো দিনো। ঠাডাত, বৃষ্টিত, শীতো চলেই ছ্যাচড়ানি। আমরা যায়াম কই?

আমরা যে কষ্ট হরতাছি, আঙ্গোর ছাওয়াল-পাওয়ালরে এই কষ্ট দিতাম না। কইয়াম, পড়ালেখা হর, বড় অইলে গার্মেন্সো যাইছ। অইনো খাইড্ডা খাওয়াই বালা। এই কষ্ট আঙ্গোরি সহ্য অয় না। পোলাপাইন ক্যামনে সহ্য হরবো?

নদীত পানি থাকলে তাইলে এইতা কাম হরুন লাগে? আজক্যা যদি আগেরডা দইরা থাকপার পাইতাম আরো উন্নতি হরবার পাইতাম।

কি বাহে, তোমরা অ্যালাও টুইখান বান্দা শ্যাষ করেন নাই?

চাচা, টুইডা তো ছুডু না। শ্যাষ তো অইয়াই গেছে।

শ্যাষ করো তাড়াতাড়ি।

সুলতান বাই, এইরহম ক্যাট-ম্যাট বালা লাগে। টুই থাইক্কা নামো। চইলা যাই। এইনো আর কাম হরতাম না।

চলো নামি।

চাচা, আমরা কাম হরতাম না। আঙ্গোরে ট্যাহা দেইন চইল্যা যাই।

মহিউদ্দিন কি হইছে কও তো?

তোমরা খালি ক্যাটর-ম্যাটর করেন। আমরা যত কাম করি তোমার ততোই হয় না।

ক্যাটর-ম্যাটর করি? এইগল্যা কোন ভাষা? শালারা, কাম যখন করবুয়ে না, একহাজারত আটশ’ ট্যাকা নে।

দ্যান, কম দিলাইন যহন এইডা আল্লার নামে ছাইড়া দিলাম। অ্যাকদিন তিনিয়ে এর বিচার হরবো।

সুলতান, বেশি কথা কওয়া শিখছিস। কামটা নেওয়ার সময় তো হাত-পাও ধরলু। আর অ্যালা চটাং চটাং কথা কইস। অকৃতজ্ঞ।

অকৃতজ্ঞ তো তোমরায়।

হারামজাদারঘর ভাগেক অ্যাট থাকি।

সুলতান বাই, আমার পাত্তর তোলা কাম নাই। তোমার মাছ দরাও নাই। আঙ্গোর এরুম হইরা কাম ছাইড়া দেওয়া কি ঠিক অইলো? হরাম কি অ্যাহন?

মন্দ চিন্তা ছাড়ো। চলো। বাড়িত যাই। অ্যাকটা ব্যবস্থা অইবোই।

৩৫
বাড়িতে পৌঁছার পর খেয়াল করলাম তার পেট উঁচু উঁচু লাগে। সে এড়িয়ে যেতে চায়। বলে, স্বাস্থ্য বাড়ছে রে চেংরি। আমি বললাম, চ্যাং মাছের মতো পিছলায়া না যায়া, আসল কথা কওয়া শুরু করেক। অনেক পীড়াপিড়ির পর সে বলে তার প্রেমের গল্প। বলে, ঢাকায় আসার পর অনেক কাজ খোঁজার চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। তারপর আমি যার কাছে আশ্রয় পাই, সে শিখাইলো এই পেশাটা। অনেক চেষ্টা কইরা শিখলাম। পরে বাসে বাসে এইটা-ওইটা বেচি। মিরাজ নামে একজন আমার পিছনে পিছনে যে বাসে উঠে প্রথম দুইদিন বুঝতে পারি নাই, পরে বুঝছি। আমি বেচা শুরু করলে অয় একবারে দশ-বারোটা কইরা কিনে। তার কিনা দেইখা আরো অনেকেই নেয়। একটা হিসাব আছে, কোনো জিনিস যদি কেউ কিনে তাইলে অন্যরাও এইটা কিনতে আগ্রহ দেখায়। সে যে জিনিসটা আগেই কিনতো অন্যরা ওই জিনিসটা কিনতে ভরসা পাইতো। আমার বেচা-বিক্রি ভালো হইতো। অয় বিশ্বাস বাড়ায়া দেয়। অন্যরাও সেই বিশ্বাসের বাতাসে আগাইয়া আসে। প্রত্যেক দিনই সে এরকম করতো। প্রথম এক সপ্তাহ পর সে আমারে বললো, তুমি কই থাকো? আগে তো দেখি নাই। আমি বললাম, সাভারেই থাকি। গোলাপগ্রামে। নতুন আসছি।

আপনে কে? কেন জানতে চান?

আমার নাম মিরাজ। আমিও সাভারে থাকি, তবে আমার গ্রামে গোলাপ নাই খালি ব্যাংক আর ব্যাংক। মানে, ব্যাংকপাড়ায় থাকি।

অর কথা শুইনা হাসি পাইলো। হাসলাম। প্রথমদিন এমনেই গেলো। কয়দিন পর যখন বাসে উঠলাম ওইদিনও এমনই হইলো। সে আমারে দেইখাই আগে বাসে উঠলো। অয় কিনলো অনেকগুলা চামড়ার মানিব্যাগ। সেদিন সবগুলা ব্যাগই বেচা হয়। মনে খুব আনন্দ পাই। অয় কইলো, চলো আমরা চা খাই। গেলাম হোটেলে। চা খাইতে খাইতে অয় বললো আমারে নাকি তার পছন্দ। এক সাথে থাকতে চায়। সেও গোলাপগ্রামে যাইতে চায়। সেদিন আর আমি কিছু কইলাম না। অয় ব্যাংকপাড়ায় যায়, আমি গোলাপগ্রামে চইলা আসি।

জানতে চাইলাম, কি কাজ করে মিরাজ?

সাইতুন বলে, অয় শুভযাত্রা বাসে হেল্পারি করে। সাভারে আইসা বাস থামলে সে আমার লাইগা অপেক্ষা করে। সে জানে আমি ওয়েলকাম বাসে উঠি। আমার সামনে যে বাসটা থাকে ওইটাতেই উঠে। আরো কয়দিন পরে তারে গোলাপগ্রামে আসতে বললাম। অয় আইলো। এইখানে খালি গোলাপ ফুলের আবাদ হয়। অন্য কোনো ফুল নাই। সেদিন খুব সাইজা-গুইজা আইছিলো। পাঞ্জাবি পড়ছিলো। চোখে কালা চশমা। নায়কের মতো লাগছিলো। একেবারে বাপ্পির মতো। পরে অয় আমারে অনেকগুলা গোলাপ কিইনা দিলো। গোলাপের ব্রেসলেট বানাইয়া আমার হাতে পরায়া দিলো। আমরা অনেকক্ষণ ঘুরলাম। অনেকগুলা গোলাপ বিছায়া আমরা শুইয়া রইলাম। অনেক গল্প করলাম। ক্যামন কইরা বিয়া হইবো। বাচ্চা হইলে ক্যামন কইরা বড় করবো। কি নাম রাখবো, সংসার ক্যামনে চলবে, আমিও কাজ করমু না অয় অ্যাকলাই কাজ করবে, এইসব আলাপ করলাম। মাগরিবের আযান দিলে উঠি। অয় বাসায় চইলা যায়। আমিও আসি। এদিন তার লাইগা অনেক ভালোবাসা কাজ করছে। রুমে আইসা খালি তার কথাই মনে পড়ে। মোবাইল নম্বর দিছিলাম। অর কথা মনে করতে করতে মোবাইলে আলো জ্বইলা উঠলো। কাছে নিয়া দেখি অয় কল দিছে। রিসিভ কইরা কথা কইলাম। অয়ও কইলো আমার কথা নাকি তার বেশি বেশি মনে পড়তেছে, এর লাইগাই কল দিছে। ওইদিন ম্যালা আলাপ হইলো। অয় খাইতে কইলো। ঘুমায়া পড়তে কইলো। আমিও এগুলাই কইলাম। এরপর থেকে আমরা সময় পাইলেই আড্ডা দেই। পার্কে যাই। মোবাইলে কথা কই। অয় বাড়ি বদলায়া আমার বাড়ির সামনে ভাড়া নেয়। আমি কাজ সাইরা ফিরলে দেখি অয় খালি শরীলে রুমের মইধ্যে বইসা আছে। অয় আমার দিকে তাকায়া থাকে, আমিও তার দিকে তাকাইয়া থাকি। কোনো কথা কওয়া-কওয়ি নাই। অয় বাইরে থাইকা আইসা শার্ট-প্যান্ট বদলাইলে ক্যামন কইরা বদলাইতো সবই আমার রুম থাইকা দেখা যাইতো। আমি দেখতাম। অয় একদিন বললো চলো ছবি দেখতে যাই। নবীনগরে আর্মিগর একটা হল আছে ওইখানে পরীমণি আর বাপ্পির ছবি দেখি। ছবি দেখতে দেখতে মিরাজ কইলো এই ছবি যেইখানে বানায় ওইখানে যাইবা? আমি কইলাম, হ, যামু। অয় পরের রবিবারে এবডিসি নিয়া যায়। মোবাইলে গান শুনায়, ও সাথিরে যেওনা কখনো দূরে…। তার লগে লগে আমিও কই, তুমি ছাড়া বাঁচি কি করে…। আমারে যেমনে খুশি রাখা যায় অমনেই খুশি রাখে। আমারে নাকি তার দ্যাশে লইয়া যাইবো। মেঘনা নদী দেখাইবো। লঞ্চে যাইবার সময় দুই সাইডে পানি সইরা যায়, ঢেউ ফুইল্যা উঠে, পক্ষি উড়ে, এইসব দেখাইবো।

চলবে…

তিস্তা: পর্ব-১০॥ হারুন পাশা

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন


webcams Etudiantes Live Jasmin Forester Theme